মাটির আলতা ও অন্যান্য কবিতা

চিরঞ্জীব হালদার
কবিতা
Bengali
মাটির আলতা ও অন্যান্য কবিতা

তোমার এক’শ আটটা হৃদপিন্ডের কাছে
প্রতিদিন অক্ষম প্রনাম রেখে আসি।

দোয়াতদানির ভেতর তার অভুক্ত অস্থি।
আবিষ্কার করিলাম তাহার কোন কল্পনাদি নেই।
মায়াকোভোস্কিকে লেখা বকল্মা আজ করতলগত।
তার উপোস দিয়ে কেনা জ্যামিতি বক্স আর অপ্সরা পেন্সিল যৌথ খামারের অবৈতনিক সভ্য।

এই যে নির্বান্ধব কলম
ডুমুর গাছ, আগে কেন আবিস্কৃত হলোনা।
যেমন হয়না মায়ের জন্ম আর মৃত্যুদিন পালন।

 

দুই

খুব ভোরে উঠে টের পাই
মা মেহগনি গাছে জল দেয়।

তার ক্ষীণ তনুতে এত উত্তাপ।
বুড়ো অমাবশ্যায় কনিষ্ঠা কামড়ে বলতো
এখন থেকে তোর সঙ্গে মেহগনি থাকলো।

সব পাতা ঝরে যাবার আগে টের পাই
মেহগনি গাছেটা ক্রমশ ভোর হয়ে উঠছে।

 

তিন

ধাতব রঙের সেই গ্রাম।
আমি শুধু খুঁজে ফিরি ঠিকানা তাহার।

ধুধুলের ফুল থেকে একথাল চাওরমনি ভাতের
সুগন্ধ গৃহস্থের অসুস্থ সানকিতে মেলে দেয়
রূপসী মেধার পালক।

এ গ্রামের সব খঞ্জ ছেলে টোপরের কারিগর।

 

চার

রাজা একটি বালিকা চাইলো।
এই খেলায় কল্পনাদি আমাকে একবার ও
রাজা হতে দিলো না।
সেই সকাল থেকে উঠে ভাবতে থাকি
পাঠ দিয়ে বানানো জ্যামিতিক গোঁফে কতখানি
গদের আঠা দিলে ঠিক ঠাক রাজা মনে হবে।
দূর্গা বিসর্জনের পর জলে ডোবা মটুক
বড়দির লুকিয়ে রাখা ত্যারাব্যাঁকা তোরঙ্গ থেকে চুরি করেছি।

কল্পনাদি তোমার দলে আর খেলবো না
কাল থেকে রানি এক বালক রাজা চাইবে
এমন দলে নাম লেখাবো।

 

পাঁচ

দুধে আলতা রাধা পিসির বর অনিল কেন
কালো বর্ণের।
প্রকৃত কুঞ্চিত কেশ মেয়েদের
স্বামীর নাম কী আয়ান।
দুধ কারবারীরা কী কম কথা বলে।
তাহাদের প্যাঁচানো কথা গুলো
দুধে মিশে গিয়ে সব সাদা আর সাদা।
এই সব ভাবতে গিয়ে প্রেজেন্ট পারফেক্ট
বারবার ভুল হয়।
অনিল বা আয়ানদের প্রতি প্রতুষ্যে
পূর্ব দিগন্ত প্রনাম ভাসিয়ে দিই।

আপনারা এই মূঢ়ের প্রণাম স্বীকার করুন।

 

ছয়

অন্ধকার দাঁড়িয়ে আছে দুয়ারর্মুখী

ও খুকি তুই ভয় পাসনে
দিচ্ছে ঊঁকি।

চোখ না খুলে তীক্ষ্ণ
এতো নজরদারী
অন্ধকারের ভয় পেয়েছে
অন্ধকারই।

আদর অনাদরে ফোটা হাস্নুহেনা
গন্ধ আমরা পাই বা নাপাই বরাত দোষে
মহান কুৎসা ছাড়া
কিই বা করতে পারি

তোমার জন্য প্রকাশক আর
বিন্নি ধানের খই
অলং্করন একটি গোধূলি
পাঠকের হই চই
না হলে সর্বনাশ—
এই বাড়িতে জমিয়ে আড্ডা
দেন গুন্টার গ্রাস
হাত তালি দাও তুমি
আমার জন্য বরাদ্দ থাক
তিন আনার ঝুমঝুমি.i

সন্তান পালনে অক্ষম যে নারী
সে আজ বিবৃতি দেয়
কিভাবে বানাতে হবে ছাদের নার্সারী।
অনেকে ছায়া হয়ে গর্বিত
অনেকে কারন
অনেকে উগরে দেয় বিপদ
অনেকে বিপদতারণ।
এই সব বীজ পত্রের
একজনও নেই প্রকাশক
যে তোমাকে রাত্রি দিয়েছিল সেই দেখি
ধার্মিক বক।
যদি ভূমি ক্ষয়ের কথা বলি
তাহলে হেসে উঠবে জোতদার
যদি পাইনের দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে প্রবন্ধ ফাঁদি
তারলে বাংলার স্যার ধার্য করবেন
হাঁটু ভাঁজ করা বিষন্ন বিকেল।
আমার তো বাবা নেই।
দেওয়ার থাকলেও ছবি নেই,
আমাদের ঘেন্না গুলো এত আটপৌরে যে তা দিয়ে মুদি দোকানি কাকু

দুদিন ধারও দেবেনা। তা ছাড়া আমরা অনেক আগেই জেনে গেছি
আমাদের পোশাক কোন ধোপাই ছোঁবে না।

 

সাত

সোনাতন কাকুই বলতে পারে আধা শ্যামলা
ঈষৎস্থুলাঙ্গী মেয়েটা মালিক কাফুরের বোন কিনা।
অধুনাপ্রচলিত ডিএন এ প্রথায় প্রমান করা যাবে কি তার অশ্বকে ডিহিশালের সরোবরে চুবিয়ে চুবিয়ে আত্মার সদগতি করা হয়েছিল।
প্রমান লোপাটের হেতু তার জড়োয়া থেকে খসে পড়া মতি মাহাত্ম্য মাঝে মাঝে অবৈধ স্বপ্নের ভাগীদার।
সোনাতন কাকু আমাদের আকাশ।
আট পৌরে চাঁদ থেকে বারো ভাতারী উপন্যাসের নায়িকা সংবাদ তার নখদর্পনে।
এই যে আমরা এক গেলাসে ঈর্ষা পানের পর
খেঁকি শিয়ালের গর্ত খুঁজতে থাকি তার ব্রান্ডেড নাম ধরুন ব্ল্যাক গোগোল।
এখানেও সেই সাম্রাজ্য লোভীদের নির্বিবাদী প্রেমিকার আত্মবলী দানের কাহিনি ছাড়ানো।
না সোনাতন মুদি কোন জাতিস্মর নয়।
আমরা জানি না দেবনাগরী হরফ কি ও কেন।
তার ১২ বাই ১৫ ফুটের লক্ষীমন্ত দোকানটার
কোন সহায়ক ছাড়াই রমরম গতিময়।
আর সোনাতন ভুলেও হিসাব মেলায় না
আপনি যদি বলেন দু টাকা তিন আনা হয়েছে তাই সই।
আপনি যদি বলেন কেটে যাওয়া দুধের দাম অমিনাংসিত থাকবে তাই সই।
যতক্ষন না গড়ুর পাখি গল্প দিয়ে ভজিয়ে দেবে সব জমাট তৃষ্ণা।
আমাদের মার্কামারা দারিদ্রের নাম চাতক।
আমাদের জনগনতান্ত্রিক ডানায় উদ্বেল কামধর্মধ্বনি।
এ সব জেনে বা না জেনে সোনাতন কাকা
কোনদিন হিসেবছাড়াই ক্যাশ বাক্স খোলা রেখে অশ্বচরিত মেঘের স্বপ্ন বিলোতে নিরুদ্দেশ।
কোন আয়ুধহীন আমরা তার প্রাচ্য পাহারাদার।

আট

কথা ছিলো
আফিম ক্ষেতের পাশে সব আয়ুধ খুলে
শুয়ে থাকবো।
ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে টের পাই
তুমি আসলে এক তৃষ্ণা।

সারা ঘুমের মধ্যে এখন
গ্যালোপিন ট্রেনের হর্ন বেজে চলেছে।
কথা ছিলো
বৈশালীর স্তব্ধ পর্ণকুঠিরে
বৌধায়ন সংগৃহীত পুঁথির স্বাস্থ্য উদ্ধার।

এখন মাটির বিছানায়
শ্বেত গোলাপের রক্তে ছয়লাপ।
এভাবেই নিজের মৃত্যু সংরক্ষন এর ইতিহাস
জমা হয়।

 

নয়

এক দরিদ্র যুবতী ঠিক কোথায় কোথায় রাত্রি
যাপন করতে পারে।

কুয়াসা দিয়ে টেনেটুনে অঙ্গবস্ত্রে ঢাকা
চমৎকার দেহবল্লরী তা যেন ডাকপিয়নের হাত থেকে গ্রহন করা মুঠোবদ্ধ প্রথম নিয়োগ পত্র।
অথবা
অধুনা গুগুল সৌজন্যে প্রাপ্ত
কল্পনায় বাঁধানো জাদুবাগানে বয়ঃপ্রাপ্ত প্রজাপতির প্রথম উড়ান ছবির সঙ্গে
আপাত ঝাপ্সা সেল্ফি।
ফোটোসপের কেরামতী ছাড়াই তিনিও
সিন্ডিকেট ধারণার জন্ম দিতে পারেন।

এসবের মধ্যে হারিয়ে ফেলতে পারি
যৌন আভিভাবকের বৌদ্ধিক তন্ময়তা।
পাশাপাশি টের পাচ্ছেন সদ্য নতুন মোজার ভেতর উপড়ানো নোখের এক তরফা ক্ষরণ।
আত্মবিশ্বাসের অলিখিত কাহিনি কোন
কালো ব্লেজার পরা আধুনিকা ভাবতে ভাবতে কৃষ্ণনাগরিক বাবুদাকে বলবেন
দিন তো একপাত্তর দার্জিলিং তরল।

এখন
আপনিও অনুভব করতে পারবেন
সিক্ত পোশাক থেকে খসে পড়া
অবৃন্তচ্যুত কনকচাঁপার নিজস্ব ধারাবিবরণী।
খুবই সহজে
তিনি আপনার যজ্ঞকক্ষের আহুতিবাদিক।

 

দশ

গ্রে -সিল্ক আর রেনবো সিকোয়েন্সের পর
আমরা কেহ কারোকে চিনিনা।
দেখা না হওয়াই নিয়তি।

একজন বস্তুনিষ্ঠ বসন্তময়তায় প্রদর্শনে ভীড়ে যাবেন
অন্যজনা লালন জনগোষ্ঠি আর কেতাবের মধ্যে
কতটা বদনামী মাপতে
উদ্ধার করবেন পানকৌড়ির রক্তে সম্পন্ন গৃহস্থের হাসি।
এখন দেখি আলতা সুন্দরীর কাজললতা খোয়া গেলে আমাকেই আদর করে ডাকা হচ্ছে।

অথচ জানতে পারিনি গোলাপ দেখার পর
কেহ হিংস্র হয়ে ওঠে
কেহ কেপ্টোমেনিয়ার আক্রান্ত।
নর্মদাসুন্দরীর পরিব্যাপ্ত আত্মজীবনীর বাতিল অক্ষরদের ডাকা হবে কি পথ্য হিসেবে প্রস্তুত থাকতে।

চিরঞ্জীব হালদার। কবি। মূলত ক্ষুদ্র পত্র -পত্রিকার লেখক। জন্ম- ২০ সেপ্টেম্বর ১৯৬১, গাববেড়িয়া; দক্ষিণ ২৪ পরগণা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। পড়ালেখা করেছেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ডিপ্লোমা। লেখালেখির শুরু গত শতাব্দীর আশির দশক। শুধু কবিতা আর ভালো কবিতাই তাঁর আরাধ্য। এপর্যন্ত নির্মিত কাব্যগ্রন্থ ষোলটি। প্রকাশিত সাতটি। যৌথ সংকলন একটি। সম্পাদিত কবিতা...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..