মাসুদ খানের একগুচ্ছ কবিতা

মাসুদ খান
কবিতা
Bengali
মাসুদ খানের একগুচ্ছ কবিতা

দীক্ষা

পথ চলতে আলো লাগে। আমি অন্ধ, আমার লাগে না কিছু।

আমি বাঁশপাতার লণ্ঠন হালকা দোলাতে দোলাতে চলে যাব চীনে, জেনমঠে
কিংবা চীন-চীনান্ত পেরিয়ে আরো দূরের ভূগোলে
ফুলে-ফুলে উথলে-ওঠা স্নিগ্ধ চেরিগাছের তলায় বসে মৌমাছির গুঞ্জন শুনব
নিষ্ঠ শ্রাবকের মতো, দেশনার ফাঁকে ফাঁকে।
মন পড়ে রইবে দূরদেশে। সাধুর বেতের বাড়ি পড়বে পিঠে,
দাগ ফুটবে সোনালু ফুলের মঞ্জরির মতো শুদ্ধ, সালঙ্কার…

দীক্ষা নেব বটে মিতকথনের, কিন্তু
দিনে-দিনে হয়ে উঠব অমিতকথক,
নিরক্ষর হবার সাধনা করতে গিয়ে আমি হয়ে উঠব অক্ষরবহুল
এই হাসাহাসিভরা ভুঁড়িটি ভাসিয়ে গল্প বলে যাব
কখনো প্রেমের ফের কখনো রাগের…
অথবা ধ্যানের, কিংবা নিবিড়-নিশীথে-ফোটা সুগভীরগন্ধা কোনো কামিনীফুলের।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরবে মঠের মেঘলা আঙিনায়
ওদিকে অদূরে লালে-লাল-হয়ে-থাকা মাঠে পুড়তে থাকবে ঝাঁজালো মরিচ
সেই তথ্য এসে লাগবে ত্বকে ও ঝিল্লিতে।
আমি সেই মরিচ-পোড়ার গল্প বলব যখন—
ঝাঁজের ঝাপটায় উত্তেজিত হয়ে তেড়ে গিয়ে যুদ্ধে যাবে সবে, এমনকি বৃদ্ধরাও।
যখন প্রেমের গল্প— কমলায় রঙ ধরতে শুরু করবে সোনাঝরা নরম আলোয়।
আবার যখন গাইব সে-গন্ধকাহিনি, সেই ভেজা-ভেজা রাতজাগা কামিনীফুলের—
ঘ্রাণের উষ্ণতা লেগে গলতে থাকবে মধুফল দেহের ভেতর।

স্বপ্নভূভাগ

এবার বলো হে ফিরতিপথের নাবিক,
ওহে মাথা-মুড়িয়ে-ফেলা ভিনদেশি কাপ্তান,
সেই দ্বীপের খবর বলো
যেইখানে মানিপ্ল্যান্ট ও সোলার প্ল্যান্টের পাতারা
একযোগে চিয়ার্স-ধ্বনি তুলে পাল্লা দিয়ে
পান করে রোদের শ্যাম্পেন।
কোন প্রজন্মের উদ্দেশে তাদের সেই স্বতঃস্বাস্থ্যপান?

সেই দ্বীপদেশের কথা বলো যেখানে নারীরা
সামান্য একটি কাঠের কুটিরে
ফুটিয়ে তোলে অন্তত বাষট্টি রকমের বাৎসল্য ও প্রীতি।

প্রীতিপরবশ সেইসব কুটিরের কথা বলো, সেই
একটানা মমতালোকের কথা বলে যাও হে কাপ্তান
যে-দেশে নিশুতি রাতে রাধিকাপুরের ঝিয়ারিরা
পথ চলে শিস দিয়ে, তুড়ি বাজাতে বাজাতে।
আর আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে
তালে-তালে পাল্টা তুড়ি বাজিয়ে সাড়া দেয়
নবীন উলটকমলের চটপটে পাতা ও পল্লব।

এবং হঠাৎই, টাশ-টাশ করে কথা বলে ওঠে
তরুণী বনবিড়ালিনীর সদ্য-বোল-ফোটা কনিষ্ঠা মেয়েটি।
তাক লাগিয়ে দেয় দ্বীপদেশের অরণ্য অধ্যায়ে।

নাবিক, অবাক সেই ভূভাগের কথা বলো
যেখানকার মাটি উষ্ণ, অপত্যবৎসল,
যেখানে মানুষ সোজা মাটিতে শুয়ে প’ড়ে
শুষে নেয় অষ্টাঙ্গে ভূতাপশক্তি সঞ্জীবন…
দেহ ও মাটিতে যোগাযোগ হয় একদম সরাসরি,
সোজা ও সহজ।

ও ফিরতিপথের নাবিক, ও মাথা-মুড়িয়ে-ফেলা প্রবীণ কাপ্তান,
আমরাও তো চলেছি উজানে। চলছি তো চলছিই অনিঃশেষ
উত্তর পেরিয়ে আরো দূর উত্তরোত্তর অঞ্চলে…
উগ্র লোনা বাতাসের সোহাগে, লেহনে বিকল হয়েছে আমাদের সেক্সট্যান্ট
মর্চে ধরেছে কম্পাসে, দুরবিনে। চলেছি তবুও।

বহু প্রত্যাশার, বহু সাধ-সাধ্য-সাধনার যোগ্য
স্বপ্নভূভাগ কি এরকমই দূর ও দুর্গম, যোগাযোগাযোগ্য!?

ব্লিজার্ড

আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে ফিরে
সমগ্র নীলিমা তছনছ করে দিয়ে
কোটি-কোটি দুষ্ট দাপুটে শিশু খেলছে হুলুস্থুল বালিশ ছোড়ার খেলা।

অজস্র কার্পাস ঝরছে
লক্ষকোটি বালিশফাটানো তোলপাড়-করা অফুরন্ত তুলা।
যেন তুলারাশির জবুথবু জাতক হয়ে পড়ে আছে ধীরা ধরিত্রী, বিব্রত বেসামাল।
সাথে উল্টাপাল্টা ঝাড়ি একটানা বেপরোয়া বাবুরাম পাগলা পবনের।

আবার কোত্থেকে এক নির্দন্ত পাগলিনীর আকাশ-চিরে-ফেলা ওলটপালট অট্টহাসি
মুহুর্মুহু অট্টালিকায় প্রতিহত হয়ে ছুটছে দিশাহারা দিগবিদিক
ঘরবাড়ি মিনার-ময়দান বাহন-বিপণী আড়ত-ইমারত গাছপালা বন বন্দর বিমান
সবকিছুর ওপর এলোপাথাড়ি থার্ড ডিগ্রি চালিয়ে বের করে আনছে
তুলকালাম গোপন তথ্য, তুলাজটিল শীৎকার।

ডালিম

যুগের যুগের বহু বিষণ্ণ বিবর্ণ মানুষের দীর্ঘনিঃশ্বাসের সাথে
নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড–
তা-ই থেকে তিলতিল কার্বন কুড়িয়ে
জমাট বাঁধিয়ে, কাষ্ঠীভূত হয়ে
তবে ওই সারি-সারি দিব্যোন্মাদ ডালিমের গাছ।
বৃক্ষের যতটা সাধ্য, তারও বাইরে গিয়ে
তবেই-না ওই টানটান বেদানাবৃক্ষ, ব্যাকুল বেদনাকুঞ্জ,
মায়াতরু…রূপাঙ্কুর…রূপসনাতন…
পাতার আড়ালে ফাঁকে-ফাঁকে ফলোদয়
থোকা-থোকা গুপ্ত রক্তকূপিত উত্তপ্ত বিস্ফোরণ
রামধনুরঙে, মগ্নছন্দে
ফলিয়ে ফাটিয়ে তোলে ডালে-ডালে লালাভ ডালিম।

বসে আছি ম্রিয়মাণ…বেদনাবৃক্ষের নিচে, পড়ন্ত বেলায়।
সামনে খুলে মেলে-রাখা একটি ডালিমফল, তাতে
প্রভূত বেদানা-দানা, নিবিড় বেদনাকোষ…আর,
বেদানার দানারা তো আর কিছু নয়, জানি–
টলটলে করুণ চোখে রক্তজমা চাবুক-চাহনি…

ভাবি,
এতসব ডালিমকোষের মধ্যে, ঠিক কোন কোষটি রচিত
আমারই সে ন্যুব্জ ব্যর্থ বিষণ্ণ পিতার বাষ্পঠাসা দীর্ঘশ্বাসের কার্বনে!
ঘনীভূত হয়ে ওই বায়ব অঙ্গার, তিলে-তিলে, অনেক বছর ধ’রে…

 

অলুক, অনশ্বর

তোমরা কারা? কতদূর থেকে এলে?
মনোহরপুর? মধুপ্রস্থ? লীলাস্থলী? অবাকনগর?
কোন যুগেরই-বা তোমরা?
উপলীয়? তাম্র? প্রত্ন? নাকি নুহের আমল?
যে যেখান থেকে, যে যুগ থেকেই আসো-না-কেন
একই জাহাজের যাত্রী আমরা এ অকূল মহাকাশে।

সহযাত্রী, এবং সমবয়সী।
তোমাদের বয়স প্রায় পনেরোশো কোটি বছর, আমাদেরও তা-ই।
যে-যে কণিকায় গড়া দেহ তোমাদের, আমাদেরও তা-ই—
সব উদ্ভব ওই মহাবিস্ফোরণের ক্ষণে।

অমরতা চাও? চাও অন্তহীন পরমায়ু?
বিলাপ থামাও, শোনো, আমরা যে যখনই আসি
অমরতা নিয়েই আসি হে অমৃতের সন্তান—
অলুক, অব্যয়, অনশ্বর, চির-আয়ুষ্মান।
জরা ব্যাধি মন্বন্তর মহামারী অনাহার অত্যাচার গুম খুন দুর্বিপাক দুর্ঘটনা
কোনো কিছুতেই হবে না কিছুই, ধস নেই, মৃত্যু নেই,
ক্ষয়ে যাওয়া ঝরে যাওয়া নেই
শুধু বয়ে চলা আছে, রূপ থেকে রূপান্তরে,
রূপক থেকে ক্রমশ রূপকথায়…
জলে স্থলে মহাশূন্যে অগ্নিকুণ্ডে…কোত্থাও মরণ নাই তোর কোনোকালে…

সাড়ে চারশো কোটি বছরের পুরনো এক সজল সবুজ
কমলা আকারের মহাকাশযানে চড়ে
চলেছি সবাই এক অনন্ত সফরে।

প্রস্থানের আগে

প্রীতি পেলে থেকে যাব আরো কিছুদিন, না পেলে এক মুহূর্ত নয়।

আবার যোগ দেব প্রকৃতির প্রতিটি আয়োজনে—
মেষশাবকের তৃণপ্রাশনের দিনে, জোনাকিদের বিচিত্রানুষ্ঠানে,
বৃষদের বপ্রক্রীড়ায়, সাতভাইচম্পা পাখিদের বেলাশেষের কলহকাণ্ডে,
হরিণ-হরিণীদের বিবাহপ্রস্তাবে,
নবীন পাহাড়ি ঝরনার অভিষেকে, উদ্বোধনে…।

জানি অবহেলা পাব, তবু
কখনো বেহাগ রাগে, কখনো তোটক ছন্দে ঘুরব
রঙচিত্র প্রজাপতিদের পিছু পিছু
বাজি ধরব শিকারসফল উদবেড়ালের অন্তরা থেকে সঞ্চারী অবধি
জলপলায়নরেখা বরাবর।

বহুকাল আগে ভুলে-যাওয়া সহপাঠীদের ঝিলিক-মাখানো
মর্নিং স্কুলের রোদ এসে পড়বে গায়ে
সেই রোদ দিয়ে সেরে নেব শান্ত প্রভাতি গোসল।

প্রীতি পেলে থেকে যাব, না হলে এক মুহূর্ত নয়।

মাসুদ খান। কবি, লেখক ও অনুবাদক। জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, বাংলাদেশের জয়পুরহাট জেলায়। বর্তমান নিবাস কানাডার অন্টারিও। তাঁর পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ। প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। পেশাগতভাবে তড়িৎ ও ইলেকট্রন প্রকৌশলী। প্রকাশিত বই: 'পাখিতীর্থদিনে' (১৯৯৩, পুনঃপ্রকাশ ২০১৯), 'নদীকূলে করি...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..