মায়াবাড়ি

জাকিয়া খান
গল্প
Bengali
মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল। হোমওয়ার্ক করছিল, টেবিলে ঝুঁকে। আমি শিউরে উঠি। কোত্থেকে এসেছে শব্দটা! আজকাল বাসাগুলো লাগোয়া থাকে। যেন বেডরুমে কথা বললেও অন্য বাসা থেকে শোনা যাবে।

বাবুই খাতার ওপর থেকে চোখ সরিয়ে ডানে বাঁয়ে মাথা ঘুরিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে। মায়ের আনমনাভাবের সুযোগটুকু পুরোপুরি কাজে লাগাল।

‘মা, আরও পড়ব?’

ছেলের প্রশ্নের উত্তরে মাথা নেড়ে ‘না’ বলামাত্রই বাবুই বইখাতা গুছিয়ে ব্যাগে ভরে নেয়। যদি মা আবার পড়াতে বসে!

এমনিতে পড়তে বসলে পড়া অবশ্য শেষ করে ঠিকমতোই। ফাহমি হাজারবার কৃতজ্ঞতা জানায় এমন লক্ষ্মী বাচ্চা পেয়ে। মুগ্ধ চোখে ছেলের দিকে চেয়ে থাকে মাঝে মাঝে, এই দেবশিশু কীভাবে ওর হলো! মনে মনে বলে, ‘সুস্থভাবে বড় কোরো তুমি সৃষ্টিকর্তা’। একটুখানি ছুঁয়ে দেয় বাচ্চাটাকে। বাবুইও কোল ঘেঁষে থাকে।

‘মা, কে বকা দিচ্ছে এত জোরে জোরে?’

‘তোমার মতো দুষ্ট করেছে হয়তো কেউ।’

‘আমি তো আর করি না মা।’

‘ওরে সোনা বাবান!’ বুকে চেপে ধরি বাবুইকে।

বিবাহপূর্ব ডিড মেনে সৌম্য আর আমার দ্বিমত, উত্তেজনা, রাগ বা বিরোধিতা প্রকাশ বেশ ঠাণ্ডা, বাবুই অভ্যস্ত তাতে। আর কখনও খুব তেতে উঠলে তার মীমাংসা হয় রাতে, যে সময়টুকু কেবল আমাদের দুজনার। সৌম্য আমার বন্ধ দরজায় জোরে কড়া না নাড়লে কিংবা আমার গুটানো হাত ধরে না টানলে আজ এই বাবুইকে কোথায় পেতাম!

ইউনিভার্সিটিতে ফার্স্ট ইয়ারেই আমাদের ৭/৮ জনের একটা ক্লোজ গ্রুপ হয়ে গিয়েছিল। কেউ হোস্টেল, কেউ-বা বাসা থেকে ক্লাস করতাম। সেকেন্ড ইয়ারের দিকে বিয়ে হয়ে গেল দুজনের। ওই বয়সেই আমাদের কেউ কেউ চাকরিও করতাম। তুমুল আড্ডা আমাদের। হঠাৎ নোটিশে ক্লাস না হওয়া দিনে আমরা ঢাকার আশেপাশে বেড়াতাম প্রায়ই। ভর্তাভাত খাওয়ার জন্য ‘নীরব’ খুব পছন্দের জায়গা।

মাস্টার্সে একদিন ১২:৪০ এ ক্লাস শেষ হয়ে গেলে আর কেউ রাজি না হওয়ায় সৌম্য আর আমি গুলিস্তান থেকে ডাবল ডেকারের দোতালার প্রথম সিটে উঠে বসলাম। লক্ষ্যহীন যাত্রা, কেবলই বাস ভ্রমণ। খুব গরম। ঘামছি দুজনই। আমার রুমাল সৌম্যর দখলে।

সৌম্য হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমাদের মেয়েটার মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল থাকবে, বাইকের সামনে বসা ওর চুলগুলো হাওয়ায় উড়তে থাকবে।’

অবাক আমি, ‘মানে কী?’

সৌম্য খুবই ক্যাজুয়াল। ‘বা রে, আমার তো মেয়েই বেশি পছন্দ।’

ও তখনও আমার অবাক দৃষ্টি পড়েনি। মনে মনে বলছি, ‘বাপু, তোমার পছন্দ দিয়ে আমার দরকার কী?’ শব্দহীনতায় সৌম্য ফিরে তাকিয়েছিল।

‘আর কবে আমার উপর তোর ভরসা আসবে বল তো?’ তবু আমার নীরবতা কথা খুঁজে পায়নি। ও খুব জোরে একটা ঝাঁকুনি দিলে আমি বরং বিরক্তি প্রকাশ করেছিলাম। বাস ভ্রমণ পানসে লাগছিল। একসময় বেচারা একতরফা যুদ্ধে ক্ষান্ত দিয়েছিল।

মনগড়া ভাবনায় আটকে পড়া আমি কী ভিতু ছিলাম! সৌম্য মায়া জড়ানো একটা ঘরের দরজার চাবি দিয়েছিল আমার হাতে। তালাবন্ধ ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকা আমার কাঁধ শক্ত হাতে চেপে ধরে বলেছিল, ‘এ আমাদের সুখ-আনন্দ-মায়া ঘর, ভরে তুলব কানায় কানায়। দুজন মিলে।’

অথচ পরদিন থেকে আমি ওকে এড়াতে চেয়েছিলাম। জেদি হয়ে উঠেছিল সৌম্য। জোঁকের মতো লেগে ছিল পরের তিনটা দিন। ইনকোর্স পরীক্ষার তারিখ দিলে আমার এলোমেলোভাব ওর নজর এড়ায়নি। সৌম্য জানত নোট পেলেও আমি রেফারেন্স বই ঘাঁটব। বিকেলে লাইব্রেরিতে আমার টেবিলে নিজেও বই নিয়ে বসেছিল। পড়া শেষে ‘উঠব’ বললে আড্ডা ফেলে আমাকে এগিয়ে দিতে এসে চুপচাপ হাঁটতে হাঁটতে বাসার গেইট পর্যন্ত এসেছিল। আমি প্রায়ই বিকেলের দিকে লাইব্রেরিতে গিয়ে রাত হয়ে গেলে বন্ধুরা কেউ না কেউ ইউনিভার্সিটি এলাকা পার করে দিত।

পরদিন সকালে অফিস যাবার সময় মা জিজ্ঞেস করল, ‘ফাহমি শুয়ে কেন, ক্লাসে যাবি না?’

‘জ্বর জ্বর লাগছে।’

কপালে হাত দিয়ে মা বলেছিল, ‘ওহ, রেস্ট নাও।’

দুদিন ক্লাসে না পেয়ে সৌম্য বাসায় এল। ‘কী করলি সারাদিন’? জানতে চাইলে ওকে সুনীলের “ছবির দেশে কবিতার দেশে” বইয়ের গল্প শুনিয়েছিলাম। খানিক্ষণ বসে ও বই হাতে চলে গিয়েছিল।

‘চল’ পরদিন ক্লাস পরীক্ষা আড্ডা শেষে বাসায় ফেরার পথে সৌম্য বলেছিল। বুঝতে পারছিলাম কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু আইস ব্রেক করতে পারছে না। শহিদ মিনার চত্বরে বসলাম। ‘বল’।

‘ভালোবাসিস?’

‘বাসি, যেমন বাসি বনি-বুলা-পলাশ-রাজিব-অনুকে।’

ও স্বভাববিরুদ্ধ চিৎকারে ফেটে পড়েছিল। ‘আমি যে তোর কষ্টে পুড়ি ওটা কিছু নয়? পাশে থেকে সব শেয়ার করতে চাই তার কোনো আলাদা মূল্য নেই? তোর সব ভয় দূর করে তোকে সুখী করতে আর নিজেও হতে চাই ওটা কেবলই যেকোনো চাওয়া? একসাথে বুড়ো হতে চাওয়া অপরাধ?’

ওর তুমুল উচ্চগ্রামের বিপরীতে আমার অসহায় উচ্চারণ, ‘আমি যে সুখী হবার মন্ত্র জানি না, সুখের বসতি চিনি না!’

আমার হাতদুটো নিজের হাতে পুরে বলেছিল, ‘সারাজীবন ধরে রাখব- উত্তাল ঢেউয়ে, জোছনামাখা চরাচরে, অসমান পথে। বিশ্বাস কর।’

‘আমার সময় লাগবে।’

লেগেছিল অনেকদিন। তারপর একদিন আমি বিশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে পেরেছিলাম। সেই শুরু আমাদের চারপায়ে চলা। আমাদের দুজনের ‘কী কী করব’ শিরোনামে এ একটা ডিডপত্র আছে। গোপন, কাবিননামার চেয়ে বেশি যত্নে রাখা।

জ্যোতির চিৎকারে ফিরে এলাম। ছেলেটা এত হামহুম করতে পারে! পাশের ঘর থেকে জানতে চাই, ‘কী হলো বাবাই?’

‘কিছু না মা, খেলি।’

বাবার সাথে কিছুক্ষণ হুটোপুটির পর আওয়াজ পাচ্ছি দাদুর রুম থেকে, দুজনের খুনসুটি মজাই লাগে।
আর আমি ঘুরে এলাম কত পেছনে! সৌম্যর কতদূর, কোনো হেল্প লাগবে নাকি দেখে আসি।

‘কী অবস্থা, খাবে না?’

‘এই তো শেষ।’

‘কিছু লাগবে?’

‘লাগবে একটা, দাও। হা হা হা… জাস্ট রিভিউ করছি, প্রায় শেষ।’

‘তুমি না! আচ্ছা… শেষ করো।’

বারান্দার রকিং চেয়ারটায় বসলাম। ‘বাবা আপনি আর একবার যদি মাকে এই কথা বলেছেন তো আজকে খারাপ হয়ে যাবে।’ ‘তোমরা এর মধ্যে কথা বলছ কেন? এটা আমার আর তোমার মায়ের ব্যাপার।’ আশ্চর্য, একই উচ্চারণ, একই ভঙ্গী! উল্টোদিকের বিল্ডিংয়ে চাবুকের মতো বাড়ি খেয়ে ফিরে আসা তুমুল শব্দে মাথার ভেতরটা ফেটে পড়তে চাইছে। উফফ্।

সৌম্য পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, টের পাই। ও সম্ভবত একই শব্দ শুনেই উঠে এসেছে। আমি ফুঁপিয়ে উঠি, ‘মন…’

কোথাও কেউ যেন ফিসফিস বলে যায়, ‘আমি, আমরা, বাবুই… সবটা মিলেই আমাদের রাজ্য! আমাদের সুখঘর, আমাদের মায়াবাড়ি।’

বুঝতে পারি, আমার চোখ ভেজা। সৌম্য আমাকে অন্ধকার বারান্দায় পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে রইল। আমি ওর নরম পেটে মাথা ঠেকিয়ে ওর নিশ্বাসে শুনতে থাকি, ‘আমি আছি, আমি আছি’…

 

জাকিয়া খান। গদ্যকার। জন্ম ১৯৭১ এর নভেম্বর, বাংলাদেশের ঢাকায়। পড়াশুনো করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'বাংলা সাহিত্য' বিষয়ে। পেশাগত জীবনে তিনি শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশিত বই: ‘বিশ্বের আলোচিত ১০ ক্ষমতাধর নারী শাসক’ (প্রবন্ধগ্রন্থ, ২০১৪), এবং ‘আমাদের পাখিরা’ (শিশুতোষগ্রন্থ, ২০২০)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ