মিনুর জীবন ও রূপান্তর বিষয়ক গালগল্প

সুদীপ ঘোষাল
গল্প
Bengali
মিনুর জীবন ও রূপান্তর বিষয়ক গালগল্প

 

ঋণে জর্জরিত গরীবলোক মিনু দাস, খুব চিন্তিত হয়ে পায়চারি করছে।রাতদিন তার বাড়িতে কাবুলিওয়ালা থেকে শুরু করে এলাকার মহাজনদের আগমণ।কেউ কেউ হুমকি দেয় খুন করার আবার কেউবা পিঠে দু চার ঘা বসিয়ে দেয়। মিনু দাস মুনিষ। এখন তার বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। শরীরটা তার, ঠিকমত না খেয়ে পাকিয়ে গেছে দড়ার মত। অবসন্ন দেহ আর বিষন্নতা তার সঙ্গি।তবু জীবনকে সে ভালোবাসে।সে বাঁচতে চায় হাজার বছর। পৃথিবীতে সে একা। অবিবাহিত, ভবঘুরে মিনু গ্রামে একটা মাটির ঘরে থাকে। এটা তার পূর্বপুরুষের বাড়ি। বাড়ির পাশে বাগান, তারপর একটা পুকুর। নানারকম পাখি,সাপ,ব্যাঙ,বুনোহাঁস, কচ্ছপ তার বন্ধু। কচ্ছপটার নাম টরেটক্কা। মিনু তার নাম ধরে ডাকলেই টরেটক্কা জল থেকে উঠে আসে, তার কাছে কিছু খেয়ে আবার জলে নামে।
মিনু ধার করে মার খায়। শোধবোধ হয়ে যায়।সাধকের মত দাড়ি বা পোশাক তার নেই।ভোটার হলেও ভোট দেয় না। কেউ ওকে কোনো সাহায্য করে না। মিনুর কোনো অভিযোগ নেই।না খেয়ে থাকার একটা অভ্যাস তার হয়েছে। খাবার কোনোদিন পেলে খেয়ে নেয় উদাসিনভাবে। আপনি তাকে দেখলে কোন পর্যায়ে ফেলবেন। মানুষ এখন আর তার খোঁজখবর কম নেয়।
মিনু দাস ক্লাস টুয়েলভ অবধি পড়াশোনা করেছে। তখন সে মাষ্টারমশাইয়ের কাছে শুনেছে কচ্ছপের কথা, কেন তারা এতবছর বাঁচে, তাদের কোন শ্রেণিতে ফেলা যায় ইত্যাদি। মাষ্টারমশাই ক্লাসে পড়াতেন, সরীসৃপের কথা।
তিনি বলতেন,কচ্ছপের শরীরের উপরিভাগ শক্ত খোলসে আবৃত থাকে যা তাদের শরীরকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রক্ষা করে। কচ্ছপ পৃথিবীতে এখনও বর্তমান এমন প্রাচীন প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে কচ্ছপের প্রায় ৩০০ প্রজাতি পৃথিবীতে রয়েছে, এদের মধ্যে কিছু প্রজাতি মারাত্মক ভাবে বিলুপ্তির পথে রয়েছে। বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আহার্য হিসেবে গ্রহণের কারণে এটি বিলুপ্তির পথে। কচ্ছপ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তা নিজের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পরিবর্তন করতে পারে, সাধারণত এ ধরনের প্রাণীদের ঠান্ডা-রক্তের প্রাণী বলে অভিহিত করা হয়। অন্যান্য প্রাণীর মত এরা নিশ্বাস গ্রহণ করে। কচ্ছপের অনেক প্রজাতি পানিতে বা পানির আশেপাশে বাস করলেও এরা ডাঙায় ডিম পাড়ে।কচ্ছপ সরীসৃপ বর্গের অন্তর্গত ডাঙ্গায় বসবাসকারী জীব। এদের দেহ খোলসদ্বারা আবৃত থাকে। খোলসের উপরের অংশকে ক্যারাপেস এবং নিচের অংশকে প্লাসট্রন , বলে।এরা কয়েক সে.মি. থেকে ২ মিটার পর্যন্ত বড় হতে পারে। এরা সাধারণত দিবাচর প্রাণী তবে তাপমাত্রার উপর নির্ভর করে তারা গোধূলীতেও সক্রিয় হয়ে থাকে। তারা সাধারণত দলবদ্ধ প্রাণী নয় এবং একাকি জীবন যাপন করে থাকে।

একজন বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল,এরা কেন এতবছর বাঁচে।
স্যার বলতেন,গ্যালাপাগোস জায়ান্ট টরটয়েজ প্রজাতির কচ্ছপ বাঁচে গড়ে ১৯০ বছর! বেঁচে আছে এমন দীর্ঘজীবী কচ্ছপের মধ্যে সবচেয়ে বুড়োটির নাম জনাথন। সেন্ট হেলেনার এই কচ্ছপের বয়স কত জানেন? ১৮৪ বছর! আর বেসরকারি হিসাবে সবচেয়ে বেশি বয়সী কচ্ছপটির বয়স ছিল ২৫৫! ২০০৬ সালে সেটি জীবনের ম্যারাথনে ইস্তফা দিয়ে বিদায় নেয় পৃথিবী থেকে। কিন্তু কচ্ছপ কেন এত বছর বাঁচে? প্রশ্নটা নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন বিশ্বের বাঘা বাঘা বিশেষজ্ঞরা। উত্তর মিলেছে, তবে এখনো রয়ে গেছে অনেক রহস্য।
গবেষকেরা দেখেছেন, দৈত্যাকার কচ্ছপের শ্বাস প্রক্রিয়া খুব ধীরগতির। তার মানে এদের শক্তিও ক্ষয় হয় অতি ধীরে। সেই ১৯০৮ সালে জার্মান শারীরবৃত্তবিদ ম্যাক্স রাবনার প্রাণীর আয়ু নিয়ে একটা সূত্র উপস্থাপন করেছিলেন। যেখানে বলা হয়েছিল, প্রাণীর বিপাক প্রক্রিয়া যত দ্রুত, তার আয়ু তত কম। গত শতাব্দীতে এটা নিয়ে অনেক বিজ্ঞানীই মাথা ঘামিয়েছেন। অনেকেরই দাবি, এই সূত্র বা যুক্তি আমলে নেওয়ার মতো নয়। তাই এই সূত্রে আস্থা রাখেনি অনেকেই। তবে এই সূত্রের হাত ধরে ইংরেজিতে একটা প্রবাদই চালু হয়ে গেছে, ‘লাইভ ফাস্ট, ডাই ইয়াং’।
ম্যাক্স রাবনারের সূত্র অনেকে না মানলেও কিছু বিজ্ঞানী অবশ্য রাবনারের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। তাঁদের বিশ্বাস, প্রাণিদেহের মৌলিক কিছু উপাদান ও স্থিতিহীন অণুর সঙ্গে বিপাক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক আছে। এই সূত্র ধরে এগোলে কচ্ছপের দীর্ঘায়ুর একটা সমাধান অবশ্য মেলে। ধীর বিপাক প্রক্রিয়ার কারণে কচ্ছপের শক্তি খরচ হয় কম। আর এ কারণে কোষের মৃত্যুর হারও যায় কমে।
বুড়ো কচ্ছপ প্রজনন করে না।
মিনু জানত,প্রাণায়াম আর বীর্যধারণ দীর্ঘ পরমায়ুর মূলকথা।

মিনু সকালে ওঠে, পুকুরে যায়, রান্না করে তারপর খায়। একবেলা খায়। আর খাওয়া জোটে না। মিনু বন্ধু টরেটক্কার সঙ্গে কথা বলে সময় কাটায়। পাশে বুনোহাঁস বসে থাকে,সাপটা সরসর করে সরে যায়, তেচোখা মাছগুলো তাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।
মিনুর মনে পড়ে না লাষ্ট কবে সে রান্না করে খেয়েছিলো। এখন সে টরেটক্কার সঙ্গে সাঁতার কাটে,তার খাবার খায় আর সারদিন পুকুরেই থাকে। মিনুকে গ্রামের লোক দেখতে পায় না। সকলের প্রশ্ন,ছেলেটা গেল কোথায়?
মিনু অনুভব করে একদিন তার আর মানুষের মত শরীর নেই। কেমন জলে সাঁতারকেটে বেড়ায়। টরেটক্কার সবকথা বুঝতে পারে। মিনু বুঝতে পারে সে আর মানুষ নেই, কচ্ছপে রূপান্তরিত হয়েছে। কি করে? তার মাথায় আসে না।
মিনু ভাবে,জল রূপান্তরিত হয়ে বাষ্প হয় আবার বাষ্পও জলে পরিণত হতে পারে। রসায়নাগারে বিজ্ঞানের সাহায্যে রূপান্তরের ক্ষমতা সে দেখেছে কিন্তু এখানে মনের ইচ্ছের ফলে রূপান্তর ঘটেছে।মানসিক শক্তি কিন্তু মিনুর গলার রোগ ভাল করে দিয়েছিল।
ইচ্ছেশক্তি থাকলে অনেক অসম্ভব কাজ সহজ হয়ে যায়।
লক্ষমাত্রা আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে প্রভাবিত করে, তখনও, যখন আমাদের পরিবারের কেও ক্যান্সার আক্রান্ত হন. এমনটাই হয়েছে শ্রেয় লয় এর ক্ষেত্রে, যিনি একজন ক্যাম্বোডিয়ার ব্যবসায়ী এবং নাকের ক্যান্সার থেকে সুম্পূর্ণ সুস্থ হয়েছেন, এবং পরে জানতে পেরেছেন যে তার ভাইও একই রোগে আক্রান্ত. ” যা হবার, তা হবেই. যদি কিছু হয়ে থাকে আমরা তাকে পূর্বের অবস্থায় নিতে পারবোনা।আমাদেরকে এর বিরদ্ধে লড়াই করে এগিয়ে যেতে হবে।

গ্রামের সুদখোর সুরেশবাবুর নজর পড়ে মিনু দাসের বাড়ির উপর। একদিন বাড়ি দখল করার জন্য লোকজন নিয়ে রাতে সবাই দেখে, ঘরে একটা কচ্ছপ আর মিনু দাস বসে আছে। সুরেশ বললেন,তোকে আর দিনে দেখা যায় না, তাই ভাবলাম একবার তোর ঘরটা দেখে যাই। তা বাবা এই কচ্ছপ কি তোর পোষা। মিনু বলে,আমিও কচ্ছপ, এ আমার বন্ধু কচ্ছপ। লোকজন ওকে পাগল মনে করে পালিয়ে যায়। আর আসে না।
আসলে ব্যাপারটি হয়েছে কি এক প্রাণী থেকে আর এক প্রাণীতে রূপান্তরের ক্ষমতা বা কৌশল, মিনু করায়ত্ত করেছে। এখন সে কচ্ছপ কেন, সাপ,হাঁস ইত্যাদি জীবে নিজেকে রূপান্তরিত করতে পারে। এক একজন তো শূণ্যে ভাসতে পারেন, অনেক তান্ত্রিক অসম্ভব কাজও করে থাকেন। মানুষের ভেতর এক বিশাল শক্তি লুকিয়ে আছে তার নাম ইচ্ছাশক্তি। যে শক্তি অফুরন্ত সম্ভাবনার দ্বার। এই অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তিকে যদি সত্যিকারার্থে জাগ্রত করা যায় তাহলে সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে হলেও বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব। অদম্য ইচ্ছাশক্তি সাফল্যের অন্যতম সোপান। অদম্য, অজেয় ইচ্ছাশক্তি যার রয়েছে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা তারই সবচেয়ে বেশি। সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছার জন্য প্রয়োজন ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করা। কিন্তু অনেক সময় মানুষ তার ইচ্ছাশক্তিকে জাগ্রত করে না। নিজের ভেতরের ইচ্ছাশক্তিকে নিজের মাঝেই ঘুম পাড়িয়ে রাখে। নিজেকে ছোট মনে করে। না পারার ভয়কে জাগ্রত করে রাখে। অথচ নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে যদি জাগিয়ে তোলা যায় তাহলে যেকোনো সাফল্য অর্জন করা যায়।একটি প্রসিদ্ধ প্রবাদ বাক্য আছে, Where there’s a will, there’s a way অর্থ- ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। সেই আদিকাল থেকেই এ প্রবাদ বাক্যটা মানুষের মুখে মুখে চলে আসছে। ছাত্রছাত্রীরাও তাদের খাতায় এ বিষয়ে অসংখ্যবার ভাবসম্প্রসারণ লিখেছে। শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে এ বিষয়ে প্রতিনিয়তই পাঠদান করে যাচ্ছেন। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো ইচ্ছা নামক এই অফুরন্ত শক্তি প্রত্যেক ব্যক্তির মাঝে লুকিয়ে থাকলেও তার ব্যবহার লক্ষ করা যায় না। ইচ্ছাশক্তিকে ব্যবহার করে জীবন পরিচালনার উপায় তথা কাজের সাফল্যে পৌঁছার কোনো তৎপরতা অনেকের মাঝেই অনুপস্থিত থাকে। যদিও সঠিকভাবে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করা এবং সে ইচ্ছাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা সত্যিই কষ্টকর ব্যাপার। কিন্তু ইচ্ছাশক্তি প্রবল হলে মানুষ পারে না এমন কোনো কাজ নেই।ইচ্ছা করলেই মানুষ অসাধ্যকে সাধন করতে পারে। কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হয়েও সাফল্যকে ছিনিয়ে আনতে পারে। সেটা হলো নিজেকে দুর্বল না ভাবা, আত্মবিশ্বাস রাখা, ব্যর্থ হওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা। নিজের মাঝে যে বিশাল ইচ্ছাশক্তি লুকিয়ে আছে এর ওপর অনেকেরই বিশ্বাস নেই। অনেকেই ভাবেন ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়, এটি তার জন্য প্রযোজ্য নয়। যারা নিজের জন্য ইচ্ছাশক্তি প্রযোজ্য নয় বলে আলসেমি করেন তারা মূলত তার ভেতর লুকিয়ে থাকা অফুরন্ত শক্তিটাকেই তিলে তিলে শেষ করে দেন, ধামাচাপা দিয়ে রাখেন। অথচ ইচ্ছাশক্তিকে প্রবল করেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লে ফলাফল বের করে নিয়ে আসা সম্ভব।

মিনু দাস বৈশাখ মাসে এক অমাবস্যায় তান্ত্রিকসাধক বিভূতিবাবার কাছে গেল। মিনু সব কথা খুলে বললো সাধককে।সাধক বললেন,তুই কচ্ছপ হতে পারিস? দেখ তো ঠিক এইরকম কি না?
মিনু অবাক। সাধক কচ্ছপ হলেন। আবার তিনি বললেন, ইঁদূর হতে পারিস?
মিনু দেখল তার সামনে একটা ধেড়ে ইঁদূর দৌড়ে চলে গেল।
সাধক নিজের আসনে বসে বললেন,লোকনাথবাবার নাম শুনেছিস?
– হ্যাঁ, বাবা
– তিনি তো বাঘ,কুকুর সবকিছুতে পরিবর্তিত হতে পারতেন।
– আজ্ঞে, চাঁদে আর পাদে। উনি হলেন মহাপুরুষ।
– সাধক হতে গেলে সরল হতে হয়। জীবকুলকে ভালোবাসতে হয়। তুই তো জীবে প্রেম করিস। যাঃ মেলা বকিস না। নিজের আনন্দ নিয়ে থাক।
মিনুকে চুপ করে থাকতে দেখে বললেন সাধক,পরমনােবিদ্যা বা Parapsychology নিয়ে আলােচনার গভীরে ঢােকার আগে Parapsychology-র বিষয়বস্তু কী? সংজ্ঞা কী? এগুলাে আগে জানা থাকলে পরবর্তী আলােচনায় আমাদের ঢুকতে কিছুটা সুবিধে হবে।যুগ যুগ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধর্মগুরু, পুরােহিত, ওঝা-গুণিন ইত্যাদির উৎপত্তি হয়েছে, হচ্ছে এবং জানি না আরও কত যুগ ধরে হবে। এই সব শ্রেণীর লােকেরা বারবারই নিজেদের প্রচার করেছেন, বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী বলে। আমাদের সাধারণভাবে পাঁচটি ইন্দ্রিয় আছে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক। বিশেষ কোনও কারণে ইন্দ্রিয় পাঁচের কম হতে পারে। কিন্তু পাঁচের বেশি হতে পারে না। এই পাঁচটির কোনও এক একাধিক ইন্দ্রিয়ের দ্বারা কোনও কিছু অনুভব করি। ক্ষমতালােভী কিছু মানুষ নিজেদের ষষ্ঠ ইন্দ্রয়ের অধিকারী বলে দাবি করে। এরা তান্ত্রিক, ওঝা বা অতীন্দ্রিয় ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবি করেন। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা পাওয়া অতিরিক্ত অস্বাভাবিক ক্ষমতার নাম দিয়েছেন, ‘অতীন্দ্রিয় ক্ষমতা’।Parapsychology বা পরামনােবিদ্যা গড়ে উঠেছে অতীন্দ্রিয় অনুভূতি জাতিস্মর ও মৃতব্যক্তির আত্মার সঙ্গে যােগাযােগকে আশ্রয় করে।পরামনােবিদ্যার ওপর গত কয়েক বছরে বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। সবগুলাে পড়ার সুযােগ না হলেও কয়েকটি পড়েছি। তাতে লক্ষ্য করেছি নতুন তথ্যের অভাব এবং পুরনাে তথ্যগুলােকেই বিজ্ঞানগ্রাহ্য করে তােলার চেষ্টা। পরামনােবিজ্ঞানীদের একটা প্রচেষ্টা বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতাে, তা হলাে, ওঁরা প্রমাণ করতে চান রাশিয়ার মতাে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে বিশ্বাসী দেশের বিজ্ঞানীরাও পরামনােবিদ্যায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বাসী।
মিনু সব শুনে আনন্দিত মনে বাড়ি ফিরে বন্ধু সাপের কাছে গিয়ে তার সঙ্গে খেলা করতে লাগলো।সে ভাবলো,ভগবান কত দয়াময়, তা না হলে চালচুলোহীন গরীবকেও তিনি অনেক ক্ষমতা দিয়েছেন।
মিনু তার মায়ের কথা বলে টরেটক্কাকে।সে বলে,
চোদ্দ বছর বয়সে মায়ের বিয়ে হয়েছিল। তখন থেকেই মায়ের স্বাধীনতা ডোবাপুকুরের শানবাঁধানো সিঁড়িতে থমকে গিয়েছিল। তবু ছোট পিসির প্রশ্রয়ে দরজাঘাটে তাল কুড়োনোর বেলা, ঘেটো রুই ধরার পালা, মাকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল। কিছুটা ডানা মেলে ওড়া,কিছুটা বাবার বাড়ির স্বাদ। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবার মত মা নতুন পুকুর সাঁতরে এপাড় ওপাড় হত। শাড়ি পরে মায়ের সাঁতারকাটা দেখে কাকা আর পিসি অবাক হত। তারাও মায়ের পিঠে চেপে সাঁতার শিখত। কাকা আর পিসির মাতৃস্নেহের অভাব মা অনেকটা পূরণ করে দিয়েছিল। আমার মা তাদের মানুষ করে তুলেছেন সন্তানের আদরে। অভাবের ঘরে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তবু ঠাকুরদা হাসিমুখে মায়ের হাতের রান্না তৃপ্তি করে খেতেন। সকলকে খাওয়ানোর সময় মায়ের খেয়াল থাকত না নিজের খাওয়ার কথা। ঠাকুরদা বলতেন,তোমার ভাত কই? মা হাসিমুখে জল খেয়ে দুপুরে মাটির দোতলা ঘরে বিশ্রাম নিত। এরকম কত রাত দিন যে কেটেছে তার ইয়ত্তা নেই। তবু হাসিমুখে মা আমার সংসারের সমস্ত কাজ সেরে বর্ষার উদ্দামতায় সাঁতরে পেরোতেন সংসার নদীর এপাড়, ওপাড়। তারপর একদিন ঘোর অমাবস্যায় ঢেকে গেল মায়ের অন্তর কাকার মৃত্যুতে। পিসিও চলে গেলেন। বাবা চলে গেলেন। মা আর সাঁতার কাটেন না। তালপুকুরে তাল পচে যায়। ঘেটো রুই ঘাটে আসতে ভুলে যায়। না হেঁটে মায়ের পায়ের জোর কমে যায়। এখন ছেলেদের আশ্রয়ে তাঁর সংসার নদী পারাপারের একান্ত সাধনায় স্মৃতিগুলোই হাতিয়ার।
মিনু মানুষের সঙ্গ ভালোবাসত।সে বেড়াতে যেত গ্রামে গ্রামে। সে তার বন্ধুদের বলছে পূর্বের কথা,মায়ার কথা।সে বলে,আমি বাড়ির কাছাকাছি অঞ্চলে ঘুরতে ভালোবাসি। গ্রামের পরিবেশে সেখানকার লোকজনের গায়ের কস্তুরি গন্ধে আমি আত্মহারা হয়ে রবীন্দ্র সংগীত গাই অনভ্যস্ত কন্ঠে। আমার লোম খাড়া হয় ভ্রমণের নেশায়।হাওড়া থেকে কাটোয়া। তারপর শিবলুন স্টেশন থেকে টৌটো তে আধঘণ্টা যেতে হবে। কিংবা
বড় বাস স্টপেজে নেমে ঢালাই রাস্তা ধরে নবগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিস পেরিয়ে, সর্দার পাড়া পেরিয়ে চলে এলাম ভট্টাচার্য পাড়ায়।পুরোনো মন্দির আর মসজিদ,গির্জা আমার মন টানে। কালের প্রবাহে সেগুলো অক্ষত না থাকলেও পুরোনো শ্যাওলা ধরা কোনো নির্মাণ দেখলেই আমি তার প্রেমে পড়ে যাই।অমরবাবু ছিলেন ষষ্টি তলায়। তিনি মা মঙ্গল চন্ডীর মন্দিরে নিয়ে গেলেন আমাকে।নবগ্রাম অজয় নদীর ধারে অবস্থিত। সবুজে ঘেরা এই গ্রাম। ভট্টাচার্য পাড়ার রঘুনাথ ব্যানার্জী বললেন,মা মঙ্গল চন্ডীর মন্দির অতি প্রাচীন।মায়ের পুজোর পালা পাড়ার সকলের একমাস করে পড়ে।মা দুর্গার পুজোর পালা তিন বছর পর এক একটি পরিবারের দায়ীত্বে আসে।সকলে মিলে পাড়ার পুজো চালায় বছরের পর বছর।হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বাজারে পাড়ায়।এখানে,ঘোষ,পাল,মুখার্জী পরিবারের বাস। মুখার্জী পাড়ার ধ্রুবনারায়ণ বললেন,আগে মুখুজ্জে পুকুরের পাড়ে শিবপুজো হতো।মন্দির প্রায় দুশো বছরেরে পুরোনো হওয়ায় ভেঙ্গে পড়েছিলো।কৃষিকাজের সময় জল না হলে আমাদের বাবা, কাকারা শিবলিঙ্গ বাঁধ দিয়ে জলে ডুবিয়ে দিতেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ হতো ও বৃষ্টি হতো।মানুষের বিশ্বাসে সবকিছু।তারপর গোস্বামী পাড়ায় গেলাম। সেখানে বদরী নারায়ণ গোস্বামীর সঙ্গে দেখা হলো।তিনি বললেন,আমরা নিত্যানন্দ মহাপ্রভুর বংশধর। মেয়ের বংশধর,দৌহিত্র বুঝলেন।আমার কাছে বংশলতিকা আছে। আমি বললাম,বলুন, আমি শুনি।তিনি শুরু করলেন,গঙ্গামাতা, তার স্বামী ছিলেন মাধব চট্টোপাধ্যায়, তার ভিটে এটা।তারপর প্রেমানন্দ,অনন্তহরি,পীতাম্বর,গৌরচন্দ্র,লালমোহন,শ্যামসুন্দর,নিকুঞ্জবিহারী,রামরঞ্জন, বংশগোপাল, বদরীনারায়ণ,বিনোদগোপাল।তারপর তিনি মন্দিরের গাত্রে লেখা বংশলতিকা দেখালেন।আমি ছবি তুলে নিলাম।পড়া যাবে নিশ্চয়।
রাধা মাধবের মন্দিরে বারোমাস কানাই, বলাই থাকেন।অগ্রহায়ণ মাসে এই মন্দিরে রাধামাধব আসেন।তখন সারা গ্রামের লোক প্রসাদ পান।আমার মনে হচ্ছে এ যেন আমার জন্মস্থান। আমার গ্রাম। স্বপ্নের সুন্দর গ্রামের রাস্তা বাস থেকে নেমেই লাল মোড়াম দিয়ে শুরু ।দুদিকে বড় বড় ইউক্যালিপ্টাস রাস্তায় পরম আদরে ছায়া দিয়ে ঘিরে রেখেছে । কত রকমের পাখি স্বাগত জানাচ্ছে পথিককে । রাস্তা পারাপারে ব্যস্ত বেজি , শেয়াল আরও অনেক রকমের জীবজন্তু।.চেনা আত্মীয় র মতো অতিথির কাছাকাছি তাদের আনাগোনা । হাঁটতে হাঁটতে এসে যাবে কদতলার মাঠ। তারপর গোকুল পুকুরের জমি, চাঁপপুকুর, সর্দার পাড়া,বেনেপুকুর । ক্রমশ চলে আসবে নতুন পুকুর, ডেঙাপাড়া ,পুজোবাড়ি, দরজা ঘাট, কালী তলা । এখানেই আমার চোদ্দপুরুষের ভিটে । তারপর ষষ্টিতলা ,মঙ্গল চন্ডীর উঠোন , দুর্গা তলার নাটমন্দির । এদিকে গোপালের মন্দির, মহেন্দ্র বিদ্যাপীঠ, তামালের দোকান, সুব্রতর দোকান পেরিয়ে ষষ্ঠী গোরে, রাধা মাধবতলা । গোস্বামী বাড়ি পেরিয়ে মন্ডপতলা । এই মন্ডপতলায় ছোটোবেলায় গাজনের সময় রাক্ষস দেখে ভয় পেয়েছিলাম । সেইসব হারিয়ে যাওয়া রাক্ষস আর ফিরে আসবে না ।কেঁয়াপুকুর,কেষ্টপুকুরের পাড় । তারপর বাজারে পাড়া ,শিব তলা,পেরিয়ে নাপিত পাড়া । এখন নাপিত পাড়াগুলো সেলুনে চলে গেছে । সাতন জেঠু দুপায়ের ফাঁকে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরতেন মাথা ,তারপর চুল বাটি ছাঁটে ফাঁকা । কত আদর আর আব্দারে ভরা থাকতো চুল কাটার বেলা ।এখন সব কিছুই যান্ত্রিক । মাঝে মাঝে কিছু কমবয়সী ছেলেমেয়েকে রোবোট মনে হয় । মুখে হাসি নেই । বেশ জেঠু জেঠু ভাব ।সর্বশেষে বড়পুকুর পেরিয়ে পাকা রাস্তা ধরে ভুলকুড়ি । আর মন্ডপতলার পর রাস্তা চলে গেছে খাঁ পাড়া , কাঁদরের ধার ধরে রায়পাড়া । সেখানেও আছে চন্ডীমন্ডপতলা , কলা বা গান, দুর্গা তলার নাটমন্দির সব কিছুই । পুজোবাড়িতে গোলা পায়রা দেখতে গেলে হাততালি দিই ।শয়ে শয়ে দেশি পায়রার দল উড়ে এসে উৎসব লাগিয়ে দেয়। পুরোনো দিনের বাড়িগুলি এই গ্রামের প্রাণ। তারপর চলে এলাম গ্রামের মন্ডপতলায়। এই গ্রামে আমার জন্ম। লেখিকা সুজাতা ব্যানার্জী এই গ্রামের কন্যা।তার দাদু ছিলেন ডাঃ বিজয় বাবু।এখনও এই বাড়িগুলো গ্রামের সম্পদ। ডানদিকের রাস্তা ধরে হাঁটলেই খাঁ পাড়া। গ্রামের মাঝে গোপাল ঠাকুরের মন্দির,কৃষ্ঞ মন্দির। তারপরেই রক্ষাকালীতলা। কত ধর্মপ্রাণ মানুষের বাস এই গ্রামে। গোপাল মন্দিরের পুজো হয় বাড়ুজ্জে পাড়ায়।গ্রামের গাছ, পাথর,আমার গান আমার প্রাণ।সেখান থেকে অম্বলগ্রাম পাশে রেখে দু কিলোমিটার টোটো রিক্সায় এই গ্রাম। একদম অজ পাড়াগাঁ। মাটির রাস্তা ধরে বাবলার বন পেরিয়ে স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করতে হবে।তন্ময়বাবু গবেষক।এন জি ও সসংস্থার প্রধান কারিগর বনের সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালেন। তার জগৎ।পশু,প্রাণীদের উন্মুক্ত অঞ্চল।বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে, সেখানে।মা কালীর মূর্তি আছে। কাঁচের ঘরে ইকো সিষ্টেমের জগৎ।কেউটে সাপ, ব্যাঙ থেকে শুরু করে নানারকমের পতঙ্গ যা একটা গ্রামের জমিতে থাকে। বিরাট এক ক্যামেরায় ছবি তুলছেন তন্ময় হয়ে।আমি ঘুরে দেখলাম প্রায় কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে বানানো রিসর্ট।ওপেন টয়লেট কাম বাথরুম।পাশেই ঈশানী নদী।এই নদীপথে একান্ন সতীপীঠের অন্যতম সতীপীঠ অট্টহাসে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে চায় এন জি ও, নৌকায়। তন্ময়বাবু হাতে সাপ ধরে দেখালেন। শিয়াল,বেজি,সাপ,ভ্যাম আছে। তাছাড়া পাখির প্রজাতি শ খানেক।একটা পুকুর আছে। তার তলায় তৈরি হচ্ছে গ্রন্হাগার।শীতকালে বহু বিদেশী পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। তন্ময়বাবু বললেন,স্নেক বাইটের কথা ভেবে সমস্ত ব্যবস্থা এখানে করা আছে। ঔষধপত্র সবসময় মজুত থাকে।বর্ষাকালে ঈশানী নদী কিশোরী হয়ে উঠেছে।এই নদীকে মাঝখানে রেখে বেলুনের চাষিরা চাষ করছেন আনন্দে।এখানকার চাষিরা জৈব সার ব্যবহার করেন। কোনো রাসায়নিক সার প্রয়োগ করেন না। এক চাষি বললেন,আমরা সকলে একত্রে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জৈব সার প্রয়োগ করেই আমরা চাষ করবো।তাতে বন্ধু পোকারা মরবে না। ফলনও হয় বেশি। এক এন জি ও সংস্থার পরামর্শে তাদের এই সঠিক সিদ্ধান্ত অন্য চাষিদের অনুকরণযোগ্য।এই এন জি ও সংস্থার যুবকরা গ্রামের ভিতর কুকুরদের নির্বিজকরণ কাজে লেগেছে।একটা লম্বা লাঠির ডগায় সূচ বেঁধে তাতে ওষুধভরে চলছে কাজ।কোনো প্রাণী আহত হলে তার সেবাশুশ্রূষা করেন যুবকবৃন্দ।সাপ ধরতে জানেন এই যুবকবৃন্দ।কোনো গ্রামে কোনো সাপ দেখা গেলে এই যুবকেরা সেটি ধরে নিয়ে এসে তাদের সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেন।এখনও এই যুবকবৃন্দ কাজ করে চলেছেন মানুষ ও প্রাণীজগতকে ভালোবেসে।বর্ষাকালে প্রচুর বিষধর সাপের আনাগোনা এই অঞ্চলে।এখানে পা দিলেই সাবধানে থাকার পরামর্শ দেন এখানকার কর্মিবৃন্দ।ঘুরে দেখার জন্য গামবুট দেওয়া হয় পর্যটকদের। প্রচুর দেশি বিদেশি গাছ গাছালিতে ভরা এই প্রাঙ্গন। একটি কৃত্রিম জলাধার আছে।তার নিচে লাইব্রেরী রুম তৈরির কাজ চলছে।ওপরে জল নিচে ঘর। কিছুটা তৈরি হয়েছে। শীতকালে প্রচুর পরিযায়ী পাখি এসে হাজির হয়। সেই পাখিদের নিয়েও চলে গবেষণা। তাদের জন্য সব রকমের উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা হয়।আর একটি জলাধারে বিভিন্ন ধরণের মাছ রাখা হয়। পা ডুবিয়ে জলে দাঁড়িয়ে থাকলে পায়ের চামড়ার মৃত কোষ খায় এইসব বিদেশি মাছেরা। ওপেন বাথরুমে ঈশানীর জল উপলব্ধ।এই রিসর্টগুলিতে সর্বসুখের ব্যবস্থা আছে।শীতকালে অনেক বিদেশি পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। রাতে থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থাও খুব সুন্দর।বেলুন গ্রামে ঢুকতে গেলে বাবলার বন পেরিয়ে মাটির আদরে হেঁটে যেতে হবে। এখন অবশ্য শিবলুন হল্ট থেকে নেমে বেলুন যাওয়ার পাকা রাস্তা হয়েছে।টোটো,মোটর ভ্যান চলে এই রাস্তা ধরে।চারিদিকে সবুজ ধানক্ষেতে হারিয়ে যায় মন এক অদ্ভূত অনাবিল আনন্দে।বেলুন ইকো ভিলেজ কাটোয়া মহুকুমার গর্ব।পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম থানার অন্তর্গত কাটোয়া মহুৃুকুমার পুরুলিয়া গ্রামে অবস্থিত মহেন্দ্র বিদ্যাপীঠ স্কুলে প্রায় চার শতাধিক ছাত্রছাত্রী পড়াশুনা করে। এই স্কুল গৃহটির পূর্ব মালিক ছিলেন মহেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পুত্র শ্রী অতুলবাবু এই গৃহটি পিতার নামে দান করেন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে।তারপর শুরু হয় কয়েকজন ছাত্র ছাত্রী নিয়ে পড়াশোনা। আজ সেই বিদ্যালয় পঞ্চাশ বছরে পদার্পণ করতে চলেছে।এবারে মাধ্যমিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপক বিপুল পাল। সে পেয়েছে মোট ৬৪৬নম্বর।বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে পুরস্কৃত করেছে স্বাধীনতা দিবসের দিনে। এক অখ্যাত গ্রামে এই বিদ্যালয় অবস্থিত হলেও এখানে পঠন পাঠন হয় খুব সুন্দরভাবে। প্রত্যেক শিক্ষক ও শিক্ষিকা মহাশয়ের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় প্রত্যেকবার মাধ্যমিকে ভালো ফল হয়। স্কুল বিল্ডিং অনেক পুরোনো। নবসাজে সজ্জিত হওয়ার প্রয়োজন আছে।কন্যাশ্রী ক্লাব,কম্পিউটার রুম, মেয়েদের ক্যারাটে প্রশিক্ষণ,পিরামিড গঠন প্রভৃতি অনেক কিছুই পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে শেখানো হয়। নানারকম অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা প্রভাত ফেরি করে।নাচগান, কবিতা আবৃত্তি ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করে তারা। কন্যাশ্রী ক্লাব মেম্বারের মেয়েরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বাল্য বিবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করে। মেয়েদের কোনো শারীরীক সমস্যা হলে বাড়িতে সাইকেলে চাপিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসে।এখন এই বিদ্যালয়ে নিয়মিত মিড ডে মিল খাওয়ানো হয় ঠিফিনে।আয়রন ট্যাবলেট ও স্যানিটারি ন্যাপকিন বিলি করা হয় নিয়মিত। প্রধান শিক্ষক মহাশয় শ্রী ভক্তি ভূষণ পাল। কম্পিউটার শিক্ষক শ্রী মেঘনাদ সাঁই মহাশয় ছাত্র ছাত্রীদের অতি যত্ন সহকারে পঞ্চম শ্রেণী থেকে কম্পিউটারে দক্ষ করে তোলেন। এই গ্রামে এ এক অতি পাওয়া বরের মত। যে বরে, ছাত্র ছাত্রীরা আধুনিকতার আলোয় আলোময় হয়ে ওঠে।খেলার দিদিমণি মৌ মজুমদার মহাশয়া ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে হিউম্যান পিরামিড,ক্লাপিং ডান্স,হিল পিরামিড প্রভৃতি অভ্যাস করান। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এগুলির প্রদর্শন করানো হয়। সকল শিক্ষক,শিক্ষিকা মহাশয়ের সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে স্কুলের সুন্দর পরিবেশ।শ্রী রাজীব নন্দী মহাশয় ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে বৃক্ষরোপণ উৎসব পালন করলেন মহা সমারোহে।এছাড়া শ্রী বিশ্বরঞ্জন রানো,সুবীর কুমার ঘোষ,শারদশ্রী মন্ডল,সুবীর ঘোষ,শমীক ব্রষ্মচারী,মৌসুমী বিশ্বাস,মৌমিতা বৈরাগ্য, দেবযানী বিশ্বাস,সুদীপ ঘোষাল নীরবে নিভৃতে কাজ করে চলেছেন স্কুলের স্বার্থে।অনিমা পাল,সম্পদ ভাই,নন্দিতাদি নন টিচিং স্টাফের মধ্যে আছেন। বিভাসদা ও আছেন। তারা সকলেই স্কুলের স্বার্থে কাজ করেন।স্বাধীনতা দিবসে ছাত্র ছাত্রীরা অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন পিরামিড প্রদর্শন করলো।তাদের পিরামিড খুব সুন্দর দর্শনীয় এক ব্যালান্সের খেলা।স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যারা জড়িয়ে ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগ ঁহেমন্ত ঘোষাল,ঁশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,অলোকময় বন্দ্যোপাধ্যায়,শ্রী বিজয় চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন ঁধ্রুবনারায়ণ চট্ট্যোপাধ্যায়।অন্যান্য শিক্ষক মহাশয়রা ছিলেন কাশীনাথ ঘোষ,পন্ডিত মহাশয়,হরেরামবাবু,সত্যনারায়ণবাবু,নারায়ণবাবু,অধীরবাবু,চন্ডীবাবু দীপকবাবু,সুকুমারবাবু,মৌসুমী ভট্টাচার্য্য মহাশয়া,কাকলি ম্যাডাম প্রমুখ।সিদ্ধেশ্বরবাবু, গীতা থান্দার,বৃন্দাবনবাবু ছিলেন অশিক্ষক কর্মচারীবৃন্দ।স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির আজীবন সদস্য হলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শ্রী প্রকাশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়।ঠিক সাড়ে দশটায় স্কুলের প্রার্থনা সভা শুরু হয়। ছাত্রছাত্রীরা এই সভায় নিয়মিত পিটির মাধ্যমে একটু শরীরচর্চা করে। তারপর, জনগণ মন অধিনয়ক,এই জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। তারপর যথারীতী ক্লাস শুরু হয়। ক্লাস প্রত্যেকদিন একদম শুরু থেকে শেষ অবধি হয়। সুবীর ঘোষ মহাশয়ের নিজস্ব উদ্যোগে স্কুলের শান্তি শৃঙ্খলা বজায় থাকে।শ্রী বিশ্বরঞ্জন রানো মহাশয়ের অবদান অপরিসীম। এক কথায় তা প্রকাশ করা অসম্ভব।পুরুলিয়া গ্রামের আমাদের এই স্কুলটি গৌরবের শ্রেষ্ঠ চূড়ায় পৌঁছবে এই আশা রাখেন অভিভাবকবৃন্দ।এ জগতে ভাল মন্দের সংজ্ঞা বড় অদ্ভূত রকমের। যে ছেলেটি ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে,সেই আবার খেলার মাঠে অন্তিম স্থানে বিরাজিত। আবার লেখাপড়ায় অকৃতকার্য হওয়া ছেলেটি খেলার মাঠে প্রথম স্থানে বিরাজিত। কেউ খারাপ নয় দৃষ্টিকোণের ভিত্তিতে। যাকে আমরা খারাপ ভাবি সেজন হয়ত সংগীতে, বাদকের ভূমিকায় অতি পারদর্শী। কোনো লোক হয়ত ব্যবসায় বা রোজগারে মন্দ কিন্তু তিনি হয়ত বড় সাহিত্যিক বা কবি। ভালমন্দ তাই আপেক্ষিক শব্দ। কোনো কিছুর সংজ্ঞা খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়। ন্যারোগেজ লাইনের ট্রেন ধরে চলে গেলাম কুমোরপুর হাটতলা হল্ট। মনে করলাম, তাড়াতাড়ি চলে আসব, দুপুরের আগে। পরীক্ষা হয়ে গেছে। বাড়িতে শাসনের দড়িটা একটু ঢিলে হয়েছে। মা বলেছেন, খাওয়ার সময় যেন ডাকাডাকি করতে হয় না। আর সবসময় স্বাধীন এই কটা দিন। বন্ধুরা ডাকল ক্রিকেট খেলা দেখার জন্য। আমাদের ফুল টিম খেলা দেখতে চলে এলাম কুমোরপুর হল্টে বিনা টিকিটে। ভাবলাম খাওয়ার সময়ের আগে বেলা দুটোর সময় হাজির হয়ে যাব মায়ের কাছে। কিন্তু সব উল্টোপাল্টা হয়ে গেল।একটা টিম খেলতে আসে নি। এত আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যাবে ভেবে আমরা কমিটির কাছে একশ টাকা দিয়ে আবেদন করলাম। কমিটি রাজি হল। আমরা মাঠে নামলাম ফুল টিম নিয়ে।পরপর অনেক টিমকে হারিয়ে আমরা ফাইনালে উঠলাম। ফাইনাল খেলা শুরু হবে বিকেল তিনটের সময়। এখন দুটো বাজে। মায়ের মুখটা মনে পরছে। ভাতের থালা সাজিয়ে বসে আছেন নিজে না খেয়ে। যেতে পারলাম না বাড়ি। খিদে লেগেছে খুব । পাশের বাড়ির কাকিমা মাঠের ধারেই বাড়ি। কাকু, কাকিমা দুজনে এসে বললেন, তোমাদের খেলা দেখে ভাল লেগেছে আমাদের। আমরা তোমাদের সাপোর্টারস। এই নাও এক থালা পিঠে তোমরা খাও। আমরা ভালোবেসে বানিয়েছি। আহা খিদে পেটে অই পিঠে একদম অমৃত। পেট ভরে খেলাম। আমার ভাই বাবু বলল, দাদা আজ বাবা চামড়া তুলবে পিটিয়ে। আমি বললাম, কি আর করা যাবে। অন্যায় করলে তো কেউ ছাড়বে না।তারপর ফাইনালে জিতে শিল্ড নিয়ে আমরা ট্রেনে চেপে বাড়ি ফিরলাম। আমাদের বিজয় নাচ দেখতে হাজির হল গ্রামের লোকজন। বাবাকেও ভিড়ে দেখলাম। লাঠি হাতে চিৎকার করছিলেন। শিল্ড দেখে চুপ করে গেলেন। মাকে ডেকে দিয়ে নিজে চলে গেলেন ছাদে।তারপর বাড়ি ঢুকলাম সন্ধ্যাবেলায়। মা তখনও উপোসি। একসঙ্গে খেলাম পিঠে আর খেজুর গুড়। মা পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, তোদের বাবা খুব খুশি। আমাকে ডেকে দিয়ে বললেন, যাও দেখ গিয়ে গ্রামের ছেলেরা খেলে শিল্ড এনেছে। গর্বের খবর গো।তারপর থেকে বাবা আমাদের আর কোনদিন গায়ে হাত দেন নি। আমি দূর দূরান্তে না গিয়ে কাছাকাছি না দেখা গ্রাম বা শহর দেখতে ভালোবাসি।একবার গেলাম বেলুন ইকো ভিলেজ পরিদর্শনে।হাওড়া আজিমগঞ্জ লোকাল ধরে শিবলুন হল্টে নামলাম। সেখান থেকে অম্বলগ্রাম পাশে রেখে দু কিলোমিটার টোটো রিক্সায় বেলুন গ্রাম। একদম অজ পাড়াগাঁ। মাটির রাস্তা ধরে বাবলার বন পেরিয়ে তন্ময়বাবুর স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করলাম।তন্ময়বাবু ঘুরিয়ে দেখালেন। তার জগৎ।প্রায় একশো প্রজাতির গাছ।পশু,প্রাণীদের উন্মুক্ত অঞ্চল।বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে, সেখানে।তার নিজের হাতে বানানো মা কালীর মূর্তি দেখলাম। কাঁচের ঘরে ইকো সিষ্টেমের জগৎ।কেউটে সাপ, ব্যাঙ থেকে শুরু করে নানারকমের পতঙ্গ যা একটা গ্রামের জমিতে থাকে। বিরাট এক ক্যামেরায় ছবি তুলছেন তন্ময় হয়ে।আমি ঘুরে দেখলাম প্রায় দু কোটি টাকা খরচ করে বানানো রিসর্ট।ওপেন টয়লেট কাম বাথরুম।পাশেই ঈশানী নদী।এই নদীপথে একান্ন সতীপীঠের অন্যতম সতীপীঠ অট্টহাসে যাওয়া যায় নৌকায়। তন্ময়বাবু হাতে সাপ ধরে দেখালেন। শিয়াল,বেজি,সাপ,ভ্যাম আছে। তাছাড়া পাখির প্রজাতি শ খানেক।একটা পুকুর আছে। তার তলায় তৈরি হচ্ছে গ্রন্হাগার।শীতকালে বহু বিদেশী পর্যটক এখানে বেড়াতে আসেন। তন্ময়বাবু বললেন,স্নেক বাইটের কথা ভেবে সমস্ত ব্যবস্থা এখানে করা আছে। ঔষধপত্র সবসময় মজুত থাকে।
তারপর বেলুন গ্রামটা ঘুরে দেখলাম। এখানকার চাষিরা সার,কীটনাশক ব্যবহার করেন না। তারপর বিকেলে নৌকাপথে চলে গেলাম অট্টহাস সতীপীঠ।এখানে মা মহামায়ার ওষ্ঠ পতিত হয়েছিলো। সোন মহারাজ এই সতীপীঠের প্রধান। তারপর দেখলাম পঞ্চমুন্ডির আসন।ঘন বনের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। মন্দিরে মা কালীর মূর্তি। রাতে ওখানেই থাকলাম।

তার পরের দিন সকালে হাঁটাপথে চলে এলাম কেতুগ্রাম বাহুলক্ষীতলা। কথিত আছে এখানে মায়ের বাহু পতিত হয়েছিলো। এটিও একান্ন সতীপীঠের এক পীঠ।তীর্থস্থান। সুন্দর মানুষের সুন্দর ব্যবহারে মন ভালো হয়ে যায়।এর পাশেই আছে মরাঘাট। সেখান থেকে বাসে চেপে চলে এলাম উদ্ধারণপুর।এখানে লেখক অবধূতের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।গঙ্গার ঘাটে তৈরি হয়েছে গেট,বাথরুম সমস্তকিছু।শ্মশানে পুড়ছে মৃতদেহ।উদ্ধারণপুর থেকে নৌকায় গঙ্গা পেরিয়ে চলে এলাম কাটোয়া। এখানে শ্রীচৈতন্যদেব সন্ন্যাস নেবার পরে মাথা মুন্ডন করেছিলেন। মাধাইতলা গেলাম। বহুবছর ব্যাপি এখানে দিনরাত হরিনাম সংকীর্তন হয় বিরামহীনভাবে। বহু মন্দির,মসজিদ বেষ্টিত কাটোয়া শহর ভালো লাগলো।কাটোয়ার ২০নং ওয়ার্ডের নন্দনপাড়ায় সনাতন মাঝির বাড়ি।গান বাজনায় ওস্তাদ লোক।সারাদিন রিক্সা চালান আর গানের সুর রপ্ত করেন মিহি সুরে।একদম মাটির মানুষ সনাতন বাবু গানের আড্ডায় বসলে আসর জমিয়ে দেন। বৈশাখ মাসে হরিনাম হয় তারই নেতৃত্বে। সারা বৈশাখ মাস স্টেডিয়াম থেকে প্রান্তিকপাড়া হয়ে নন্দনপাড়ায় হরিনামের দল নামগানে মুখরিত করে তোলে সনাতনবাবুর হরিনামের দল।একদিকে সংসারের চিন্তা আর একদিকে সংগীতের সাধনায় তার সময় কাটে সুন্দর। কোনোদিন তার মুখে কোনো দুঃখের কথা শুনি নি। দুঃখকে জয় করে চলার নামই জীবন। তিনি আরও বলেন,অনেক মানুষের সঙ্গে মিশতে পারলে র মধ্যেই তার অধিষ্ঠান গো…।সম্পদ প্রধান। আমি বলি পিসি।কাটোয়া মহুকুমার সিঙ্গিতে বাড়ি।বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি বছর।ভোরবেলা উঠে তিনটি বাড়িতে বাসন ধোয়ার কাজ করেন। তারপর খবরের কাগজ বাড়ি বাড়ি দিয়ে আসেন। সকলের ফাই ফরমাশি শুনে কাজ করে দিয়ে মাসে আয় করেন তিন হাজার টাকা। ছেলেদের কিছু দেন। বাকিটা নিজের জন্য আর একজন পালিত পুত্রের জন্য রাখেন।তিনি বলেন,শুধু আমার আমার করলে হবে না। অপরের জন্যও চিন্তা করতে হয়।অবসর সময়ে খবরের কাগজ, বই পড়েন। বিকেলবেলা আবার কাজ। বিয়ে হয়েছিলো বাল্য বয়সে। স্বামী আর নেই। ছেলেরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত।তবু কোনো অভিযোগ নেই। কাজই তার মন্ত্র। কাজই তার ধর্ম।ট্রেনে যাওয়া আসা করার সময় কিছু লোক দেখতাম ট্রেনের মেঝেতে বসে থাকতেন স্বছন্দে।তাদের মত আমারও সিটে না বসে মেঝেতে বসার ইচ্ছে হতো।কিন্তু পারতাম না লোকলজ্জার ভয়ে।কি সুন্দর ওরা মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে ঘুগনি খায়।ট্রেনে হরেক রকম খাবার বিক্রি হয়।ওরা দেখতাম টুকটাক মুখ চালিয়ে যেতো।আমি জিভে জল নিয়ে বসে থাকতাম ভদ্র বাবুদের সিটে।তারা হাসতেন না।অপ্রয়োজনে কিছু খেতেন না বা কোনো কথা বলতেন না। ওদের মাঝে গোমড়া মুখে বসে মুখে দুর্গন্ধ হতো।
তারপর গানের এৃক বিকেলে আমি বেপরোয়া হয়ে ট্রেনের মেঝেতে ওদের মাঝে বসলাম। লুঙ্গি পরা লোকটা গায়ে মাটির গন্ধ।বেশ হাল্কা হয়ে গেলো মনটা। লোকটা বললো,ভালো করে বসেন। কত আন্তরিক তার ব্যবহার।তারপর ট্রেনের খাবার খেতে শুরু করলাম।প্রথমেই ঝালমুড়ি।পাশের লোকটাও ঝালমুড়ি কিনলেন।খেতে লাগলাম মজা করে। তারপর এলো ঘুগনি,পেয়ারা,গজা,পাঁপড়,লজেন্স ও আরও কত কি। মনে হলো এ যেন কোনো ভোজবাড়ি।খাওয়ার শেষ নাই।যত পারো খাও। মেঝেতে বসার অনেক সুবিধা আছে।আমাদের দেশে গরীবের সংখ্যা বেশি।তাই গরীব লোকের বন্ধুও হয় অনেক।পথেঘাটে ওরা পরস্পরকে চিনে নেয় চোখের পানে চেয়ে।তাই ওদের মাঝে গরীবের দলে নাম লিখিয়ে আমি ভালো থাকি,জ্যোৎস্নায় ভিজি…
নন্দনপাড়ার সুনীল হাজরা বলছেন আমাকে সাপ ধরার গল্প। কত কষ্ট করে জঙ্গলে একটা বাড়ি করেছেন তিনি। তবু সৎ উপায়ে রোজগার করেন। দুবেলা টিউশানি পড়ান। আর তাছাড়া ফুটপাতের দু একজন শিশুকে ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। তিনি বলছেন,শুনুন আমার কথা।
সাপ নিয়ে গল্প লেখেন নি এমন লেখকের সংখ্যা কমই আছে বলে মনে হয়। কিন্তু আমি যে কাহিনী শোনাবো সেটি একেবারে সত্য ঘটনা আমার জীবনের।ঘরের ভিতরে প্লাষ্টার নেই,বাইরেও তাই।আশেপাশে পাড়া বলতে একটু দূরে নন্দনপাড়া। আমি রাতে চিৎকার করলেও কেউ শুনতে পাবে
না। একদিন রাতে ঘুম ভাঙ্গলে দেখি চার দেওয়ালে চারটি সাপসাচিতি সাপ। আমাকে দেখে থমকে গেলো।এক জায়গায় টর্চের আলো ফেলি তো আর এক জায়গায় অন্ধকার হয়। তখন সাপগুলো নিচে নামার চেষ্টা করে। আমি মশারির ভিতরে চুপ করে বসে থাকি। পাশে ছেলে, স্ত্রী। হঠাৎ স্ত্রীর ঘুম ভাঙ্গলে দেখে সাপ। ভয় পেয়ে যান উনি।বাধ্য হয়ে আমি একটাকে মারতে পারি। কিন্তু বাকিগুলো পালিয়ে যায়। এইভাবে রোজ সাপের মুখোমুখি হতাম আমরা। তারপর পাশে একটু জায়গা ।সেখানে আরও একটা ঘর তৈরি হলো। রান্নাঘর হলো।ডাইনিং হলো।কষ্ট করলে যে কষ্ট মিলে যায় একথা ষোলোআানা সত্যি। কিন্তু আরও ঘটনা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। পাশের ঘরে এবার আমি একা শয়ন করতাম। পুরোনো বড় ঘরে মা আর ছেলে। এখন ভেতর বাইরে সব প্লাষ্টার, রং হয়েছে। অসুবিধে নেই।আবার একদিন আমার শোবার ঘরে রাত একটার সময় ঘুম ভেঙ্গে যায়। রান্নাঘরে মুড়ির টিন,চালের টিন সব গড়িয়ে পড়ে যায়। আমি মশারির ভিতর থেকে টর্চ নিয়ে বাইরে আসি। দেখি সব পড়ে আছে।এতক্ষণ শব্দ শুনছিলাম। ভাবছিলাম কোনো চোর ঢুকেছে। চোরকে দেখলে বলবো,ভাই যা নেবার নাও। কিন্তু মেরো না আমাকে। কি করে জানবে চোর নয় স্বয়ং যম ঢুকেছে আমার ঘরে। দেখি রান্নাঘরে বিরাট ফণা তুলে বিশাল দৈর্ঘের একটা গোখরো। দেখেই আমি দরজা খুলে বাইরে এসে ওদের ডাকি। ওরাও উঠে দেখে। তারপর চিৎকারে চলে আসে রাতে ওঠা দু চারজন। তখন আশেপাশে বাড়িঘর হয়েছে। তারা এসে বললেন,মা ঢুকেছেন ঘরে। মেরো না। পাপ হবে। আমি আর কিছু করতে পারলাম না। কার্বলিক অ্যাসিড ঘরে ছড়িয়ে দিলাম। কিছুতেই সাপ বেরোয় না। সারারাত জেগে কাটালাম। সকাল হলে সাঁড়াশি নিয়ে চলে এলো ওঝা। মুখে মদের গন্ধ।আমি বললাম,আপনি ঠিক করে দাঁড়াতে পারছেন না। সাপ ধরবেন কি করে? ওঝা বললেন,আমি তালে ঠিক আছি।আপনার চিন্তা নেই।পাঁচশো টাকা দিলে আমি খুব খুশি হব।
তারপর শুরু হলো সাপ ধরার পালা। সাপটা একটা গর্তে ঢুকেছে। সিমেন্টের মেঝের ফাঁকে।খুঁড়ে বের করলো সাপ। ফণা তুলে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। আমি বাধ্য হয়ে সাঁড়াশি কেড়ে ফণাটা চেপে ধরলাম। লেজে ধরলাম আর একটা সাঁড়াশি দিয়ে। তারপর ওঝার হাতে ধরিয়ে দিলাম। আর তার পকেটে গুঁজে দিলাম টাকা। উনি মহানন্দে চলে গেলেন জঙ্গলের দিকে। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
সাপ ধরে বাইরে নিয়ে গেলেন পাঁচঘড়া গ্রামের নামকরা লোক।তাকে বাবা বলেই ডাকে সবাই।দুটো বড় বড় সাঁড়াশি হাতে তিনি সহজেই ঘরের সাপ ধরে বাইরে আনেন। কোনো সাপ মারেন না তিনি। তিনি বলেন, সাপ আমাদের পরিবেশ বান্ধব। গঙ্গাটিকুরি স্টেশন লাগোয়া চা দোকানে চা পান করে পরের ট্রেনে চলে গেলাম সালার। সেখানে ডঃ অসীম হাজরার চেম্বা। তিনি একজন বিখ্যাত দাঁতের ডাক্তার। তিনি সমাজসেবি। তাছাড়া তিনি কবি ও ঔপন্যাসিক।তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসের নাম, ছেলেখেলা। কাটোয়া শহরে তাঁর বাড়ি। সালারে তাঁর চেম্বারে মাননীয় নুরুল হুদার সঙ্গে পরিচয় হলো। তিনি সমবায় সমিতির ম্যানেজার।আবার ডাক্তার অসীম হাজরার সহকারী।
পরিশ্রমী সমাজসেবি ডঃ অসীম হাজরার সঙ্গে থেকে তিনিও সমাজের সেবা করতে ভালোবাসেন। অবসর সময়ে লেখালিখিও করেন। হস্তলিখন সুন্দর তার।
মানুষকে এত ভালোবেসেও মিনুর একাকিত্ব ঘোচে না। সে একা থাকতেই পছন্দ করে।ধার করে খায়। তার জন্য মারও খেয়েছে অনেকবার, টাকা শোধ দিতে নাপারার জন্য।মিনু এখন অসুবিধা বুঝলে কখনও কচ্ছপ হয়ে যায় কখনও হয়ে যায় বিষধর সাপ। সাপ দেখে ভয়ে কেউ যায় না আর তার বাড়ি। অনেকে মিনুকে পাগল বলেও প্রচার চালায়। একদিন রাতে প্রায় কুড়িজন মিনুর বাড়ির জানলার ফাঁক দিয়ে দেখে,মিনু শূণ্যে ভাসছে। সবাই অবাক। কি করে সম্ভব এই ভেল্কিবাজি। অনেকে বলে,সাধক হলে এসব সম্ভব।কিন্তু মিনুকে দেখে সাধক বলে মনে হয় না। একদম সাধাসিধে সরল, গরীবলোক।গ্রামের মাতব্বর জিতেন বলে,আরে সাধকরা সরল হয় আর গরীবও হয়। ওদের কোনো চাহিদা থাকে না এই নশ্বর পৃথিবীতে।
যাইহোক মিনুকে কেউ আলাদা করো কোনো পর্যায়ে ফেলতে পারছে না। ভারি মজা তো। তার ঘরে কখনও সাপ থাকে কখনও থাকে কচ্ছপ। তখন মিনু থাকে না। আবার মিনু যখন ঘরে থাকে তখন শূণ্যে ভাসে। এটা কি করে সম্ভব।নিশ্চয় বেটা কিছু তুকতাক জানে। এরকমভাবে বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়। মৃত্যু, মহামারি গ্রামকে ছোঁয় কিন্তু মিনু একইরকম থাকে। তার খাবারের সন্ধানে আর ধার চাইতে হয় না। সে ঘরে একাই থাকে। প্রায় পঞ্চাশবছর পরে গ্রামের ছবি পাল্টে যায়।মিনুর এই অলৌকিক ক্ষমতা গ্রামটিকে ভ্রমণবিলাসীরা বিখ্যাত করে তোলে। তাকে নিয়ে চলে আলোচনা আর গবেষণা।
শরীর পরিবর্তনের ইতিহাস কম নেই পৃথিবীতে। তবু একটা অজ গ্রামের লোক মিনু দাস সরল,সহজ ও আত্মভোলা হয়েও কি করে সাধক বা সুফির মত রূপান্তরের ক্ষমতা অর্জন করে তা নিয়ে সে নিজেই চিন্তিত।কিন্তু আমরা জানি আড়ম্বর নয়, একান্ত নির্জনে আত্ম উপলব্ধির চেষ্টা হল প্রকৃত সাধনা। অতএব সাধকের তালিকায় সংযোজিত হল আরও একটি নাম… ।
মিনু তার গুরু আশ্রমের সাধকের কাছে শুনেছিল, অন্ধপ্রদেশের ভিজিয়ানা গ্রামে শিবরাম এর জন্ম হয়। বাবা।নবজাতকের নাম রাখা হলো শিবরাম। শিবের কৃপায় জন্ম বলে নবজাতকের নাম রাখা হল শিবরাম। শিবরাম ছেলেবেলায় গম্ভীর, শান্ত ও উদাসীন প্রকৃতির। একবার তিনি সেতুবন্ধ রমেশ্বরের নিকটে একটি মেলায় উপস্থিত হয়ে দেখেন এক ব্রাহ্মণকুমার প্রাণত্যাগ করেছেন। তৈলঙ্গস্বামী কমান্ডগুলো থেকে জল ছিটিয়ে দিলে যুবক প্রাণ ফিরে পায়। এছাড়াও তিনি হিমালয়ের পাদদেশে বসবাসকারী এক বালকের শবদেহে প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন।একবার এক জন্মবধির কুষ্ঠ রোগীকে এবং আরেকবার এক যক্ষা রোগীকে রোগমুক্ত করেন। এক মহিলার স্বামী সর্প দংশনে মারা গেলে তিনি ঐ মৃতব্যক্তির দংশিত স্থানে গঙ্গা-মৃত্তিকা লেপন করে তাকে বাঁচিয়ে তোলেন ফলে মহিলাটির বৈধব্যদশা দূর হয়। ত্রৈলঙ্গ স্বামী যখন নর্মদার তীরে বাস করতেন তখন একদিন নর্মদার জল দুগ্ধে পরিণত করে তা পান করেছিলেন। যোগী-ঋষিগণ কখনও সাধারণ মানুষের মত জীবন-যাপন করেন না স্বামী সব সময় উলঙ্গ হয়ে চলতেন।একবার আদালতে এক বৃটিশ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে তিনি মলত্যাগ করে তা ভক্ষণ করেছিলেন।অথচ উপস্থিত সবাই দেখলেন তিনি সুগন্ধিযুক্ত সুসাদু খাদ্য খেয়েছেন। আসলে শৈব-যোগীরা লজ্জা, ঘৃণা ও ভয়ের ঊর্ধে এবং তাঁরা চন্দন ও বিষ্ঠায় সমজ্ঞান করেন। ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ, শীত-গ্রীষ্ম প্রভৃতি কোন কিছুই যোগীদের প্রভাবিত করতে পারে না। ত্রৈলঙ্গ স্বামী যখন অজগরবৃত্তি অবলম্বন করতেন তখন নিজের ইচ্ছায় আহার সংগ্রহের চেষ্টা করতেন না। তাঁকে ভক্তরা যা খেতে দিতেন তাই তিনি তৃপ্তিভরে খেতেন। একবার এক একদল দুষ্টলোক তাঁকে পরিক্ষা করার জন্য চুণগোলা জল তাঁর সামনে তুলে ধরলেন। কিন্তু তিনি তাতে রুষ্ট না হয়ে সব চুণগোলা জল অবলীলায় পান করলেন। এরপর ঐ দুষ্টলোকগুলো অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চায়। স্বামীজীও তাঁদের ক্ষমা করে দেন।তিনি মা গঙ্গার তীরে থাকতে পছন্দ করতেন। তিনি কখনও গঙ্গায় ডুব দিয়ে জলের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতেন। কখনও জলে চিৎ হয়ে ভেসে থাকতেন এমনকি তাঁকে স্রোতের বিপরীতে কোন প্রকার অঙ্গ-সঞ্চালন করেই ভেসে থাকতে দেখা যেত। একদিন মণিকর্ণিকার ঘাটে ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সাথে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের সাক্ষাৎ ঘটে। তখন ত্রৈলঙ্গ স্বামী মৌনভাব অবলম্বন করেছিলেন। তাই রামকৃষ্ণদেব তাঁকে ইশারায় জীজ্ঞাসা করেছিলেন ঈশ্বর এক না অনেক। তখন তিনি ইশারাতেই বুঝিয়ে দেন, সমাধিস্থ হয়ে দেখতো-এক, নইলে যতক্ষণ আমি, তুমি, জীব, জগৎ ইত্যাদি নানা জ্ঞান থাকে ততক্ষণ ঈশ্বর অনেক। ত্রৈলঙ্গ স্বামী হিমালয়ের মানস সরোবর, নেপাল, তীব্বত, পুস্কর, প্রয়াগ, বারাণসী সহ বিভিন্ন তীর্থ পরিব্রাজন শেষে জীবনের শেষভাগে পঞ্চগঙ্গার ঘাটেই অবস্থান করেছেন। ত্রৈলঙ্গ স্বামী পঞ্চগঙ্গার ঘাটের নিকটস্থ বিভিন্ন স্থানে এবং মহেশভট্টের বাড়িতে প্রায় আশি বৎসর কাল বাস করেছেন। পরিশেষে ৩০০ বৎসর বয়স অতিক্রম করার পর পৌষ মাসের শুক্লা-একাদশীর দিন ত্রৈলঙ্গ স্বামী নিজ ইচ্ছায় মহাসমাধী যোগে ইহলীলা সংবরণ করেন। ক্ষুদিরাম যখন গয়ায় তখন রামকৃষ্ণের জননী চন্দ্রাদেবী একদিন শিব মন্দিরে গিয়েছিলেন পূজা দিতে। সেখানে এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা হয় তাঁর। তিনি প্রত্যক্ষ করেন, এক দিব্যজ্যোতি মহাদেবের শ্রীঅঙ্গ থেকে নির্গত হয়ে প্রবেশ করছে তাঁর শরী‌রে। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই গর্ভবতী হন চন্দ্রা দেবী।
গদাধরের বয়স যখন ছয় কি সাত তখন বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে ক্রীড়ারত গদাধরের চোখ হঠাতই চলে যায় আকাশের দিকে। কালো মেঘের প্রেক্ষাপটে এক ঝাঁক বককে উড়ে যেতে দেখে ভাবতন্ময় হয়ে পড়ে গদাধর। কিছু পরে মূ্র্চ্ছা যায় সে। জ্ঞান ফেরার পরে দেখা যায়, সে একেবারে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। এই ঘটনাকেই ভক্তেরা শ্রী রামকৃষ্ণের জীবনের প্রথম ‘ভাবসমাধি’ বলে মনে করেন। গদাধর যখন ৮ বছরের তখন প্রতিবেশিনীদের সঙ্গে কামারপুকুরের অদূরে আনুড় গ্রামে বিশালাক্ষী দেবীর পুজো দিতে যাওয়ার সময়ে দেবীর নামগানরত গদাধর পুনর্বার ভাবতন্ময় হয়ে‌ পড়ে। অবিরল ধারায় জল গড়াতে থাকে গদাধরের চোখ থেকে। সন্ত্রস্ত মহিলারা একমনে বিশালাক্ষী দেবীকে স্মরণ করে তাঁর কৃপা প্রার্থনা করতে থাকেন। কিছুক্ষণ দেবীর স্তব করার পরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে গদাধর। গদাধরের বাল্যকালে একবার শিবরাত্রির সময়ে গ্রামস্থ সীতানাথ পাইনের বাড়িতে শিবের মহিমাসূচক যাত্রার আয়োজন হয়েছে। কিন্তু যাত্রা মঞ্চায়নের দিনে দেখা গেল শিবের ভূমিকায় যে ছেলেটির অভিনয় করার কথা সে আসেনি। উপস্থিত সকলের অনুরোধে শিবের ভূমিকায় অভিনয় করতে সম্মত হল গদাধর। কিন্তু শিবের সাজসজ্জা পরিহিত অবস্থায় মঞ্চে অবতীর্ণ হওয়ার পরে পুনরায় বিহ্বল হয়ে পড়ে সে। বিরামহীন নয়নাশ্রু গড়াতে থাকে তার চোখ থেকে। পরের দিন সকাল পর্যন্ত এরকমই তন্ময় অবস্থায় কাটে তার। দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের প্রধান পুরোহিত নিযু‌ক্ত হওয়ার পরে দেবীর দেখা না পেয়ে শ্রী রামকৃষ্ণ একদিন আত্মাহূতি দেবেন বলে স্থির করে মন্দিরের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা খাঁড়াটির দিকে ধাবিত হন। তখনই জগন্মাতার এক অদ্ভুত রূপ দর্শন হয় তাঁর। তিনি প্রত্যক্ষ করেন, এক আশ্চর্য জ্যোতিঃপুঞ্জ দশদিগন্ত আচ্ছাদিত করে ফেলেছে আর সেই পুঞ্জীভূত জ্যোতির ভিতরে উঠছে অন্তহীন ঢেউ। অভিভূত রামকৃষ্ণ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন এই দৃশ্য দেখে। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে দেবীর পূজা করছেন ঠাকুর। রানি রাসমণি উপস্থিত রয়েছেন সেখানে। হঠাৎ রানির গায়ে আলতো চাপড় মেরে ঠাকুর বললেন, ‘‘কেবল ওই চিন্তা! এখানেও ওই চিন্তা!’’ ঠাকুরের এই আচরণে সকলেই যখন অভিভূত তখন রানি নিজেই লজ্জিত মুখে স্বীকার করলেন, দেবীর সামনে বসেও দেবীর ধ্যানে তিনি মনোযোগ দিতে পারেননি। বরং চিন্তা করছিলেন একটি বিশেষ মোকদ্দমা বিষয়ে। ঠাকুরের আচরণের ইঙ্গিতটা ছিল সেদিকেই। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক মথুর বিশ্বাস একবার রামকৃষ্ণের কাছে আব্দার করেন যে, ঠাকুরের যেমন ভাবসমাধি হয়, তেমনই ভাবসমাধির অভিজ্ঞতা লাভ করতে চান তিনিও। ঠাকুর মথুরবাবুকে বিরত করার অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু মথুরবাবু নাছোড়। শেষে ঠাকুর বাধ্য হয়ে বলেন, ‘‘ঠিক আছে, মা-কে বলব, তিনি যা করার করবেন।’’ এর কয়েকদিন পরেই সমাধিস্থ হন মথু‌রবাবু। তাঁর চোখ থেকে অবিরল ধারায় ঝরতে থাকে জল। সেই অবস্থায় ঠাকুরকে দেখে তাঁর পা জড়িয়ে ধরেন মথুর। গদগদ কন্ঠে বলেন, ‘‘এ কী করলে ঠাকুর! আমার যে বিষয়কর্ম কিছুতেই মন বসে না আর। আমাকে মুক্তি দাও এ থেকে।’’ ঠাকুর হেসে বললেন, ‘‘আগেই বলেছিলেম, ভাবসমাধি সকলের সয় না।’’ একবার ঠাকুরের খুড়তুতো দাদা হলধারী কোনও কারণে ঠাকুরের প্রতি রুষ্ট হয়ে তাঁকে অভিশাপ দেন, ‘‘তোর মুখ দিয়ে রক্ত উঠবে।’’ তার কয়েকদিন পরে সত্যিই ঠাকুরের মুখ থেকে রক্তপাত শুরু হয়। হলধারী সহ সকলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শেষে এক বয়স্ক সাধু ঠাকুরকে পরীক্ষা করে বলেন, আসলে হঠযোগ সাধনার চরম অবস্থা জড়সমাধিতে পৌঁছে গিয়েছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণ। ফলে সুষুম্নাদ্বার খুলে গিয়ে রক্ত মাথায় উঠে যাচ্ছিল। এই অবস্থায় রক্ত মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে উপকারই হয়েছে তাঁর। নতুবা ঠাকুরের জড়সমাধি আর ভাঙত না। নিজের অভিশাপ বরে পরিণত হয়েছে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন হলধারী। ঠাকুরের বিয়ে দেবেন বলে মনস্থ করেছেন মা চন্দ্রাদেবী আর দাদা রামেশ্বর। কিন্তু পছন্দমতো পাত্রী আর পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে ভাবাবিষ্ট ঠাকুরই একদিন বলে দিলেন, ‘‘জয়রামবাটী গ্রামের শ্রীরামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে যে পঞ্চম বর্ষীয়া কন্যা, সেই আমার উপযুক্ত।’’ ঠাকুরের নির্দেশিত বাড়িতে খোঁজ করতেই সন্ধান মিলল সারদামণির।
বাবা লোকনাথ নিজের রূপ পরিবর্তন করতে পারতেন। প্রয়োজনে কখনও বাঘ বা কুকুরের রূপ গ্রহণ করেছেন। এল শিষ্য তাঁকে বলেছিলেন, আপনি আমার বাড়ি গেলেন না। বাবা বললেন, গেয়েছিলুম তো। এমন এক লাঠির আঘাত করলি এখনও দাগ আছে। আমি কুকুরের রূপে তোর বাড়ি গেলাম। দেখলাম তোর পশুদের উপর কোনোমায়া,নেই। সব জীবকে সেবা দিবি। তবে মানব জীবন সফল হবে। শিষ্য তো অবাক। তিনি ক্ষমা চাইলেন বাবার কাছে লজ্জায়। বাবার দেহত্যাগের পরে এক অলৌকিক ঘটনা ঘটে মথুরামোহনের জীবনে।একবার তিনি কাশীধামে যান।সেখানে হঠাৎ বাবা কে সশরীরে দেখার ইচ্ছা জাগে তার। কিন্তু তা সম্ভব নয় বলে মনের মধ্যেই চেপে রেখে দিলেন।এক সন্ধ্যাই বিশ্বনাথ মন্দিরে আরতি দেখতে গেলেন।ভীড়ের মাঝে হঠাৎ অনুভব করলেন,কে যেন তার হাত ধরে টানছেন।তাকিয়ে দেখলেন,বাবা লোকনাথ !!! তিনি বিষ্ময়ে স্থির হয়ে গেলেন কিছু সময়ের জন্য।আবেশ কাটবার পর দেখেন,বাবা তার হাত ধরে মন্দিরের ভেতরে নিয়ে যাচ্ছেন।বাবার চরণে প্রণত হয়ে তিনি পদধূলি মাথায় নিলেন।এদিকে আরতি শেষ হয়ে গেলে বাবা আবার মথুরামোহনের হাত ধরে মন্দিরের বাইরে নিয়ে এলেন।তারপর তার বাড়ির পথা অন্ধকার গলির মাঝে পথ চলতে চলতে এক সময় তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আজো বাবাকে কেউ একমনে ডেকে তার দর্শন পেতে চাইলে বাবা অবশ্যই আসবেন।জয় জয়শ্রী বাবা লোকনাথ।
মিনু ভাবলো,তাহলে সে কিন্তু শরীর রূপান্তরের প্রথম মানুষ নয়। গুরুদেব বলেন,অহঙ্কারশূণ্য হয়ে তাঁকে ডাকলে তিনি দাসানুদাস হয়ে ইচ্ছেপূরণ করেন ভক্তজনের। মিনু আজ প্রায় কতদিন পর কচ্ছপের রূপ থেকে মানুষরূপে আত্মপ্রকাশ করল সে নিজেই জানে না। গ্রামের কাউকে সে চিনতে পারছে না। একবার গ্রামের রাস্তায় হাঁটার শখ হল তার। হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় দেখল এক জনসমাবেশ। দেখলো, এক বিরাট ময়াল রাস্তা আটকে পড়ে আছে গাছের শেকড়ের মত। মিনু দেখল,সকলে লাঠি,বল্লম নিয়ে সাপটাকে আক্রমণ করেছে। মিনু নিজে দুহাতে ধরে ময়ালটিকে বনের মধ্যে ছেড়ে দিল এবং নিজেও বনের মধ্যে অদৃশ্য হল।এখন মিনু বড় ময়ালে রূপান্তরিত হয়ে সৃষ্টির রক্ষা করার জন্য মহিলা ময়ালের সঙ্গে মিলিত হবে।কচ্ছপটিও, মহিলা কচ্ছপ।তার সঙ্গেও মিনুর রূপান্তরিত রূপে মিলিত হয় প্রয়োজনে।ঠাকুর রামপ্রসাদও সংসার করেছিলেন, মিনুর সংসার প্রকৃতির মাঝে অরূপরতনের সন্ধানে।
মিনুর অদৃশ্য হওয়া দেখে, সকলে তো অবাক হয়ে গেল। লোকজন ঘিরে ধরলো,গ্রামের বয়োঃবৃদ্ধ লোকটিকে। তার নাম লোচনদাস। তিনি বললেন, উনি আমাদের গ্রামেরই লোক। উনি নিজের শরীর পরিবর্তন করে জলে বা বনে থাকেন।মাঝে মাঝে ইচ্ছে হলে বাইরে বেরোন। গ্রামের ছেলে বিনয় জিজ্ঞেস করল,উনি কি খান?
বৃদ্ধ বললেন,যখন জলে থাকেন জলজ প্রাণীর খাবার গ্রহণ করেন আবার পাখি বা সাপ হলে তাদের খাবার গ্রহণ করেন। যার জীবনে করুণাময়ের আশীর্বাদ জড়িয়ে আছে, তার আবার খাবার অভাব কি করে হবে রে, পাগলা।
এইকথা বলে তিনি মিনুর স্মৃতি মনে করে, সজল চোখে রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলেন।

 

সুদীপ ঘোষাল। গল্পকার। জন্ম ভারতের পশ্চিমব্ঙ্গরাজ্যের কেতুগ্রামের পুরুলিয়া গ্রামে। প্রকাশিত বই: 'মিলনের পথে' (উপন্যাস)। এছাড়াও কয়েকটি গল্প ও কবিতার বই আছে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..