মূক নীল পাখী

শিখা কর্মকার
কবিতা
Bengali
মূক নীল পাখী

রূপকথা

নেব্রাস্কার দিক হারানো মাঠে নেমে আসে নিঝুম সন্ধে, শীতল হয়ে আসে ঝলমলে স্টীলের মরাই. বেড়ে ওঠে তিলে তিলে কচি ভুট্টাদানাগুলি, স্তরে স্তরে সাজানো পাতার ভেতরে, নরম শাঁসে ভরা, অনন্ত সবুজ ক্ষেতের ভেতর; যত কমে আসে দিনের গা জ্বালিয়ে দেওয়া উত্তাপ, বুজে আসে হাজার শামুকের খোল, দীঘিভরতি  শালুকের পাপড়ি, আর গুহার পাথুরে চাতালে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে বাঘ-বাঘিনীরা।

কখন যেন টুকটুকে মোরব্বার মত  লাল মেঘ-রঙে ভরে যায় পশ্চিম আকাশের কোল, ঘাসে ঘাসে রুক্ষতা দেখতে দেখতে তাও মিলিয়ে যায় কুয়াসা ও অন্ধকারের ভেতর। দিগন্ত বিস্তৃত ক্ষেত শেষ হলেই চোখে পড়ে আকাশপাতাল ছুঁয়ে থাকা সুদীর্ঘ এক সেতু। সেই শেষহীন সেতু দেখে মনে হয় এটা পেরোলেই হয়ত পৌঁছে যাবো যার কাছে ও যেখানে যেতে মন চায়। এ যেন  সেই ম্যাজিক ব্রীজ, যার তলায় সুজির বালি, মিষ্টি সরবতের নদি স্রোত, আর ভেসে যাচ্ছে সাদা হেরনের মত নির্মল স্বচ্ছ পবিত্রতা সময়ের হাত ধরে।

তখনো আকাশে সুখী আভার ভেতরে উড়ে যাচ্ছে শেষ কাক, তখনো পাহাড়ের পাশ হয়ে যেতে যেতে চোখে পড়ছে নেটিভ অ্যামেরিকানদের স্বপ্নবন্ধনের আল্পনা, গল্পের ব্যাঙ্গমা রাজকুমারীর অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে, আর ভেতরে জুড়ে জাগছে আশা; তবে কি আবার দেখা হবে, পারবে কি এই পাখি সন্ধান দিতে জীবনের সেই আসল রূপকথাটির?

কুণ্ঠিত কবিতা

ডাকলে আসতে চায়না কবিতা। লজ্জা করে তার। সংকোচে গুটিয়ে যায় সে। কাছে গেলে সোজা এক গঙ্গাফড়িঙের চোখে গিয়ে ঢুকে পড়ে। কখনো বা বহুরূপীর আঁশে।  শেকড়ের ভিজে কোষ পেলে মাটির রসের মত ঊর্ধগামী হয় সে। না বলে কয়ে ছড়িয়ে যায় সবুজের কণায় কণায়।

কখনো বা তোমার মতই চায় সে এক দিগন্ত একাকীত্ব,  অফুরান স্বাধীনতা। তারায় তারায় সে খুঁজে খুঁজে বার করে আনে কবেকার সোনালী উপকথার উত্তাপ। বৃষ্টির জলে সে খুঁজে পায় তার প্রিয় নদীটির স্রোত। যাপন তার দুঃসাহসী এবং লাজুক, চাতকের মত সে থাকে অনন্ত অপেক্ষায় অথচ কাছে গেলে চিরকালীন উদাসীনতার মুখোশ পরে ঠেলে সরিয়ে দেয় চির-আকাঙ্খিত সান্নিধ্য।

সে একা হয়ে গেলে রুক্ষ বিষুবরেখাও শোকার্ত হয়ে ওঠে, মুছে যায় সমস্ত রং পৃথিবীর। অদৃশ্য চুম্বকের মত, অমাবস্যার অন্ধকার রাতের ভুলভুলাইয়ার মত ডাকে তাকে গভীর এক  প্রচ্ছন্ন ভালোবাসা, গাছের বাকলে লুকিয়ে থাকা মথের ডিমের মত নিঃসাড় হয়ে থাকে সে,  যেন প্রাণ আছে অথচ প্রকাশ নেই। যেন বুক ফাটে অথচ বলবার প্রয়াস নেই।  কেন যে এমন হয়, সেও কি জানে? কে জানে।সাক্ষী হয়েছি এসবের বলেই লাজুক কবিতাকে আর ডাকিনা ভুলেও।

মনখারাপ হলে একা একাই তাই  চলে যাই আইরিশের প্রান্তরে যেখানে হাজার পুষ্ট কুঁড়ি উন্মুখ হয়ে আছে ফুটে ওঠার জন্যে। যেখানে কেঁচোরা এসে ঝুরঝুরে মোলায়েম করে দিয়ে গেছে মাটি। দুলছে হাল্কা হাওয়াতে নীল, হলুদ, বেগুনী, পাল্কিগুলি নিখুঁত কারুকৃতি এঁকে মাটির বুকেতে। জানি, সময় হলে, কাটলে লজ্জা, মুছলে অপরিচয়ের দুরত্ব, কবিতা আসবে। হাসবে সে, হয়ত ভালও বাসবে কোনদিন।

মূক নীল পাখী

কবিতার  কল্লোলে তুমি সুখকে লুকোও, দুঃখকেও, অথচ কররেখা, প্রতিটি অঙ্গুলীর শিল্পীত শোভন কারুচিত্র, আকাঙ্ক্ষার ডালপালার আভাস গড়িয়ে যায় পংক্তির গায়ে, গল্পের ছলে।

মার্চ সরতেই আলো নিয়ে ফেরে এপ্রিল, সঙ্গে তার মসৃণ তাপাঙ্ক, তবু বৃক্ষাদি রুক্ষ বড়ো, খাঁ খাঁ করে বসন্ত=বকুলের বন। ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে তুমি উড়ে যাও সোন্দাল হয়ে মিশে যেতে হিমমগ্ন পর্বতে ও নামহীন খাদে, ভেতর জুড়ে  তবু কুরে খায় মধুর  আনন্দ, অনন্য এক টান। যার সীমাহীন ব্যাপ্তি পৃথিবীর  এক থেকে অন্য সমুদ্রে, অক্ষ থেকে বিষুবরেখা পার হয়ে সেই ব্ল্যাকহোল পর্যন্ত।

এক একদিন মেঘ সরে গেলে, নোনা লাগা অনন্ত চরের সূর্যাস্তে তুমি একা হেঁটে গেলে,  নিস্তব্ধতার রিং-টোনে ভরে ওঠে অন্তর ও বাহির আকাশ, সেই মুহূর্তে জন্ম হয় প্রিয় নক্ষত্রের।

সমস্ত দ্বন্দ্বের শেষে ফিরে আসো অন্ধকারের কোলে, জেনে সারাটা শরীর জুড়ে প্রবাহিত হয় কবিতার ফল্গুধারা, বেঁচে থাকার প্রত্যেকটি পলে অথচ সোনালী মাছের মতই দুঃসহ তৃষ্ণায় জ্বলে যেতে থাকো আজীবন।

অনুক্ত শব্দরাশি তোমার, খুলে দেয় অনুভুতির প্রতিটি  জানালা, ফিরিয়ে আনে হারিয়ে যাওয়া মূক নীল পাখী, পালকে শুশ্রূষা যার, দৃষ্টিতে প্রিয় নক্ষত্রের মধুসঞ্জীবনি।

মাইল ফলক

জেগে উঠছে শহর, এক গাছ কুঁড়ি, এক দিগন্ত ঘাস, ককুন ফাটিয়ে উড়ে আসছে প্রজাপতি, মথ, বাতাস বইছে জোরে, দ্রুত বাইরে আসার ডাক দিচ্ছে এক আকাশ মেঘ। আমি যা শুনছি যেন প্রার্থনার কলি, যেন জীবনের উপচার, যেন সন্ন্যাসের অগ্নিবর্ণ উত্তাপ।

নদী বইতে শুরু করেছে ভেতর থেকে বাইরের দিকে, হৃদয় জুড়ে শুধু শয্যা নয়, সঙ্গ ত্যাগ করে ফিরে যাবার গান বাজছে। পৃথিবী জুড়ে বেজে উঠছে তার সুর, নুড়িতে পারিত-নুড়িতে-বালিতে তার উদ্বেগ, বৃষ্টির বিন্দুতে বিন্দুতে তার আকাঙ্খা, জেগে উঠতে উঠতে আমার শহর, পেরিয়ে যাবো চেনা মাইল-ফলক, আর সর্বইন্দ্রিয় জুড়ে নেশার মত কেবল এক টান বাজতে থাকবে রিমঝিম করে।

শিখা কর্মকার। কবি। জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যে, বর্তমান নিবাস উত্তর আমেরিকার আটলান্টা, জর্জিয়া। পেশায় শিক্ষিকা, নেশায় ফটোগ্রাফার, ও ভালোবাসায় কবিতা। পনেরো বছরের অধিককাল স্বেচ্ছাসেবিকা বিভিন্ন স্কুল ও লাইব্রেরিতে। দশ বছরের অধিক জর্জিয়াতেই সঞ্চালিকা ও মুখপাত্রী একটি বিশিষ্ট...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রতিভাস

প্রতিভাস

স্পষ্টতা অন্ধকারের মতো স্পষ্টতা আলোর মধ্যগগনে নেই। উত্তাপে ঝলসে যাওয়া চোখে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয় রাত…..

চিঠি

ক্ষোভ রোদের দোকানি হয়ে, ছুঁয়ে গ্যাছি দূর পরবাস আলোর ক্রেতারা দেখে, শূন্য ঝুলি খালি সর্বনাশ।…..