মৃতদেহ

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতা
Bengali
মৃতদেহ

মৃতদেহ

আমি বারান্দার এককোণে
মরার মতো বসে থাকি
বাড়ির দুটো বিড়াল
দিনে দশবার করে উঁকি দিয়ে যায়
লেবুগাছটা বারান্দার গ্রিল পেরিয়ে
আমাকে সবসময় ছুঁয়ে থাকে
মাঝে মাঝে পায়রা আসে
অবাক চোখে আমার দিকে তাকায়
হয়তো ও কিছুতেই বুঝতে পারে না
মরে গিয়ে কিভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা
চেয়ারে বসে থাকা যায়
ফেরিওয়ালা আমাকে দেখে
তার গ্রীষ্মের দুপুরে
নিজের পছন্দমতো রঙ লাগায়।

আমার কোনো সকাল ভাঙে না
আমার কোনো দুপুর ভাঙে না
আমার কোনো বিকেল ভাঙে না
আমি যেন এক আত্মহত্যার বিকেলে দাঁড়িয়ে আছি
সকাল থেকেই যেন কোনো রঙ নেই
কোথাও যেন যাবার একটা ভীষণ তাড়া
গন্তব্যের ছবি না থাকায়
আমার ভাবনার শরীরে কোনো হাত পা নেই
কারও কোনো কথাই যেন আমার কানে আসে না
ছুটে কোথাও একটা পৌঁছে যেতে চাই।

সকালের রোদ গায়ে এসে পড়লেই
বারান্দার দরজা বন্ধ হয়ে যায়
দরজা একটা থাকে
অনেক কিছু ঢুকে যেতে পারে
নিজের খুশিমতো আবার বেরিয়েও আসতে পারে
বারান্দার কাজ সেই কবে শেষ হয়ে গেছে
তাই এখানে কেউ আসে না
বাড়ির আরও পাঁচটা দিক থেকে
বাইরের রাস্তাকে দেখা যায়
তিনটে ওপরে, বাকি দুটো নিচে
ভাত খেতে খেতে আমার বমি আসে
গলায় মাঝে মাঝেই ভাত আটকে যায়
জল গিললেও ভাত নামে না
এক একসময় মনে হয় আমি নিয়ম করে
রোজ দুপুরে ভাত খাই কেন?
কেনই বা আমার জন্যে দুপুর আসে
সন্ধ্যের অন্ধকারের চাদরে
আমার কী অসুবিধা হয়?
সারাদিন আমি সত্যিই কী কিছু দেখি?
নিজেকে রোজ নিয়ম করে
চেয়ারে বসিয়ে রাখা কেন?
কেন রোজ সকালে আমার সামনে দিয়ে
লোকেরা সকাল বলে যায়?
আমার কী আছে?
আমি আমার কাছে কে?

বারান্দায় অনেক ভাত এসে জড়ো হয়
অনেক অনেক ভাত
আমি সেগুলোকে যখন তখন খাই
অনেক ভাত রাস্তায় ছড়িয়ে দিই
অন্ধকারে অনেক ভাত
সামনের বাড়ির দোতলার বারান্দায়
দশহাত দিয়ে ছুঁড়ে মারি
আমি চিৎকার করি
গায়ের জোরে গলায় হিন্দি গানের সুর আনি
শ্যাওলা-জমা, ঘাস গজানো বারান্দা খুলে
আমি যখন তখন রাস্তায় উঠে আসি
রাস্তা নোংরার ভয়ে
অনেকে জোর করে আমাকে
বারান্দায় বসিয়ে দিয়ে যায়
ব্যস্ত সময়ে রাস্তায় শুয়ে পড়ি
গালাগাল দিয়ে ওরা আবার
আমায় বারান্দায় ঢুকিয়ে দেয়।

আজ বারান্দায়
যখন তখন দু’একজন ঢুকে পড়ে
কাউকে চিনি না
মনে হয় চিনে কী হয়েছে?
ক’জন চেনা গলা মিলিয়েছে?
চেয়ারের ধার থেকে বারবার
নিজেকে মাঝখানে সরিয়ে আনি
আমি কিছু দেখতে চাইছি কেন?
আমার বলার আগেই
আজ অনেকে কথা বলছে
কানে আসছে দোতলার বারান্দার গালাগাল
হিন্দি গানের সেই সুর
আমার দ্বিগুণ চিৎকারে কেউ গাইছে
ফেরিওয়ালা আজ কিছুতেই
গ্রীষ্মের রঙ খুঁজে পাচ্ছে না।

 

অন্য সুরের বৃত্তে

“কোথায় তুমি!”
কথা শুনে তুমি এত রেগে গিয়েছিলে
যেন এক আকাশ রোদ্দুর পেরিয়ে
মুখ চোখ লাল করে বাড়ি ফিরেছিলে
আমি তো অত কিছু ভাবি নি
দেখতে না পেয়ে মন বলে ফেলেছিল
যেভাবে হাওয়ার যাত্রাপথ থেকে
একটু সরে গিয়ে হাওয়ার বয়ে যাওয়া দেখে
আমি সর্বত্র তোমাকেই দেখতে চেয়েছিলাম
দুপুর থেকে একটু একটু করে রোদ সরে গিয়ে
দিনের সারা শরীর কেমন পাণ্ডুর হয়ে গিয়েছিল
সবাই আমাকে পাড়ার পুরোনো বটগাছের নিচে
আমার ঠাকুরদার কাছে নিয়ে গেল
কেউ তো আমাকে চেনেই না
জামা পুরোনো হলেই কি পুরোনো হয়ে যায় ?
আমি মুখ খুলতেই সবাই আমাকে লাথি দেখালো
আমার কথার যত গয়না ছিল
সব ওরা টেনে খুলে ফেলতে চাইলো
গয়নাই আমাকে রাস্তা দেখিয়ে এনে
নদীর ধারে বসিয়ে দিল

ডাকের মধ্যে কে যেন শুনতে পেয়েছিলো
চারদেয়ালের গণ্ডির স্থবিরতার গানের সুর
পায়ের গতিবিধি দেখে
অনেকে নাকি বুঝতে পেরেছিল
আমি অধিকারের গণ্ডি পেরিয়ে
অনেক দূরে চলে যেতে চাই
শীতের রোদে পিঠ দিয়ে
সবাই গল্প জুড়ে দিয়েছিল
বসন্তকালের কাক ডাকা ভোরের গল্প
ঠাণ্ডা হাওয়ায় কেউ পাশ ফিরে শোওয়ার কথা ভাবে নি
একজনও কেউ তার পাশের জনকে খোঁজে নি
এখানে আমার ডাক নিয়ে
গল্প হওয়া তো দূরের কথা
একজনও কেউ আমায় নিয়ে আগ্রহ দেখায় নি
শুধুমাত্র ডাকের এক ভিন্ন সুরের জন্য
আমার গায়ে ভিন গ্রহের ছাপ দিয়েছিল
জেনে গিয়েছিলাম আমার সুরে
গলা মেলাতে একজনও কেউ জেগে উঠবে না
নদীর পাড়ে এখন আমি হাত পা ছড়িয়ে বসে
জলের গভীর তলদেশ থেকে
যে সুর আমার বুকে আশ্রয় নিয়েছিল
তাকে এখনও তেপান্তরের মাঠ দেখানো হয় নি

আমি সবকিছু ভুলে যেতে চাইছিলাম
যেন আমার সঙ্গে কারও কিছুই হয় নি
যা কিছু দোষ সব আমার সুরের
চেনা মুখের আড়ালে সব সরিয়ে নিয়ে গিয়ে
আবার ভোরের অপেক্ষায় থাকব

নদীর পাড়ে শুয়ে আমি সারারাত গান শুনবো।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

ফেরা

ফেরা

ফেরা অনেক দিন আসিনি তোমার চোখের কোণে, বুকের পাশে, নিঃশ্বাসের চারপাশে। ভেবো না আমি পথ…..