মৃত্যুর দ্বারে দাঁড়িয়ে স্মৃতির অবগাহনে পরী

উইলি মুক্তি
ছোটগল্প
Bengali
মৃত্যুর দ্বারে দাঁড়িয়ে স্মৃতির অবগাহনে পরী

 

বৰ্ষাকালের ঝুম বৃষ্টি। মাঝে মাঝে বিকট শব্দে বিদ্যুত চমকাচ্ছে। টিনের চালে বৃষ্টির রিমঝিম জল-তরঙ্গের চমৎকার মনোমুগ্ধকর ধ্বনি। কিন্তু তার কান পৰ্যন্ত সেই আওয়াজ পৌঁছায় না। ভাবলেশহীন মানুষটি একা একা ঘরের সামনের পাটাতনের উপর মুর্তির মতো বসে আছে। একদৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টির আঁচ লেগে সম্পূৰ্ণ ভিজে গেছে। পরার কাপড় গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। বাহিরের ঝড়ের সাথে তার মনেও প্ৰচন্ড রকম ঝড় বইছে। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। স্মৃতির অবগাহনে ফিরে তাকায় পরী, বহু বছর আগেকার সেই দিনগুলোর দিকে, তার শৈশবে।

মদনগঞ্জ শহরের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠিত বড় ব্যবসায়ী সৈয়দ মতিউর রহমান মিঞা। বনেদি পরিবারের ছেলে। সুপুরুষ, দীর্ঘাকার বিনয়ী স্বভাবের মতি মিঞাকে শহরের সকলেই চেনে, অনেক সম্মান করে চলে। সবসময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে যেয়ে আদায় করেন। ছোটবেলা থেকে কখনো নামাজ কাযা করেননি। প্রচুর ধন সম্পদের মালিক মতি মিঞা সবসময় গরীবদের অনেক দান খয়রাত করেন। খালি হাতে কখনই কাউকে ফিরিয়ে দেন না। টাকা পয়সার ব্যাপার নিয়ে কেউ সমস্যায় থাকলে উনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। দরদী ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিতি তাঁর। এই শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি মতি মিঞা। মদনগঞ্জ শহরের ধাবমান বাজারের মাঝখানে দুই বিঘা জায়গা নিয়ে বড় বড় গদি আছে তাঁর। যেখানে বাণিজ্যিক সব ধরনের লেনদেন হয়। বিস্তর জায়গা নিয়ে মতি মিঞার পৈতৃক ভিটা বাড়ি। এক পাশে টাকা পয়সার লেনদেন এবং বিভিন্ন আলাপচারিতার জন্য ব্যবসায়ীদের বড় কাছারি ঘর। সারাদিনব্যাপী বিভিন্ন স্থান থেকে আগত বড় বড় মহাজনদের আনাগোনায় বাড়ির কাচারি ঘর গমগম করে। মতি মিঞা সেই ঘরের গদির মধ্যে বসে কে কীভাবে ব্যবসার কাজ কর্ম করছেন তা পর্যবেক্ষণ করেন আর আয়েশ করে কোল বালিশে হেলান দিয়ে গরগর করে হুক্কা টানেন।

ম্যানেজার ‘নুরুছুন সরকার’ বাড়ির বাহির এবং ভেতরের সব ধরনের কাজের তদারকি করেন। অবিবাহিত, সহজ সরল একজন ভালো মানুষ। মনের মধ্যে কোনো প্যাঁচ নেই।পান খেয়ে সবসময় ঠোঁট লাল করে রাখেন।কথায় কথায় হো হো করে হাসেন আর তখন তার বড় বড় লাল দাঁত গুলো বেরিয়ে পড়ে।চুল সবসময় তেল দিয়ে পরিপাটি করে রাখেন।কিছুক্ষণ পর পর পকেট থেকে চিরুনি বের করে মাথা আঁচড়ান। সমগ্র বাড়িতে লোকজন, আত্মীয় স্বজন, কাজের লোক, খানাপিনা সোরগোল যেন লেগেই আছে।ধরতে গেলে সবসময়ই জমজমাট একটা অবস্থা। বাবুর্চি দিয়ে প্রতিদিন বড় বড় হাঁড়িতে বিভিন্ন ধরনের মুখোরচক রসনার আয়োজন করা হয়। বিশাল আকারের বেতের ঝাঁঝর দিয়ে ভাত পরিবেশন করা হয়। সাথে থাকে বড় বড় অ্যালুমনিয়াম ডিশের মধ্যে মাছ, মাংস, ডাল, নানা ধরনের সবজির ভাজি এবং সাথে মিঠুাই ইত্যাদি। খাওয়ায় কোনো কিছুরই কমতি নেই যেন। কখনো কেউ ক্ষুধার্ত পেটে অথবা শূন্য হাতে এ বাড়ি থেকে ফেরত যায় না। সর্বক্ষণই এই বাড়িতে জাঁকজমকপূর্ণ একটা উৎসবের পরিবেশ বিরাজ করে।

মতি মিঞার সহধর্মিনী মরিয়ম বেগম অসম্ভব সুন্দরী একজন নারী। লম্বা ঘোমটার আড়ালে অন্দরমহলের ভেতরেই থাকেন। দাঁড়িয়ে থেকে নিজ হাতে বিশাল পরিবারের তদারকি করেন। সাত কন্যা আর তিন পুত্র সন্তানের জননী মরিয়ম বেগম। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় কন্যা হচ্ছে পরী। দেখতে পরীর মতই সুন্দর এবং সুশ্রী। বাবা মা তাই সখ করে নাম রেখেছেন পরী বানু।

হঠাৎ একদিন মাঝরাতে ছোট্ট পরীর ঘুম ভেঙ্গে যায়। সহ্যাতীত যন্ত্রণায় কিছুক্ষণ পর পর ফুঁপিয়ে কান্না করছে। অল্প অল্প করে তিনদিন ধরেই ব্যথাটা হচ্ছিল। ভয়ে পরী কাউকে জানায়নি। আজ আর ব্যথা সহ্য করতে পারছে না। কানে আঙুল দিয়ে পানির মতো কিছু একটা অনুভব করল সে। পরীর মা মরিয়ম বেগম পাশের ঘর থেকে উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

-পরী ও পরী কী হইছে ?

-কানদস্ ক্যান ?

-কান ব্যথা করতাছে মা।

কাঁদতে কাঁদতে পরী উত্তর দেয়। মরিয়ম বেগম বিছানা ছেড়ে উঠে পাশের ঘরে যায়। কান দেখে বলেন, মনে হয় কানে পানি ঢুকছে।

আইচ্ছা এহন ঘুমা সোনা। বিয়ানে নুরুছুনরে কমুনে ডাক্তারের কাছে লইয়া যাইতে। মরিয়ম বেগম কিছুক্ষণ পরীর পাশে বসে থাকেন। তারপরও পরী ব্যথার কারণে ঘুমাতে পারে না। ছটফট করে।গোঙানির মত শব্দ করেই চলেছে। দাদি পাতলা কাপড়ের মধ্যে হ্যারিকেনের গরম তাপ নিয়ে পরীর কানে ভাব দেয়। বড় বোন আদর করে সান্ত্বনা দিয়ে বলে,

-লক্ষ্মী বইন আমার এহন ঘুমা। কালকা নুরুছুন কাকু তরে ডাক্তারের কাছে লইয়া যাইব। দেহিছ তরে অনেকগুলা মিষ্টি ঔষুধ দিবো।তর কান ব্যথা এক্কেবারে ভালো হইয়া যাইব।বড় বোনের আদর আর সান্ত্বনা পেয়ে প্রচন্ড ব্যথা নিয়ে পরী ঘুমাবার চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুম আর আসে না।পরদিন যথারীতি নুরুছুন সরকার ঘুম থেকে উঠেই পরীকে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।

ডাক্তার কেরামত আলি, টিং টিঙে লম্বা ঢ্যাঙা চেয়ারার বয়স্ক একজন মানুষ। চুলে পাক ধরেছে বহুকাল আগে। মাথায় একটিও কালো চুল নেই। বয়সের ভারে কিছুটা কুঁজো হয়ে গেছে। চোখে ঠিকমত দেখতে পায় না। ভারী কাঁচের চশমাটা নাকের আগায় ঝুলে থাকে।যে কোনো জিনিস দেখতে গেলেই একদম চোখের সামনে নিয়ে দেখে। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পরীর কান পরীক্ষা করে দেখলেন, কান থেকে তরল জাতীয় কিছু একটা গড়িয়ে পড়ছে।

-কান পাকছে। ঔষুধ দিলে ঠিক হইয়া যাইব। ডাক্তার নুরুছুনকে বললেন,

-হ ডাক্তার সাব পুসকুনিতে গোছল করতে যাইয়া মনে হয় কানে পানি ঢুকছে। পোলাপান মানুষ, একবার গোছল করতে পুসকুনিতে নামলে আর উঠতে চায় না। ঔষুধ দেন ঠিক হইয়া যাইব।

ডাক্তার পরীর কান পরিস্কার করলেন। একটি ছোট ঔষধের বোতল থেকে দুই ফোঁটা ঔষধ ওর কানে ঢেলে দিলেন। ফ্যানার মত বলক দিয়ে কী যেন বের হয়ে এলো পরীর কান থেকে। মূহুর্তের মধ্যে চিৎকার করে পরী মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। নুরুছুন ভয়ে হন্তদন্ত হয়ে বলতে লাগলেন,

-হায় হায় এইডা কী হইল ডাক্তার সাব? বেহুশ হইয়া গেল ক্যান? পরীর এই অবস্থা দেখে ডাক্তারের মুখ ও ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

কয়েক ঘন্টা পর পরীর জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলে দেখতে পেল তীরের মত সকলের দৃষ্টি তার দিকে। ভাই বোনেরা সবাই ওর পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। মা মরিয়ম বেগম আঁচলে চোখ মুছছেন। মতি মিঞা উচ্চস্বরে নুরুছুনের সাথে কথা বলছেন। দরজা আর জানালার বাইরে বাড়ির সকলে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে ঘরের ভেতর কী ঘটছে।অসহ্য কানের যন্ত্রণায় পরী চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। কান দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ব্যথা কিছুতেই কমছে না।অতঃপর পরীর এমন খারাপ অবস্থা দেখে চিকিৎসার জন্য মতি মিয়া শহর থেকে এলোপ্যাথিক ডাক্তার নিয়ে আসলেন। ভালো চিকিৎসা হলো। কিছুদিনের মধ্যে পরী সুস্থ হয়ে উঠল ঠিকই। কিন্তু পরবর্তীতে জানা গেলো হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার ভুল করে এসিড জাতীয় কিছু একটা ঢেলে দিয়েছিলো পরীর কানের মধ্যে। সেই কারণে ওর ডান কানের পর্দা ছিড়ে গেছে এবং কানটি চিরতরে সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। দিন অতিবাহিত হতে লাগল আর ধীরে ধীরে পরীর শ্রবণশক্তি লোপ পেতে লাগল। মাস খানেকের মধ্যেই মরিয়ম বেগম ব্যাপারটি লক্ষ্য করলেন। পরী কানে কম শোনে এবং তার কথা ও কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

আট বছরের পরী চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী। কানে কম শুনতে পায় বলে সবাই ওর সাথে জোরে কথা বলে। স্কুলে গিয়েও তেমন একটা সুবিধা করতে পারে না। অনেকে ব্যঙ্গ করে কথা বলে। বয়রা বলে ক্ষেপায়। হাসাহাসি করে। বন্ধুরাও তার সাথে আগের মতো আর মেশে না। পরীর একদম ভালো লাগে না। মগজের সাথে লেখাপড়ার সংযোগ কিছুতেই সে মেলাতে পারছে না। স্কুল থেকে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে দাদিকে সব কথা খুলে বলে পরী। দাদি সোহাগ করে বলে,

-তুই ঐসব কথা কানে লোইছ না দাদু। তোর মতো কইরা তুই মন দিয়া লেহাপড়া কর। দাদিও চিন্তায় পড়ে যায় কিন্ত পরীকে বুঝতে দেয় না। এভাবেই কিছুদিন চলার পর একসময় স্কুলের শিক্ষকের মাধ্যমে মতি মিঞার কানেও কথাটি পৌঁছায়। মতি মিঞা বলেন, স্কুলে যেয়ে সুবিধা করতে না পারলে বাসায় মাস্টারের কাছে যেন পড়ে। সেদিন থেকে পরীর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। বধির হয়ে যাওয়ার অপারগতায় পরীর জন্য স্কুলের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধুদের কাছ থেকেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলো সে। বড় সংসারে ছোট ছোট ভাই বোনদের দেখা শোনা করা। মা কে ছোট খাটো কাজে সাহায্য করা এই কাজগুলো পরীর জন্য নির্ধারিত হয়ে গেল। দূর থেকে মা মরিয়ম বেগম আকাশ কুসুম ভাবেন। পরীর ভাগ্য কী এভাবেই কাটবে? নিরানন্দ, বর্ণবিহীন বেদনা নিয়ে ? বুকে পাথর চেপে, অশ্রুসজল চোখে নীরবে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

নদীর স্রোতের মত দিন গড়িয়ে যেতে লাগল। ভাইবোনেরা প্রত্যেকেই স্কুল লেখাপড়া শিখে বড় হয়ে গেল। কিন্তু পরীর লেখাপড়া আর তেমন এগোল না। অজ্ঞতার আবরণে অন্ধকার গুহায় আবৃত হয়ে রইল পরীর ভবিষ্যত। এত ভীড়ের মাঝে ও নিজের জগতে পরী ছিল সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ, একা অসহায়।

পরী এখন শ্ৰাবণের কুমারী যুবতী। সর্বাঙ্গে পরিপূর্ণ যৌবনের মদমত্ত লাবণ্য ফেটে পড়ছে। বর্ষার টইটুম্বর নদীর জলে ঢল নেমেছ যেন। তার অঙ্গে লাবণ্য টলমল করছে। অপরুপ সৌন্দর্যে সেখানে ঢেউ তরঙ্গ খেলা করছে। কিন্ত পরীর মন কুমারী সুলভ প্রশান্তিতে নিস্তরঙ্গ। সেখানে যৌবনের প্রবণতা নেই। চেহারায় এক মধুর গাম্ভীর্য। শ্রাবনের মেঘের মত দীঘল কালো চুল। দুধের মতো গায়ের বরণ। বড় বড় উজ্জ্বল চোখে স্নিগ্ধ বুদ্ধির প্রভা। চোখ দুটো গহন রাতের মত নিবিড়। একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না।পরীর সৌন্দর্যে সকলেই ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। দাদি পরীকে বাহিরে যেতে দেন না। আদর করে কাছ ছাড়া করেন না। সবসময় নিজের কাছেই বুকের মাঝে আগলে রাখেন।পাড়ার ছেলেরা বাড়ির আঙিনায় এসে উঁকিঝুকি মারে। বিষয়টি দাদি খেয়াল করেছেন। পরীও বাহিরে তেমন যায় না। সারাক্ষণ দাদির সাথে সাথেই থাকে। দাদির সাথে কোরআন তেলওয়াত করে। ওনার কাছ থেকে সেলাই শিখে। যত্ন করে পরীকে দাদি সংসারের সব কাজ শেখায়। দাদিকে অনেক ভালোবাসে পরী। পানের বাটা সাজানো, পান ছেঁচে দেওয়া। ভাত বেড়ে খাওয়ানো, কাপড় ধুয়ে দেওয়া, যত্ন করা এসব কাজই ছোট বেলা থেকে পরী নিজের হাতে দাদির জন্য করছে।

জেনারেটর ভাড়া করে আনা হয়েছে শহর থেকে। সেদিন সমস্ত বাড়িতে আলো ঝলমল করছিল। চারিদিকে আলোর রশ্মি। বাড়িতে লোকে লোকারণ্য।পরীর বড় বোনের বিয়ে। অনেক ধুমধাম করে মতি মিঞা তাঁর বড় মেয়ের বিয়ে দিলেন। বছর ঘুরতেই এক এক করে পরীর পিঠাপিঠি ছোট দুই বোনেরও বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু পরীর কথা কেউ ভাবছে না। ওর অস্তিত্ব যেন সকলে বেমালুম ভুলে গেছে।

তার বিয়ের ব্যাপারে কারোরই কোনো রকম আগ্রহ নেই। পরী ভাবে তার জীবন বিবর্ণ ঝড়ে যাওয়া পাতার মত। বসন্ত এসে কবে পরীকে ভালোবেসে আহ্বান করবে পরী নিজেও জানে না। মনের মাঝে তীব্র এক অভিমান নিয়ে নীরব জীবন যাপন করছে। ঘরের মধ্যে ঘন অন্ধকার।নিজেকে লুকিয়ে পরী গোপনে ফুঁপিয়ে কাঁদে। কিন্ত কাউকেই কিছু বুঝতে দেয় না। বলার সাহসও পায় না।পরীর এই কষ্ট কারো চোখেই পড়ে না। একদিন দাদির কাছে প্রথম পরীর গোপন কষ্ট ধরা পড়ে যায়। দাদি জানতে চান,

-কানদছ্ ক্যান বুবু?

-পরী নিশ্চুপ।

দাদি পরীকে আদর করে কাছে টেনে নেন। আবার ও জিজ্ঞেস করেন,

-ক আমারে, ক সোনা আমি কাউরে কিচ্ছু কমু না।

কানতাছছ ক্যান দাদু ?

দাদির আদরের কাছে নিজেকে সপে দেয় পরী। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে দাদির বুকের উপর।দাদিও চুপ থেকে পরীকে কান্নার সুযোগ করে দেন। একসময় শান্ত হয়ে চোখ মুছতে মুছতে পরী মুখ খোলে।

-দাদি বলেন,

-এহন ক কী হইছে ?

কান্না জড়ানো গলায় আফসোস করে পরী বলে,

-বাবায় ছোট ছোট বইনগো বিয়া দিয়া দিতাছে।

-আমার বিয়ার কথা একবারও কেউ কয় না, ভাবেও না। আমারে কি বাবায় কোনোদিন বিয়া দিব না দাদি?

একথা শুনে দাদির অনেক কষ্ট হয়,বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে ওঠে পরীর জন্য। এমুন সুন্দর একখান মাইয়া আর আল্লায় ওর কপালডা ক্যামুন বানাইয়া দিছে। নিজেকে সামলে নিয়ে, না বুঝতে দিয়ে হাসি মুখে পরীকে বুকে জড়িয়ে ধরে দাদি বলেন,

-ওরে আল্লাহ এই কথা! বিয়া করনের লাইগা কানতাছছ ? ওরে পাগলিরে।দাদি পরীকে আশ্বাস দিয়ে বলেন,

-আইচ্ছা খাড়া, কান্দিছ না। সবুর কর।

আমি তোর বাপের লগে কথা কমুনে।

চকিতে পরী উৎফুল্ল দৃষ্টি নিয়ে দাদির দিকে তাকিয়ে বলে,

-সত্য দাদি? সত্যই কথা কইবা তো বাবার লগে?

-হ, হ কমুরে পাগলি কমু। আনন্দে পরী দাদির গলা জড়িয়ে ধরে সোহাগ করে।মুখটা বুকের মধ্যে আরো খানিকটা গুঁজে দেয় যেখানে আছে পানের মিষ্টি একটা ঘ্রাণ।

আহা,

সুখ জিনিসটা মানসিক প্রশান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়।দাদির আশ্বাসে নিজের মনেই পরী সুখের সাগরে কল্পনার তরঙ্গ ভাসিয়ে দেয়।

কিছুদিন পর দাদির কথা অনুযায়ী মতি মিঞা পরীর জন্য পাত্র খোঁজ করা আরম্ভ করলেন। পরীর সব কথা জেনে শুনে পরীকে যে বিয়ে করতে চায় এমন এক উপযুক্ত ভালো পাত্র খুঁজে বের করলেন মতি মিঞা। দেখতে শুনতে ভালোই। লেখাপড়া একটু কম জানে। ব্যবসা করেন। নাম হোসেইন সিকদার। পাঁচ ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার বড় হোসেইন সিকদার। পরীকে দেখে তাদের অনেক পছন্দ হলো। আসলে পছন্দ হওয়ার মতই তো পরী। বিয়ের দিন তারিখ ও ঠিক হয়ে গেল।শান্ত স্বভাবের মেয়ে পরী আনন্দে আপ্লুত হয়ে গেল।তার চেহারা ঝলমল করতে লাগল। মনের খেয়ালে পরী আকাশের মধ্যে প্রাসাদ বানানোর স্বপ্নও দেখতে লাগল।অনাকাঙ্খিত প্রাপ্তি, ঘটে যাওয়া ঘটনায় পরীর অভিমানী মনকে সকল যন্ত্রণা হতে দূরে সরিয়ে দিল।আত্মীয় স্বজন, বাড়ির অন্যেরাও ওর আনন্দ দেখে মনের মধ্যে একটা প্রশান্তি অনুভব করতে লাগল। যথারীতি ধুমধাম করে প্রচুর উপঢৌকন আর গা ভর্তি জরোয়ায় মুড়িয়ে পরীকে শ্বশুরবাড়ি পাঠালেন মতি মিঞা। বিদায় বেলায় হোসেইন সিকদারের হাত দুটো চেপে ধরে মতি মিঞা ধরা গলায় অশ্রুসজল চোখে বললেন,

-পরী আমার অনেক আদরের মাইয়া। ছোটবেলা থেকে ওর সমস্যার কারণে ওর অনেক কষ্ট। ওরে কোনোদিন কষ্ট দিও না বাজান।বিনয়ী হোসেইন সিকদার অক্ষরে অক্ষরে শ্বশুরের সব কথা পালন করার প্রতিজ্ঞা করলেন। স্বামীর হাত ধরে নতুন জীবনের পথে রওনা হলো পরী বানু।

স্বামী সোহাগীনি পরীর দিনকাল অনেক ভালো কাটছিল শশুরবাড়িতে। নতুন নতুন ঝলমলে শাড়ি পরে সেজে গুজে বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসে। মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়ায় ঘরময়। সমবয়সি বোনদের কাছে হরবর করে নিজের সুখের কথা বয়ান করে। সুযোগ বুঝে দাদিও পরীর সাথে একটু আধটু খুনশুটি করেন।যেন জন্মান্ধ এক যুবতি হঠাৎ করেই একদিন সকালে চোখ খুলে পৃথিবীর রূপ রসে নিমগ্ন হয়ে গেছে।আশেপাশের অসুন্দর কোনো কিছুই এখন আর তাকে স্পর্শ করে না। হোসেইন সিকদারের কাছে শশুরবাড়িতে পরী সুখে আছে দেখে সবাই মোটামুটি নিরুদ্বেগ।শান্ত নির্লিপ্ত স্বভাবের মেয়ে পরীকে বাড়ির সকলেই অনেক ভালোবাসে, আদর করে। তাই তারা মনে প্রাণে আস্বত্ব হলো পরী এখন নিজের সংসার নিয়ে ভালোই আছে।

শারদ অপরাহ্ন।গাঢ় নীল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে একটা দুটো পেজা তুলোর মেঘ। এমন এক স্বর্ণালী দিনে খবর এলো পরী অন্তঃসত্ত্বা। হোসেইন সিকদার, তার মা এবং বাড়ীর সকলে অনেক খুশি এই সুখবরে।

বেশ কয়েক মাস পরের কথা। পুরানো দিনের প্রচলন।মেয়েদের প্রথম সন্তান তার বাবার বাড়িতে হয়।আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা পরীকে হোসেইন সিকদার তার বাবার বাড়িতে রেখে যান বাচ্চা প্রসবের জন্য।পরীর জীবনে এখন সুখের সীমা নেই।তার স্বামী অনেক অমায়িক ভালো একজন মানুষ।পরীকে ভীষণ ভালোবাসে, যত্ন করেন। নতুন অতিথির আগমনের আশায় পরীর মাঝে এক আনাবিল আনন্দের প্রস্তুতি চলতে থাকে। দাদি তার পুরাতন শাড়ি দিয়ে নবজাতকের জন্য ছোট ছোট কাঁথা সেলাই করতে লাগলেন। মতি মিঞা আর মরিয়ম বেগমও খুশিতে আটখানা পরীর আনন্দ দেখে। অজান্তেই তারা ঠোঁটের কোনে হাসি টেনে এনে শান্তির নিঃশ্বাস ছাড়েন।

কিছুদিনের মধ্যেই পরীর কোল জুড়ে ফুটফুটে একটি ছেলে সন্তান পৃথিবীতে এলো। নবজাতকের আগমনে পরিবারের সকলের খুশি যেন আর ধরে না।পুরো বাড়ি জুড়ে আনন্দের উৎসব শুরু হয়ে গেলো। অপার্থিব খুশির ঝিলিক পরীর চোখে মুখে।বাচ্চার মুখ দেখে সুখের বন্যায় ভাসতে লাগল পরী। আদরের নাত্নি পরীর বাচ্চা কোলে নিয়ে দাদির আহ্লাদের সীমা নেই। হাত ভর্তি মিষ্টি নিয়ে হোসেইন সিকদার হাজির হলেন ছেলের মুখ দেখার জন্য।চারপাশে প্রত্যেকেই যেন পরীর সুখে খুশির বন্যায় ভাসতে লাগল।

হঠাৎ কিছুদিন পর মরিয়ম বেগম বাচ্চাকে গোছল করাতে যেয়ে খেয়াল করলেন বাচ্চাটার চোখ দুটো কেমন যেন ঘোলাটে। নিজের মনেই প্রশ্ন করলেন,

চোখ দুইডা এমুন ঘোলা সাদা দেখায় ক্যান?

কিছুটা বিভ্রান্ত।পরমুহূর্তেই ভাবলেন, হয়তো তার দেখার ভুল।তারপরও পরীর দাদিকে একবার ডেকে এনে দেখালেন। উনিও একই কথা বললেন। মতি মিঞা সঠিক কারণটা জানার জন্য ডাক্তার ডেকে আনালেন।

ডাক্তার বললেন,

-আমার ধারণা ভুল ও হতে পারে। মনে হচ্ছে বাচ্চাটির জন্মই হয়েছে জন্মান্ধ হয়ে। তারপর ও একবার চোখের ডাক্তার দেখানো দরকার।

হায়, ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস।

এত সুন্দর পৃথিবীর আলো দেখা থেকে বঞ্চিত এক অবুঝ শিশু কখনোই তার মা কে দেখতে পাবে না ? এই কথা ভাবতেই পরীর উজ্জ্বল মুখটিতে বিষাদের কুয়াশায় ছেয়ে গেল।মন উতলা হয়ে ওঠল। কান্নায় ভেঙে পড়ল অসহায় পরী। নবজাতককে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পরীর স্বামী সহ শাশুড়ি জোহুরা বেগমও মতি মিঞার বাড়িতে এলেন। প্রথমবারের মত নাতিকে দেখতে পেরে উনি আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু যখন জানতে পারলেন নবজাতকের কথা যে পরীর বাচ্চা জন্মান্ধ তখন যেন তিনি ক্রোধে ফেটে পরলেন। চোখ বড় বড় করে আকাশ থেকে পড়লেন। শুরু থেকেই পরীর কানে কম শোনার সমস্যা ছিল। কথাও ঠিকমত বলতে পারে না, অস্পষ্ট শোনায়।এই নিয়েই জহুরা বেগম তেমন খুশি ছিলেন না।তার উপর অন্ধ বাচ্চা জন্ম দেওয়া। উচ্চস্বরে বলতে লাগলেন,

-এইডা কী কন বেয়াই সাহেব! এতদিন চুপ কইরা আছিলাম পোলার কারণে।হেয় আপনের মাইয়ারে পছন্দ কইরা নিছে।এহন আপনে এইডা কী শুনাইলেন!! আর তো চুপ থাকা যায় না।উনি উচ্চস্বরে মতি মিঞার সাথে তর্ক করতে লাগলেন।তার ধৈর্যের বাঁধ যেন ভেঙে পড়ল। তিনি বোঝাতে চাইছেন, যেন এ সব কিছুর জন্য পরীই দায়ী। জহুরা বেগম পরীর বাবা মা কে অনেক কটু কথা বলে অপমান করতে লাগলেন। এমনকি তিনি পরী এবং নবজাতককে ফিরিয়ে নিয়ে যেতেও অসম্মতি জানালেন।এক কথা দুই কথায় বিষয়টি অনেক দূর গড়াল।তাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হলো।মতি মিঞা ছিলেন সেই শহরের দাপটে লোক।অন্যায় কাজ কখনও করতেন না। প্রশ্রয় ও দিতেন না।পরীর শাশুড়ির এসব কথা এবং অমানবিক আচরণে উনি ক্ষুব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর আত্মসম্মানে প্রচন্ড ভাবে আঘাত লাগল।তৎক্ষনাত সবার সম্মুখেই সিদ্ধান্ত নিলেন যে পরীকে আর উনি শ্বশুরবাড়িতে পাঠাবেন না। দাদি এবং মরিয়ম বেগম তাদের দুজনকেই অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্ত কিছুতেই উনাদেরকে শান্ত করা সম্ভব হলো না।

মানুষের দুর্বল মূহুর্তে অন্যের দ্বারা মারাত্মকভাবে আঘাত পাওয়া অন্তরাত্মার কতখানি যে ওলটপালট করে দেয়, তা একমাত্র যে ভুক্তভোগী সেই বুঝতে পারে। উভয় পক্ষের বাকবিতন্ডা, আকস্মিকভাবে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনায় পরীর স্বামী এবং পরী দুজনেই হতবিহ্বল।পরীর স্বপ্নের পৃথিবী, চোখের সামনেই দেখতে পেল ভেঙে খান খান হয়ে যেতে। সকল সিদ্ধান্তের পর বাকরুদ্ধ হোসাইন সিকদার পরীর দিকে করুন দৃষ্টি ফেলে মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।আর অসহায় পরী অসীম বেদনায় অশ্রুসজল চোখে দরজায় দাঁড়িয়ে তার স্বামী আর শাশুড়ির প্রস্হানের দিকে তাকিয়ে রইল।সুখের দিনগুলো হারিয়ে যাওয়ার এক অজানা আশংকায় বুক ধরফর করতে লাগল।অতিরিক্ত প্রাপ্তির সেই বিস্ময়ের ঘোরটুকু কেটে যেতেই একটা হারানোর ভয়ঙ্কর ভয় তাকে পেয়ে বসল। অতিরিক্ত প্রাপ্তির এটাই বিপদ।পাওয়ার পরিমাণ যতই বাড়ে হারানোর ভয়ও ততই বাড়তে থাকে সমাণুপাতে। সেইদিন রাতে পরীর চোখে আর ঘুম এলো না। দাদিকে জড়িয়ে ধরে সারারাত সে কাঁদল।

সমস্ত চরাচর কেমন যেন এক বিস্তীর্ণ নিঝুম স্তব্ধতায় কুকড়ে আছে। শুধু যে আলো নেই তা-ই নয়, শব্দও নেই। তারাগুলো যেন লাল রক্তবিন্দুর মত জ্বলছে। ঘোর অমানিশা যেন এক বিপর্যয়ের আশঙ্কায় মূক।

ভয়ার্ত বিহ্বলতায় কাতর পরী।

দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারে না।

সময়ের রূপান্তরে অনুভবে বিহ্বল শূন্যতা নিয়ে পরীর আতঙ্ক কুণ্ডুলি পাকিয়ে বসল। হৃদয়ের গহীনে কত কথা জমে আছে। কী করে বলবে তার স্বামীকে? নির্জন রাতে কুপির নিভু নিভু আলোতে পরী পেন্সিল দিয়ে সাদা কাগজে ভুল বানানে গোটা গোটা অক্ষরে মনের কথা লিখে। চোখের পানিতে কাগজে কত লেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। হোসেইন সিকদার এলে তার হাতে চিঠি খানা দিবে এই আশায় বালিশের নিচে যত্ন করে লুকিয়ে রাখে।

মাস খানেক পর মায়ের বাধ্য ছেলে হোসেইন সিকদার অবাধ্য হয়ে পরীর সাথে গোপনে দু দুবার দেখা করতে আসলেন। বউ এবং সন্তানকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শ্বশুরকে হাত জোর করে অনুরোধও করলেন। কিন্তু মতি মিঞা তার সিদ্ধান্তে অটল।

বললেন,

-তোমার মা আইসা যদি পরীকে ফিরাইয়্যা লইয়া যায় তয় আমি ওরে পাঠামু। নিজের সন্তানের অপমানের কথা ভেবে মতি মিঞা মেয়েকে এভাবে শশুর বাড়ি পাঠাতে রাজি হলেন না। কোনো ভাবেই যেন সমাজের কাছে নিজেদের সম্মান ক্ষুণ্ণ না হয়। উপরন্ত জেদ আর নিজেদের অহংকারী আত্মমর্যাদার কথা ভেবে উনি সিদ্ধান্ত নিলেন।পরী এখন থেকে এখানেই থাকবে। এই কথা ভেবে হোসেইন সিকদারকে শক্ত ভাবে ধমকের স্বরে বলে দিলেন,

যদি তোমার মা রে লইয়া আইতে পারো পরীকে লইয়্যা যাওয়ার জন্য তবে আইসো নয়ত এই বাড়িতে আর কোনোদিন যেন তোমারে না দেখি। নির্বাক পরীর স্বামী কোনো কথা না বলে নীরবে চলে গেলেন।

ভালোবাসার আকুলতা নিয়ে আসা হোসেইন সিকদারের জীবনের সকল রঙিন স্বপ্নগুলো যেন বিরহের দ্বারে এসে এক দমকা হাওয়ায় ধুলোয় মিশে গেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় পরী বাবার সিদ্ধান্তের উপর আর কোনো কথা বলার সাহস পেল না। মুঠো করে রাখা স্বপ্নগুলো যেন নিমিষেই বালুর মতো হাত গলে বেড়িয়ে পড়ল। এই দুঃখের রাজ্যে সে যেন একলা পথের পথিক। বাবার এই সুখের সাম্রাজ্য এখন তার কাছে পীড়নকর হয়ে দাঁড়াল। ফেলে আসা নিজের সাজানো সুখের সংসার আর স্বপ্নগুলোর কথা ভেবে চোখের জলে বুক ভাসে পরীর।নিজের কথা ভাবে, কাঙাল যদি চিৎকার করে কাঁদতেও চায় তবে কতদিনে শেষ হবে এই কান্না ? যাতনার সিঁড়ি ভেঙ্গে পরী দিনগুলো মন্থর গতিতে অতিবাহিত করতে লাগল।

স্বামী আবারও নিতে আসবে এই আশায় বুক বেঁধে শূন্য দৃষ্টিতে আকাশ পানে তাকিয়ে থাকে। ব্যাকুল বেদনার্থ হৃদয়ে দিনের পর দিন প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে লাগল পরী। যেন তার মনের মাঝে সারাক্ষণই বাজে-

আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল সুধাইলো না কেউ।

বছর ঘুরে নতুন বছর আসে। অস্তমিত সূর্য পশ্চিম দিগন্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে সোনালী আভা। ঈদ উপলক্ষে বোনেরা তাদের স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে ঈদ উদযাপনের জন্য বাবার বাড়িতে আসে।বাবার দেওয়া নতুন নতুন শাড়ি গহনা পরে সবাই ঘুরে বেড়ায়। সমস্ত বাড়ি আনন্দের ফোয়ারায় উদ্বেলিত হয়। নির্লিপ্ত পরী নিরলস ভাবে তার মা মরিয়ম বেগমের সাথে রান্নাঘরে কাজ করে যায়।যে অল্পতে তুষ্ট থাকে তার কাছে পৃথিবীর তাবৎ কষ্ট ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যায়।পরীর বেলাতেও তেমনটি হলো।

দেখতে দেখতে দু বছর কেটে যায়। একদিন হঠাৎ খবর আসে পরীর স্বামী আবার বিয়ে করেছেন। এই কথা শোনার পর পরীর সাজিয়ে রাখা এতদিনের সমস্ত স্বপ্নগুলো কাঁচের চুড়ির মতো ঝনঝন শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। দিন রাতের সকল অপেক্ষা আর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দুচোখের অশ্রুজল অবিশ্ৰান্ত হয়ে আছড়ে পড়ল বালিশের উপর।ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে অতলান্ত কষ্টের সাগরে নিজেকে সমর্পণ করল।জীবন স্বপ্নের রক্ত বর্ণের সূর্যের গোলাটা ধীরে ধীরে তলিয়ে যেয়ে পরীর জীবনে আঁধার এনে দিল।অপরিমেয় এই কষ্ট সামাল দিয়ে উঠতে পরীর অনেকটা সময় লেগে গেল।

চৈত্র মাস।রোদের তেজে তাকানো যায় না। মাথার ওপর আগুন ছড়িয়ে হাসছে প্রখর সূর্য। জ্বলছে আকাশ বাতাস। তার সাথে সেই জ্বলন্ত নরকে যোগ দিতে ধেয়ে আসছে পাগলা হাওয়ার ঘূর্ণি ঝড়।সেই সাথে উড়িয়ে আনছে ভালোবাসার গন্ধবিলাস।ভুলতে পারছে না পরী তার প্রণয়দেবতা প্রিয় মানুষটির কথা।

ব্যর্থ আক্রোশে দাপাদাপি করছে দেহের ভেতর।দূরন্ত ঝড় অধির আগ্রহে মুক্তি চাইছে পরীর দেহ থেকে।এত ভালোবাসা এত স্মৃতি কী করে ভুলে যাবে পরী।কঠিণ রেখা ফুটে ওঠে পরীর চেহারায়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, ভেঙে পড়লে চলবে না তার ছেলের জন্য তাকে বেঁচে থাকতে হবে।

অভিযোগবিহীন মায়ের সংসারের কাজ আর নিজের সন্তানের দেখাশোনা করে কোনো রকমে পীড়নকর দিনগুলো অতিবাহিত করতে লাগল।পরীর জীবনটা মাটির উপর দাঁড়িয়ে ধুলোর মতো উড়ছে। দিনগুলো কেবল নিয়মের বাঁকে স্বল্প পরিসরে বাঁধা।যেন ভাগ্যের কাছে পরনিগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকা।

ছেলেটার চোখ দুটোর দিকে তাকালে বুকের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে কেঁদে ওঠে। কেমন এক গভীর বেদনায় পরী আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। এত সুন্দর ফুটফুটে ছেলেটির চোখ দুটো কেমন ডিমের কুসুমের মতো ঘোলাটে দেখতে।

 

এরমধ্যে তার সব চাইতে কাছের মানুষ দাদিও একদিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরতরে বিদায় নিলেন।

একদিন পরীর এক ছোট বোন রুসন ঢাকা থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। ছেলেটাকে দেখে রুসনের অনেক মায়া হয়। কথা প্রসঙ্গে রুসন মরিয়ম বেগমকে বললেন,

ছেলেটিকে চোখের ডাক্তার দেখানো দরকার। ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে হয়ত পরীর ছেলেটি আবার দেখতে পারবে।

মরিয়ম বেগম বললেন,

-জন্মের অন্ধ কি ঠিক হইব?

-রুসন বলল, চেষ্টা করতে দোষ কোথায় মা ?

মরিয়ম বেগম রাজি হলেন।

বললেন,

-দ্যহি তোর বাপেরে জিগাইয়্যা লই। সব কথা শুনে মতি মিঞাও সম্মতি দিলেন। কথা মতো পরী আর তার সন্তানকে চিকিৎসার জন্য ছোট বোন রুসনের বাসায় ঢাকায় নিয়ে আসা হলো।চোখের ডাক্তার দেখানো হলো। ঢাকার বড় চক্ষু বিশেষজ্ঞ সব কিছু পরীক্ষা করে বললেন, অপারেশন করলে চোখ হয়তো ভালো হতে পারে। তবে সময় লাগবে। এই কথা শুনে আনন্দে পরীর চোখ চকচক করে উঠল। ছেলে চোখে দেখতে পাবে। আমাকে দেখতে পাবে,এই কথা শুনে এক মুহূর্তের মধ্যে ছেলেকে নিয়ে সে স্বপ্ন দেখতে থাকে।আবার নতুন স্বপ্ন নিয়ে আশায় বুক বাঁধে পরী।খুশির অশ্রু সঙ্গ করে কিছুদিন পর সে বাড়ি ফিরে আসে।হরবর করে মরিয়ম বেগমকে সব কথা এক নিঃশ্বাসে বলে শেষ করে। আহ্লাদিত কণ্ঠে মাকে অনুরোধ করে, মা তুমি কিন্ত আমার পোলার অপারেশন করাইতে ঢাকায় লইয়া যাইবা।পরীর মাও শুনে অনেক খুশি হলেন এবং পরীকে আশ্বস্ত করলেন যে, অপারেশনের জন্য তার ছেলেকে আবার ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে।

পরী আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঘুরে ঘুরে এই খবর বাড়ির সবাইকে দিতে লাগল। ছেলেকে নিয়ে এক নতুন আশার আলো দেখতে পেয়েছে পরী।পুকুরপাড়ে কাপড় কাচতে কাচতে সবাইকে বলতে লাগল,

-ডাক্তারসাব কইছে আমার পোলার চোখ বালা হইয়্যা যাইব।ওয় আমারে দেখতে পারব। আনন্দে আত্মহারা পরী নির্ঘুম রাত কাটায়। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছেলের ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো সুঁই সুতো দিয়ে নকশি কাঁথার মত বুনতে থাকে।দিন গড়িয়ে যায়।পরী দুদিন পরপরই মাকে তাগিদ দিতে থাকে ছেলেকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। বড় সংসারের নানাবিধ ঝামেলার কারণে, আজ যাব কাল যাব বলে মরিয়ম বেগম আর সময় করে উঠতে পারছিলেন না।ঠিকমত মনোযোগও দিতে পারছিলেন না।এরই মধ্যে হঠাৎ করে একদিন ছেলেটি টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়ল। মরিয়ম বেগমকে পরী ছেলেটির জ্বরের কথা জানাল।ডাক্তার এসে ছেলেটিকে দেখে ঔষধ দিয়ে গেলেন।জ্বর প্রায় কমেই আসছিল।

কিন্ত বিধির কী বিধান! হঠাৎ করেই মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় প্রচন্ড জ্বরে আড়াই বছরের বাচ্চাটিকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো।

বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন সন্তানকে হারিয়ে পরী পাগল প্রায়। নাওয়া খাওয়া ঘুম সব বন্ধ হয়ে গেল। রাত দুপুরে দৌড়ে কবরস্থানে চলে যায়।ছেলের কবরের উপর কান্নায় আঁছড়ে পড়ে।সারারাত সেখানে বিলাপ করে কাঁদে।বাড়ির লোকজন জোর করে তাকে কবরস্থান থেকে ধরে নিয়ে আসে।কোনো ভাবেই পরীকে শান্ত করা যায় না।পাগলের মতো দৌড়ে যায় মা মরিয়ম বেগমকে মারতে। চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে বলে,

-তুই, তুই আমার পোলাডারে মারছস। বারবার কওনের পরও তুই আমার পোলারে ডাক্তারের কাছে লইয়া যাছ নাই।ঔষুধ কিনা দেছ নাই। তুই মারসছ আমার মানিকডারে, তুই মারসছ। আমার সোনা মানিক মইরা গ্যাছে।আমারে একলা ফালায় থুইয়া চইলা গেছে।

-ও আল্লাহ্ রে।এইডা তুমি কী করলা আল্লাহ !

চিৎকার করে বুক চাপড়িয়ে বলে, আইজ আমার স্বামী থাকলে আমার যাদু সোনা মরতো না। উদ্ভ্রান্ত পরীর চোখ মুখ ঠিকরে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। নিত্যদিনের নৈসর্গিক জীবনের পথচলা পাগল প্রায় পরীর জীবন অস্বাভাবিক আচরণে পরিণত হলো।

তার হাহাকারে বাড়ির সবাই স্তব্ধ।গাছের পাতাগুলোও যেন একে একে ঝরে পড়ে তার আর্তনাদে।ওর অবস্থা দেখে সকলের চোখে নীরব অশ্রু ঝরে। মতি মিঞা এবং মরিয়ম বেগম মেয়ের এই কষ্টে নির্বাক পাথর হয়ে যান। কেবল বিড়বিড় করে বলেন,

এইডা কী হইলো?

বাস্তবতা এতটাই কঠিন যে কখনও কখনও বুকের ভিতর গড়ে তোলা বিন্দু বিন্দু স্বপ্নগুলো ও কেমন অসহায় হয়ে পড়ে।কাঁচের টুকরার মতো ভেতরটা ভেঙে গেলে বাকি জীবন ভাঙ্গা টুকরোগুলোকে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করেই থাকতে হয়।

দীর্ঘদিন এভাবেই পরীর চরম পাগলামি চলতে থাকে।প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের পর যখন সব কিছু নীরব শান্ত হয়ে যায় তেমনই একটি সময় পরী একদম শান্ত হয়ে পাথরের মত হয়ে গেল। আর কারো সাথে কথা বলে না, কাঁদেও না। একাকিত্বকে আঁকড়ে ধরে সামনের দিনগুলো নিরানন্দ ভাবে অতিবাহিত করতে থাকে। দিন গড়িয়ে যায় নতুন বছর আসে।এক সময় বাকি ছোট বোনদের প্রত্যেকেরই বিয়ে হয়ে যায়। ভাইরাও বিয়ে করে নতুন বউ ঘরে নিয়ে আসেন। কয়েক বছর পর পরীর বাবা বার্ধক্য জনিত অসুস্থতার কারণে নিজ দেহ ত্যাগ করেন।যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে ঘর বাড়ির পরিবর্তন হয়।নতুন নতুন মানুষদের আগমন ঘটে।বেশ কয়েক বছর পর মরিয়ম বেগম দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী থাকার পর ওনার বড় বউয়ের হাতে পরীকে দেখে রাখার সমস্ত দায়িত্বভার সঁপে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মাঝে মাঝেই পরীর বোনের ছেলে মেয়েরা দল বেঁধে বেড়াতে আসে সৈয়দ বাড়িতে।অতীতে যখনই ঐ বাড়িতে বেড়াতে আসত সেই একই জায়গার কত পরিবর্তন। কোনো কিছুই আগের মত নেই।কিন্তু পরী যেমনটি ছিল তেমনই আছে।তার সেই পুরনো ঘর, সেই বিছানার কোনো পরিবর্তন নেই। একই বিছানার উপর নীরব পরীকে বসে থাকতে দেখেছে দিনের পর দিন।বারান্দার এক কোণায় বসে যতদূর চোখ যায় ভাবলেশহীন শূন্য দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন কারো প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছে।পাথর যতই শক্ত হোক না কেন অতিরিক্ত ঘষাঘষি করলে পাথরও একসময় ক্ষয় হয়ে যায়।পরী ঠিক তেমন করেই নিজের একান্ত কষ্টকে বুকে চেপে ভেতরে ভেতরে ক্ষয় হতে লাগল।

কাছে যেয়ে যখনই কেউ জানতে চাইত, কেমন আছো তুমি ? বলত, বালা আছি।পরিচয় দেওয়ার পর পুরো গাল ভরে নিষ্পাপ হাসি টেনে এনে ওদের মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে জড়িয়ে ধরত।আদর করে বলত, কেমুন আছো সোনা পাখিরা? চোখে তেমন দেখতে পেতো না তারপরও খুশিতে তার বড় বড় চোখ দুটি যেন ঝলমল করে উঠত।গলা উঁচু করে সবাই কে জানান দিত,

-ওরে আমার বুইনের পোলা, মাইয়ারা আইছে, পুলাও নান, মানসো নান, মিঠাই আন। বরাবরই ভালো ভালো খাবার খেতে পরী অনেক পছন্দ করত।ছোট মাছ তার একদমই পছন্দ ছিল না।বড় মাছ না হলে গাল ফুলিয়ে বসে থাকত।

শেষের দিকে আর কাউকে চিনতে পারত না। অর্থশূন্য দৃষ্টি নিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত।চোখে তেমন আর কিছুই দেখতে পেতো না।কানেও শুনত না। কণ্ঠ ফ্যাসফ্যাসে হয়ে গিয়েছিল। কিছু জানতে চাইলেও উত্তর ঠিকমত পাওয়া যেতো না। বয়সের ভারে আস্তে আস্তে সবকিছুই অকেজো হয়ে গেছে। সকলের চোখের সামনে সেই স্মৃতি এখনও দৃশ্যমান।

এক পরন্ত বিকেলের মিষ্টি সোনা রোদ গুটি গুটি পায়ে জানালার কাঁচ গলে পরীর চেহারার উপর এসে পড়েছে।কী রুগ্ন দেখাচ্ছে পরীকে।গায়ের রঙটি হলদে হয়ে গেছে। দুই গালের চোয়াল ভেঙ্গে গেছে। বড় বড় চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে। বহুদিন যাবত সে অসুস্থ। হাসপাতালের একটি বিছানায় শুয়ে আছে অপ্রকাশক্ষম পরী। অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণা হওয়া সত্ত্বেও উফ পর্যন্ত করছে না। তার ছোট ভাইয়ের ছেলে মেয়েরা পালা করে তাকে হাসপাতালে এসে দেখাশোনা করছে। খাইয়ে দিয়ে যায়। অপ্রাণ চেষ্টা করছে পরীকে সুস্থ রাখার। অথর্ব নির্জীব একটি দেহ যেখানে কোনো ভাষা নেই। চাহিদা নেই। এই বিশ্ব সংসারে বেঁচে আছে শুধুই নির্মোহ দৃষ্টি নিয়ে নিজের খেয়ালে নিজের ধ্যানে। তার মনের ভেতর-বাড়িতে মৃত্যুর সাথে কী আলাপন চলছে কেউ তা বলতে পারে না। বেঁচে থাকাটা যেন তার জন্য দুঃসহ এক শাস্তি। ক্যানসারে আক্রান্ত পরীর শরীরের অনাকাঙিক্ষত কিছু অংশে পঁচন ধরে গেছে। বুকে হাত দিয়ে বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। শরীরের কোনো যন্ত্রণা এখন আর তার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। মাঝে মাঝে শরীরের কিছু অংশ মৃত বলে দাবি করে।

তখন রাত্রি দ্বিপ্রহর।বৃষ্টি ভেজা অভিমানী এক রাত। কোনো এক অভিযোগ নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দুটো কুকুর অনর্গল কেঁদে চলেছে।কিছুক্ষণ পর পর দমকা হাওয়া এসে জানালায় ধাক্কা দিচ্ছে।প্রবল বাতাসের দাপটে জানালার কাঠের পাল্লা দুটোর গায়ে বৃষ্টির ঝাপটা ক্রমাগতই আছাড়ে পড়ছে।নীল কুয়াশা মাটি থেকে থরে থরে জমে মনে হয় যেন আকাশ ছুঁয়েছে।বাহিরে তাকালে শুধুই নীল ধোঁয়াষার মতো দেখায়।নীলাভ অন্ধকারের মধ্যে কখনো কখনো বুক চেতিয়ে তলোয়ার শানাচ্ছে বিদ্যুতের রেখা।

মেঘাচ্ছন্ন আকাশের বুক হতে থেকে থেকে যেন প্রতিবাদের ঝঙ্কারে ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ঝমঝম শব্দে পাগলের মত এদিক ওদিক হাতড়ে নিয়ে তীব্র গতিতে অঝরে ঝরে পড়ছে জলধারা। মাথার উপর আলো গুলো দপদপিয়ে উঠল।অন্ধ মানুষের ঘোলাটে চোখের জ্যোতির মতো বিবর্ণ সেই আলো। হাওয়ার ধাক্কায় বৃষ্টির ফোঁটা গুলো এলোপাথাড়ি হয়ে পড়ছে, যেন গতিপথ ঠিক করে উঠতে পারছে না। কখনো বৃষ্টির ছাট এদিকে যাচ্ছে, কখনো ওদিকে। দিগন্ত সীমাকে ফালাফালা করে দিয়ে একাধিকবার ঝলসে উঠল বিদ্যুত। ঘরের ভেতর খা খা শূন্যতা বিরাজ করছে। জানালার বাহিরে তাকালে বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে।মনে হয় মাতাল করা এক কালো রাত্রি কৃষ্ণ-গহব্বরে ডুবে আছে।

আচ্ছা, মৃত্যুর আগ মূহুর্তে কি মৃত মানুষের শরীরের গন্ধ মাছি টের পেয়ে যায় ?

সারাক্ষণই গা এর উপর একটা মাছি বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর পরই মুখের কাছে এসে ভন ভন করে। তাড়িয়ে দিলেও আবার এসে হাজির হয়।মৃত্যুর দ্বারে দাঁড়িয়ে স্মৃতির অবগাহনে পরী নীরবে প্রহর গুনে চলেছে অন্তিম শয্যার।

টানা দুই বছর ক্যান্সারের সাথে অদম্য যুদ্ধ করার পর ভাগ্যের কাছে নির্মম ভাবে অবহেলিত পরীর আজ দমের নিষ্কৃতি হলো।

রুদ্রর সেই কবিতার লাইনগুলো—

আমি সেই অবহেলা

আমি সেই নতমুখ,

নিরবে ফিরে যাওয়া অভিমান-

ভেজা চোখ আমাকে গ্রহণ করো।

 

কখনও কখনও গভীর অতলান্ত প্রশ্নের সমুদ্রে তলিয়ে যাই। মন কতই না অজানা প্রশ্নের দ্বারে দাঁড় করিয়ে রাখে। নিরবিচ্ছিন্ন সুখ যাকে বলে সেটা কি পরী কখনো পেয়েছিল? সব সময় শুনে এসেছি নিজের কর্ম দোষে আল্লাহ পাক ভাগ্য নির্ধারণ করেন। তবে পরী? পরীর কী অপরাধ ছিল ? কী এমন অন্যায় করেছিল যে সারাজীবন তাকে এই অভাবনীয় কষ্টের মহা সমুদ্র পাড়ি দিতে হয়েছিল?

 

উইলি মুক্তি। কবি ও গল্পকার। জন্ম বাংলাদেশ ঢাকা, আর কে মিশন রোড। বেড়ে ওঠা, ধানমণ্ডি। বর্তমান নিবাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক। পড়াশোনা করেছেন ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজ, ইউনিভার্সিটি অফ ডিট্রোয়েট মিশিগান। প্রকাশিত বই: 'জল পাথরের যুগলবন্দি' (কাব্যগ্রন্থ, ২০২০ সাল)

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

বিভেদ

বিভেদ

অন্তরাদের ফ্ল্যাটের সামনে পাশের বাসায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ থাকে। ওদের বেলকনি আর অন্তরাদের বেলকনি প্রায়ই…..