মেঘের আড়ালে

শাহাব আহমেদ
গল্প
Bengali
মেঘের আড়ালে

আমেরিকার মিড ওয়েস্টে কিছুদিন ছিলাম। সেখানে আমার পরিচয় ছিল একটি পরিবারের সাথে। একজন বাঙ্গালী ভদ্রলোক, তার আমেরিকান স্ত্রী ও এক মেয়ে। উনি একটি ভার্সিটিতে বোটানি  পড়াতেন। তার স্ত্রী ছিল ডাক্তার, আর মেয়েটি স্কুলে পড়তো।

অত্যন্ত পরিশীলিত পরিবার। তাঁর বয়েস ছিল প্রায় ষাটের কাছাকাছি। অত্যন্ত মৃদুভাষী একজন মানুষ। বাড়ীতে মূলত ইংরেজীতেই কথা-বার্তা হতো। তার স্ত্রী বা মেয়ে বাংলা জানতো না।

সেই শহরে অন্য কোন বাংগালী ছিল না, আমি নিজেও তখনও ব্যাচেলর। নতুন চাকরি নিয়ে এসেছি। ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে। প্রায়ই তাদের ওখানে যেতাম।

যৌবনে আমেরিকায় এসেছিলেন পড়াশুনো করতে।

আর ফিরে যান নি।

ধীরে ধীরে পিতা মাতা গত হয়েছেন, ভাই বোনের সাথে সম্পর্ক ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গেছে।

আমি গেলে খুশী হতেন।

তার স্ত্রী ছিলেন বন্ধু বৎসল রুচিশীল একজন নারী।

মেয়েটি ছিল আমার খুব প্রিয়।

নম্র ও ভদ্র।

বয়:সন্ধিক্ষণের আমেরিকান মেয়েদের মধ্যে যে রূঢ়তা, রুক্ষতা , বন্যতা , অহমিকা এবং বালখিল্যতা দেখা যায় তা চোখে পড়ে নি।

চিত্র: রিয়া দাস

সে তার পিতাকে খুব ভালোবাসতো।

ছোট্ট এক নদীর তীরে ছায়া ঘেরা বাড়ী। হরিণ হাঁটে সেই বাড়ীর সাঁঝের নির্জনে। সারস ধ্যান করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে। নদী পার হয়ে বিস্তীর্ণ মাঠ। আকাশের সাথে মেশামেশি সেই মাঠের।

গল্প হতো তার সাথে। ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে গিয়ে এই মৃদু মানুষটিই কেমন সজীব ও উচ্ছসিত হয়ে উঠতেন। চোখে দেখা দিত এক অদ্ভুত আলো। মনে হতো যেন তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টা ছিল ৭১। যুদ্ধ আর বিজয়! সেই অনির্বান স্মৃতি জ্বল জ্বল করে উঠতো তার চোখে।

বিদেশে চলে আসা মানুষগুলোর জন্য দেশ হল বুকের গহীনের এক পবিত্র মন্দির। কত কোমল অনুভূতি সেখানে। যা আপাত অতি তুচ্ছ, সেই সব জিনিসের কথা তুলতেন তিনি। শীতের ভোরে বকুল তলায় বকুল ফুল তোলার গল্প, সেই বকুলের তন্ময়- ঘ্রাণ । গাছে ফুটে থাকা বকফুলের বর্ণনা। সদ্য দেশ থেকে আসার কারণেই হয়তো বা আমার কাছে খুব অবাক লাগতো। লোকজন কত বড় বড় জিনিস নিয়ে কথা বলে, তর্ক করে। তাদের সাফল্যের বর্ণনা করে হামবড়া ভাব দেখায়।

অথচ এত বড় একজন মানুষ দেশ থেকে এত দূরে প্রশ্ন করেন:

“গিমা শাক খেয়েছেন কখনও?”

গিমা শাকের নামও শুনিনি, খাওয়া তো দূরের কথা।

“আমাদের এলাকায় হয়। শাকের মধ্যে সবচেয়ে তিতা। একবার খেলে সারা জীবন মনে থাকে। যুদ্ধের সময় অনেক খেতে হয়েছে। তিতারও যে একটা স্বাদ আছে তখন বুঝেছি। ঘন সবুজ ছোট ছোট পাতা, কী যে সুন্দর!”

ভাবি বোটানির প্রোফেসর, তার লতা-পাতার সৌন্দর্যবোধ ভিন্ন হতেই পারে। কিন্তু বিষয়টা তা নয়। বিষয়টা মাতৃভূমির সাথে সম্পৃক্ত।

দেশ নিয়ে, তার কোন অভিযোগ ছিলো না। ছিলো না কোন ক্ষোভ, যা প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে বেশ প্রবল। শুধু স্মৃতি। এক অপূর্ব মুগ্ধতার জ্যোতির্ময় স্মৃতি। পিছনে ফেলে আসা গ্রামের বরবটি ক্ষেতের শিশির বিন্দুর মত দৃষ্টি উপেক্ষিত কোন দীর্ঘনি:শ্বাস টের পাওয়া যেত কখনও কখনও।

কিন্তু খুবই সংক্ষিপ্ত। বয়সে অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাকে তুমি বলে ডাকতে রাজি হন নি। নিকটত্বের মাঝেও দূরত্ব ছিল যা অতিক্রম হয় নি।

অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই ঘটনাটি ঘটে।

এক সকালে উনি রওনা দেন ভার্সিটির পথে, কিন্তু গাড়ী এক্সিডেন্ট করে মারা যান। স্পট ডেড।

স্থানীয় একটি কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।মাটির নীচে স্বদেশ বা বিদেশের কোন তফাৎ আছে কিনা জানা নেই, বিদেশে ঘুমিয়ে পড়া মানুষ জাতির সম্মিলিত স্মৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় কি না তাও।

কিন্তু সীমাহীন মানসিক বিপর্যয় নেমে আসে পরিবারটিতে।আমি একা হয়ে পড়ি। কিছুদিন পরে আমিও চলে আসি অতি নির্জন অন্য শহরে। রোগী দেখা নিয়ে ডুবে থাকি আপাদ মস্তক। ছোট শহর, মানুষের চেয়ে গাছপালা বেশী। পাখী, প্রাণী আর গবাদী পশু। ধীরে ধীরে অস্তিত্বের কোথায় যেন টের পাই ফেলে আসা দেশের স্মৃতিকল্প।

মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয় মা ও মেয়ের সাথে।

প্রায় বছর খানেক পরে মেয়ে পিতার একটি ডায়েরি খুঁজে পায়।

বেশীরভাগই খালি, মাঝে মাঝে কিছু লেখা।

পড়তে না পেরে ডায়েরিটি পাঠিয়েছে আমার কাছে।

আমি সেই ডায়েরি খুলে বসেছি।

মাত্র কিছুদিন আগেও জীবিত ছিল যে মানুষটি আমি তার অনুভূতির জগতে বিচরণ করছি। এক বিষন্ন বেদনার সেই জগত।

মৃত্যুর বছর খানেক আগের কয়েকটি এন্ট্রি:

Don’t walk away from me,
I have nothing, nothing, if I don’t have you.

ব্রিটনি হিউস্টন গাইছে , গান নয় যেন গলায় রক্তক্ষরণ।

এই ভাবেই গাইতে হয় এবং এই গানই গাইতে হয়।

আমি গাইতে পারি না, আফসোস।

কাঁসার থালার মতই বিরাট ও গোল।

রাত ঝকঝক করছে।কলা পাতার ছায়া পড়েছে মাটিতে। কলা পাতা বাঁশপাতার চেয়ে বড়, আমলকি পাতার চেয়েও। কলা পাতা যে এত সুন্দর আগে কেন তা চোখে পড়ে নি, ভাবছি।

দুই পুকুরের মাঝ দিয়ে রাস্তা আর সেখানে সারি সারি কলা গাছ।

একটা গাছে কলার থোড়।রাত ঝকঝক করছে।আসলে চাঁদ, গোল চাঁদ।

না আমি ওখানে নেই।

এ আমার মাথার ভেতর। সবকিছুই। চাঁদটা ছাড়া।

আমি ওখান দিয়ে হাঁটতাম, কোনো একদিন।

এত আগে যে প্রায় মিথ্যে কথার মত সত্য। অথবা মিথ্যেই।

——–

আমার মাথায় একটা বটগাছ, তার অনেক ডালপালা, পাতা ও বায়বীয় শিকড়।

অনেক টিয়া পাখী ক্যা ক্যা করে কথা কয় অবিরল।

ওরা কি কয় আমি সব বুঝি না।

আমি কি বলি বুঝে না ওরাও। কিন্তু ওরা পাখী। ওদের কত সুন্দর রং। ওরা যেন শুধু রং দিয়েই তৈরী, রং আর রং, কোন পালক নেই।

পালকহীন আমার তার কথা ঠিকই মনে পড়ে।

সে বলে আমার মনে পড়ে না।

সে জানবে কী করে?

সে কি সব জানে?

ভাব দেখায় জানে।

আমার অনেক অনেক ব্যতিক্রমি ইচ্ছা হয় কিন্তু মাথায় গাছটা এত ভারী।

নড়তে চড়তে পারি না।

জানি সে অপেক্ষা করে থাকে। জানি সে চড়তে চায় অনুভূতির নৌকায়।

অক্সিটসিন নামে যে একটা হরমোন আছে তার শরীরে, তার পাগলা স্রোত আর বুভুক্ষু ঘুর্নিতে সে ওলট পালট হয়ে যেতে চায় উদভ্রান্ত ডিঙির মত। কিন্তু চরে ঠেকে যাবে, জটিলতা বাড়বে, এই ভয়ে আমি আর চড়তে চাই না ওই নৌকায়।

আর চাইলেই কি পারি?

আমি খুব ভীতু। আমি একজন সংসারী মানুষ।

আমার মেয়েটি আমার দেশের কলমী লতার মত নরম ও সুন্দর!

আমি তাকে ভালোবাসি।”

————-

আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে গ্রাস করে নেয় এই ডায়েরি। কী অপূর্ব কাব্যময়তা ! একজন মানুষ যে নিরীহ নির্জন জীবন কাটিয়েছে বাংলা ও বাংগালির সংশ্রবের বাইরে, প্রায় সন্তের মত। অথচ কী অসম্ভব অনুভূতিপ্রবণ মন! আর শিল্পীর মত কত সুন্দর ও

বর্ণালী তার বাংলার প্রকৃতির চিত্র! পড়তে থাকি।

……………

“ওর আমার প্রতি ভালোবাসা ও যত্নের কমতি নেই। কিন্তু কি যেন আমার নেই।

এ কি ভাষার ব্যবধান?

আমি রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনে আপ্লুত হই, সে তার অন্তর্মাধুর্য বুঝতে পারে না। গানের কথাগুলো অবোধ্য তার কাছে। সুর তার গহীনে স্পর্শ করে না, যেমন করে আমার।

বলে, “এত বোরিং গান তুমি শোন কী করে? বিরক্তি লাগে না?”

আমার বিরক্তি লাগে না, গহীনে নাড়া দেয়।

ওর জন্য সত্যিই আমার দু:খ হয়। ওর দোষ নয় যে সে কবিগুরুর গান বুঝতে পারে না। হয়তো দোষ আমার, আমারই ওকে বাংলা শেখানো দরকার ছিল।এত দীর্ঘ দিন এক সাথে আছি!

আমার ঝম ঝম বৃষ্টি ভালো লাগে, ইচ্ছে করে ওকে পাশে বসিয়ে বৃষ্টি দেখি। কিন্তু ও ভয় পায়, যখন বিজলী চমকায় ও চমকে ওঠে। যখন বজ্র গর্জন করে ওর হৃৎপিন্ড দৌড়ায়। শুধু এই টুকুই। কত মানুষের কত অপ্রাপ্তি, অসুখ, অতৃপ্তি থাকে, আমার কিছুর অভাব নেই, নেই কোন অবিশ্বাস।

হ্যাঁ অভ্যাস, হয়তো অভ্যাসের কারণেই ওর নিবিড়তা আমাকে আর উদ্দীপিত করে না আগের মত।

যৌনতাপ নিভে গেছে।

একি প্রাপ্তিরই কামনা বিধ্বংসী ফল?

না কি বয়েসের ক্রান্তিকাল? এত তাড়াতাড়ি?

মেনে নিতে পারি না সমাপ্তির রংয়ের এই ধুসরতা।

ইচ্ছে হয় আবার জ্বলে উঠুক জীবন ও যৌবনের স্ফুলিংঙ্গ, তীব্র কামনার নিরয়ের বৈশ্বানোর। “

————–

“মানুষ কত সাহসী কাজ করে, কেউ কপিলার জন্য কুবের হয়ে যায়, কেউ সমুদ্রে নিঁখোজ হয়, কেউ মহাদেশ আবিস্কার করে, কেউ দুই আঙুলে নিজ দেহের ভার বয়ে উঠে যায় গিরিচুড়ায়, মরে যাবার ভয় তাদের থামাতে পারে না। আমি মরে যেতে ভয় পাই না, আমি জীবন্ত অনুভূতিকে ভয় পাই। আমি ভালোই ছিলাম নিজের খোলসের মধ্যে লুকিয়ে, চেকভের বাক্সবন্দী মানুষটির মত।

যার কোন অপ্রাপ্তির অভিযোগ নেই, যাকে কোনদিন কোন ফেইক তৃপ্তির অভিনয় করতে হয় না, বট- অশথ্থের মত যাকে জড়িয়ে না ঘুমালে ঘুম আসে না, তাকেই আমি ভালোবাসি। সে আমার মেয়ের মা। সে আমার ভাষা বোঝে না, কিন্তু সে আমাকে ভালোবাসে।

কিন্তু তারপরেও …

ফল ভরা নত বৃক্ষের মত আনত হয়ে আছি তৃষ্ণায়। অনেক আগে জন্ম হয়েছিল সে তৃষ্ণার।

৩৫ বছর আগে।

“চক্ষে আমার তৃষ্ণা, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে”

কিসের তৃষ্ণা আমি জানি, কার জন্য তৃষ্ণা তাও।

সে তখন গোটা গোটা অক্ষরে লিখতো। অনুভূতির ভারে লাইন বাঁকা হয়ে যেত বাঁকা মেঠো পথের মত। অথচ প্রতিটি  অক্ষর যেন ছিল হিলিয়াম পূর্ণ এক একটি বেলুন! ওরা আমাকে হাওয়ার ডানায় বসিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যেত কত দূরে, কত উঁচুতে!

সময়টাই ছিল অন্যরকম।

এখন তার চিঠির লাইন গুলো সোজা, টান টান ঋৃজু, কম্পিউটারের সুন্দর ফন্টে লেখা।

বেলুন, হিলিয়াম,কল্পনা, স্বপ্ন, কিছু নেই।

আছে ছাইরঙ্গা সরাসরি কথন, ধারালো চাকুর মত।

“তুমি তো ভালোই আছো, মনে হয় খুব সুখী, খালি বৌ বৌ করো। আগে আমাকে অনেক ভালোবাসতে, এখন যেন সেই কথা মনে করতেও তোমার বাঁধে।”

————-

“বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে আছি। রোববারের সকালের রোদ হাঁটছে সোনালি চুল এলিয়ে। দূরে গির্জার চুড়ায় চিক চিক করছে আলো। নদীতে ঝিলমিল করছে জল।

তীরে নলখাগড়াগুলো মাথা নাড়ছে বাতাসে।

কেমন একটা বিষণ্ণতা আমার মধ্যে।

হাজার বছর আগের একটি জাপানি কবিতা পড়ছিলাম:

Looking to the east
We saw the glow of morning
rising over fields
Then turning to look behind
the moon was just then setting.

“পূবদিকে তাকিয়ে দেখি উষার আলো হেঁটে আসছে প্রান্তর বেয়ে, পেছনে ফিরে তাকাই, দেখি অস্ত যাচ্ছে চাঁদ”।

বিরহের কবিতা। মিলন যেখানে অসম্ভব। একের আগমন অন্যের প্রস্থানের পূর্বশর্ত।সেই যুগেও মানুষ ভালোবেসেছে, অনুভব করেছে বিরহ ও অপ্রাপ্তির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ।

আমাদের পুরাণের উর্বশীর কথা মনে পড়ে। জাপানি কবিতায় যে বেদনার সুর তাই রয়েছে উর্বশীর গল্পে। মর্ত্যে নেমে এসেছিল সে, দেখা হয়েছিল পুরূরবার সাথে।

ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিল তারা। শুধু শর্ত ছিল উর্বশী যদি কোনদিন পুরূরবাকে অনম্বর দেখতে পায় সে তাকে ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু স্বর্গের গন্ধর্বগন ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল তার অনুপস্হিতিতে।

উর্বশীর নৃত্য ছাড়া স্বর্গ স্বর্গ নয়।

তাই তারা রাতের অন্ধকারে উর্বশীর প্রিয় মেষ অপহরণ করে।

বিছানা ছেড়ে উঠে পুরূরবা সেই মেষ খোঁজার জন্য, অন্ধকারে তাকে দেখতে পাবার কথা নয় কিন্তু দেবতারা বিদ্যুৎ চমকিয়ে আলোকিত করে দেয় ঘর।

উর্বশী তাকে দেখে ফেলে। তাদের মিলন-পূর্ব চুক্তি ভগ্ন হয়। উর্বশী স্বর্গে চলে যায়।

উর্বশী হল উষার কুয়াশার প্রতীক, আর পুরূরবা সূর্যের। প্রভাতের বিশুদ্ধতা নিয়ে যখন পুরূরবা হেসে ওঠে ঝলমলে সুন্দর, উর্বশী হারিয়ে যায় আলোর সমুদ্রে। তাদের ভালোবাসায় মিলন হল অসম্ভবের মিলন।”

……..

স্তব্দ মুগ্ধ বেদনার সুর এই ডায়েরীর পাতায় পাতায়। আমি ডাক্তার, কবি বা সাহিত্যিক নই। কিন্তু আমাকে চুম্বকের মত টেনে রাখে। একজন আশ্চর্য মানুষ। বিদেশী স্ত্রীর প্রতি সে বিশ্বস্থ থেকেছে কিন্তু বুকের ভেতরে গোপনে লালন করেছে ভালোবাসা আরও এক নারীর জন্য। নারী যাকে সে হয়তো ভুল করেই ভালোবেসেছিল যৌবনে। কিন্তু উর্বশী ও পুরূরবার মত বিপরীতমুখী ছিল সেই ভালোবাসা।

সেই নারীকে পেলে হয়তো রবীন্দ্রসঙ্গীত না বোঝার সমস্যাটা থাকতো না, হয়তো ঝমঝম বৃষ্টিও একসাথে দেখতে পেতো, কিন্তু ততখানি সুখী হতো কিনা বলা মুশকিল, যতটা সে উল্লেখ করেছে বিদেশী স্ত্রীর সাথে। আমি বিয়ে করি নি এখনও। আমি জানি না কেমন এই ঘর-সংসার ও যাপিত জীবন।

আবার পড়তে শুরু করি।

………

আজ ফোন করেছিল, কথার সাথে ছন্দ রেখে চটাস করে চুম্বনের শব্দ। আমি চুপ করে শুনি।

“তুমি এত কিপটে কেন?” সে প্রশ্ন করে। আমার উত্তর দিতে ইচ্ছে হয় না। ফোনে চুম্বন পাঠানোর বয়েস আর নেই।

বলে, “চলে এলেই তো পারো।”

“এত হাজার মাইল ইচ্ছে করলেই কি পার করা যায়?”

“অন্যেরা পারে, তুমি পারো না কেন?”

“আমি অন্যদের মত নই। আমার অন্যদের মত ছুটিও জোটে না। মা বাবা যতদিন থাকে, দেশে যাবার একটা কারণ থাকে। আমার মা বাবা নেই।”

“বা রে তোমার ভাই বোন আছে না?”

“আছে, কিন্তু তুমি তো আমাকে ভাই বোনের কাছে আসতে বলছো না, বলছো তোমার কাছে আসতে।তোমার কর্তা কি তা পছন্দ করবেন?”

নৈ:শব্দ।

তারপরে দীর্ঘনি:শ্বাস।

সহস্র সহস্র মাইলের ব্যবধান অতিক্রম করে সে আমাকে ডাকছে আজ। অথচ সে আমাকে পাগল করেছিল একদিন, তারপরে চলে গিয়েছিল উর্বশীর মতই ধরা ছোয়ার বাইরে। আমি কোনদিন দেশ ছেড়ে আসতে চাই নি। অথচ…. সে এখন হঠাৎ উদয় হয়ে আবার তছনছ করে দিচ্ছে ভেতরের সব। ভেবেছিলাম আমি তাকে ভুলে গেছি, কিন্তু আমি আবারও নিজেকে চিনতে পারি নি। ঘুর্নিঝড়ের নাচ শেষ হলে যেমন ধঞ্চে-শোলার ক্ষেতে দেখা যায় সব ভেঙে চুরে মিসমার হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি বিধ্বস্ত বুক আমার …..”

————–

অপরাজিতা নীল কষ্ট ফুল হয়ে ফুটেছে ডায়েরির পাতায়। শংখচুড়ের বিষের মত যন্ত্রণা!

“আমার বয়েস এখন আর ষোল নয়, নয় ছাব্বিশও। অথচ তৃষ্ণা সেই একই, ষোল বা ছাব্বিশের মতই । ভাবতে ও পারি নি সে আমাকে এতোটা উদ্বেলিত করবে । আমরা দৈনন্দিন জীবনের উনুনে ছাই চাপা জীবন অতিক্রম করি । কিন্তু কত যে বিস্ময় লুকিয়ে থাকে ধারণাও করতে পারি না।

আমি কাঁপা কাঁপা বুকে ভাবনার অন্য পথে হাঁটি।

যেন অনেকগুলো গুন্ডা মনের জঙ্গলে। কোমরে ওদের  রিভলভার। সুন্দরবনের বাঘের চোখের মত চোখ ওদের আমাকে খেয়ে ফেলতে চায়। বাংলাদেশে পাইন গাছ জন্মায় না কিন্ত পাইন গাছের মতই তন্বী সে আজও, দেবদারু গাছের মত ঋজু। ভোরের বেলি ফুলের মত সতেজ। বুকে সেই চোখ জ্বালা করা আগুন!

গহীন গাঙে ঝড়াক্রান্ত ডিঙ্গির মত আমি।”

এর পরে অনেকগুলো পৃষ্ঠা খালি। কোন লেখা নেই । রেল সড়কের মত সমান্তরাল রেখা টানা শূন্যতা। যে পদ্মা চরে তার প্রিয় গিমা শাক জন্মে আবার মরে যায়, তার বাতাসের হু হু ক্রন্দনের মত যেন।

শেষ লেখাটি খুঁজে পাই:

“কালরাত্রির মত কালো মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ, আর তার চোখে কখনও ঝুপ ঝুপ, কখনও ফোটা ফোটা। কখনও গুড়ি গুড়ি জলীয় বাষ্পকণা।

বুঝে উঠতে পারি না কোথায় এই আর্দ্রতা?

হাওয়ায় না আমার চোখে?”

মৃত্যুর বেশ কিছুদিন আগের লেখা।

হয়তো মনের অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। হয়তো নয়।

হয়তো সেই অস্থিরতাই তাকে টেনে নিয়ে গেছে আত্মবিনাশে, কোন চিহ্ন না রেখে।

মনে হয় সমস্ত আর্দ্রতা জড়ো হয়েছে আমার চোখে।

তারই বর্ণিত কালো আকাশের মত মন। আমার মাথা ঝিম ঝিম করে।

মেয়েটিকে পিতার ডায়েরি সম্পর্কে আমি কী বলবো ভেবে পাই না।

শুধু সময়ের কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে থাকি।

শাহাব আহমেদ। লেখক ও চিকিৎসক। জন্ম ১৯৬২ সালে, বিক্রমপুরের ঝাউটিয়া গ্রামে। নারায়ণগন্জ হাই স্কুল এবং ঢাকা কলেজ শেষ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে ১৯৮২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন গমন করেন। তৎকালীন লেনিনগ্রাদ শহরে অনার্সসহ মেডিক্যাল ডিগ্রি অর্জন করেন...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..