যদিও জান্নাত

সম্পূর্ণা চ্যাটার্জ্জী
কবিতা
Bengali
যদিও জান্নাত

আমি

প্রতিদিন চলে যায়, প্রত্যেকটা রাত পাঁজা ইঁটের জঙ্গলে বাঁচা
প্রতিবার তোমাদের অপমান চেনায় আমাকে।
প্রতি চাহনিতে দাঁত, চোখের ওপারের সব বীভৎসতা
আমি মরিনা। প্রত্যেক খুনের আরও কাছে যাই। খুন হই
ভোজালির ভোজবাজি উধাও। আমারও ছিল স্বহস্ত কিছু কোপ
তবুও গুটিয়ে নিই হাত। বারবার করা ক্ষমায় মহত্বের বিসর্জন।

যেদিকে আমার পিঠ ছিল দেয়ালে রক্ত ছোপ
সেদিকে আমারই আদলে কার যেন একইরকম হত্যা
হাতের রেখায় বেড়ে যাওয়া জীবনে তারও ছুরি পোঁতা।

প্রতিবার প্রত্যেক মুখে ধূর্ততা ভীষণ চেনা
প্রতি প্রত্যাঘাত চেনায় আমাকে। প্রত্যেক ফাঁসীর দড়িতে আমারই শরীর!

প্রতিদিন বাঁচি অসহ্য সহ্যের কালশিটের অসংখ্য হাতুড়ির বারিতে
প্রত্যেকবার আবারও উঠে বসি রুদ্ধশ্বাস রহস্যের আমিতে –
শিকারী কিম্বা চাবুকের আঘাত।

 

সময়

আজকাল মাছ খাইনা। তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় অস্থির করা স্থির চোখ। পাথরের গায়ে ফুটে ওঠে আঁশ, কানকো আর নীল হওয়া অন্ধকার শিল্পকলা। অভ্যেসগত পেটে শামুক আর গুগলিতে মাছেদের বেশ চলে যায়। নদী নদী আকাশে ছিপ নিয়ে বসে থাকে পৃথিবী। উঠে আসে জলবায়ুহীন শিশুরোদ, বিকাশের গায়ে পচনশীল রন্ধনশালা। জিহ্বার ডগায় তখন তরুণ লালসা, স্বজাতির ভোজ খাওয়া মধ্যাহ্ন সম্প্রীতি ।উত্তরাধিকারের বঁটিতে শুকিয়ে মা ঠাকুমার হাত কাটা রক্ত । আমি হাত বাঁচিয়ে বসি। তবু দেখি অনেকগুলো খুন আমারও হাতে লেগে। ওসব সত্য উদ্ঘাটন মিথ্যের মতো জ্যান্ত সংসারে হয়না। উজ্জ্বল আলোর পাশে উদোম হয়ে পড়ে থাকা মরা মেয়েটার শরীরের খুব কাছে গেছিলাম। এমনই আঁশটে গন্ধ ওর শরীরের চারপাশে। সবাই বলছিল আগের রাতে হোগলার জঙ্গলে মাছ ধরে এনেছিল কারা! আঁশ ছাড়িয়ে টুকরো টুকরো ভাগাভাগিতে শুকনো পাতারা জ্বলে উঠেছিল নিঃশ্বাসে! বিধবা সেজদিও এভাবেই শ্মশানে গেছিল সেদিন ওর বিছানার চাদরে নির্জন বৈধব্যেও নিষিদ্ধ মেছো গন্ধ । চোখ বুঁজলেই দেখি ওর গর্ভে ঘুমন্ত শিশুটার মৃত্যুর পাতে পড়ে থাকা নিয়মভঙ্গের একটুকরো শুভ । প্রতি রাতে পুকুরের ঘাট বেয়ে নেমে যাওয়া ডুবন্ত জীবনটা সকালে রোজ ওঠে ভেসে মাছেদের গন্ধ নিয়ে। পোষা বেড়ালের লোভী চোখটা তখন জ্বলজ্বলে ওঠে পায়ের পাশে। আমি এতো কিছু বুঝিনা। বাঁচা বললেই বঁড়শিতে আঁটকানো একদলা চিৎকার বুঝি, গিলে খেয়ে যায় মৃত্যুকেও!

 

জান্নাত

যদি আবারও কথার পরে ফেরো কথায় চলে যাব এখনিই
বাস, অটো, রিক্সা যেকোনো কিছুতে চড়ে সোজা যাব জান্নাত …

তুমি তখনও ধর্ণা দিচ্ছ রোদের সামনে বা চুরি করে রাখছ চাঁদের কিছু জোচ্চুরি
শহরের লিফলেটে বিলি হচ্ছে আস্তিন গুটিয়ে রাখা চোখের মাস্তানি
আমি তখন চুমুক দিচ্ছি প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের বুর্জোয়া সন্ধ্যে
পৃথিবীর সব রাস্তাই যেন হাফ গেরস্ত, সারাদিন খুব ছোট ছোট জিনিসে চুল থেকে নখ ডুবিয়ে বসা
অবসর কিছুটা বিছানায় শরীরে মুখ গুঁজে বৃষ্টি বিলাস
বা নেশার পাত্রে বরফ , বুকে লুম্পেন সোসাইটির ক্লিভেজ শুষে নেয়া
এভাবেই তোফা আছি।

যদি আবারও কথার পরে ফেরো কথায় চলে যাব এখনিই

সাঁ করে একদম ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনি যুদ্ধে
খুব সামনে থেকে দেখব ধর্মের কতটা কাছাকাছি গেলে খিদেটাই শুধু বেঁচে থাকে
অথবা খাদকের মাটি খুৃঁড়ে বার করব দুগ্ধপোষ্য শিশুর মরা যোনী
যেখানে চালান হয়ে যায় পৌরুষ,দেশ, রাষ্ট্র প্রবল যৌনতায়
সবাই তখন নিজের কথা ভুলে আঙুল তোলে,দোনলা ট্রিগার দাবিয়ে ছুঁড়ে দেয় উন্মাদ শব্দ
অন্তর্বাসের বিজ্ঞাপনের হোর্ডিয়ে শিশু-ধর্ষণ আর সভ্যতা ক্রমশ জ্বলজ্বলে হয়ে জ্বলে!

বহুদিন বাদে পাশাপাশি কোনো একবিষয়ে একমত হয় সবাই
প্রতিবাদ শেষ। ট্রিপল এক্স রাতের প্রাপ্তবয়স্ক লুকোচুরিতে ঈশ্বররা আবার ব্যস্ত পশুর সঙ্গে সঙ্গমে
পরের সকালে চিরআয়ুষ্মান হাতের আশীর্বাদে জন্মাবে কীর্তিমান অমানুষ!

আমি সেই মুহূর্তে পার্কস্ট্রিটে বড়দিনের ভিড়ে আরেকবার সেক্যুলার হয়েছি
আহ্! এখনও কথাদের থামাতে পারোনি, চুমু খেয়ে ঠোঁট দেব বন্ধ করে
ইদানীং সাপে ব্যাঙে চোমাচুমি করে কথাদের বদলাতে শিখেছি।

দাঁড়িয়ে আছি জাহান্নামের দোরগোড়ায়।

 

যদিও

তোমার হাত ধরে পেরতে পারিনি অনেকটা আঁকাবাঁকা
দূরে তবুও দুটো মানুষ খুব সহজ দিনের ছায়ার তলায়
আমার তখন আর কিছুই হবার ইচ্ছে নেই
প্রত্যেকটা কবিতা পড়ে শোনাচ্ছি তোমার শোনবার ইচ্ছে ছাড়াই
প্রতিবার নিরর্থক পঙক্তির মানের পাশে ফাঁকা রয়ে যাচ্ছে দুঃখবোধক চিহ্ন
আড়চোখেও দেখছিনা তোমার নিরুত্তাপ মুখের শিরা উপশিরা
প্রবলভাবে অগ্রাহ্য করছি তোমার চুপ করে থাকা
আমার তখন বলবার ইচ্ছে! কাটাকুটি খেলার হিসেব ঘরে আমার অনেকগুলো শূন্য
ওই শূন্যগুলো ভরাট করেছি তোমার চোখ নাক এঁকে একচিলতে হাসি দিয়ে!

তোমার জীবন থেকে মুছতে পারিনি জটিল সব অন্ধকার
তবু খুঁজে খুঁজে নিয়ে এসেছি অনেকগুলো মেঘ!
ক্যালেন্ডারের পাতা বর্ষপঞ্জীর প্রত্যেক গ্রীষ্মের পর এনেছি ঝমঝমে আষাঢ় শ্রাবণ
রঙচটা গাছগুলো মরা দিনের রোদ সরিয়ে তখন ভিজতে ভিজতে আবার সবুজ!

নগর কবিয়ালের গিটারে তখন ঝড়,
“তোমরা যতোবার দূরে গেছ ভিড় ছেড়ে
আমি ভালোবাসা খুঁজেছি জনা দুই, নিকোটিনে বিষাক্ত এ শহরে
তুমি যতোবার যেতে চেয়েছ প্রেম থেকে অপ্রেমে
নিয়ম ভেঙে সুর বেঁধেছি তোমার পুড়ে যাওয়া ছন্দের অভিমানে ….”।

সম্পূর্ণা চ্যাটার্জ্জী। কবি। জন্ম আসাম তারপর বড় হওয়া হাওড়ায়। বর্তমানে বিবাহসূত্রে উত্তর কলকাতার বাসিন্দা। লেখাপড়া করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। নিয়মিত কবিতা লেখা তাঁর প্যাশন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..