যেসব কথা শিখিয়ে গেল কেউ

শানু চৌধুরী
কবিতা
Bengali
যেসব কথা শিখিয়ে গেল কেউ

যেসব কথা শিখিয়ে গেল কেউ

ঘোড়াটির সুখ থিতিয়ে পড়েছে
আনারস খেতের ধারে
অযথা মিলিয়ে যেতে যেতে
আমার চেনা সমস্ত মুখ
ঘাসের ভিতর চলে গেল
যদি মানুষ হতাম তবে
রেখে দিতাম এসব দৃশ্য
বাহানা করার মতো
আমি কপট হতে পারছি না দ্যাখো

দুই

ঘুমের ভিতর চলে যাচ্ছে অসংখ্য ডিঙি নৌকো
আজ আমি আছি লেখার থেকে বহুদূরে
ভরা খেতের মাঝে কাকতাড়ুয়ার মতো দাঁড়িয়ে
যে মেয়েটা রোজ পড়তে যেত ধুম জ্বর নিয়ে
তার অসুখের আগে আমি দেখেছি রূপরেখার প্রয়াস

তিন

আমার মনে হয় একদিন ক্ষয়ে যাবো আমি।
কবিতা লেখার মতো জোরবল থাকবে না আমার।
তবু কোথাও সাজানো মাটি নিয়ে বসে থাকবে কেউ
সময়ের আগে খুঁড়ে ফেলার অপেক্ষায়।
তারপর শেষবারের মতো তাকে চুমুতে ভুলিয়ে
আমি বলব দ্যাখো বাসনপত্রের ভিড়ে কিভাবে কাটিয়ে ছিলাম জীবন

চার

তুমি চুপচাপ বসে আছো। খয়েরী ডানার শোকে।
কত ধকল নিয়েছে শরীর এই রাস্তায় তুমি জানো না।
ছোট টগরের শাখায় জড়িয়ে থাকা সাপ
যেন খুঁজছে সুবাস

এ সমস্ত শেষ হলে উঠে দাঁড়াবে তুমি
তামাক পুরে নেবে পাতায়
আর দেখবে ঝিলের দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে
ডানার প্রভেদে উড়ে যাওয়ার অক্ষমতা

পাঁচ

জীবন জুড়ে শুধু অ্যাকিলিসের ছায়া
আমার পথ থেকে আমি বৃষ্টি দেখতে দেখতে বুঝেছি
আসলে আমার কোনো পথ নেই

যে ভালবাসে আমায় তার পথে চলে যাবো আমি
যে সরিয়ে দেবে আমায় তার পথে ক্লান্ত হয়ে যাবে
আমার কষ্টে ভরা জুতোজোড়া

এর বেশি আমি আর কী দিতে পারি বলো
ভয়ংকর বেড়ালের পেটের ভিতর গুটিয়ে আছে
আমাকে উপেক্ষা করার দাগ

ছয়

এত প্ররোচনার ভিড়ে
কারও বাড়ির পাশে উড়ে যাচ্ছে শোকের শাড়ি
তুমি আমাকে বলোনি কোনোদিন
শোকের রঙ সাদা হয়

আমি কুঁকড়ে ছিলাম আপাত বিস্মৃতির মাঝে
আমার সততা ও সাহস নিয়ে

তবুও দ্যাখো কিভাবে খুন হয়ে গেছে
আমার ভালবাসাটুকু

সাত

ধর্মের অর্ধেক ঈশ্বর রয়েছে তোমার কাছে
এই নির্বোধ প্রশ্নের ভিতর বহুকাল চলে গেছি আমি
এখন কারও অপরূপ চোখ, আমাকে শেখায়
ছেড়ে যেও না বড় কোনো অভিমানে

আট

একটা প্রাগৈতিহাসিক ঘোড়া
যার ক্ষুর ভেঙে যাওয়ার পর সে বুঝেছিল
দৌড়ে যাওয়ার মতো কোনও রাস্তা নেই

যেখানে ভালোবাসার মতো এক নেশা
তোমার মরে যাওয়া থেকে তোমায় জীবিত রাখে
সেখানে চোখের জল এক তুচ্ছতম শিকার বলে রেখেছিল
নিস্তেজ স্বর্গের অমরত্বকে অবহেলা করার কথা

নয়

আমি পাগল হয়ে যাব
এসব তিসি ফুলের শৈশবে
যেখানে চুল খুলে দাঁড়িয়ে আছে সোনালী
আমি হাওয়ায় চোখ রেখে দেখেছি
তোমার মুখ বদলে যাওয়ার আগে
আমার অপারগ দৃষ্টি কেমনভাবে দেখেছে
ওই লাল শাড়ির আঁচল
স্বপ্ন এক পবিত্র যুদ্ধ
যে বলেছিল ভালবাসার কথা!

দশ

সে প্রবলভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে তার চেতনাগুলো
আমি তার হাতের পাতা স্পর্শ করে দেখেছি
নিজের ভিতর সে বয়ে নিয়ে চলেছে আমায়

এগারো

কিছুই দিতে পারিনি
স্বার্থপরের মতো কবিতা নিয়েছি তোমার থেকে
এই ঋণ বাড়তে বাড়তে
আমি তার মুখের হাসিটিতে দেখেছি
এক অনন্য চিরাগ

বারো

রাত্রি তোমার হাতের মতোই শান্ত
যেখানে আমি শুধু চেয়েছি
মনের মতো এক নীল রঙ
তবু তাঁর বিষণ্ণতা নিয়ে আমার ভাবতে ভাল লাগে
আর ডুবে যেতে ইচ্ছে করে
যেখানে সোনালী হয়ে আছে আকাশ

তেরো

বিটোফেনের বধিরতার মতো আঁকড়ে ধরেছি তোমায়
আর কবিতার বানান ভুল হতে হতে কয়েকটা দ্রাঘিমা
নিচে টেনে নিয়ে আসে আমায়

কোনও মেয়ের হাত চেপে ধরে নীল করে দিয়েছি আমি
আর এই নীল রঙের পৃথিবীর চেয়ে একা হতে হতে
বুঝেছি বেঁচে থাকা কত সরল

একটা সরলরেখা টানতে টানতে যেসব রাস্তায়
পড়ে গেছে হিংসের হাসি
তাদের দেখে শিখেছি আমি, কবিতা লিখিনি কোনোদিনই

চৌদ্দ

মেয়েদের কথা তেমন জানি না আমি
সুক্ষ্ম পারদের ভিতর বৃষ্টি দেখতে দেখতে
একটা পূর্ণ নদীর কথা ভাবি

কতকাল হয়ে গেল কৈপুল ঝিলের
মরা মাছের আঁশ হয়ে ভেসে উঠেছি

অথচ জীবনবোধ থেকে খানিক দূরে
স্মৃতির ঘোরাফেরা দেখে বুঝি
আমি কাউকে ভুলিনি আজও

পনেরো

সহজ জীবন সহজভাবে রাখাই ভালো
জোড় বেঁধে দেখেছি আমি
শুধু হিংস্রতার ঘাতক

চোখ বেঁধে রেখেছি এখন

শান্ত ভাষার কাছে কান্না কখনও
দামি নয়

শানু চৌধুরী। কবি। জন্ম ও বেড়ে উঠা ভারতের কলকাতায়। লেখাপড়া ইংরেজি সাহিত্যে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..