যৌনতা বর্ণনায় মাত্রাবোধঃ একটি পুনর্চর্বণ

সঞ্জীব নিয়োগী
প্রবন্ধ
Bengali
যৌনতা বর্ণনায় মাত্রাবোধঃ একটি পুনর্চর্বণ

ভারতীয় সাহিত্যে যৌন/শৃঙ্গার রসের প্রায়োগ কোনও নতুন বা আচম্‌কা আমদানি নয়। সাংস্কৃত সাহিত্যে একা কালিদাসই একশো। আর বাংলা ভাষার প্রথম নিদর্শন হিসেবে পরিচিত ‘চর্যাপদ’ বলছে – ‘তু মুহু চুম্বি কমল রস পীবমি’! এবং মধ্যযুগ, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন; যা আজ নাকি অনেকের কাছে অশালীন। আবার অষ্টাদশ শতাব্দীতে কী দেখছি? না, ‘বিদ্যাসুন্দর’! বাঙালি কুমারি কন্যার সক্রিয় সেক্স; উপরন্তু, বিপরীত রতি!

তবে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে যৌনতা বিষয়টি যেভাবে প্রযুক্ত হয়েছে, তার সাথে প্রাচীন বা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ওই বিষয়ক বর্ণনায় ও বিশ্লেষণে প্রার্থক্যের নানবিধ কারণ বর্তমান। ফ্রয়েড, মার্কস্‌, ডারউইন।  শিল্প, বলশেভিক, ফ্রেঞ্চ বিপ্লব। এবং যুদ্ধের বহুমুখি প্রতিফলন। সমাজ বদলাতে বদলাতে এমন জাগায় চলে এলো যে, একাকীত্বই মানুষের মুখ্য বেরাম হয়ে দাঁড়াল। এইসব নান তত্ব ও তথ্যের নিরিখে অন্যান্য বিষয়ের মতো যৌনতাও বিশ্লেষিত হতে থাকল। যৌনতা বিষয়টি সাহিত্যে নতুন ছিলনা তখনও, শুধু অনুধাবনের মাত্রাটা হয়ে উঠতে চাইল নতুনতর, অভিনব। মানুষের সমাজের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো বদলের সাথে সাথে সামাজিক সংস্থাগুলির নীতি নির্ধারণে নৈতিকতার প্রশ্নটি নবতর প্রেক্ষাপটে বিবেচিত হবার যোগ্যতা পেল। উনবিংশ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লব মানুষের সামাজিক চালচলন, মূল্যবোধের পুনর্নিধারণে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে। সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছে নারীর ব্যক্তি-সত্ত্বার সার্বিক বিকাশের, তার যৌন-মুক্তির নবমূল্যায়ণের বিভিন্ন প্রশ্ন।  উনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে বিংশ শাতাব্দীর প্রথম তিন-চার দশক অব্দি মনোবিজ্ঞান আর নিউরো সাইন্স এমন কিছু কাজ করে, যেগুলোকে আধুনিক যৌনতা বিষয়ক চিন্তা-ভাবনার ভিত হিসেবে দেখা হয়ে থাকে, যেখানে প্রধানত সেই সমস্ত যুগপ্রাচীন বিধিনিশেধগুলি বিজ্ঞানের আলোয় পরীক্ষিত হয়, যেগুলি নৈতিকতার প্রশ্নে ছিল জর্জরিত। বিজ্ঞানের এই স্টাডিগুলির মূল প্রতিপাদ্য ছিল মানুষের যৌন-বিবিধতা (sexual diversity)ও সেই বিষয়ে যুক্তিবাদী মনোভাব নিয়ে বিচার করা।

জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলিকে মানুষ বিজ্ঞানের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সত্যের/সিদ্ধান্তের আলোয় ফেলে, সেই মানদণ্ডে বিচার করে। আবার সেই স্ত্য/সিদ্ধান্তও কিন্তু পরিবর্তনশীল! সিদ্ধান্তের এই পরিবর্তনশীলতাই জীবনে লাগাতার নতুন মানে ও মাত্রা যোগায়। বিজ্ঞানের মৌলিক ও চমকপ্রদ আবিষ্কারের ধাক্কাগুলোই আধুনিক সাহিত্যের বীজাগার।

‘আধুনিকতা’র প্রদর্শনে কখনও সাহিত্য এগিয়ে যায় আবার কখনও এগিয়ে যায় সমাজ। এইভাবে ন্যায়-অন্যায়, উচিৎ-আনুচিতের প্রশ্নটিও টিকে থাকে তার চিরন্তনতা নিয়েই। জীবনের ক্রমবিকাশ আর মনন-চর্চার এটি একটি অন্যতম লক্ষণ।

একথা কিছুটা বিস্মিতই করে যে, বিতর্কের যে বিষয়গুলি বহুকাল আগেই হয়তো মীমাংসিত হয়ে যাবার কথা, জীবনের কিছু তথাকথিত স্পর্শ্বকাতর প্রবণতা শিল্পে কীভাবে ডেমোন্সট্রেট করা হবে তার মাপকাঠি, সাময়িক হলেও, নির্ধারিত হয়ে যাবার কথা, সেখানে আজও সেসব নিয়ে প্রাথমিক কথা-বার্তা সারা হয়নি বলে মাঝে মাঝে ভ্রম হয়। বিশেষত সাহিত্য-শাখায়! কেননা, শিল্পের এই শাখাটির সাথে আপাতত যদি ‘চিত্র শিল্পের’ তুলনা করি, তাহলেও একথা কিছুটা বোঝা যায় যে, অভিব্যক্তির ক্ষেত্রে চিত্র-শিল্প যেন একটু বেশিই স্বাধীন; এবং এটা ঘটতে পেরেছে একারণে কি, যে, এক্ষেত্রে অভিব্যক্তির প্রাথমিক শর্তগুলি বিষয়ে সমাজের সাথে একটা বোঝা-পড়া হয়ে গেছে? সাহিত্যের তুলনায়, এই শিল্প অভিব্যক্তির সামাজিক মাপকাঠিতে যুক্তিপূর্ন হয়ে ওঠার অনুঘটকগুলির প্রচ্ছন্নতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে? তা নইলে তো এমনটা হবার কথা নয়। মতপ্রকাশের/ভঙ্গিমার সামাজিক মাপকাঠিতে যুক্তিপুর্ণ আর গ্রহণযোগ্য না হয়ে উঠতে পারলে কোনও প্রকাশ-মাধ্যম তার অন্দরের দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, সংকোচ কাটিয়ে উঠে কোনও একটা বিশেষ প্রবণতাকে মূলস্রোতে মুখ্যভাবে মিশিয়ে দিতে পারেনা। অথবা, আমাদের সমাজে চিত্র-শিল্পের যে অভিঘাত, তা সাহিত্য-শিল্পের থেকে ভিন্নতর বলেই, সম্ভবত অভিব্যক্তির সামাজিক মাপকাঠি দুই ক্ষেত্রে আলাদা।

সাহিত্যে ব্যবহৃত শব্দের আর চিত্রকল্পের যে সীমাহীন শক্তি আর বহুমাত্রিক ইঙ্গিত পাঠককে অতিক্রম করতে হয় তা সচরাচর ছবির ক্ষেত্রে  এড়িয়ে যাওয়া যায়। সাধারণ মানুষের ‘চিত্র শিল্পের’ জগতে তার কোনও রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র নেই। সেই মাপের ছবি আঁকিয়ের সাথে সাধারণের চেনা জানা নেই। জনপ্রিয়তায় অনেক অনেক পিছিইয়ে বলেই চিত্র শিল্পীর ছবির অভিঘাত সাহিত্য শিল্পীর শব্দের অভিঘাতের চেয়ে আমাদের সমাজে অনেক কম। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, আমি কিন্তু সাধারণ মানুষের শিল্প-আগ্রহের কথা বলছি, আর তা এই কারণেই বলছি যে, সাধারণের সামাজিক মূল্যবোধের নিরিখেই নির্ধারিত হয় গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি। শ্লীল অশ্লীলের ধারণা।

লেখক দ্বারা ব্যবহৃত বাক্য-বন্ধের অসচরাচরতা বা সমাজ-মিশুকে না হবার কারণে পাঠকের একটা অংশের অসহমতি থাকতেই পারে। এদিকে চিত্রশিল্পকর্ম শুধুমাত্র অন্তর্গত সিমেট্রির কারণেও এক ঝলকেই মনে অনুকূল ভাব সঞ্চারে সক্ষম হতে পারে। তার বিষয়গত হিসেব পরবর্তীতে নিলেও চলে; এমনকী, না নিলেও চলে। কেননা, বিজ্ঞানের এই বিপুল সম্প্রসারণের পরেও, ছবি কিন্তু তুলনামূলক ভাবে লিখিত সাহিত্যকর্মের চেয়ে কম মারণক্ষমতা রাখে, সাধারণ মানুষের মনোভূমিতে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে দীর্ঘ মতামত দিতে পারেন যে পিসিমা বা কাকু অথবা ভাইপো বা বোনঝি তাদের অনেকেই কিন্তু অবধারিতভাবে নন্দলাল বসুর অংকন-প্রতিভা বিষয়ে অন্ধকারে। এর আরেকটা কারণ, আমাদের বিদ্যা-প্রতিষ্ঠান গুলোতে ভাষা-সাহিত্য ব্যতিরেক অন্য কোনও শিল্পকর্ম জানা আবশ্যিক নয়। তাই চিত্রকলার অভিঘাত জনতার ব্যবহার-অভ্যাসের বৈশিষ্ট্যের কারণে সাহিত্যের থেকে ভিন্নতর। চিত্রকর মকবুল ফিদাহুসেনের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক দলের ফতোয়া এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবেই ধরা যেতে পারে কেনেনা হুসেনের আঁকা হিন্দুদের দ্বারা পূজিতা এক  দেবীর নগ্ন রূপ সহজেই শিল্পীর বিপক্ষে এক শ্রেণির জনতার বিরুদ্ধ মত তৈরির উস্কানিতে ইন্ধনের কাজ করেছে।

“…সব রিপুগুলোই খানিকটা দরকার’ – একথাটি কোনও কবি বা লেখকের পক্ষে বেদের মতো। … যদি ষড়রিপুর সমস্ত অনুভব রচনায় না আসে – লেখা তো আলুনি হয়ে যাবে। কোন রিপুকে কতটা কাজে লাগাবে, এটা তোমার ওপর। কোনও লেখকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নিজের ভাষা অ স্টাইলের দিক দিয়ে তিনি প্রশ্নাতীত রূপে নিজস্ব অসামান্যতায় বিরাজ করছেন, কিন্তু কোনও একটা বিষয়বস্তু, ধরা যাক যৌনতা, এত বেশি রকম প্রাধান্য পাচ্ছে সব লেখায় যে তিনি একপেশে হয়ে যাচ্ছেন। কোন রিপুকে কতটা কাজে লাগাবে – এ হল শৈল্পিক ভারসাম্য-বোধের কথা।’’

জয় গোস্বামী (যে কথা গানের অধিক ।। সংবাদ প্রতিদিন ।। ১৯ শে জুলাই ২০০৯ রবিবার)।

জয় গোস্বামীর এই আপাত গুরুগম্ভীর মতামতটি পাঠ করতে গিয়ে, করে, ব্যক্ত মতামতের স্ববিরোধের কারণে বর্তমান পাঠক কে ধাক্কা খেতে হয়।   সেই ধাক্কা একারণে নয় যে, সাহিত্যে যৌন-বর্ণনা বিষয়ে এই পাঠাক অবিসংবাদী ভাবে ভিন্নমত। বরং একজন সচেতন, নিরপেক্ষ, যুক্তিবাদী পাঠকের কাছে      কারণ এটাই হতে পারে যে, জয় গোস্বামীকে লেখা-সচেতন-লেখা লেখায় সিদ্ধহস্ত একজন উঁচু মানের সাহিত্যিক ও যুক্তিপরম্পরার কারিগর হিসেবে দেখে আসতে অভ্যস্ত পাঠক যখন  সেই লেখকের কাছ থেকে এমন অমনোযোগী মন্তব্য (উদ্ধৃত অংশ) পান তখন হতাশা স্বাভাবিক; বিষয়টি যেহেতু তাত্বিক।

উদ্ধৃতিটি একটু কাটা-ছেঁড়া করে দেখা যাক।

(ক) জয় এখানে বলছেন, কোনও একটা বিষয়বস্তু, ধরা যাক যৌনতা।

প্রশ্ন হচ্ছে, বেছে বেছে যৌনতাই বা কেন? ধরা যাক হাস্যরস কেন নয়? কেন তিনি বলছেন না, ধরা যাক বীর রস?

উত্তরও আমরা সহজেই দিয়ে দিতে পারিঃ তিনি এখানে ‘যৌনতা’কে উদাহরণ হিসেবে এই কারণে ‘ধরেছেন’ যে, কেবল মাত্র হাস্যরস বা বীররসে পরিপূর্ণ একটি রচনার বিপক্ষে গণমত তৈরি করা শ্রীযুক্ত জয় গোস্বামী কেন, কোনও তথাকথিত ধর্মগুরুর পক্ষেও অসাধ্য। সুতরাং ধরা যাক যৌনতা বলাটা নিরাপদ ও নিজের সিদ্ধান্ত প্রতিপাদনের ক্ষেত্রে সাময়িক হলেও, সহায়ক।

বড় কোনও মহাকাব্যিক রচনায় ‘সমস্ত রসের’ সামঞ্জস্যপূর্ণ মিশেল পাঠক আশা করতে পারেন, গ্রহণ করতে পারেন সাদরে, সমুচিত রসাস্বাদনের প্রক্রিয়ায়, সঙ্গত কারণেই। যদিও, একথা সবাই জানি, উত্তম শ্রেণির রচনায় একটি প্রধান রস থাকা অবিপ্রেত। যদি কোনও রচনার প্রধান রসটি পাঠক সনাক্ত/উদ্ধার করতে না পারেন, তাহলে তা রচয়িতার ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকে। সুতরাং কোনও রচনার ‘প্রধান রস’ যা-ই হোক না কেন, তার প্রাধান্য সেই রচনায় স্পষ্ট ভাবে টের পাওয়া যাবে। এটাই রীতি-সিদ্ধ।

(খ) …ষড়রিপুর সমস্ত অনুভব রচনায় না আসে লেখা তো আলুনি হয়ে যাবে। এই কথা আরও যেন গোলমেলে। দীক্ষিত পাঠক নিজস্ব মেধার আলোয় এই বক্তব্যটিকে রাখলে মনে হতে পারে, কেউ বুঝি তাকে সুবিন্যস্ত বাক্যজালে ফেলে দিয়ে কোনও ভাবে ঠকিয়ে ভ্রমের মায়াজালে বেঁধে রাখতে চাইছে। …যৌনতা বিষয়ক শুচিবাই আর কুসংস্কার এমন এক বিজ্ঞান-বহির্ভূত অবস্থানে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয়, যে, শুধু যুক্তিহীন জট পাকিয়ে যাওয়াকেই বড় রকমের ‘মন্থন’ বলে ভুল হতে থাকে।

ষড়রিপুর সমস্ত অনুভবের দাবী করেছেন জয় গোস্বামী তার এই বক্তব্যে, তা না হলে লেখা নাকি আলুনি হয়ে যাবে। তাহলে একবার ভাব যাক-

শিবরামে যৌনতা নেই = আলুনি

তারাপদ রায়ে বীভৎস রস নেই = আলুনি

কামিনী রায়ের কবিতায় শৃঙ্গার রসের অনুপস্থিতি = আলুনি

মধুসূদনে হাস্যরসের অভাব = আলুনি

জয় গোস্বামীর আলোচ্য বক্তব্যটি আরেকবার পড়া যাক। আমরা শুধু ‘যৌনতা’ শব্দটা বাদ দিয়ে এখানে করে দিচ্ছি ‘হাস্যরস’।

‘…কোনও লেখকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নিজের ভাষা অ স্টাইলের দিক দিয়ে তিনি প্রশ্নাতীত রূপে নিজস্ব অসামান্যতায় বিরাজ করছেন, কিন্তু কোনও একটা বিষয়বস্তু, ধরা যাক হাস্যরস, এত বেশি রকম প্রাধান্য পাচ্ছে সব লেখায় – যে তিনি একপেশে হয়ে যাচ্ছেন। কোন রিপুকে কতটা কাজে লাগাবে – এ হল শৈল্পিক ভারসাম্য-বোধের কথা।’

কী দাঁড়ালো? আমাদের শিবরাম, পরশুরাম, মুজতবা আলী, সুকুমার রায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, তারাপদ রায় সকলেই তাহলে একপেশে আর শৈল্পিক ভারসাম্যহীন ?

বোঝাই যাচ্ছে, ধরা যাক শব্দটি ব্যবহার করে যেন যে-কোনও একটি ‘রস’, পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই, বেছে নেবার জন্য হাত বাড়ানোর ছল করলেও, আসলে জয় গোস্বামীর যে ‘যৌনতা’ শব্দটি বেছে নেবার উদ্দেশ্যই ছিল সেই পাথককে-ভ্রমে-ফেলে-দেওয়া শব্দবাঁধনের মূলে এবং তা করা ছাড়া গত্যন্তরও ছিলনা, একথা আরও স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায় তখনই, যখন আমরা ‘যৌনতা’ শব্দটির স্থানে হাস্য রস/বীর রস/মধুর রস ইত্যাদি যেকোনও বিকল্প বসাই। আর তা করলেই সম্পূর্ণ বক্তব্যটি সারহীন ও হাস্যকর হয়ে ওঠে।

অন্যান্য রসের মতো জীবনের স্বাভাবিকতা হিসেবে যৌনতাকে নিতে না পারাটাই এক শ্রেণির পাঠকসমাজের সমস্যার মূলে। যৌনতা মানে যে ভালগারিটি নয়, সে কথা বারংবার বোঝা গেছে। আসলে যৌনতায় নয়, যৌন-বর্ণনার বিশেষ স্টাইলে, অভিনব পরিবেশন রীতিতে গতানুগতিকতায় অভ্যস্ত পাঠক হোঁচোট খান। এটা পরীক্ষামূলক সৃষ্টিকর্মের সাথে অপরিচয়ের কারণে আর চিরাচরিত সামাজিক মান্যতাগুলোকে অপেক্ষাকৃত স্বল্প মেধা খরচ করে বাঁচিয়ে রাখা সহজ অ নিরুপদ্রব বলে ঘটে। প্রচলিত শব্দবন্ধন, বর্ণনা নতুন অভিঘাত আনতে সক্ষম নাও হতে পারে। অথচ ‘মন’ ও অন্যান্য বিষয়ে বিজ্ঞানের নব নব আলো সম্পর্কে ওয়াকিব কোনও লেখক পুরাতনে আটকে থাকতে পারেন না।

শ্লীল-অশ্লীল বিষয়ে দীর্ঘ দিন নানা ভাবে পাঠকের অভিমতের ওপর লক্ষ্য রাখতে গিয়ে কেউ কেউ হয়তো খেয়াল করেছেন, যে, শৈল্পিক ভারসাম্য বোধের একজাতীয় সাধারণীকৃত বুলি কপচানো হলেও, আসলে প্রচ্ছন্ন বা সোচ্চার ভাবে কেবল যৌনতার ক্ষেত্রেই পরিমিতি বোধের প্রশ্নটি বারবার উঠে আসে। …কেন? মনে হয় এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটা সমাজবিজ্ঞানের প্রেক্ষিতেও প্রয়োজনীয়। ভাবতে হবে, কেন শৃঙ্গার রসের সাথে অন্যান্য রস মিশিয়ে সর্বদা পানীয়টি সফ্‌ট করার সুপরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। কেন জঙ্গলে একা একা বা যৌবনে-মউবনে অথবা জুঁই ফুলে যুথিদি জাতীয় কাঁপাকাঁপা হাতে আধখোলা বুক ছোঁবার উঞ্ছবৃত্তি মূলক প্রকৃত অশ্লীল সাহিত্যকে আদর্শ উৎপাদনের ছাপ মারা প্যাকেটে দিনের পর দিন ক্রয়বিক্রয় করা হবে।   ভাবতে হবে, খেলাটা কতখানি বাজার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আর কতখানি অন্যান্য বিষয়ের দ্বারা।

 সব রিপুগুলোই খানিকটা দরকার — যদি ষড়রিপুর সমস্ত অনুভব রচনায় না আসে লেখা তো আলুনি হয়ে যাবে।

-এই কথা একজন লেখকের রচনা-সম্ভারের সামগ্রিক বিচার-কালে যদি কেউ মাথায় রাখতে চায়, তবুও হয়ত কিছুদূর অব্দি সেই স্বাধীনতা সে খুবই সঙ্কুচিত চিত্তে নিলেও নিতে পারে। যদিও তা অনুমোদন করা শিল্পের স্বাস্থ্যের জন্য অনুচিত। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট/বিচ্ছিন্ন রচনার ক্ষেত্রে এই কথা বেদবাক্য হিসেবে ধরে নিলে তা হবে সমূহ বিপত্তির কারণ। কেননা-

পাঁচমিশেলি যৌনরস কী?

পাঁচমিশেলি হাস্যরসই বা কেমন হয়?

একটু মজা করার জন্য ভাবা যাকঃ

শিবরামের হর্ষবর্ধন/গোবর্ধন যদি উপরের সিদ্ধান্তকে সন্তুষ্ট করার মিশন নিয়ে সমরেশ বসুর বিবর এর নায়কের মতো ভাবেঃ …অচেনা মেয়েটির গায়ে হাত দিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি, আমার এক হাত তার কোমরে, আর এক হাত তার কাঁধে কাঁধের হাতটার কনুই মেয়েটির বুকে ঠেকে আছে, আর মেয়েটি লজ্জা লজ্জা মুখে হাসছে…

বা, ধরা যাক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সৃষ্ট চরিত্র গোরা, আধ্যাত্মিক পথের প্রশ্নাতুর পথিক, যে জীবনের মানে খোঁজার ও আচারমগ্নতার ক্লান্তি দূর করতে এবং অবশ্যই সব রিপুগুলোই খানিকটা দরকার – এই সিদ্ধান্ত প্রতিপাদনে সহযোগিতা করার জন্য শিবরামের ‘আমার সম্পাদক শিকার’ গল্পের কথকের ভাবনা ধার করেছেঃ  …হাম কিংবা টাইফায়েড, সর্পাঘাত কিংবা মোটর-চাপা, জলে ডোবা কিংবা গাছ থেকে পড়ে যাওয়া, এগজামিনে ফেল করা কিংবা কাঁকড়া-বিছে কামড়ানো জন্মাবার পর এর কোনটা না কোনটা কারু না-কারু বরাতে কখনো না কখনো একবার ঘটেই। অবশ্য যে মোটর চাপা পড়ে তার সর্পাঘাত হওয়া খুব শক্ত ব্যাপার, সেরকম আশঙ্কা প্রায় নেই বললেই হয়, এবং যার সর্পাঘাত হয় তাকে আর গাছ থেকে পড়তে হয় না।

যৌন-মনের ন্যূউডস্টাডির সাহায্যে ব্যক্তিমানুষের হাবভাব বোঝা ও ব্রেন-ম্যাপিং এর কাজ একভাবে সহজ হয়ে আসে। মানব-জীবনের অন্যসব দিকের মতোই এই দিকটাও সমান গুরুত্বসহ আলোকপাতের দাবী লেখকের কাছে রাখে। এবং বিশ্বসাহিত্যের বড় মাপের কাজগুলো এই দাবীর যথাযথ উত্তর দেয়। একএকটি বিশেষ রিপু/প্রবনতা/ঘটনাকে প্রধান ভাবে অবলম্বন করে কোনও এক লেখকের এক বা একাধিক অথবা সমস্ত রচনা শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতেই পারে। সেই বিস্তারের মধ্যে যুক্তি-পরম্পরা থাকা অভিপ্রেত। নির্বাচিত রিপু বা রস কী হবে আর তার ফ্রিকোয়েন্সি কেমন হবে তা ঠিক করে দিতে চাওয়াটা শিল্পের স্বাধীনতায় হাত দেওয়া; গোঁড়ামি। একজাতীয় মোড়লগিরি।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ