রবীন্দ্র-নজরুল: সঙ্গীতে সঙ্গতি

মধুরিমা কর
গবেষণা, প্রবন্ধ
Bengali
রবীন্দ্র-নজরুল: সঙ্গীতে সঙ্গতি

সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ
চেতনাতে নজরুল
যতই আসুক বিঘ্ন-বিপদ
হাওয়া হোক প্রতিকূল
এক হাতে বাজে অগ্নিবীণা,
কন্ঠে গীতাঞ্জলী
হাজার সূর্য চোখের তারায়
আমরা যে পথ চলি।

বাংলা গানের ভুবনে নিত্যশ্রুত শব্দবন্ধ দুটি হল,রবীন্দ্রসঙ্গীত ও নজরুল গীতি। বাঙালির সংস্কৃতিকে অবিচ্ছেদ্য করে তুলেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম।এই দুই শ্রষ্টার গান শুনেই আমার বেড়ে ওঠা।সঙ্গীত শিক্ষার একেবারে গোড়ার দিকে গানের কাব্যার্থ তেমনভাবে বোধগম্য না হওয়ায় মন অতটা কাড়ত না,যতটা সুর মনকে ছুঁয়ে যেত।কিন্তু তখন থেকেই গানের কিছু শব্দ,কথা,সুর মনের ভেতরে নানা ভাবনার উদয় ঘটিয়েছিল।আর সেই সকল ভাবনার বাস্তবায়নই এই প্রবন্ধ।

শিল্পীর ধর্মই হল শিল্প।সমাজ ও জীবনের অন্তর্নিহিত সত্যকে শিল্পে প্রতিষ্ঠা করা তার অন্তরের ইচ্ছার পাশাপাশি নৈতিক দায়িত্বও।এই প্রবন্ধে আলোচিত দুই মহাণ শিল্পীর সমগ্র শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভাবনাগুলোকে সীমিত বাক্যে ব্যক্ত করা অসম্ভব;তাঁদের সৃষ্ট শিল্প জগতে তাঁদের সবচেয়ে ভালোলাগা তথা ভালোবাসার বিষয় গানের প্রসঙ্গেই আমার নিজস্ব কিছু চিন্তার কথা ব্যক্ত করে তাদের শিল্পীসত্তার মহানুভবতাকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি মাত্র। কিন্তু এই গানের পরিধিও তো সুদূর বিস্তৃত,স্বল্প কথায় তার সমগ্র ক্ষেত্রকে তুলে ধরার মতো অসাধ্য সাধন ক্ষমতার অতীত।তাই প্রতিদিনের জীবনে নিয়ে চলা কিছু গানকে কেন্দ্র করে নিজস্ব যে ভাবনা গুলো গড়ে উঠেছে তারই সামগ্রিক একটা ধারনাই প্রবন্ধে বর্তমান।

বাংলা ভাষা ও শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ছিলেন একই সাথে কবি ও গীতিকার। রবীন্দ্রনাথের সময়কালেই বাংলা সাহিত্যে নবযুগের সূচনা করতে যে নবীন দল আত্মনিয়োগ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে নজরুল ছিলেন অন্যতম।তিনি সর্বপ্রথম রবীন্দ্রভাবমন্ডলের মধ্যে থেকেও অন্য এক সুরের ঝঙ্কার তুলেছিলেন ঠিকই কিন্তু এই ভিন্নতার মাঝেও নানান অভিন্নতার ধ্বনি শোনা যায় তাঁর গানে ও কবিতায়।গানও তো আসলে কবিতাই;তার ভেতরের সেই কাব্যিক ভাবনাই আমাদের অনুভূতিকে প্রবুদ্ধ করে।এভাবে অনেকক্ষেত্রেই রবীন্দ্রগান নজরুলকে প্রেরণা যুগিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সংগীত চিন্তা’গ্রন্থের ‘গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ’-এ বলেছিলেন,”বাক্য যাহা বলিতে পারে না গান তাহাই বলে।”১ অর্থাৎ গানে কথা ও সুরের মেলবন্ধনেই যথার্থ ভাবনা পরিস্ফুট হয়।রবীন্দ্রসঙ্গীতে কথা ও সুরের হর-পার্বতীর মিলনে,গানের ভাববস্তু আমাদের চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে যেমন জীবনে দুর্লভ আনন্দ ও বেদনার স্বাদ এনে দেয়,তেমনই নজরুলগীতিতেও কথার ও সুরের অভিনব বুননই আমাদের জীবনের সর্বস্তরের উপলব্ধিকেই জাগিয়ে তোলে।গানের মাধ্যমেই প্রাণকে জাগানো সম্ভব।তাঁদের সমগ্র সৃষ্টির শ্রেষ্টতম সৃষ্টি হল সঙ্গীত।গানের মাধ্যমে তাঁরা যেভাবে তাঁদের অন্তর্দর্শনকে সম্পূর্ণরূপে তথা সুপরিকল্পিতভাবে সর্বসমক্ষে পৌঁছে দিয়েছে,তেমনটা বোধহয় আর কোনো ক্ষেত্রেই হয়নি।

গান সম্পর্কিত তাঁদের ব্যক্তিগত মতামতের মধ্যেও এক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়।গুরুদেব তাঁর গানকে কেন্দ্র করে বলেছিলেন,’তোমরা কবি টবি যা বলো বলতে পারো,কিন্তু গানেই আমি বড়।’

নজরুলও বরাবরই তাঁর সঙ্গীতের প্রশস্ততা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন।১৯৩৮সালে জনসাহিত্য সংসদের ভাষণে তিনি বলেছিলেন,’সাহিত্যে দান আমার কতটুকু তা আমার জানা নেই,তবে এইটুকু মনে আছে,সঙ্গীতে আমি কিছু দিতে পেরেছি।’

কবিগুরুর সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সঙ্গীত সর্বশ্রেষ্ঠ।তাঁর গানে প্রেমভাবনার পাশাপাশি জাতি,ধর্ম নির্বিশেষে মানবতার ভাবনাই ব্যক্ত হয়েছে।তাঁর মানব ভাবনার মূলে ছিল অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব নাগরিকের সুদৃঢ় অবস্থান।তিনি বলেছিলেন,তাঁর লেখাগুলি মানুষ মনে রাখুক আর নাইবা রাখুক,তাঁর গান মানুষ চিরকাল মনে রাখবে।তাঁর রচিত স্বদেশ পর্যায়ের গানগুলোতে মূলত অসাম্প্রদায়িক চেতনা,মানবকল্যাণের ভাবনাই বিরাজমান।

বিদ্রোহী কবির বহুমুখী সৃজনশীল কর্মযজ্ঞের মাঝে আমরা খুঁজে পাই তাঁর প্রেমের কথা,সেই প্রেম মানবপ্রেম যেমন,দেশপ্রেমও তেমন।সাহিত্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি তার প্রমান দিয়েছেন।নিজেকে তিনি সর্বদা জাতি,ধর্ম ও সম্প্রদায়ের উর্ধ্বে রেখেছেন;তাঁর বহু গানে হিন্দু দেব-দেবীর প্রসঙ্গও বর্তমান।আসলে তিনি যা বিশ্বাস করতেন তাই বলতেন,লিখতেন,ও গাইতেন।তাই গানের মধ্যে দিয়েই তাঁর গভীর আর্তি প্রকাশিত হয়েছে,

”আমায় নহে গো,ভালোবাসো শুধু,
ভালোবাসো মোর গান!”২

দুজন ব্যক্তির জীবনচর্চা ও জীবনবোধ ভিন্ন,তাঁরা একান্তই তাঁদের জীবনবোধকেই তাঁদের সৃষ্টিতে ধরতে চেয়েছেন সর্বদা। নানা সুর,বাক্য ও শব্দচয়নের পাশাপাশি নজরুলের গানের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার বহু উপাদান লক্ষ্য করা যায়।আসলে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটই তাঁদের চেতনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলও তার ব্যতিক্রম নন;কখনো সেই চেতনার প্রকাশভঙ্গি এক,তো কখনো ভিন্ন। রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় অনুপ্রাণিত হয়েও তিনি কিছু গান রচনা করেছেন,এমনকি কাব্যগ্রন্থের নামকরনও।বিদ্রোহ-উল্লাসের সুরে রচিত তাঁর’অগ্নিবীণা’কাব্যগ্রন্থের নামটি রবীন্দ্রনাথের ”অগ্নিবীণা বাজাও তুমি কেমন করে”৩গান থেকেই নেওয়া।
অপরের ভাবনা বা দর্শনকে আত্মস্থ করা তখনই সম্ভব,যখন অন্তরাত্মা সেই ভাবনাকে প্রশ্রয় দেয় বা সেই দর্শনে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে মন।অন্যথায় গৃহীত সেই ভাবনাকে দিয়ে আর যাই হোক না কেন,শিল্প সৃষ্টি হয় না!

রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু গানের প্যারডি রচনা করেন নজরুল। মূল রবীন্দ্রসঙ্গীত,

”আমায় ক্ষমো হে ক্ষমো নমো হে নমো
তোমায় স্মরি হে নিরুপম
নৃত্য রসে চিত্ত মম,উচ্ছল হ’য়ে বাজে।”৪

নজরুলের প্যারডিতে তা হল-

”ওহে,শ্যামো হে শ্যামো নামো হে নামো
কদম্বডাল ছাইড়া নামো
দুপুর রোদে বৃথা ঘামো—ব্যস্ত রাধা কাজে।”৫

সকলেরই জানা একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত,

”আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী’
তুমি থাক সিন্ধুপারে ওগো বিদেশিনী।।
তোমায় দেখেছি শারদপ্রাতে,তোমায় দেখেছি মাধবী রাতে,
তোমায় দেখেছি হৃদি-মাঝারে ওগো বিদেশিনী।
আমি আকাশে পাতিয়া কান শুনেছি শুনেছি তোমারি গান,
আমি তোমারে সঁপেছি প্রাণ ওগো বিদেশিনী।
ভুবন ভ্রমিয়া শেষে আমি এসেছি নূতন দেশে,
আমি অতিথি তোমারি দ্বারে ওগো বিদেশিনী।।”৬

এই গানটিতে যেমন প্রেমভাব বর্তমান। প্রায় একইরকম কথায় সৃষ্ট নজরুলের একটি গান-

“বিদেশিনী চিনি চিনি-
চিনি চিনি ওই চরণের নূপুর রিনিঝিনি।।
দ্বীপ জ্বলে ওঠে পাথর তলে
তোমার চরণ ছন্দে,
নাচে গাঙচিল সিন্ধু কপোত
তোমার সুরে আনন্দে।
মুকুতা কাঁদিছে হা’র হতে ওগো
তোমার বেণীর বন্ধে।
মলয়ে শুনেছি তোমার
গলার সুরের রিনিঝিনি।
সাগর সলিল হয়েছে সুনীল
তোমার আঁখির বর্ণে
তোমার আঁখির আলো ঝলমল
দেবদারু তরু-বর্ণে;
অন্ত তপন হয়েছে রঙীন
তোমার তনুর বর্ণে
শঙ্খ ধবল বেলাভূমে
সাগর নাচে রিনিঝিনি।।”৭

কিন্তু এই গানে আবার ঈশ্বরের ভাবকল্পই যেন নির্মাণ করেছেন শ্রষ্টা।’বিদেশিনী’ সম্বোধনের অর্থ,গান দুটিতে ভিন্ন।

রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি ধাই’ গানটির একটি লাইন ”কোথাও দুঃখ,কোথাও মৃত্যু/কোথাও বিচ্ছেদ নাই।”৮

নজরুলের “মৃত্যু নাই,দুঃখ নাই/আছে শুধু প্রাণ”৯গানে যেন সেই একই বাণীই উচ্চারিত হয়েছে।

‘রামদাসী মল্লার’ রাগে সৃষ্ট নজরুলের গান,
“ঝর ঝর করে শাওন-ধারা।
ভবনে এলে মোর কে পথহারা!
বিরহ-রজনী একেলা যাপি;
সঘনে বহে ঝড় সভয়ে কাঁপি।
উথলি’ওঠে ঢেউ,কুটিরে নাহি কেউ;
গগনে নাহি মোর চন্দ্রতারা।
নিভিছে গৃহদীপ,নয়নে বারি;
আঁধারে তব মুখ নাহি নেহারি।
তোমার আকুল কুন্তল-বাসে
চেনা দিনের স্মৃতি স্মরণে আসে।
আজ কি এলে মোর প্রলয়-সুন্দর।
ঝলকে বিদ্যুতে আঁখি-ইশারা।”১০

এই গানের সাথে গুরুদেবের
”ঝর ঝর বরিষে বারিধারা।
হায় পথবাসী,হায় গতিহীন, হায় গৃহহারা।।
ফিরে বায়ু হাহাস্বরে,ডাকে কারে জনহীন অসীম প্রান্তরে-
রজনী আঁধার।।
অধীরা যমুনা তরঙ্গ-আকূলা অকূলা রে,
তিমিরদুকূলা রে।
নিবিড় নীরদ গগনে গরগর গরজে সঘনে,
চঞ্চলচপলা চমকে- নাহি শশীতারা।।”১১

এই গানের ভাবসাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।

নজরুলের লেখা অন্য একটি গান,
”অন্তরে তুমি আছো চিরদিন
ওগো অন্তরযামী।
বাহিরে বৃথাই যত খুঁজি
তাই পাই না তোমারে আমি।।
প্রাণের মতন আত্মার সম
আমাতে আছো হে অন্তরতম
মন্দির রচি,বিগ্রহ গড়ি
দেখে হাসো তুমি স্বামী।।
সমীরন সম আলোর মতন
বিশ্ব রয়েছ ছড়ায়ে,
গন্ধে কুসুমে সৌরভ সম
প্রাণে প্রাণে আছো জড়ায়ে।
তুমি বহুরূপি তুমি রূপহীন
তব লীলা হেরি অন্ত বিহীন
তব লুকোচুরি-খেলা-সহচরী
আমি যে দিবসযামী।।”১২

এই গানে আধ্যাত্ববাদে বিশ্বাসী রবীন্দ্রনাথের ”অন্তরে জাগিছ অন্তরযামী।
তবু সদা দূরে ভ্রমিতেছি আমি।।
সংসার সুখ করেছি বরণ,
তবু তুমি মম জীবনস্বামী।।
না জানিয়া পথ ভ্রমিতেছি পথে
আপন গরবে অসীম জগতে।
তবু স্নেহনেত্র জাগে ধ্রুবতারা,
তব শুভ আশিস আসিছে নামি।।”১৩

গানটির ভাবধ্বনি যেন অনুরণিত হয়েছে।

ভানুসিংহের পদাবলী, ”বসন্ত আওল রে!
মধুকর গুন গুন,অমুয়ামঞ্জরী কানন ছাওল রে।
শুন শুন সজনী,হৃদয় প্রাণ মম হরখে আকুল ভেল,
জর জর রিঝসে দুঃখদহন সব দূর দূর চলি গেল।
মরমে বহই বসন্তসমীরণ, মরমে ফুটই ফুল,…….
…..মোদিত বিহ্বল চিত্তকুঞ্জতল ফুল্লবাসনা-বাসে।।”১৪

এই গানটির মতোই নজরুলের
”বসন্ত আজ আসল ধরায়
ফুল ফুটেছে বনে বনে।
শীতের হাওয়া পালিয়ে বেড়ায়
ফাল্গুনী মোর মন-বনে।
ফুলগুলি হায় ঝরেছিল
হিমেল হাওয়ার পরশনে।
দখিন হাওয়ার হিল্লোলে আজ
প্রিয়তমের স্পর্শ নে!
উদাসী এই মাতাল বাতাস
জাগায় ধারায় মাতায় আকাশ;
হাসিতে তার কিসের আভাস-
মন জানে মোর মনে মনে।”১৫

গানটিতে বসন্ত ঋতুর আগমনীর বার্তাই ধ্বণিত হয়েছে।

এ তো গেল ভাবের কথা।ভাবনার পাশাপাশি সুর ও শব্দেরও কিছু সাদৃশ্য রয়েছে।গুরুদেবের প্রকৃতি পর্যায়ভুক্ত গ্রীষ্মের গান,

”দারুণ অগ্নিবাণে রে হৃদয় তৃষায় হানে রে।।
রজনী নিদ্রাহীন, দীর্ঘ দগ্ধ দিন
আরাম নাহি যে জানে রে।।
শুষ্ক কাননশাখে কান্ত কপোত ডাকে
করুণ কাতর গানে রে।।
ভয় নাহি,ভয় নাহি। গগনে রয়েছি চাহি।
জানি ঝঞ্ঝার বেশে দিবে দেখা তুমি এসে
একদা তাপিত প্রাণে রে।।”১৬
এই গানের সুরের চলনের সাথে নজরুলের,
“তৃষিত আকাশ কাঁপে রে,
প্রখর রবির তাপেরে।।
চাহিয়া তৃষ্ণার বারি
চাতক ওঠে ফুকারি’
করুণ শান্ত বিলাপে রে।।
রুদ্র যোগী ও কে দূর বিমানে
নিমগ্ন রহিয়াছে যেন ধ্যানে।
শকুন্তলা সম ভয়ে কাঁপে ধরা র’য়ে র’য়ে
অগ্নি-ঋষির অভিশাপে রে।।”১৭

গানটির সুরের চলনের কী অদ্ভুত এক মিল খুঁজে পাই!গ্রীষ্মের প্রাকৃতিক রূপ বর্ণিত হয়েছে দুটি গানেই।’বৃন্দাবনী সারং’ রাগকে আশ্রয় করে দুটি গানেই সুরের পাশাপাশি কথা ও ভাবেরও কিছু সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়,বিশেষত ‘করুণ শান্ত বিলাপে রে’ ও ‘করুণ কাতর গানে রে’ এই দুটো বাক্যে।

এছাড়াও তাঁদের বিভিন্ন গানের ভেতরে বেশ কিছু শব্দ ও বাক্যও যেন এক।যেমন,রবীন্দ্রগানের ‘আশ না মিটিতে’ নজরুলের গানে হল ‘না মিটিতে আশ’।এছাড়াও ‘বরণের মালা’,’ওলো সই’,’কান পেতে রই’,’বিজন ঘরে’,’বাজায় বেনু’,’মাভৈ মাভৈ’ ইত্যাদি শব্দ দুই শ্রষ্টার বেশকিছু গানেই লক্ষ্যনীয় ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম দুজনই তাঁদের সৃষ্টিতে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছেন।কালজয়ী সেই সকল সৃষ্টি বাঙালির সম্পদ;যা আমাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ,উল্লাস,যন্ত্রণা,ভালোবাসার সাথে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে।তাঁদের বয়সের বিস্তর ব্যবধান থাকলেও, দুজনের ভেতরের সম্পর্ক ছিল সুন্দর ও গভীর; নজরুলকে উৎসর্গীকৃত রবীন্দ্রনাথের ‘বসন্ত’ নাটক সেই আবেগ ও ভালোবাসার কথাই বলে।শিল্পীর কোনো জাত হয় না,একথা যেন এই দুই জাতশিল্পীর জীবন দর্শনের ক্ষেত্রে ধ্রুবসত্য।ধর্মের কথা যদি হয়,তবে গানই তো হয়ে উঠেছে তাঁদের ধর্ম; সেইসকল গান প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যকে যেমন তুলে ধরেছে,তেমনই মানুষের মাঝে নিরন্তর প্রেমভাব জাগ্রত করে চলেছে,জাত-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে স্বদেশের বুকে থাকা সকল মানুষকে এক হওয়ার মন্ত্র যুগিয়েছে।রবীন্দ্র-নজরুলের সেই সকল গান,যার প্রতিটি ছত্রে মানবতার ভাবনাই বর্তমান তেমনই দুটি গান দিয়েই এই আলোচনার ইতি টানবো।

“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।
………………………………………………………..
এক সে দেশের মাটিতে পাই
কেউ গোরে কেউ শ্মশানে ঠাঁই,
মোরা এক ভাষাতে মা’কে ডাকি,এক সুরে গাই গান”১৮

“এসো হে আর্য,এসো অনার্য, হিন্দু-মুসলমান।
এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ,এসো এসো খৃস্টান।
এসো ব্রাহ্মণ,শুচি করি মন ধরো হাত সাকার।
এসো হে পতিত,হোক অপনীত সব অপমানভার।”১৯

তথ্যসূত্র:
১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,’গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ’,সংগীতচিন্তা, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ,৬ আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড, কলকাতা ১৭, চৈত্র ১৪২১,পৃ ২১
২.কাজী অনিরুদ্ধ,সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি,প্রথম খন্ড, সাহিত্যম্,১৮বি, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা-৭০০০৭৩,পৃ ১১২
৩.রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ,৬ আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড, কলকাতা ১৭,পৌষ ১৪০৪,পৃ ৭৩
৪.তদেব:পৃ ৫৪৩
৫.https://www.bongodorshon.com/home/story_detail/parody-of-rabindrasangeet-becomes-najrulgeeti
৬.রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ,৬ আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড, কলকাতা ১৭,পৌষ ১৪০৪,পৃ ৩০৬
৭.কাজী অনিরুদ্ধ,সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি, পঞ্চম খন্ড, সাহিত্যম্,১৮বি, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা-৭০০০৭৩,পৃ ৩৪
৮.রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ,৬ আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড, কলকাতা ১৭,পৌষ ১৪০৪,পৃ ২৩৪
৯.কাজী অনিরুদ্ধ,সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি,প্রথম খন্ড, সাহিত্যম্,১৮বি,শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা-৭০০০৭৩,পৃ ১৫৬
১০.কাজী অনিরুদ্ধ,সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি, পঞ্চম খন্ড, সাহিত্যম্,১৮বি, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা-৭০০০৭৩,পৃ ৪৯
১১.রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ,৬ আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড, কলকাতা ১৭,পৌষ ১৪০৪,পৃ ৪৩৯
১২.কাজী অনিরুদ্ধ,সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি, পঞ্চম খন্ড, সাহিত্যম্,১৮বি,
শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা-৭০০০৭৩,পৃ ২০২
১৩.রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ,৬ আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড, কলকাতা ১৭,পৌষ ১৪০৪,পৃ ১০৮
১৪.তদেব:পৃ ৭৫৩
১৫.কাজী অনিরুদ্ধ,সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি, পঞ্চম খন্ড, সাহিত্যম্,১৮বি,
শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা-৭০০০৭৩,পৃ ১৬৫
১৬.রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ,৬ আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড, কলকাতা ১৭,পৌষ ১৪০৪,পৃ ৪৩১
১৭.কাজী অনিরুদ্ধ,সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি, তৃতীয় খন্ড, সাহিত্যম্,১৮বি, শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা-৭০০০৭৩,পৃ ১৬৬
১৮.কাজী অনিরুদ্ধ,সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি, প্রথম খন্ড, সাহিত্যম্,১৮বি,শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা-৭০০০৭৩,পৃ ৪
১৯.রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গীতবিতান, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ,৬ আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোড, কলকাতা ১৭,পৌষ ১৪০৪,পৃ ২৫১

মধুরিমা কর। গবেষক। জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের শিলিগুড়ি। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে গবেষণা কাজ করছেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ