রাই

বন্দনা মিত্র
কবিতা
Bengali
রাই

রাই

আপনাকে কাল দেখেছিলাম,
মাঠের ধারে কালো তমালতলী ।
আসলে ওটা চৌরাস্তার বুড়ো অশথ,
ঠাট্টা করে আমরা অমন বলি।
আপনার রঙের মত কালো মেঘে মেঘলা সকাল
আমাদের পাড়ার পথে ছড়িয়ে ছিল এদিক ওদিক ,
আপনার হাতে বাঁশি – যেমন থাকে, পীতবাস ও শিখীপাখা –
পদ্মপলাশ নাগর প্রেমিক ।
হাসবেন না, জানি ওসব বোকা মেয়ের কল্পবিলাস –
আসলে তো গাড়ির সিটে, মোবাইলে দু চোখ জোড়া
চাট্টিখানি কথা নাকি? ষোলহাজার না কত যেন
বান্ধবীদের মেসেজ পড়া !
কপাল ভাল , সিগনালে আজ লালচক্ষু অনেকটা ক্ষণ
এবং আমি লাইন দিয়ে অটো স্ট্যান্ডে লোকের ভিড়ে
আপনাকে আজ দুচোখ ভরে দেখব বলে জানেন মশাই
তিনটে অটো ছেড়ে দিলাম, মায়ের কিরে।
আমি তখন ক্লাস ইলেভেন, বাবা তখন কারখানাতে
ছাটাই হবার কমাস আগে, রাগিণীতে বইটা এল ।
দশ বারোবার দেখেছিলাম আপনার সেই তেরছা চাওয়া
শিষ দিয়ে গান, ঝাঁকড়া চুলে গীটার হাতে –
প্রেমে পড়তে আর কি লাগে ঐ বয়েসে ?
তারপর তো বাবার নেশা, মায়ের অসুখ, ভাই বোনেদের ইস্কুল ছুট
এবং আমার মাসাজ শপে চাকরি নেওয়া –
যাকগে এ সব ফালতু কথায় আপনার আর কি যায় আসে
আপনাকে তো দেখতে পেলাম নিজের চোখে আশ মিটিয়ে অনিমিখা
কাচের আড়াল, চশমা ঢাকা দুচোখ ছিল ব্যস্ত ফোনে
থাক না , তাতে আমার কি যায়? কেঁউ জানে না
আজকে আমি কয়েক মিনিট ছিলাম ব্রজে শ্রীরাধিকা।

 

সুভাষ মুখো

তাঁর মাথায় উচিত ছিল মুকুট থাকা ।
কিন্তু ছিল বাস্তবিকে ঝাঁকড়া ঘন এক মাথা চুল।
চোখে ছিল মোটা কাচের চশমা ঘেরা ,
কাঁধে ঝোলা, নিপাট ভালমানুষ সাজা ছদ্মবেশে
মস্কো থেকে পন্ডিচেরী চলত তাঁহার আসা যাওয়া।
কানে একটু কম শুনতেন, দৃষ্টি ছিল আপাতক্ষীণ
নরম কিন্তু হৃদয়ভেদী। তিনটে পাঁচটা কুকুর ছিল।
বেড়াল এবং টবের গাছে লঙ্কা জবা। বন্ধু ছিল
বসুধাময়- চায়ের দোকান, হাট বাজারে
কিংবা রেলের ইশটিশনে – অনায়াসে
আরপাঁচটা লোকের মত। অথচ ঠিক
অন্য কারোর রকমটি নয়।
মানুষটা যে সাংঘাতিক তা বোঝাই যেত,
যখন সটান গা ভাসাতেন উলটো স্রোতে –
টাকা মূলো , চোখ রাঙানী, চিমটি কাটা
বাক্যহূলের মৌমাছিকে থোড়াই কেয়ার।
তাঁর মাথায় থাকা উচিত ছিল সিধে সটান রাজার মুকুট
বাস্তবিকে লোকটা বোধহয় রাজার মতই –
আজন্মকাল ধর্মযুদ্ধে রণ নিপুণ সব্যসাচী।
তলোয়ারের ধার ধারে নি,
হাতে ছিল খাপ খোলা এক ঝর্ণা কলম –
এক পৃথিবী নিজের দাওয়ায় বিছিয়ে নিতে আবার কি চাই?
সে রাম নেই, অযোধ্যা নেই
চারদিকটাও বেশ কিছুটা বদলে গেছে।
কিন্তু তিনি এবং তাঁহার অক্ষয়তূণ শব্দ শায়ক
আজো দেখুন , বন্ধ কাচের শারসি ভেঙে আছড়ে পড়ে
কালবোশেখি ঝড়ের মত,
আমার এবং আপনাদেরও সুসজ্জিত ড্রয়িং রুমে।
তন্দ্রা ভেঙে আকাশ দেখি, রোদ উঠবে, উঠতে হবেই
কোথা থেকে ভরসা জাগে।
এক পৃথিবী বুকের কাছে আনতে গেলে আবার কি চাই!

ত্রিপাদ ভূমি

কে আঁকে মানচিত্র
কে তোলে কাঁটাতার বেড়া?
কে ভাগ করে আকাশ?
মানুষ শুধু কাঁথাকানি জড়ো করে
এ দোর ও দোর ভিক্ষা চেয়ে মরে।
ভিক্ষা চায় নিজস্ব ত্রিপাদ ভূমি
নিকোনো বারান্দা এক,
নিজস্ব কয়েকটি মুখ, মুখে হাসি,
এক থালা পেট ভরা ভাত।
এই সব ভিক্ষা করে করে সারাদিন
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখে
সূদূর অদৃশ্য হাত মানচিত্র এঁকে গেছে
উঠোনের মাঝখানে –
এদেশে সদর বাড়ি ওদেশে অন্তর।

 

কবি ই জানেন শুধু

কবিই জানেন শুধু ,
তিনি বহুকাল জননক্ষমতাহীন, নপুংসক হতমান।
শীতের দুপুর বেয়ে উড়ে আসা শব্দাবলী
দুই হাতে মুঠো করে ধরে নেন
ডুবন্ত মানুষজন যেমন আঁকড়ে ধরে খড়কুটো।
আঙুলের ফাঁক দিয়ে বহতা জলের ন্যায়
ইতস্তত পড়ে থাকে
সেইসব ছিন্নমূল অধরা পংক্তিগুলি।
বালকের অত্যাচারী হাতে যেমন ছড়িয়ে থাকে
বিধ্বস্ত বেলিফুল , গাঁথা মালা ছিঁড়ে।
মৌমাছি উড়ে যায় মধুর তলাশ করে
ইলিশের দর বড়ই আকাশ ছোঁয়া –
বিলাপের সুর বাজে,
কিছুদিন প্রেম করে যুবকটি কেটে পড়ে
যুবতী বিবাহ করে – সুচাকুরে সুপুরুষ মধ্যবয়সী স্বামী।
ঋতু আসে ঋতু যায়,
নির্বিকার চলমান নাগরিক ভীড়,
হু হু শিষে ছুটে যাওয়া লাস্ট ট্রেন ধরে
সন্ধ্যায় নিরাপদ ঘরে ফেরে।

বাজারের এক কোণে বুড়োবট তলে
কবি শুধু বিব্রত বসে থাকে
শুধু কবি জানে, সে বীতব্রত
নিভন্ত হোমের পাশে ভ্রষ্ট সমিধ।
শুধ কবি জানে, তিনি নপুংসক
জনন ক্ষমতাহীন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ