রাতের গর্ভপাত

উজান উপাধ্যায়
কবিতা
Bengali
রাতের গর্ভপাত

রাতের গর্ভপাত

প্রথম যাকে ভালোবেসেছি–
দ্বিতীয় বার তাকে চুম্বন করতে গিয়েই টের পেয়েছি, প্রেমিকাটি ততদিনে অন্ধ হয়ে গেছে।

দ্বিতীয়জন অন্ধ হয়েছে ঠিক তখনই, যখন যখন তার ঠোঁটে চাঁদের আলো রেখেছি আমি।

তৃতীয় জন ছিল অসম্ভব খ্যাপাটে।
আমাকে সাক্ষী রেখে প্রতিদিন সে সঙ্গমে যেত কৃষ্ণচূড়া গাছটির ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহগিনি গাছটির কাছে।

সে অন্ধ হতে চেয়েছিল নিজের থেকেই, তাই আমার কবিতা দিয়ে রোজ রাতে চুল্লি সাজাতো।

এভাবে দেখেছি আরও-
সব নারী আমারই নদীর পাশে
খুলে রাখে পোশাক আশাক, হীরে জহরত।
অলঙ্কার সাজ, শয্যাবস্ত্র ছেড়ে নিরাভরণ জলদাগে তার স্বচ্ছতোয়া দ্বীপ।

সেই দ্বীপে যুদ্ধের সাজ পড়ে নারীরা গিয়েছে সব নির্বাসনে, সব অস্ত্র লুকোনো পাঁজরে তার –
চন্দনের বনে মহুয়া, পলাশ সেইসব উল্লাসের সৌরভ বয়ে আনে।
প্রতিটি রাতেই অন্ধ মেয়েরা নিষেধাজ্ঞা ভেঙে ফেলে নীল রঙে বিষ গুলে আদিমতম শ্বাসে সাপ হয়ে যায়-
ছোঁবলে ছোঁবলে গন্ডায় গন্ডায় অন্ধ ভোরের জন্ম হয় – পুরুষেরা আঁতুরঘরে ঢুকে ডুকরে ওঠে প্রসব বেদনায়।

 

আজগুবি

ট্রেন ফেল হয়ে গেলে সঙ্গী সাথীরা চলে যায়। একা একা পরের ট্রেনের জন্য হাজারো চিন্তায়। আদৌ পৌঁছনো হবে কিনা তা নিয়ে ভাববার অখন্ড অবসর।
এই যে শিবির গাছ ও নদীর, নৌকা ও নোঙরের এসব তোমাকে বলে দেবো এই অলস অপেক্ষার মুহূর্তদের গুচ্ছে ভিড়িয়ে।
তুমি তো বুঝেই গেছো প্রেম, নির্মল বন্ধুতার সাথে জুড়ে আছে যারা তাদেরকে বেশি কথা বলতেই নেই।
তাদের বাঁধতে হবে সন্দেহের টাইট দড়িতে।
এসব আজগুবি শব্দ ও প্রসঙ্গদের চিবিয়ে নেবার মাঝে অসহ অবসাদ ধরমরিয়ে ভাঙে…
হুইসেল দিতে দিতে মানুষের বাইরের ব্যস্ত অবয়ব ঠিক যেন শ্বাসরোধ করতে করতে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ছে তারই ভেতরে, জনশূন্য করে দেবে অন্তর্লীন সব প্লাটফর্ম।

 

অলীক মহাকাব্য

আমাদের জন্ম হয়েছিল দুটি আলাদা গ্রহে। ঘাসের রঙ আলাদা ছিল। আমাদের বাসস্থানে আলাদা রঙের গাছেরা প্রতিবেশী হয়ে উঠেছিল।
তোমার মেয়েবেলায় যেসব ভ্রমর, যেসব সরষে ফুল, বিকেলের নরম রোদে কমনীয় হয়ে ওঠা নদী, জানলায় আছড়ে পড়া অবেলার বেপরোয়া হাওয়া-
আমার ছেলেবেলায় হয়তো তেমন ছিল না তারা।
আমাদের জন্মকুন্ডলীর ঠিক কোন ভাঁজে আমাদের মুখোমুখি হওয়ার
লগ্ন লেখা ছিল, পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞান লোককথা আর সঙ্গীতের সর্বব্যাপী বিধি সেসবের খবর রাখেনি।
জানিনা, জন্মদিনের প্রথম শঙ্খনাদে সমলয় জেগে উঠেছিল কিনা সকলের নজর এড়িয়ে।
তোমার বাড়ন্ত বেলা, আমার প্রথম যৌবন ভিন্ন ভিন্ন বহুভুজে ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিতে সময়ের আশ্চর্য খেলাকে চূড়ান্ত অবহেলা করে গিয়েছিল।
তবুও বিরল এক বাঁশি, তবু প্রিয় পাখিদের ডাক মেঘের অন্তরালে কি এক অদ্ভুত মিলন সংবাদ গেঁথে রেখেছিল।
হঠাৎ বাঁকলো সমতল, হঠাৎ অন্ধকারে পাতালের গোপন কুহক নান্দনিক গন্ধ এনে দিল।
দুই ভিনগ্রহী নারী ও পুরুষ নীলজলে আশ্চর্য এক ঘোড়ার গাড়িতে একদম কাকতালীয় ভাবে মুখোমুখি হলো।
তারপর আমাদের প্রেম। তারপর একটাই গ্রহ।
তারপর অবাক লন্ঠন। তারপর বৃদ্ধ বাতিঘর হঠাৎই জোয়ান।
শহরের ঠিক মাঝখানে আমাদের উন্মুক্ত চুম্বন, তারপর রাষ্ট্রবিধি ধরে যুদ্ধের নতুন নিশান।
আমাদের হাতে এলো দেশ, আমাদের মুখর প্রবেশ, আত্মারা পরম বাঙ্ময়।
এইভাবে কত যুগলের দেখা হয়ে যায়। কত অন্ধ রাত আনন্দে অক্ষয়-
বিষণ্ণ আস্তাবলে এইভাবে যুগান্তের আলো প্রেমিক ও প্রেমিকার মহাকাব্যিক আসঞ্জনে রচনা করে চলে অলীক বিস্ময়।

 

হলোগ্রাম (Hologram)

অতঃপর সরে গেছি নিজের শরীর থেকে, নিজের আত্মা থেকে। অবশেষে হুররে বলে সরে গেছি আমার আমির সব গুছিয়ে ফেলা উল্লসিত নৌবহর থেকে। আমাকে ঘিরেছে যারা চূড়ান্ত আদর আর ভালোবাসা দিয়ে মোড়া মুকুটের ভিড়ে তাদের ভিতরে যেইসব টুকরো বা আস্ত আমি হাঁটুমুড়ে, হামাগুড়ি দিয়ে কিম্বা লুকিয়ে থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা রস গন্ধ প্রেম ও ভ্রমণলিপি আয়ত্ত করার ফাঁদে ডুবেছিল- জেলেমাঝির মতো স্বাড়ম্বর ওস্তাদী দিয়ে সেইসব সরিয়ে ফেলেছি অলস আলোর নির্বাক ইস্তাহারের স্বেচ্ছা দ্বীপান্তরে।
আমি তো জানিই বরাবর, এইভাবে সরে না এলেই খুঁজে নেওয়া যায় না নিজেকে।
যারা যারা নোঙর ফেলেছে এতদিন বৃষ্টিস্নাত হৃদয়ের সবুজ মিনারে, তাদের চোখের নীড়ে আশ্চর্য সমাধি দেখে নিতে এইবার সময় পেয়েছি।
তাই সব ভালোবাসা ছিঁড়ে, তাইসব আহ্বান ভেঙে তাইসব স্নেহ মায়া এবং কুশলপ্রস্তাব তছনছ করে সন্ধের নিয়ন্ত্রণে পালিত সাঁঝবাতি থেকে সরিয়ে ফেলেছি হতভম্ব নক্ষত্রদের পুরোপুরি।
জানিনা আমার নামে যে কটা ডাকঘর ছিল, কত প্রেম বেনামী চিঠির ভাঁজে সুচতুর বিলাস ভেজেছে।
ফুটন্ত জ্যোৎস্না তরলে চুবিয়ে রেখেছি অক্ষরবৃন্ত, ছিন্নভিন্ন করেছি প্রণয়দগ্ধ জোনাকির লিপিবদ্ধ জীবনচরিত।
এইখানে একা শুয়ে আছি, ফটোএলবামে জমে যায় প্রতিটি ব্লুপ্রিন্ট আর নেগেটিভ আলো জ্বলে উঠছে নিভন্ত উল্কাদের ঝাঁজালো তন্দ্রায়।
ঘুম যে প্রসবসম্ভবা হতে পারে, কতবার বুঝিয়েছে শীতলক্ষ্যা নদী, কতবার জন্মান্তর চেয়ে মৃত্যুকে ছলনা করেছি।
অথচ সবটুকু ছিল আমার বিনির্মাণে, বুঝে গেছি যেই-নিশ্চুপ হাস্যোজ্জ্বল মুখে গেঁথেছি গোলকধাঁধা- চাতকের প্রশ্রয় ছুঁয়ে নিয়ে।
এতক্ষণে ঈশ্বরী স্বস্তির ছন্দে গেয়েছে লালন।
এতক্ষণে রাত্রির গর্ভগৃহে পা ফেলেছি নিঃস্বতার।
আত্ম হন্তারক যদি না হলাম, আমি যে চিরস্থায়ী নিজের গোলাম।
শূন্যতার অন্ধ হলোগ্রাম।

উজান উপাধ্যায়। কবি। কবিতাপুরুষ। জন্মের আগেই প্রথম দোয়াত শূন্যে কুড়িয়ে নেওয়া। যাপনের প্রতিটি কার্নিশে, ভ্রমণের প্রতিটি আক্ষেপে কবিতার মেয়ে কবি উজানের অক্ষরবৃষ্টিকে ছুঁয়ে থাকে প্রেমে-অপ্রেমে। শুষ্ক নগরীতে ভালোবাসা লিখতে এলাম - এই উচ্চারণে একাকীত্বের গর্ভে লালিত তার নির্জন, ম্যাজিকাল, অভিকেন্দ্রীয় রূপান্তর।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..