রামধনু

সুজান মিঠি
গল্প
Bengali
রামধনু

ইচ্ছে করেই আজ দেরি করে বিছানা থেকে উঠলো বর্ণালী, প্রতিদিন ভোর থেকে ছোটা, অনিশ এর অফিস বেরোনোর সময় 9 টা, আর ছেলে পুপুর স্কুলের গাড়ির হর্ন বাজে ঠিক 8.20 তে। তার মধ্যে ব্রেকফাস্ট টিফিন সবকিছু সেরে নেওয়া, প্রতিদিনের রুটিন বর্ণালীর জীবনে। আজ দেরি করে ওঠার সিদ্ধান্তটা নিয়েছে গত সাতদিনের প্রস্তুতিতে।

প্রয়োজনীয়তা দেখতে চাওয়া, বা দেখাতে চাওয়া ।

ঘুম ভেঙে অনিশ যখন দেখলো বর্ণালী ওঠেনি তখনো, কপালে হাত দিয়ে উষ্ণতা অনুভব করে বললো, ‘ শরীর খারাপ বর্ণালী?’ নির্লিপ্ত উত্তর দেয় সে, ‘না’।

— ‘তবে ওঠনি যে, আমার অফিস, ছেলের স্কুল…’

— ‘সামলাও না একদিন’।

বলা বাহুল্য, বিয়ের দশ বছর অতিক্রান্ত, আর এর মধ্যে বর্ণালীর অসুস্থতা বিশেষ চোখে পড়েনি পরিবারের কারোরই। দৈবাৎ কয়েকবার যখন হয়েছে, শাশুড়ি মাতা বিরক্তি হজম করে সামলেছে কিছুটা।

— ‘সকালবেলা কি হেঁয়ালি শুরু করেছ, বলোতো! কিছু প্রবলেম না হলে ওঠো, বাবা মা তো বসে আছে চায়ের জন্য।’ খানিকটা জোরেই বললো অনিশ।

কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরে ধীরে উঠলো বর্ণালী, নিচের ঘড়িতে সাতটা ঘন্টা পড়লো, এ বাড়ির মতোই ঝাঁজ নিয়ে।

— ‘মা, ও মা কি গো, আমায় রেডি করে দাও, আরে গাড়ি এসে যাবে তো, ও মা কি হোলো! আরে কিছু বলো না মা।’

ঘর থেকে বেরিয়ে বাথরুমে ঢোকে বর্ণালী। প্রতিদিনের কাকস্নানে দেহের মনে অনেক আবর্জনা জমা হয়েছে যেন। সাওয়ার খুলে দিল সে। জলধারা চুপচাপ তার চুল বেয়ে কপাল বেয়ে নেমে আসছে শরীরে, নিজেকে নদী ভাবতে লাগলো বর্ণালী।

বাইরে থেকে শশুরের গলা- ‘বৌমা, আজ কি চা দেবে না?’

অনেকক্ষন নদী হয়ে পরে বেরিয়ে আসে বর্ণালী। বাইরের কোনো আওয়াজই আজ কানে নিতে চায়না যেন সে। দরজা বন্ধ করে আলমারি থেকে বের করে সেই নীল রঙা শাড়িটা। বারো বছর আগের শাড়ি এখনো তার গায়ে সমুদ্রের ঢেউ হতে পারে। শাশুড়ির তীব্র ডাক, ‘ও বৌমা, কি ঢং হচ্ছে আজ, রিমো তো স্কুল যাবেনা, বলি আমার ছেলে অফিস না গেলে, চলবে তো?’

বাবার দেখা প্রতিষ্ঠিত সুপাত্র অনিশকে প্রথম দেখে বর্ণালীর মনে হয়েছিল তার ভাবনা তার ব্যক্তি স্বাচ্ছন্দ্যে তার স্মৃতি সংরক্ষণে বিশেষ হস্তক্ষেপ করবে না হয়তো। কিন্তু বিয়ের পর তার ধারণা বদলে গেল সম্পূর্ণ। শশুর শাশুড়ি স্বামী সংসারের কতৃত্বের নামে একজন যন্ত্র হয়ে উঠলো সে। রাতের বিছানাতেও থাকে না যন্ত্রের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাম।

শরীরের মাদকতা উন্মত্ততা একদিকে, আর ভিজে বালিশে লুকিয়ে রাখা স্মৃতিরা অন্যদিকে-সবদিকে।

সেই বেঞ্চের তলা দিয়ে লুকিয়ে পাওয়া প্রথম প্রেমপত্র, কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা, ‘বর্ণালী, আমার রামধনু হবি?’

আর অনেকবার লিখে, কুঁচিয়ে বারবার ভেবে লেখা উত্তর, ‘হ্যাঁ’।

অনেকগুলো বছর একসাথে, বর্ণালী আর নিশীথ। দুজন একসঙ্গে নিশীথের রামধনু। নিশীথ খুব ভালো গান গাইতে পারতো। আর বর্ণালী আঁকত ছবি। ছবি আর গান এগিয়ে চলেছিল রামধনুর রঙে। কিন্তু বিয়ের বয়স হয়ে যাওয়া বর্ণালীর বাড়ির কাজের মাসির ছেলে নিশীথের সাহস হয়নি বর্ণালীর বাবার কাছে এসে তার ভালোবাসার হাত চেয়ে নিতে। যার সাহায্যের কারণে সুধা মাসির ছেলে হয়েও সে পেরেছে পড়াশোনা করতে, মানুষ হতে, তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে তার মেয়েকে সে রামধনু করে নিয়ে যেতে।

নিতান্ত অভিমানে অনিশের গলায় মালা পরিয়েছিল বর্ণালী, অদৃশ্যের উদ্দেশ্যে ছুঁড়েছিল প্রশ্ন- ‘সুধা মাসির ছেলে হয়ে ভালোবাসলি কেন, নিশীথ?’ সানাইএর সুরে ভেসে গেল কোথায় কত দূরে সেই অব্যক্ত প্রশ্ন।

খুব একটা আসক্তি না থাকা সত্তেও হুজুগে সামিল হওয়ার জন্যই হয়তো বর্ণালীর হাতে স্মার্ট ফোন তুলে দেয় অনিশ। বলে – ‘জানি, তোমার সময় নেই, তবু গান শুনো, ছবি দেখো।’ নিশীথ বলতো- ‘বর্ণমালিকা, আমার রামধনু, তুই নিজেই তো রঙের বাহার, তুই নিজেই তো ছবি সোনা।’

‘বৌমা, অনেক নাটক করেছ সকাল থেকে, বলে দিলেই হতো, আমি আজ কিছু করবো না, আপনি করুন। বলি ছেলেটা তো আমার রাগ করে না খেয়ে বেরিয়ে গেল, নাতিটার মুখে কিছু দেবে তো নাকি! ও কি না খেয়ে থাকবে আজ?’

শাশুড়ির গলার স্বর খুব তীক্ষ্ম, বুকের ভিতর গিয়ে ফালা ফালা করে দেয়। বর্ণালী নীল শাড়িতে তখন সমুদ্র হয়ে উঠেছে, খোলা চুল মেঘ হয়ে সমুদ্রের বুকে পিঠে ভেসে বেড়াচ্ছে। খুব ধীরে ধীরে রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকে সে। ছেলে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বর্ণালীকে, – ‘ও মা, কি সুন্দর লাগছে তোমায়। কিন্তু তোমার কি হয়েছে, কথা বলছো না কেন?’ রিমোর নিষ্পাপ মুখে চুমু দিয়ে গ্যাসের নব ঘোরালো বর্ণালী।

অনিশের আনা মোবাইলে ফেসবুক ইনস্টল করে দিল খুড়তুতো ননদ চুমকি। বললো, ‘বৌদি, আমাকেও কিন্তু দিতে হবে, মাঝেমাঝে, আমার ফোনটা এত ভালো না’।

ফেসবুকে সার্চ করলো, নিশীথ রায়। সঙ্গে সঙ্গে প্রথমেই সেই চেনা মুখ, যাকে বিয়ের পাঁচ বছর পর থেকে বহুবার টিভিতে দেখে আসছে বর্ণালী, গায়ক হিসেবে ভালোই প্রতিষ্ঠিত সে। রিকোয়েস্ট টা পাঠিয়েই দিল, অনেক ভেবে চিন্তে। সন্ধ্যে পর্যন্ত ভীষণ উৎকন্ঠা নিয়ে কাটলো সেদিন তার। টিভিতে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় ‘বিয়ে করেননি কেন?’

প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল একবাক্যে- ‘রামধনু আসেনি এখনো।’ সন্ধ্যের কিছু পরে নোটিফিকেশন এল, আর এলো মেসেজ– ‘বর্ণালী দত্ত কি বর্ণচোরা, নাকি রামধনু?’

বর্ণালী অনেকক্ষন এই একটা লাইন পড়লো তারপর লিখল– ‘আমি বর্ণান্ধ।’ এরপর নিশীথের আর চিনে নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়,

— ‘ রামধনু, ডিপিতে ছবি তো দিতে পারতিস একটা, পুরানো ছবিতে তোর নতুন রঙের বিচ্ছুরণ যে আর হচ্ছে না রে, সোনা।’

তারপর অভিযোগের বন্যা, কান্না, আক্ষেপ, আর তারপর ধুয়ে মুছে শান্ত প্রশান্তি। ফেসবুক নয়, ফোন নম্বর দিলো বর্ণালী, দুপুরের যে একঘন্টা ওর নিজের, লুকিয়ে রাখা খাতায় এঁকে চলে শুধুই রামধনুর ছবি, যে খাতা হঠাৎ একদিন দেখে ফেলেছিল অনিশ, হেসে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ ভারী অদ্ভুত তো, এত ভালো আঁকো, অথচ শুধু রামধনুর ছবি কেন?’ এক ঝটকায় হাত থেকে খাতাটা নিয়ে বর্ণালী বলেছিল, ‘ছাড়ো তো, এসব আজেবাজে আঁকিবুঁকি।’ সেই এক ঘন্টা নিশীথ কে দিলো বর্ণালী। সারাদিন চরকির মত সংসারে ছুটতে ছুটতে এই দুপুরের আনন্দ তাকে দিত একরাশ মুক্তি। এক আকাশ আনন্দ আর এক সমুদ্র আফসোস।

নীল শাড়িটা হঠাৎ একদিন এনে গায়ে জড়িয়ে দিয়ে বলেছিল নিশীথ, ‘দেখ দেখ, তুই আজ রামধনু না, তুই আজ আকাশ। না না ওই দূরের সমুদ্র তুই আমার। তুই আমার সমুদ্র।’

— ‘ও বৌদি, কি করছো, তোমার সঙ্গে না আমার একটা কথা আছে।’ পাশের বাড়ির ননদ চুমকি এসে বললো বর্ণালীকে। রিমো এসে বলে — ‘ও পু’মনি মায়ের কি হয়েছে, বলোতো! কারো সঙ্গে আজ কথা বলছে না, রান্নাও করছিল না। দেখো আমার আজ স্কুল ও অফ হয়ে গেল। দেখো না গো মায়ের কি হয়েছে?’

— ‘বৌদি, রিমো কি বলছে এসব, তোমার শরীরখারাপ বুঝি?’

— ‘না চুমকি আমি ঠিক আছি, তুমি যাও, বিকালে তোমার কথা শুনবো সব।’

টুকটাক কিছু রান্নার কাজ শেষ করতে লাগলো বর্ণালী।

গত দুপুরে নিশীথ তাকে বুঝিয়েছে, ‘নিজেকে গুরুত্ব দিতে শেখ বাবু, এমনভাবে সবটা বিলিয়ে দিস না। কোনো কিছু আটকাবেনা রে তোর জন্য।’

বর্ণালী প্রতিবাদী সুরে বলেছে, ‘আমার উপর সবাই কত ভরসা করে, ভালোবাসে। স্বামী শশুর শাশুড়ি সবাই।’

— ‘বেশ, কাল তুই পরীক্ষা করে দেখ, একদিন যদি ওদের অবহেলা করিস, নিজেকে শুনিস, নিজের সাথে কাটাতে চাস, দেখবি ওরা কেমন ফোঁস করে উঠবে। কোনো অনিয়ম চলবে না সংসারে।’

কিছুটা চ্যালেঞ্জ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া, দেখি না কি হয়, বর্ণালী ভাবতে লাগলো আসলে এটাই সত্যি, নিশীথ ঠিক বলেছে, না খেয়ে রাগ করে অফিস গেছে অনিশ, ছেলের স্কুল অফ হয়েছে বলে শাশুড়ি শশুর ক্ষুণ্ন, এমনকি রিমো পর্যন্ত নালিশ জানিয়েছে চুমকির কাছে। তার তবে এই দাম সংসারে! অসুস্ততা ছাড়া ইচ্ছেমত ছুটি নিতে পারেনা একদিনও!

আজ দুপুরের একঘন্টা সম্পূর্ণ নিজেকে নিয়ে কাটালো বর্ণালী, নিশীথের পনেরবার মিসডকল পূর্ণ হয়েছে ততক্ষনে। সন্ধ্যায় ফিরে এসেছে অনিশ, কফি খেতে খেতে ছেলেকে নিয়ে খেলার গল্পে মেতে। একবারও বলেনি বর্ণালীকে, ‘ তোমার ইচ্ছাগুলোর ডানা হবো আমি, দুজনে উড়বো একসঙ্গে, এক আকাশে।’ কি সব ভাবছে সে আজ! ছেলেকে পড়াতে হবে এক্ষুনি, টেবিলের উপর বই গুলো সাজাতে লাগলো সে। রিমো বাবার আদর খেয়ে এসে মায়ের কাছে পড়তে এলো, এসে বললো, ‘ মা বড়দের কেউ বেবি বলে?’

বর্ণালী হেসে বলে, ‘কেন, তোমাকে বুঝি কেউ বেবি বলেছে?’

‘না গো মা, আমি তো জানি আমি বেবি, কিন্তু বাবা লিখছিল, একটা আন্টির ছবি ছিল, তাতে।’

— ‘কি লিখছিল?’ __ ‘লিখছিল আই মিস ইউ বেবি।

উপরে লেখা ছিল কুহেলি নিউ।’

বর্ণালী কখনো অনিশের ফোন চেক করে না, তাই পাশে অফ করে রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পরে অনিশ। বর্ণালীর বর্নেরা রাতের অন্ধকারেও হাতড়ে বেড়ায় সেই সুর, একমুঠো জোনাকি এনে অন্ধকারের মধ্যে ছেড়ে দিয়েছিল বর্ণালীর নীল শাড়িটার কোঁচড়ে, একগাল হেসে তারপর আচমকা গেয়ে উঠেছিল নিশীথ–

‘গায়ে মেখে আলো প্রিয়া,
রামধনু হয়েছে দিয়া…’

দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লো একটা, তারপর অনিশের ফোন নিল হাতে, প্রথম অবিশ্বাসের আন্দোলনে ফোন অন করতেই প্রথম প্রমাণিত সত্য – ‘ কাল ঠিক পাঁচটায়, বেলুড় মঠে গঙ্গার ধারে অপেক্ষা করবো।’ নোটিফিকেশন দেখে সঙ্গে সঙ্গে আবার অফ করে দেয় ফোন।

মনের মধ্যে একটা খটকা বিঁধে আছে কাঁটার মত সারাদিন। ভাবছে অনিশ যা করছে যদিও সে তেমন কিছুই জানে না, তবু সেও কি দুপুর অবসরে এই একই কাজ করছে না!

নিশীথের কথা শুনে দেখতেও চাইল বাড়িতে তার গুরুত্ব কি, রাতের বিছানায় শুকনো প্রতিবাদী স্বর অনিশের কানে পৌছায় না কখনো, ‘অনিশ, ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করা অন্যায়, ধর্ষণ।’ মুখ আলতো করে চেপে ধরে অনিশ, তারপর তার সারাদিনে স্মোক করা দু এক পেগ ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় বর্ণালীর গোলাপি ঠোঁটে। বর্ণালী চোখ বন্ধ করে ভাবে, ‘জানিস রামধনু, তোর ঠোঁট কাঁপলে আমার খুব কষ্ট হয়, ইচ্ছে করে দুহাত দিয়ে ঢেকে রাখি আমার গোলাপ পাপড়িদুটোকে। না, এসব আর সে ভাববে না। নিশীথ তার অতীত, তাকে বালিশের নীচে রাখাই শ্রেয়। আর অনিশ তার বর্তমান, শরীরের উপরে, আর বর্তমানের হাতের মুঠোয়। বর্ণালী ভাবলো নিশীথের ফোন সে আর ধরবে না।

রিমোকে স্কুল থেকে এনে, তাকে একটু দরকারে যাচ্ছি বলে বিকেল চারটে নাগাদ বেরোলো বর্ণালী। মঠে ঢুকলেই মন তার শান্ত হয়ে যায়, গঙ্গার বাতাস সব সত্যিগুলোকে ভুলিয়ে দেয়। শিথিল মনে এগোতে এগোতে সামান্য দূরে এসে পৌঁছায় সে, আর একটু সামনেই বসে আছে দুজন, অনিশ আর কুহেলি। নামটা এটাই সেভ আছে ফোনে, রিমো ঠিক দেখেছে। পিছনের গাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে ললাটে এক থাবড়া সিঁদুর এঁকে দেওয়া স্বামীর প্রথম কথা শুনতে পেল- ‘তুমি বুঝতে পারছ না কূহু, ডিভোর্স দিতে চাইলে ঝামেলা ভীষণ, খোরপোষ, এককালীন টাকা, কোর্ট কাছারি, ছেলের দায়িত্ব, বাব্বা ওসব কি মুখের কথা?’

— ‘তবে আমি কি সারাজীবন এমনিই থাকবো, আর তুমি ওই বর্ণালীর মধু খেয়ে বেড়াবে?’ ঝাঁঝ পুরো ধানীলঙ্কার মত। অনিশ বেশ ভালো জনের কাছেই এসে পড়েছে। বর্ণালীর ঠোঁটের কোণে প্রতিশোধের মুচকি হাসি এসে মিলিয়ে যায় অনতি পরেই। হাতের উপর হাত রেখেছে অনিশ, এত লোকজন চারদিকে, এর থেকে বেশি কি আর করবে এখানে! — ‘কূহু, একটু অপেক্ষা করো, ঠিক ব্যবস্থা করবো। আর বর্ণালী তো একটা নির্বিষ ঢোড়া, ওকে নিতে অত ভয় খেয়োনা।’ না বর্ণালী আর নিতে পারেনা। কোনোরকমে বাড়ির রাস্তায় হাঁটা দেয় সে।

‘উ বৌমা, রান্না দিনের পর দিন এত খারাপ হচ্ছে কেন তোমার? মুখ দেয়াই দূর্দায় হয়ে পড়েছে।’ বেশ বিরক্তির ভাঁজ শশুরের মুখে। পাশেই নির্লিপ্ত অনিশ, কিছুটা পরে বলে, – ‘দেখো, বর্ণালী, মোবাইল অডিক্টেড হয়ে যেও না যেন, আর হ্যাঁ রান্নার সময় ওসব না ঘাঁটাই ভালো।’ বর্ণালী কোনো কথার জবাব দিল না। এগুলো কোনোটাই যে সত্যি নয়, তা বোধহয় অনিশ নিজেও জানে।

দুপুর-অবসরের একলা সময়টাও কেড়ে নিচ্ছে চুমকি, বৌদি এইটা দেখো, বৌদি ওইটা দেখো, ফোন নিয়ে এমন হাজার কিছু দেখানো শেখানো আর নিজেও আনন্দ পাওয়া, ভাবটা এমন, দেখো আমি কত্ত জানি । এসেই হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, ‘ ও বৌদি, তোমার কাজ শেষ হলো? আজ একটা দারুন গান শোনাবো তোমায়।’ বর্ণালী জামাকাপড় ভাঁজ করতে করতে বললো, ‘বেশ, শোনাও।’

গায়ে মেখে আলো প্রিয়া,
রামধনু হয়েছে দিয়া…
নরম নদী নীল সাগরে
বর্নেরা সব ঝরছে ঝরে…

— ‘ও বৌদি, কেমন বলো গানটা?ওই যে নিশীথ কুমার আছে না, নতুন উঠেছে ওর গাওয়া।’

— ‘হ্যাঁ, ভালো। বলছি চুমকি, আমার শরীরটা ঠিক ভালো লাগছে না। আমি একটু শুই?’ বর্ণালীর কথায় কিছুটা ক্ষুণ্ন চুমকি বেরিয়ে গেল, ‘আচ্ছা পরে আসব তবে বলে।’ প্রতিদিনের একঘন্টা তার নিজের। একলার। ব্লক করে দেওয়া নম্বরটা আনব্লক করে নিজেই ফোন করলো বর্ণালী।

ফোন রিসিভ করেই নিশীথ গেয়ে উঠলো, ‘ওগো প্রিয়া, আমার রামধনু কন্যে/ আজিও দেখো বসে আছি শুধু তোমারই জন্যে।’ বর্ণালী হঠাৎ ভীষণ জোরে কেঁদে উঠলো। অনেক্ষন একভাবে কাঁদলো অনেকদিনের পরে। হাসির সাথে সাথে কান্নাটাও যে অবলুপ্ত হয়ে গেছিল তার। নিশীথ চুপ করে ফোনের ওপ্রান্তে। কান্নার শেষে নিশীথ জিজ্ঞেস করলো, ‘তুই আমার রামধনু হবি?’ একটু চুপ থেকে ধরা গলায় বর্ণালী বলে, ‘ হুঁ।’

রাতে ডিনার সেরে অনিশ ঘুমিয়ে পড়া রিমোকে কোলে নিয়ে উপরে এনে শোওয়ায়, তারপর মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বর্ণালী সব কাজ সেরে এসে যখন শোয়, তখন অনিশ কখনো ঘুমিয়ে যায়, আর যেদিন শরীর খেতে ইচ্ছা হয়, সেদিন অপেক্ষা করে, বর্ণালী পিঠ পাতার সঙ্গে সঙ্গে খাবলে ধরে বাঘের মতন। — ‘কুহেলিকে বিয়ে করছো না কেন?’

চমকে ওঠে অনিশ। – ‘মানে, কুহেলিকে বিয়ে কেন করবো?ও আমার অফিসের স্টাফ, কেন এসব বলছো হঠাৎ আজ?’

— ‘না, এমনি। মনে হলো তাই।’ বর্ণালীর কথায় কাষ্ঠ হাসি হাসলো অনিশ, – ‘তোমার মনে হওয়াটা ভারী অদ্ভুত।’ বলেই ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে অনিশ।

দুপুরের এক ঘন্টা এখন বর্ণালী আর নিশীথের সময়। অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে দুজনের। নিশীথ নতুন কোনো গান বানালেই অপেক্ষা করে দুপুর সখির জন্য। তাকে শুনিয়ে তবে রেকর্ডিং। বর্ণালীও এখন ঘুম থেকে উঠে ভীষণ আনন্দ নিয়ে কাজ করে আর দুপুরের অপেক্ষা করে তার এক আকাশ গল্প রোজ রোজ কে ধৈর্য্য নিয়ে শুনবে, তা নইলে!

বর্ণালী ওঠে, শশুর শাশুড়িকে চা দেয়, স্বামী ছেলেকে ব্রেকফাস্ট টিফিন দেয়। স্কুল বাস আসে ঠিক 8.20 তে। তারপর ঘরে এসে রান্না, খেতে দেওয়া সমস্ত করে নিয়ে ছবি বুনতে শুরু করে, কথার ছবি। দুজনে মিলে গাঁথে মালা, আর হাসতে হাসতে মালা বদল করে রোজ।

কুড়ি বছর কেটে গেল এভাবেই। শশুর শাশুড়ি রাগ আর দেমাকি বৌমার জন্যই ছেলেকে হারানোর দায় চাপাতে চাপাতে নাতি আর তাদের বন্ধুদের কাঁধে চেপে ইলেকট্রিক চুল্লিতে পৌঁছে গেছেন। অনিশ কুহেলিকে নিয়ে পাকাপাকি চলে যাওয়ার আগে বর্ণালীকে চিঠিতে লিখে গিয়েছিল — ‘ বর্ণালী, আমি বরাবর চেয়েছিলাম উষ্ণতা, তপ্ত আগুন বুকে নিয়ে রাত কাটাতে, কিন্তু সংসারের ঘানি টানতে টানতে তুমি ঠান্ডা ঢোঁড়া হয়ে গেছ।। তাই উষ্ণতার খোঁজে চললাম। ডিভোর্স পেপারটা সই করে রেখে গেলাম, মনে হলে সই করে দিও। না করলেও ক্ষতি নেই, আমি আর ফিরব না। তোমার কথাই রাখছি, বুঝলে। কাল কুহেলিকে বিয়ে করছি।’ শশুর শাশুড়ি সেই অবধি বর্ণালীকে দোষ দেয়।

শাশুড়ি বলেন, ‘ কি মেয়েমানুষ, নিজের স্বামীকে বস করতে পারে না গো!’

অনেক কষ্টে কোম্পানির চাকরিটা জোগাড় করেছিল বর্ণালী। প্রায় প্রতিদিন শশুর শাশুড়ির কথা হজম করেও চলছিল রিমোকে উপযুক্ত মানুষ করে গড়ে তোলার চেষ্টা। আর নিশীথ রয়ে গেল, ওই ফোনের ওপ্রান্তে। রামধনুর অপেক্ষায়।

বর্ণালীর এখন শুধুই অবসর। ছেলে বলে দিয়েছে এখন থেকে তোমার বিশ্রামের সময়। কাজ করবো আমি। নিশীথও আর বিশেষ গান টান গায়না। এখন শুধু সুর দেয়, আর নতুন ছেলেদের দিয়ে গাওয়ায়। যা কখনো হয়নি, সেদিন দরজায় বেল শুনে দরজা খুলে অবাক বর্ণালী দেখে নিশীথ দাঁড়িয়ে। চোখ মুখ শুকনো, সেও বিস্মিত বর্ণালীর মতোই। বর্ণালী কিছু বলার আগেই হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলো রিমো– ‘এইযে শিল্পী নিশীথ কুমার, তুমি গাইয়ে বলে কি সাত খুন মাপ নাকি? জানো মা, এই শিল্পীর গাড়িতে আজ আমার বন্ধু পূজার একসিডেন্ট হয়েছে। ওর হাতে খুব পেন হচ্ছে। আবার ছুটে এসে আমার বাড়িতেই আশ্রয় নিতে এসেছে!’ উত্তেজিত রিমোকে শান্ত করতে বর্ণালী বলে, ‘রিমো, উনি তো ইচ্ছা করে এমন করেননি, একসিডেন্ট তো হঠাৎ ই হয় এভাবে। হ্যাঁ ওনার সাবধান হয়ে ড্রাইভ করা উচিত ছিল, আর পূজারও ঠিক করে রাস্তা পার হওয়া। আচ্ছা ঠিক আছে, এনাকে ছেড়ে এখন মেয়েটাকে দেখগে যা।’

— ‘মা তুমি এঁদের জানো না, পাবলিক ফিগার তো, তাই তার ফায়দা লোটে। সুন্দরী মেয়ে দেখলেই ছোঁক ছোঁক করে।’

রাগের চোটে অন্ধ হয় বর্ণালী, সজোরে এক চড় দেয় ছেলের গালে। ছেলের রাগের আগুনে পুড়ে ঘি– ‘মা, তুমি কেন এনার জন্য আমায় মারলে? তুমিও তারমানে এদের মতো, আমি এখন বুঝি বাবা কেন আমাদের সঙ্গে থাকেন না। নিশ্চই তুমি কিছু একটা করেছিলে তাই বাবা চলে গেছে। তোমার জন্য আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি। তুমি খুব খারাপ, খুব।’

অনেক ভেবে সারাজীবন যার জন্য নিজেকে ওই দুপুর এক ঘন্টায় আটকে রেখেছিল বর্ণালী, সেই ছেলেকে ছেড়ে চলে গেল তার নিশীথের কাছে। পাহাড়ের গায়ে ঝর্ণার পাশে কাঠ দিয়ে বানানো তাদের সুখের কুঁড়ে। বাইরে লতাপাতা দিয়ে লেখা রামধনু। ঝর্ণায় স্নান করে দুজনে একসাথে আর গান গায় রবীন্দ্রনাথে ডুব দিয়ে তুলে আনে ‘ ভালোবাসি, ভালোবাসি।’

সেবার নতুন পর্যটকদের নিয়ে এসেছিলেন গাইড, এক নতুন প্রকৃতির স্বাদ দিতে। সেই সময় নিশীথ আর বর্ণালী তখন দুজনে মিলে ছবি আঁকছে, নিশীথ আঁকছে রামধনু আর বর্ণালী জীবন, জীবনের ছবি। সে নিশীথ রিমো সুধা মাসি, তার বাবা মা সবাই একসাথে। বাইরে খুব হৈ হট্টগোল, কাঠের কুঁড়ের জানলা দিয়ে বর্ণালী দেখে দামি সাজ-পোশাকে অনিশ-কুহেলি-রিমো আর নতুন একজন। রিমোর বউ। পূজা বলেই ডাকলো বোধহয় রিমো। ঝর্ণার জলে নেমে এ ওকে জল ছুড়ছে, ও একে। তোলপাড় করে দিচ্ছে শান্ত ঝর্ণার বুক। কুহেলিকে মা মা ডেকে অস্থির ছেলে। রিমো তবে বাবা মা খুঁজে পেয়েছে। কত কষ্ট করেই সে তার গরিব মায়ের কাছে ছিল এতদিন। যাক ওরা ভালো আছে খুব। বর্ণালীর চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ার আগেই জলটা মুছিয়ে দেয় নিশীথ। তারপর বাইরের কোলাহল থেমে যায়, পাহাড় আবার শান্ত হয়। দোয়েলটা মিষ্টি সিস দিয়েই চলে। ঝর্ণাও গলা মেলায় তাতে। আর একটু পরেই নামে রাত। একমুঠো জোনাকি নিয়ে এসে নিশীথ বর্ণালীর কোঁচড়ে দেয় ছেড়ে, তারপর গেয়ে ওঠে– ‘

‘গায়ে মেখে আলো প্রিয়া,
রামধনু হয়েছে দিয়া…’

সুজান মিঠি (ছদ্মনাম)। আসল নাম সুজাতা মিশ্র। ছদ্মনাম সুজান মিঠি; এই নাম আসলে কয়েক জন বন্ধুদের দেয়া। বাবা-মায়ের দেয়া নাম সুজাতা মিশ্র। মা মিঠু মিশ্র ও বাবা কাশিনাথ মিশ্র। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোনো’ পরিবারে জন্ম সুজাতা মিশ্রের ইং ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..