রিতা’র জীবনবোধের কবিতা

এইচ বি রিতা
কবিতা
Bengali
রিতা’র জীবনবোধের কবিতা

ওয়েস্টার্ন-কোটটি বিক্রির জন্য

অগোছালো ওয়েস্টার্ন-কোট পরা নারীটি
বসে আছে একা
মেইনস্ট্রিটের শীতল আবহাওয়া তখন
ঝাপসা করে যাচ্ছে ম্যাকডোনাল্ডের কাঁচদেয়াল।

টেবিলগুলোতে ফ্রাইস, বার্গার
সাথে মানুষ ও শ্যানেলের তীব্র গন্ধ।

ছেলে ঘরে অপেক্ষায়
বলেছে তাকে, ক্যারামেল পিক্যান চিজকেইক!
ইয়াম্মি ডিনার!
বন্ধুরা বলেছে দেখা হবে আজ; রাত বারোটায়।

মে’র শেষে বৃষ্টির ঘ্রাণে
উন্মাতাল হতো যে বাদামি চোখ
আজ তাঁর চোখে বিস্ময় ভরা শূন্যতা।

হৃদয় তাঁর অনুভব করে তীব্র বিষ
নীল রঙ গাল বেয়ে ছুটে আসে বুক বরাবর
পিতার দেয়া একুশ বছর পুরানো ওয়েস্টার্ন-কোটটি
ছুঁয়ে দেখে একবার
নাহ! বোতামগুলোও ঠিকঠাক আছে
রঙটাও বেশ।

শৈশব ছেড়ে কৈশোরে স্বাগতম তোমায়
আজ ডিনার হবে! সব হবে!
বলো তাদের; দেখা হবে রাত বারোটায়।

 

খসে পড়া তারার খোঁজে

অঙ্কুরোদগমের আগেই নিজ হাতে পোঁতা বীজটা,
মরে গেল
সেই থেকে লোকটার ভীষণ জ্বর
চাদরে মোড়ানো ক্লান্ত শরীর রাতভর জেগে থাকে
রাতের আকাশে তারাদের গুঞ্জনে খুঁজে ফিরে;
খসে পড়া তারা
আহত মগজে বৈদ্যুতিক সংকেতের ব্যাঘাত ঘটলে,
লোকটা উম্মাদ হয়ে পড়ে।
অন্যরা তাকে বলে প্রেমিক
আমি বলি, হৃদয়ভাঙা এক শূন্যমানুষ।

 

মানুষ ও পশু কাছাকাছি

রাত বারোটা।
শীতের প্রকোপে গাছের পাতারা সবুজ ছেড়ে হলদে
সদ্যফোটা ফুলটি একা, জড়সড়ো
শহরের আঁধারে বাতিগুলো জ্বলজ্বলে
যেন ক্রিসমাস স্পেক্টাকিউলার
আঁধারের নগরী পাহারায় কুকুরটি
ঘেউ ঘেউ করে যায় অবিরাম
ক্ষুধার্ত চোখে রাহুল আর কুকুর;
একে অপরকে শুঁকে নেয়।

অদূরে পড়ে থাকে একটি পোটলা
কানামাছিতে মাছির দল
সমাধিকারে মানুষ আর পশু কাড়াকাড়ি;
বড্ড বাড়াবাড়ি
নির্জীব মানুষ পশুর বুকের কাছাকাছি।

কতক মানুষের হাতে স্যামসাং-টুয়েল্ভ প্রো
লজ্জাহীন জাতি; সেলফি আহ্লাদী
কেউ জানে না আঁধারের গল্প
ক্রমেই গাঢ় হয় পৃথিবীর অন্ধকার
উবে যায় মানুষের শরীরে মাটির গন্ধ।

নক্ষত্রোজ্জ্বল চোখে
রক্ত ঢেউ
যন্ত্রণায় বিদীর্ণ চাঁদ
প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় বুর্জোয়া তালুকে
নির্লিপ্ততায় রাহুল, পাশে কুকুরটি
লোলুপ দৃষ্টিবর্ষণে অযাচিতবিলাপ;
প্রতিধ্বনিতে আছড়ে পড়ে বিশ্বমানবতার দেয়ালে।

কুকুরটি তখনো ঘেউ ঘেউ ডেকে বলে;
মানবতা লঙ্ঘনের গল্প তবে শেষ হোক।

 

জ্বর নেমেছে

পুড়ে যায় শরীর তার
জ্বর নেমেছে গা’য়ে, ভীষণ জ্বর।

সূর্য ছুঁয়ে গেছে মধ্য-আকাশ
কুয়াশায় ঢেকেছে মন
কাঁপুনি উঠে তাই শীতল প্রবাহে
বুজে আসে গোল গোল চোখ-

জ্বর নেমেছে গা’য়ে তার; ভীষণ জ্বর।

বুকে কাঁপন পুরাতন অভ্যাসে
বিড়ালছানা মিউমিউ ডাকে
বোধ খোয়া যায় মমতার কাছে
ভীত মন তারে কোথায় রাখে-

জ্বর নেমেছে গা’য়ে তার; ভীষণ জ্বর।

 

বদলে যাওয়া সকাল

ধরুন, ঘুম ভেঙ্গে চোখ খুলতেই
সবকিছু কেমন অদ্ভূত দেখতে পেলেন।
সামনে কোন আকার, আকৃতি বা রঙ নেই
অনেকটা কুয়াশায় মোড়ানো সাদা-কালো;
দেয়ালের মত
কিংবা বলা যায়,
বিভ্রম বা ধাঁধার মতো লাগছে সব
কিছুটা আলোর ঝলক এর মত দেখতে
মাঝেমধ্যে পরিচিত আরো কিছু রঙ ফুটে উঠছে
ধরুন আপনি,
প্রিয় উপন্যাসটি খুঁজছেন, সাথে সহায়ক চশমাটি
কিন্তু কিছুই খুঁজে পেলেন না
গতরাতে কফির কাপটি কোথায় রেখে ঘুমিয়েছিলেন,
তাও বুঝতে পারছেন না
আপনি চোখ দুটো বার বার ডলা মোচরা করছেন
কাজ হচ্ছে না
চোখ দুটো স্বচ্ছ জলে ধুয়ে নিবেন, তাও পারছেন না
ধরুন,
চার্লস বনেট সিনড্রোম আপনাকে পেয়ে বসেছে!
আপনার কাছে তখন;
আজকের সকালটির মানে কী হবে?

 

যদি তোমাকে সব সত্য বলে দিই

যদি আমার সকল অক্ষমতাগুলো আজ তোমাকে বলে দিই
এই যেমন,
আমার ধৈর্যহীন দিনগুলোতে ক্লান্তিময় রাত
ক্ষয়ে যাওয়া দুর্বল হাড়ে অচল ঝুলন্ত শরীর
অসহনশীল আচরণে হুটহাট রেগে যাওয়া
অকারণে চিৎকার
তারপর কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়া!
যদি এই সব ব্যথাময় আচরণগুলো
আজ তোমাকে বলে দিই
যদি বলে দিই সবকিছু যা ছিল আড়ালে লুকানো
এমনকী ওষধের বাক্সটা যদি ছুঁড়ে ফেলি তোমার মুখে
এবং রক্ত গড়িয়ে পড়ে তোমার ঠোঁট বেয়ে বুকে;
তখনো কি তুমি আমায় ভালোবাসার গান শোনাবে?
যদি শৈশবের গোপন স্পর্শের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা
তোমাকে আজ বলে দিই
যদি বলে দিই কৈশোরের বেপরোয়া ভাবনায় প্রেমে পড়া
বয়সের দাবিতে তারুণ্যের অনৈতিক উন্মাদনায়;
নগ্ন হবার কথা;
তখনো কি তুমি আমায় ভালোবাসার গান শুনাবে?

 

ভিতরের তোলপাড়

তুমি যখন পতিতাদের নষ্ট বলো
আমার ভাবনায় তখন আসে, পতিতাদের পুনর্বাসন
চিত্রকল্পে নিজস্ব ঢং নিয়ে রচনা করি
অতীত ও ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন।
নিমজ্জিত ভাবনায় নিজ দর্শনে বুঝে নিই;
ভিতরের তোলপাড় তোমার-আমার সবার।

পীড়ন সহ্য করে পীড়িত হই
শৈশবের তুমুল ঝড়ে খড়কুটোদের খতিয়ে দেখে;
আরাধ্য শব্দে রচনা করি কিছু একটা।

তুমি তাকে কবিতা বলো
কিংবা ছাইপাশ
কী আসে যায় তাতে?

 

অতৃপ্ত ক্ষুধা

ফ্লাশিং এর রাস্তায় গৃহহীন লোকটা শুয়ে ছিল
আমি তখন রোদের প্রকট তাপে বাজারের পিছে ছুঁটছিলাম
গৃহহীন লোকটাকে দেখেই মনে হল,
তার খাদ্য প্রয়োজন
বললাম, উঠে বসো!
তোমাকে আমি খাবার এনে দেই
শান্ত চোখে লোকটা উঠে বসলো,
তারপর বলল, আমাকে কেন খাবার এনে দিবে?
বললাম, তোমার নিশ্চয়ই ক্ষুধা লেগেছে
সে বলল, আমি তোমাকে বলিনি সে কথা!

সাইডওয়াকে পড়ে থাকা লোকের ভাবগাম্ভীর্যতা দেখে
আমি অবাক হলাম।
বললাম, তুমি ক্ষুধার্ত।
লোকটা হাসি মুখে তার হাত উচিয়ে আমাকে বিদায় জানালো
আমি কিছুটা তিক্ততা নিয়ে যেই ঘুরে দাঁড়ালাম,
সে আমাকে ডাকতে শুরু করলো,
যেই ইয়ং ল্যাডি! হেই ল্যাডি!

আবারো অবাক হলাম,
ফিরে তাকাতেই সে বলল,
আমার ক্ষুধা মেটাবার সাধ্য নেই তোমার
তুমি যেতে পারো!
আমি শুধু তাকিয়েই থাকলাম! এরপর চলে এলাম
সেই থেকে আজবধি আমি কেবল;
তার ক্ষুধার পরিমাণ নিয়ে ভাবছি।

এইচ বি রিতা। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায়। বর্তমান নিবাস কুইন্স, নিউইয়র্ক। তিনি নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুল শিক্ষকতায় জড়িত রয়েছেন দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে। পাশাপাশি কাজ করছেন দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা ভার্সনে। এছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

ফেরা

ফেরা

ফেরা অনেক দিন আসিনি তোমার চোখের কোণে, বুকের পাশে, নিঃশ্বাসের চারপাশে। ভেবো না আমি পথ…..