রিনাদের বাড়ি

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী
গল্প, পডকাস্ট
Bengali
রিনাদের বাড়ি

যে জায়গাটাতে বসে কাগজ পড়ছিল অরণি, সেটা যে বেশ্যাদের এক আবাসস্থল—সেটা তার জানার কথা নয়। সে কোনদিন বেশ্যাপাড়াতে যায়নি। ওই পাড়া নিয়ে তার যা জ্ঞান তা ছবি দেখে। এছাড়া যখন সে বড় শহরে গেছে, দেখেছে তার বাস চলে যাচ্ছে মেয়েরা নানা সাজে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই বাড়িটিকে দেখে সে কেন, অচেনা কারও পক্ষে ধারণা করা সম্ভব নয় যে এটি একটি বেশ্যাবাড়ি।

এবার বাড়িটি সম্পর্কে কিছু কথা বলা বা বর্ণনা দেওয়ার প্রয়োজন।

বাড়িটি অত্যন্ত পুরানো দিনের। কিন্তু তাই বলে ভাঙা ঝুরঝুরে নয়। এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায়, বেশ যত্ন আত্তি করা হয়। তাই পুরানো হলেও বাড়িটি বেশ গায়ে গতরে। একটা চটক আছে। বাড়ির মধ্যে একটা বনেদিয়ানার ভাব লক্ষ করা যায়। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে কোন সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়ি। অরণি এমনটাই ভেবেছিল।

বাইরে একটা রক আছে। কিন্তু সেটার চটা উঠে গেছে। তবে পরিস্কার। ধুলোময়লা কিছু জমা নেই। দুটি কুকুর চুপ করে শুয়ে আছে সেখানে। তার বাইরেও অনেকটা জায়গা পড়ে আছে। সেখানে বসেই কাগজটা পরে নিত পারত অরণি। কিন্তু তার সেই ইচ্ছেটা হল না। সে ঢুকে পড়ল বাড়ির ভেতর। বাড়ির মূল গেটে কোন দরজা নেই যে আগল দিয়ে রাখবে। ফ্রেম আছে, কিন্তু পাল্লা নেই। ভেতরে অনেক রোদ।   অরণি ঢুকেই সামনেই আবার একটা লাল রক পেল। আর সেখানে বসেই সে খবরের কাগজটা পড়তে শুরু করে দিল। বড় করে হেডিং, এক সাংবাদিক মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশে খুন হয়েছেন। সেটা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নানা ধরণের চাপানউতোর শুরু হয়েছে। অরণি খুব মন দিয়ে সেই খবরটা পড়তে লাগল।

গল্পটির অডিও পাঠ শুনুন এইখানে-

এবার অরণি বিষয়ে কিছু কথা বলার সময় হয়েছে। সে কে এবং এখানে সে কী করছে।

অরণি ফিরছিল এক বাসে। বাসটা যে বাজারের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল, সেটা ওর চেনা। অরণির যেখানে বাড়ি, সেখান থেকে পাঁচ কিমি দূরে অবস্থিত এই গ্রাম্য বাজার। জায়গাটার নাম চন্ডীতলা। প্রায় রাস্তার উপরেই সকলে পসরা সাজিয়ে বসেছে। লোকজন রাস্তার উপর খুব ছুটোছুটি করছে। বাসকে যেতে হচ্ছে তাদের সামলে। ফলে বাসের গতি কম।

 বাস ফাঁকা। হ্যাঁ, এদিকের বাস ফাঁকাই যায়, এখন টোটোর জ্বালায় বাসের কারবার প্রায় উঠে যেতে বসেছে। এই তো শ্রীরামপুর থেকে তিন নম্বর বাস প্রায় উঠেই গেল। এই সেদিন এক বাস মালিক তো টোটোওয়ালাদের বাপবাপান্ত করছিল। সঙ্গে পাবলিকেরও। লোকে বেশি ভাড়া দিয়ে টোটো চাপে, অনেক জায়গায় টোটোর জন্য লাইন পড়ে কিন্তু কেউ  বাসে উঠতে চায় না।

যাইহোক, সেটা আলাদা প্রসঙ্গ। ছাব্বিশ নম্বর বাসের কন্ডাক্টর যখন তার কাছে ভাড়া চাইল, অরণি দেখল তার পকেট ফাঁকা। মানিব্যাগ নিয়ে সে কি বেরোয়নি, নাকি কেউ মেরে দিল—সে কিছুই বুঝতে পারল না। বাসে আসবার সময় সে কোনও ভিড় অনুভব করেনি, উঠেই জায়গা পেয়ে গেছে।  তাহলে গোলমালটা হল কোথায়?

বাস তাকে নামিয়ে দিয়ে বাজারের ভিড় ডজ করতে করতে এগিয়ে যেতে লাগল সামনে। কিছুক্ষণ ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থেকে সামনের লাল রাস্তাটা দিয়ে সে হাঁটতে শুরু করল।

চন্ডীতলা সে ভাল করেই চেনে।  কিন্তু যে রাস্তাটা দিয়ে সে হাঁটছিল সেটা প্রথম দিকে চেনা থাকলেও পরে পরে অচেনা হয়ে উঠতে থাকে।  এদিকের গাছগুলো কিন্তু একই রকম আছে। তার মনে পড়ল যখন টোটো ছিল না, তখন সাইকেলে লোকে যাতায়াত করত। সাইকেল চালালে হার্ট ভাল থাকে বলে একটা প্রবাদ আছে। এখন আর সেই প্রবাদের কথা শোনা যায় না লোকজনের মুখে।

চিত্র: রিয়া দাস

এই রাস্তাতে আগেও এসেছে। অরণি যখন কলেজে পড়ত, একটি মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমের কথা নানাদিকে শোনা যেত। মেয়েটির নাম ছিল রিনা। কলেজ শেষ হবার কয়েকমাস আগেই মেয়েটির সঙ্গে তার সম্পর্ক ভেঙে যায়। সেটা ঠিক কী কারণে, আজ আর মনে পড়ে না অরণির। মেয়েটিকেই ভুলে গেছিল সে। মনে পড়াল এই রাস্তাটাই। নেমেই যখন পড়ল, দেখা যাক না—মেয়েটির বাড়িটিকে সে চিনতে পারে কিনা।

রাস্তা এক থাকে, গাছপালা বদলে যায়। বদলে যায় বাড়িঘর। তবে কি সে একই রকম দেখতে এক রাস্তায় চলে এল?

অরণি বাড়িটার ভেতর অবাধে প্রবেশ করে সাংবাদিক হত্যার খবর পড়ছে। আর মাঝে মাঝে মুখ তুলে তাকাচ্ছে। দেখছে বাড়িটির অবস্থান। উঠোনের সামনেই খাটো ঝুলের ফ্রক পরা একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বয়স আন্দাজ বারো হবে। তবে তার চাহনি, চোখ মুখ ও শরীরের গঠন বলে দিচ্ছে সে খুব বোঝদার। তার পিছনের উঠোন উঁচুনিচু, সেখানে কিছুকিছু জায়গায় পাতলা হয়ে দূর্বাঘাস বেড়ে উঠেছে। উঠোনটা যেখানে শেষ হচ্ছে সেখানেও এমনি একটা পুরাতন লাল বাড়ি আছে। তবে তার বিস্তার কম। নিচু রক ও একটি, না দুটি ঘর আছে সেখানে। ঘরগুলি প্রমাণ মাপের। সেই ঘর আছে একটি আমগাছের ছায়ার নিচে। গাছ শুয়ে পড়েছে একতলা সেই ছাদের উপর। সে ছায়া রাতেও সমান কার্যকারী তা ঘরের সামনের মাটির রূপ ও ঘাসেদের বিস্তার ও রঙ দেখলে বোঝা যায়। রিনাদের বাড়ি কয়েকবার সে এসেছে। তখন কি এই তিনমহলা বাড়িটি ছিল?

মনে পড়ল না অরণির। রিনার কথাই তার আর মনে পরে না। এ জন্য যে সে কোন বেদনা বোধ করে তা নয়। এই যে তার মনে পড়ল, তার মনের ভেতর কোন প্রতিক্রিয়া হল না। কেবল মনে হল, পথ ভুলে সে যখন এখানে এসেই পড়ল, একবার গেলে হয় না রিনাদের বাড়ি?  রিনা কি এখন তাকে চিনবে? না চেনাই স্বাভাবিক। আর চিনলেও গুরুত্ব দেবার কিছু নেই। সব ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে।

তাছাড়া সে কি এখনও আছে নাকি। কবেই বিয়ে হয়ে গেছে তার। ছেলেপুলে হয়েছে, তাদের হয়ত এখন সে ইস্কুলে পাঠায়। তাছাড়া সে কি এখনও নিজের বাড়িতে পড়ে আছে নাকি?

তবে একটা কাজ করা যেতে পারে। একবার ওর বাড়িটাকে দেখে নেওয়া যেতে পারে বাইরে থেকে। তারপর সে ফিরবে। আর হ্যাঁ, এদিকে সে কোথায় যাচ্ছিল—কিছুই মনে পড়ল না না। কিন্তু ফেরাটা তার জীবনে সত্যি হবে।

এই ভেবে সে মনে করল মেয়েটিকে ডাকে। ডেকে রিনাদের বাড়ির হদিশ নেয়। এতটুকু মেয়ে কি রিনাদের বাড়ি চিনবে?

এইভেবে সে আবার কাগজ থেকে মুখ তুলে তাকাল সামনের দিকে।  উঠোনের ওদিকের বাড়িটা থেকে মৃদু একটা সংগীত ভেসে আসছে।  কেউ কি গান করছে না রেডিও? অথবা মোবাইলে হচ্ছে?  আর হ্যাঁ, সে এও খেয়াল করছে, মেয়েটা কিন্তু একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে; আর তাকে দেখছে। ওদিকের বাড়িতে দুটি বড় মেয়ে ছাপা শাড়ি পরে ঘরবার করছে। এই দুই বাড়ি মুখোমুখি হলেও ওদের এক ধারে পরপর ছোট ছোট ঘর আছে। সেগুলি পাঁচ ইঞ্চির গাঁথুনি ও রক বলে কিছু নেই। পাতলা ছাদ। দেখে মনে হয় এই বাড়ির সঙ্গে ওগুলি পরে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানেও কিছু মেয়ে ঘরবার করছে। এই বাড়িতে কোন পুরুষমানুষ নেই। আর সে যে কাগজ পড়ছে বসে, তাতে কারও কোন হেলদোল নেই। অরণি এবার একটু অবাক হল বৈকি।

এই সময় সেই বাড়িতে  একজন পুরুষ ও পিছুপিছু একজন নারী ঢুকল। লোকটা সাধারন জামাপ্যান্ট পরেছে আর বউটির পরনে সস্তা তাঁত, কিন্তু পরিপাটি করে পরেছে। লোকটা বেশ লম্বা আর ঢ্যাঙা, মাথার সামনে কিছুটা টাক। বউটির সাধারণ উচ্চতা, শ্যামলা রঙ ও বয়সে অনেকটা ছোট লোকটার থেকে। এরা কারা? অরণি কাগজ থেকে মুখ তুলে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটা তখন কোমর থেকে হাত নামিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। বলল, কী চাই?

লোকটা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বউটা বলল, এ আমার সঙ্গে এসেছে। এ একটা ঘরে ঢুকতে চায়।

মেয়েটি বেশ দাপটের সঙ্গে বলল, তা কী করে হবে? ওই কাকুটা আগে এসেছে। কাগজটা পড়া হয়ে গেলে আমার সঙ্গে কথা বলবে। তাই আমি কাকুর সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। কারণ আমি খদ্দের হাতছাড়া করতে চাই না।

তখন অরণি বুঝল সে একটি গোলমেলে জায়গায় এসে পড়েছে। সে রক থেকে লাফ দিয়ে নামল। হাতের কাগজ ভাঁজ করেনি। এক হাতে মুঠো করে ধরেছে। বলল, এই কীসের কথা হচ্ছে রে?

মেয়েটি মুখ ভেঙিয়ে বললে, ন্যাকা, যেন জানে না।

আরে বল না।

ঘর খালি হলে তুমি আমার সাথে যাবে?

তার মানে?

ঐ ছোট ঘরের রেট কম, আর পাকা ঘরের বেশি। পাকা ঘরের মালিক আলাদা। ওরা নিজেদের মর্জিমত চলে। ওই আমডালের ঘরে গেলে বেশি পড়বে।

আমি যাব এটা তুই ভেবে নিলি কেন?

কারণ তুমি লাইন দিয়েছ।

কীসের লাইন? এখানে তো কোন লাইন নেই।

কে বলেছে নেই? বেশ্যাবাড়ি যে যেখানে বসে সেখান থেকেই সে লাইন শুরু হয়ে যায়। তোমার পরে ওই টাক ঢুকবে।

টাককে নিয়ে তুই ঢুকে যা। আমি নেই।

তবে কী মারাতে এতক্ষণ এখানে ঢুকলে? এটা কি খবরের কাগজ পড়ার জায়গা।

বাইরে তো কোন সাইনবোর্ড দেওয়া নেই। বুঝব কীকরে?

এটা তো আর বিদেশ নয়, সাইনবোর্ড ঝোলাব। এদেশে আগে আইন হোক, তখন সাইনবোর্ড দেখবে। নাও, এখন ফোটো।

বেশি ঝামেলা না করে উঠে পড়ল অরণি। হাতের কাগজটা গুছনো হয়নি। না হোক, অসুবিধে হয়নি। কারণ পুরোটা এখনও সে পড়ে উঠতে পাড়েনি। সেই সাংবাদিক হত্যার খবরেই আটকে আছে। বাকিটা পড়ে নিতে হবে। সেটার জন্য কোথাও বসতে হবে। কারণ খবরটা গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটা পড়তে গেলে হট্টগোলের ভেতর হবে না।

একটা ঢালু রাস্তা দিয়ে এসে যেখানে থামল অরণি, সেটা একটু নির্জন। গাছপালার ভেতর টানা লম্বা একটা বাড়ি; পাঁচ ইঞ্চির গাথুনি ও মাথায় লাল টালি চাপান। দেখে মনে হল সেটা একটা ইস্কুলবাড়ি। বন্ধ। কিন্তু বাইরে থেকে ভাল করে চোখ বুলিয়ে বুঝল, সেখান পড়াশুনো হয়। কারণ দেওয়ালে চট-পেনশিলের দাগ। নানা ছবি আঁকা। মনে হল শিশুশিক্ষা কেন্দ্র। তার মনে হল সাংবাদিক হত্যার খবরটা পড়ার জন্য এই জায়গাই বেস্ট।

লম্বা বারান্দায় পছন্দ মত একটা জায়গা বেছে নিয়ে সেখানে ফুঁ দিয়ে বসে পড়ল। তখন কে একজন তার পাশে বসল। মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে, সেই বউটা। সাধারণ বাঙালি মেয়ের মত উচ্চতা। পাতলা ঠোঁট। তার চেহারায় আলগা একটা চটক আছে; যা দেখে যৌন উদ্দীপনা কিছুটা হলেও জাগতে পারে।

তাকে দেখে একটু অবাক হল অরণি, বলল, আপনি?

বউটি বসে বসেই সামনের দিকে একটু ঝুঁকে এল। বলল, আপনি এলেন, তাই চলে এলাম।

আর আপনার সঙ্গে যে ছিল?

ওকে মেয়েটির ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছি।

আপনাদের ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না।

তেমন কিছু নয়। আমরা স্বামী-স্ত্রী নই।

তবে?

আমি একজন বিধবা।

কিন্তু আপনার কপাল দেখে সেটা বোঝা যাচ্ছে না।

হ্যাঁ, আমি সিঁদুর পরি।

কিছুই বুঝছি না।

আসলে আমরা বিয়ে করব—কিন্তু আটকে যাচ্ছে।

কেন? সেই কবে, ব্রিটিশ আমলেই এর আইন পাশ হয়ে গেছে।

সেটা নয়।

তবে?

আসলে ও ওখানে ঢুকতে চাইছিল না। আমিই জোর করে—।

ওই বাচ্চাটার সঙ্গে করবে?

না না। ওখানে অনেক বড় মেয়ে থাকে।

অর যদি কোন যৌনরোগ হয়?

হবে না। এখন সবাই কন্ডোম পরে।

ও যদি না পরে?

পরবে।

একটা হিসেব আমি মেলাতে পারছি না, আপনাকে আমার ভীষণ চেনা লাগছে।

সেটাই স্বাভাবিক।

কেন?

কারণ আমিও আপনাকে চিনি।

হ্যাঁ, সেটাই জানতে চাইছি।

একটা সময় অফিসের কাজের সূত্রে আমি আপনার কাছে যেতাম।

আপনি মনে রেখেছেন, আমি কেন ভুলে গেলাম?

কারণ আপনি প্রাক্তনদের কথা মনে রাখেন না।

অরণি আবার উঠে পড়ল। সাংবাদিক হত্যার রহস্য এই শুরুতেই শেষ হবে না, বোঝা যাচ্ছে। কত দেশেই তো সাংবাদিক হত্যা হয়। কিন্তু এই ব্যাপারটা অন্যরকম। এর জল অনেকদূর গড়াবে। আর এটা যেন টানটান রহস্যের মত। ক্রাইম থিলার।

সেখান থেকে উথে পড়ল অরণি। কিছুতেই খবরটা শেষ করা যাচ্ছে না। খবরটা নদির মত চলেই যাচ্ছে চলেই যাচ্ছে। কাগজটা যেমন সে গুছিয়ে নিতে পারছে না, তেমনই খবরটিও তার পিছুপিছু চলে আসছে।

এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে একটা বাড়ির সামনে এসে থেকে গেল অরণি। রাস্তাটা ইট বাঁধান। কিন্তু শ্যাওলা জমে আছে। গাছেরা নিচু ও সরু সেই রাস্তার উপর ঝুঁকে পড়েছে। তার গায়ে একটা বাড়ি। এই বাড়িটাই না? এটা যদি না হয়, রিনাদের বাড়ি তবে কোনটা ছিল?

একটা লোক যাচ্ছিল। টাকে ডেকে অরণি জানতে চায়, রিনাদের বাড়ি এদিকে কোথায়?

আপনি কে?

মানে?

আপনার পরিচয় কী?

আমি একজন সাধারণ নাগরিক।

তাহলে একথা জিজ্ঞাসা করছেন কেন?

মানে?

সাধারণ নাগরিক সাধারণ ভাবে বেঁচে থাকে। তার নিজের কোন ব্যক্তিত্ব থাকে না, থাকতে নেই। সাংবাদিকের মত অত কৌতূহল কেন আপনার?

অরণি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এই জায়গা সে চিনতে পারছে না। কতবার এসেছে এখানে। দূর থেকে দেখে চলে গেছে রিনাদের বাড়ি। তবে কি আগের লাল বাড়িটিই রিনাদের বাড়ি ছিল? তারা কি বাড়ি বেচে দিয়ে সরে পড়েছে আর সেখানে খুলেছে বেশ্যালয়? নাকি ইস্কুলবাড়িটিই ছিল তাদের। সেখানে এখন পাঠ চলে?

এখান থেকে বেরুতে হবে। কিন্তু সে পথ ঠিক করতে পারছে না। ইটের রাস্তাগুলো সব চলতে শুরু করেছে। গলিগুলি এঁকেবেঁকে যাচ্ছে। গাছপালাগুলি ঘুরে যাচ্ছে ও বাড়িগুলি ক্রমাগ্রত নিজেদের মধ্যে স্থান পরিবর্তন করছে। সে এখন কোনদিকে যাবে?

সে যখন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, দেখল বাস কন্ডাক্টর তার দিকে ‘ও দাদা খুচরো হল, ভাড়াটা দিয়ে যান’ বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে আসছে।  খবরের কাগজটা গুছিয়ে নিয়ে অরণি দ্রুত মোবাইল খুলল। ক্যামেরা অন করে ফেসবুকের সঙ্গে যোগ করে দিল।

অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী। গল্পকার। লেখকের দেশ-ভারতবর্ষ। জন্ম ১৯৭৬ সালে, ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি জেলার ছোটচৌঘরা গ্রামে। পড়াশুনো- বাংলা সাহিত্যে এম এ। জীবিকা- চাকুরি। প্রকাশিত বই- একটি। 'মশাট ইস্টিশনের মার্টিন রেল' (১৫টি গল্পের একটি সংকলন)।  প্রকাশিত গল্পের সংখ্যা দুইশত। পশ্চিমবঙ্গের নানা পত্র পত্রিকায়...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..