রুপালী পর্দার সিনেমা এবং দর্শক যখন আমি

আজমত রানা
চলচ্চিত্র, নন ফিকশন, প্রলাপ
Bengali
রুপালী পর্দার সিনেমা এবং দর্শক যখন আমি

সিনেমা নিয়ে কারা লিখেন; যারা সিনেমা বানান, সিনেমা নিয়ে গবেষণা করেন, সিনেমায় অভিনয় করেন, সিনেমার খবর নিয়ে সাংবাদিকতা করেন, সিনেমায় অর্থলগ্নি করেন অথবা সিনেমা নিয়ে লেখাপড়া করছেন। আর এ সবগুলোর নড়ি বাঁধা আছে সিনেমার দর্শকের সাথে। দর্শক নেই তো সিনেমা নেই। তো সেই দর্শক কি সিনেমা নিয়ে কিছু লিখবে না? তাদেরইতো সবচে বেশি লেখা দরকার। এসব আমার এলোমেলো ভাবনা।

আমাদের মফঃস্বল শহরের একমাত্র সিনেমাহল ‘বলাকা টকিজ(ষাটের দশকে এটা জর্জ কার্ণেশন ড্রামেটিক ক্লাব নাম ধারণ করে যাত্রা শুরু করে। সত্তুরের দশকে নাম পাল্টে নাট্য সমিতি হল করা হয়। একইসময়ে এ হলটিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও নাট্য প্রযোজনা চলতে থাকে। কখনও নাটক বন্ধ করে সিনেমা আবার কখনও সিনেমা বন্ধ করে নাটক। সময়ের বিবর্তনে একসময়ে নাটক বন্ধ হয়ে সিনেমা প্রদর্শন নিয়মিত করা হয়। নাট্য সমিতি হল হয়ে যায় বলাকা টকিজ। শহরে ‘বলাকা‘ নামে একটি আধুনিক সিনেমা হল তৈরি হলে বলাকা টকিজের মৃত্যু ঘটে। বর্তমানে এটি ধংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। আমাদের শহরের সংস্কৃতি চর্চ্চার সূতিকাগার এবং অনেক ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষি ছিল এ হলটি) এ কালো কাপড়ের পর্দায় ঢাকা লেডিস গেট দিয়ে প্রবেশ করে মায়ের আঁচলের তলায় বসে প্রথম মানুষের জীবন সাদা পর্দায় দেখে আমার বিস্ময়ের সীমা ছিল না। দিনের পর দিন প্রতিক্ষার প্রহর গুনেছি কখন মা আবার বলাকা টকিজে যাবেন। বাবার বদলীর চাকরী, এ বছর এখানে তো আরেক বছর অন্য কোথাও। এভাবেই আমি যখন অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তখন বাবা বদলী হলেন সৈয়দপুরে। আমরা যেখানে থাকতাম কিছুটা গ্রামের দিকে। আমার স্কুল ছিল শহরে। যাওয়াআসায় প্রায় বার কিলোমিটার পথে পা দুটোই ছিল একমাত্র ভরসা। এ পথের ধারেই ছিল দুটি সিনেমা হল একটির নাম লিবার্টি অন্যটি বিজলী

বরাবরই লেখাপড়ায় অমনযোগী ছাত্র হওয়া সত্বেও এখানে স্কুল যাতায়তে আমি ভীষণ মনোযোগী হয়ে পড়লাম। কারণ একটাই, তা হলো স্কুল যাওয়ার পথের ধারে সিনেমা হল দুটো। যাওয়ার পথে একবার আসার পথে একবার পোস্টার আর স্থির চিত্রগুলো দেখতাম। আমার সকল সাধ, সাধ্য, কামনা বাসনা, অই এক বিন্দুতেই যেয়ে মিলিত হয়েছে। আমরা যখন ছাত্র তখন প্রায় প্রতিটি সিনেমা হলেই মর্নিং শো নামের একটা শো হতো। এটা সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে বারোটার মধ্যেই শেষ হয়ে যেত। আমরা যারা স্কুল ফাকি দিয়ে সিনেমা দেখতে অধিকতর আগ্রহী তাদের কথা বিবেচনায় রেখেই বোধ হয় কর্তৃপক্ষ এই শো টির ব্যবস্থা করেছিলেন। তো আমরা সপ্তাহে একবারতো বটেই কোন বন্ধু টিকিটের পয়সা দিলে একাধিক বারও হলে ঢু মারতে কোন আপত্তি ছিল না। এর পরেই রয়েছে আত্মীয় স্বজন এলে সিনেমা দেখার পালা। সেক্ষেত্রে আগন্তক মেহমানই সিনেমা দেখার উৎসবের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে থাকেন। সিনেমা দেখতে দেখতে বাদাম চিবানো এবং সিনেমা দেখার পর বাড়ি ফিরে বন্ধুদের সাথে সে সিনেমার গল্প বলাটা একটি আবশ্যিক বিষয় ছিল। আমাদের মধ্যে আবার যারা একটু বেশি পাকনা তারা মিনেমা দেখা শেষ হলেই বাইরে এসে একটা গানের বই (তখন যে সিনেমা প্রদর্শিত হতো তার গানের লিরিকসগুলো চটি বই আকারে বিক্রি হতো) কিনে নিয়ে বাড়িতে ফিরতো আর পুরো সপ্তাহ জুড়ে খালি গলায় সুর তোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হতো।

আমাদের সিনেমা দেখায় কোন বাছ বিচার ছিল না। সিনেমা হলে ঢোকাই ছিল ব্যাপার। সিনেমা দেখতাম মুলতঃ মারদাঙ্গা টাইপের। রাজরানী, বাহাদুর, রংবাজ, সেতু, নিশান, জারকা, এমন সব সিনেমা আমাদের খুব প্রিয়। ইবনে মিজানের নাম তখন আমাদের সবার মুখস্ত। এক টাকা পচাত্তর পয়সায় টিকিট কেটে থার্ড ক্লাশের বেঞ্চে বসে সিনেমা দেখার সে যে কি মজা তা বোঝানো যাবেনা, বিড়ম্বনাও কম নয়। একবার সিনেমা দেখছি। পর্দায় চুড়ান্ত ক্লাইমেক্স, নায়ক ভিলেনকে আচ্ছা মতন প্যাদানী দিচ্ছে অমনি আমাদের আধপাগলা বন্ধু সেকেন্দার লাফিয়ে বেঞ্চে উঠে চিৎকার শুরু করলো মার শালাকে মার আরো মার। সেকেন্দার নিজের পা এমন ভাবে ছুড়লো যে সামনের বেঞ্চে বসা দর্শক ছিটকে তার সামনের সারির দর্শকের গায়ে পড়ে গেল। মুহূর্তেই পর্দার অনুকরনে অন্ধকার হলে ঢিসুম ঢিসুম শুরু হয়ে গেল। কে যে কাকে মারছে, কে যে ভিলেন আর কে যে নায়ক আল্লাহ মালুম। ফলাফল প্রদর্শনী বন্ধ, আর নিজেদের শরীরে দুচারটা কিল ঘুসি হজম করতে হলো। বাইরে এসে দেখি সেকেন্দারের মুখে সুপরীর মতো ফুলে ওঠা দুটো কালসিটে দাগ তারপরেও চেচিয়ে বলছে দিলাম শালা দুটাকে, একেবারে সোহেল রানা স্টাইলে। বললাম কাকে দিলি? সহাস্যে জবাব দিল সামনে যারে পাইছি। আবার প্রশ্ন করলাম কারে পাইলি? এবার জবাব দিল ‘দেহি নাই’।

আসলেই আমরা তখন সিনেমার কিছুই দেখতাম না। শুধু তাকিয়ে থাকতাম কখন নায়ক ভিলেনের ওপড় ঝাপিয়ে পড়বে, কখন নায়ক নায়িকার প্রেম হওয়ার সাথে সাথেই একটা গান শুরু হবে, কখন দৈত্যটা আসবে,কখন কৌতুক অভিনেতারা হাজির হবে এসবই ছিল দেখার বিষয়। এরই মাঝে আমাদের সিনেমা দেখায় নতুন মাত্রা যোগ হলো। সিনেমা হলগুলোতে ইংরেজি সিনেমা প্রদর্শিত হতে শুরু করলো। সিনেমা গুলো অধিকাংশই মারদাঙ্গা। ফাইফ ফিংগার অব ডেথ আর আয়রন ফিংগার দেখার পর আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ালো কংফু কারাতে শিখতে হবে। আমরা অনেক খোঁজা খুজি করে একটা প্রশিক্ষন কেন্দ্র পেলাম। কয়েকদিন যাতায়ত করেই বুঝে ফেললাম সিনেমায় দেখানো কুংফু আর বাস্তবের কুংফু এক নয়। অগত্যা একজন বাদে সবাই ইউ টার্ন নিলাম। থেকে গেল শুধু আমাদের বন্ধু বক্কর। পরে সে লেখাপড়াই ছেড়ে দিল ফলে আমরা জানতেও পারিনি সে কোনদিন কুংফু মাস্টার হতে পেরেছিল নাকি হারিয়ে গেছিল কুংফুর অপ প্রয়োগ করে কোন অন্ধকারে। আমরা গ্যারিশন হলেও যাতায়ত শুরু করলাম। ওখানে ইংরেজি ছবি প্রদর্শিত হতো। পর পর দেখলাম সানফ্লাওয়ার, নেদার দি সী নর দ্যা সেন্ডস, দ্যা ট্র্যাপ, লিটল ফ্লাওয়ার, গানস অব নাভারন, অল কোয়াইট ইন ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, কলড অফ ওয়াইলড, ওল্ড ম্যান এন্ড দ্য সী, এমন আরো অনেক ছবি। আমাদের গতানুগতিক সিনেমা দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেল অনেকটাই। আগ্রহ কমতে শুরু করল আমাদের দেশের বিজাতীয় নাম আর চুরি করা কাহিনীর দুর্বল নির্মাণ সিনেমার প্রতি। রাজ রাজাদের উদ্ভট পোশাক, যাত্রার অনুকরনে অভিনয় আর খিস্তি খেউরের ভেতরেই আমাদের চিন্তার আলাদা একটা জগত তৈরী করে দিলেন আমাদেরই এক শিক্ষক। আমজাদ হোসেনের গোলাপী এখন ট্রেনে সিনেমাটা সবে মাত্র দেখেছি। একদিন অর্থনীতি ক্লাশে শাহজাহান স্যার চিরাচরিত নিয়ম ভেঙ্গে মুখটা গম্ভীর করে বললেন “ তোদের মধ্যে কে কে গোলাপী এখন ট্রেনে দেখেছিস”? ছাত্রদের সিনেমা দেখাটা তখনও অপরাধ পর্যায়েই পড়ে বলে সবাই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছি। স্যার আবার জিজ্ঞেস করতেই দাঁড়িয়ে বললাম, আমি দেখেছি।

কেমন লেগেছে?

ভালো লাগেনি (আসলেই তখন আমাদের ভালো লাগেনি)

স্যার একটু হাসলেন; তারপর সিনেমাটার কাহিনী, সংলাপ, চিত্রগ্রহণগোলাপীদের সামাজিক অবস্থানশ্রেণী বৈষম্য, প্রেক্ষাপট এবং সিনেমায় ফ্রিজ শটে বার বার রেল লাইন দেখানোর অর্থটা যখন ব্যাখ্যা করলেন তখন আমার সামনে সিনেমার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হল। আবার দেখলাম গোলাপী, আবার দেখলাম এবং আরো একবার। প্রতিবারই এক নতুন গোলাপী আর এক নতুন সমাজ বাস্তবতা দেখলাম প্রতিবারই এক নতুন বার্তা নিয়ে ফিরলাম।

এখনতো সিনেমা হলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বার যাকে সিনেমার ভাষায় বলে সেকেন্ড রাউন্ড বা থার্ড রাউন্ড তেমন কোন ছবি মুক্তি পায়না। আমরা যখন সিনেমার দর্শক ছিলাম তখন কিন্তু অধিকাংশ সিনেমা হলেই এধরনের পুরনো সিনেমা মুক্তি পেত। এভাবেই সুতরাং,আবির্ভাব, আলিঙ্গন, অবুঝমন, ময়নামতি, অশ্রু দিয়ে লেখা,নীল আকাশের নীচে, দর্পচূর্ণ, কাঁচ কাটা হিরে, পিচ ঢালা পথ সহ অসংখ্য মিষ্টি প্রেমের কাহিনী নির্ভর সিনেমা গুলো দেখে ফেলেছি। বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছি ষাটের দশকটাই ছিল রুপালী পর্দার সোনালী দিন। কাহিনী, সংলাপ, সংগীত চিত্রনাট্য, সম্পাদনা সব কিছুই ছিল মনে রাখার মত। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু তা তো হয়ই নি বরং রুপকথার ভূতের মত আমরা পেছন দিকে হেঁটে গেছি অবলিলায়। সত্তুর দশকের মাঝামাঝি থেকে আশির দশকে নির্মিত অধিকাংশ চলচ্চিত্র দেখে এমনটাই ধারনা হয়। জনপ্রিয় ভারতীয় হিন্দি সিনেমাগুলোর কাহিনী, সংলাপ, গানের কথা আর সুর চুরি করে যাকে বলে কার্বন কপি রিমেইক করা শুরু হলো। সেন্সর বোর্ড নামের এক অথর্ব সার্টিফিকেট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে ম্যানেজ করে অথবা পাশ কাটিয়েই এ সকল অপকর্ম হতো।

আশির দশকেই আমরা তরুণরা নতুন এক সিনেমা ধারার সাথে পরিচিত হলাম। এ সিনেমাগুলো হলে মুক্তি পেত না। এগুলোর নির্মাতা একঝাক শিক্ষিত পরিশ্রমী তরুণ। তারা নিজেরাই এর অর্থের যোগানদাতা, নিজেরাই প্রদর্শক। প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে অপেশাদার শিল্পী, কলা কুশলী নিয়ে ১৬ মি. মি. ফিল্মে ধারন করা এসব সিনেমা নিজেরাই কাধেঁ বয়ে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শন করেছিলেন। স্বল্প দৈর্ঘ চলচ্চিত্র নামে পরিচিত এ ঘরানার সিনেমাগুলোকে আবার কেউ কেউ মুক্ত দৈর্ঘের সিনেমা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন।যদিও ষাটের দশকেই সরকারি প্রচারণার কাজে প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শুরু এদেশে তবুও তানভির মোকাম্মেল, নির্মুলেন্দু গুণের কবিতা হুলিয়াকে চিত্রায়ন করে এ ধারায় নবযাত্রা শুরু করেন আর মোরশেদুল ইসলাম আগামী নামের একটি স্বপ্ল দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র বানিয়ে দর্শকদের সাথে পরিচিত হন। ভারতে অনুষ্ঠিত চলচ্চিত্র উৎসব থেকে আগামী রৌপ মুয়ুর ছিনিয়ে নিয়ে আসার পর যারা এতদিন তাদের ‘সিনেমার ফেরিওয়ালা‘ বলে কটাক্ষ করতেন তারাও নড়ে চড়ে বসলেন। তাদের পর আরো অনেকেই এ ধারায় সিনেমা বানাতে আসলেন। যারা এলেন তাদের অধিকাংশই চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী। এ ধারাটির সাফল্য বা ব্যর্থতা যা কিছুই থাক না কেন আমাদের মতো দর্শকের রুচিবোধ তৈরীতে এক বিশাল ভূমিকা রেখেছে নিঃশন্দেহে। অবাণিজ্যিক চিন্তা থেকে এসব সিনেমা বানাতে তরুণরা এগিয়ে আসলেও অনেকেই আর আদর্শের জায়গাটুকুতে স্থির থাকতে পারেননি। ফাঁক ফোকর গলিয়ে বাণিজ্য এসে এখোনেও বসতি গড়েছে। এধারার প্রবর্তকেরাও একসময় তাকথিত বাণিজ্যিক ধারার ৩৫ মি.মি ফিল্মের মূল ধারায় ফিরে গেছেন। তবে তাদের অনেকের বানানো সিনেমা আমাদের কাছে বরাবরই মনে হয়েছে টেলি সিনেমা। এগুলো না মনে হয়েছে সিনেমা না টেলিভিশনের নাটক। অতএব দুটো মিলে একটা। আসলে আমাদের মতো দর্শকরা তখন ভেবে নিয়েছিলাম যেমন করে সত্তরের দশকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নকশাল বাড়ি (সিপিআই এমএল) আন্দোলনে যুক্ত একঝাক তরুণমার্ক্সবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সিনেমা বানাতে এলেন। তাদের হাত ধরে কলকাতার বাংলা সিনেমা তথাকথিত পারিবারীক সেন্টিমেন্টের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে এক নবতর ধারার সংযোজন ঘটালো। একই ভাবে ৭১ সালে আলজিরিয়ার কৃষি বিপ্ল­বের পর এমন কিছু তরুণ নির্মাতার আবির্ভাব ঘটে। যারা আলজিরিয়ার স্বাধিনতার পর সেখানে তাদের স্বপ্নের সমাজ ব্যবস্থা দেখতে পারেননি। তাদের একধরনের ক্ষোভ ও দ্রোহ থেকে তাদের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের নতুন বিশ্লেষণ ও শ্রেণী সংগ্রামের সামাজিক মুল্যায়ন করেছেন। তাদের নির্মিত চলচ্চিত্র গুলোতে একধরণের দর্শণ ও বক্তব্য উপস্থাপন করা হতো। টগবগিয়ে জ্বলতে থাকা এসব তরুণদের চলচ্চিত্র মানেই আন্দোলন, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের গল্প। তেমনি ভাবে আমরাও চাইতাম এ শিক্ষিত চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীরা আমাদের সিনেমা, সাহিত্য সংস্কৃতি এমনকি রাজনীতিতেও একটা পরিবর্তন আনতে পারবেন কিন্তু আমাদের হতাশ করে তারাও হয়ে উঠলেন আপোষকামী। সম্ভবনার পথটি রুদ্ধ হলো দিনে দিনে।

পর্দায় সিনেমা দেখা যায় আর এ পর্দাাটিকে রুপালী পর্দা বলে। কেন বলে সেটা নিয়ে আমার কৌতুহলের শেষ ছিলনা। শুরুর দিকে ভাবতাম রুপা দিয়ে তৈরী, এর পর উদ্ভট উদ্ভট সব ভাবনা এলো। এই পর্দার পেছন থেকেই শব্দ আমাদের কান পর্যন্ত আসতো। একসময় ধরেই নিয়েছিলাম পর্দার পেছনে কিছু থাকে, ওরাই কথা বলে, গান গায়। কতবার যে উঁকি ঝুকি দিয়ে সেই লোকগুলোকে দেখার চেষ্টা করেছি তার ইয়াত্তা নেই। একটু বড় হয়েই জানতে পেরেছি আসলে পর্দার পেছনে একটা শব্দযন্ত্র আছে। সেখান থেকেই শব্দ বের হয়।

তখন সিনেমা পত্রিকা চিত্রালী এবং পূর্বাণী পড়তাম। তাতেই কোন এক সিনেমার বিজ্ঞাপনে দেখলাম লেখা রয়েছে স্টেরিও সাউন্ড। আমি আবার চিন্তায় পড়লাম। ছুটে গেলাম এক বন্ধুর কাছে। ওর কাছে যাওয়ার কারণ হলো ও কিছুদিন আগে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার কিনেছে যেটা স্টেরিও সাউন্ড। এটা নিয়ে ওর গর্বের শেষ নাই।

আমি সেই বন্ধুর কাছে বাধ্য ছাত্রের মতো জানতে চাইলাম এই ‘মনো এবং স্টেরিও সাউন্ডের পার্থক্য কী? ও আমাকে বসতে দিল এবং খুব যত্নের সাথে ক্যাসেট প্লেয়ারটা মুছে হেড পরিস্কার করে চালিয়ে দিল। গান বাজতে শুরু করলো। বন্ধুটি গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে আমি তাই দেখে বললাম

পার্থক্যটা বুঝিয়ে বলনা।

কেন, তুই বুঝতে পারছিস না?

না; আমার কাছে তো একই রকম মনে হয়।

আমার কথা শুনে বন্ধুতো মহা খাপ্পা। ক্যাসেট প্লে­য়ার বন্ধ করে বলল, যা ভাগ তুই এগুলো বুঝবিনা।

তবে সাউন্ড যে সিনেমায় একটা বিশাল ব্যাপার সেটা অনুভব করেছিলাম ইংরেজি সিনেমা দেখে। আমাদের সিনেমা আর হলিউডি সিনেমার শুধু সাউন্ড দিয়েই যদি ব্যবধান নির্ধারণ করা যায় সেটাও হবে যোজন যোজন।

এরই মধ্যে একদিন পত্রিকায় পড়লাম ঢাকার মধুমিতা সিনেমা হলটা আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমে সমৃদ্ধ করা হয়েছে। এটাকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল ডলবি সারাউন্ড সাউন্ড সিষ্টেম। আবার চিন্তায় পড়ে গেলাম, এটা আবার কী? খায় না মাথায় দেয়। একেই তো মফঃস্বলের গোডাউন মার্কা সিনেমা হলে কানের পর্দা ফাটানো শব্দে (থার্ড ক্লাশের দর্শক ছিলাম বলে সাউন্ড বেশি কানে লাগতোসিনেমা দেখতে অভ্যস্ত। সেখানে মাঝে মধ্যেই এত বেশি শব্দ হয় যে থার্ড ক্লাশের দর্শকরা চেচিয়ে হল মাথায় তুলতো তখন অপারেটর ব্যাটা কোথায় থেকে যেন সাউন্ডটা কমিয়ে দিত আবার কখনও কখনও সাউন্ড এত কমে যেত যে আবার হল মাথায় তোলার অবস্থা তখন পাশ থেকে টুক করে গেট ম্যান ব্যাটা দু হাত তুলে চেচিয়ে বলতো ‘রিল নষ্ট, রিল নষ্ট‘ রিল নষ্ট হলে তো আর কারো কিছুই করার থাকেনা। সবাই সিনেমা দেখায় মন দিই। সেই দর্শক আমি এ ধরনের একটা সাউন্ড সিস্টেমে বসে সিনেমা দেখতে আকু পাকু করতে শুরু করলাম।

আমার ঢাকায় যাওয়ার সুযোগ হলো একবার। মতিঝিলের শাপলা চত্বরের একটু সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখি মধুমিতা সিনেমা হল। এইতো সেই সিনেমা হল যেটাতে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম লাগানো হয়েছে। হলে প্রদর্শিত হচ্ছে ইংরেজি সিনেমা ‘ক্লিফ হ্যাংগার‘। কাজ কাম সব তুলে রেখে দাঁড়িয়েই থাকলাম হলের সামনে। দুপুর সাড়ে বারোটায় টিকিট কেটে হলে ঠুকলাম। ঢাকার কোন সিনেমা হলে সেই প্রথম আমার প্রবেশ। আহ্ এই যদি সিনেমা হল হয় তবে না খেয়ে পর পর তিনটা শো দেখা যায় বলে আমার ধারনা হল (ছোটবেলায় ঈদের দিন এবং অন্য সময় ভালো লেগে গেলে যে কোন সিনেমা এক দিনে পর পর দুটি শো দেখার একাধিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ আমার জীবন)। শুরু হলো সিনেমা। প্রথমেই চমকে যাওয়ার পালা। আমাদের মফস্বলের সিনেমা হলগুলোতে শব্দ আসে পর্দার দিক থেকে কিন্তু এ কী! এখানে শব্দ আসছে চার পাশ থেকে। ঠিক যেদিক থেকে হলে শব্দটা হলে পর্দার ছবিটা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হবে সেদিক থেকেই। পর্দায় একটা উড়োজাহাজ ক্র্যাশ দেখানো হল। বরফের ওপর আছড়ে পড়া প্লেনের তলা থেকে ছিটকে আসা বরফ গুলো আমার শরীরে এসে পড়লো, আমার কাছে অন্ততঃ তাই মনে হলো (সাউন্ড ইফেক্টের কারণে)! লজ্জা পেয়ে নড়ে চড়ে বসলাম। আমার কাছে এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। আজ পর্যন্ত আমাদের সিনেমায় এধরনের কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। সভা সমিতি আর মিডিয়ার সামনে আমাদের দর্শক কমে যাচ্ছে বলে আর্তচিৎকার করলেই দর্শক বাড়বেনা। দর্শক সিনেমা হলে আনতে গেলে হলে দর্শককে আটকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন বসায় তেমন দেখায়। নইলে যারা সিনেমা হল ভেঙ্গে বিপনী বিতান করছেন তাদের সাধুবাদ জানাচ্ছি কারণ সিনেমা বানানো, প্রদর্শন করা, অর্থ লগ্নি করা,এখন আর আলু পটলের ব্যবসার কাতারে নেই। এটা শিক্ষিত এবং প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের হাতের জিনিস। আশার কথা সম্প্রতি দেশের বেশ কিছু সিনেমা হলকে ইতোমধ্যে ডিজিটাল ফরমেটের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের উপযোগী প্রজেকশন সিষ্টেমের আওতায় আনা হয়েছে। আগামীতে সারা বাংলাদেশেই এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই জানা গেছে।

সাম্প্রতিককালে আমরা দর্শকরা আরো একটি ধারার সিনেমার সাথে পরিচিত হতে শুরু করলাম। এসব সিনেমাও মূলতঃ তরুণদের হাত ধরেই এগুতে শুরু করলো। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে প্রচলিত গত বাধা নায়ক নায়িকা ভিলেন এই ত্রিমুখী দ্বন্দ্বের ফর্মুলার বাইরে বেরিয়ে একটা নতুন কিছু দেয়ার চেষ্টা করছে। মাটির ময়না, রানওয়ে, টেলিভিশন, প্রজাপতিশঙ্খনাদ, চাকা, আহ্, ডুবসাঁতার, মেইড ইন বাংলাদেশ, গেরিলা, অন্তর্যাত্রা, রাশেদ আমার বন্ধু, নাচোলের রানী ইত্যাদি এ ধারার কিছু চলচ্চিত্র। মফস্বলে কোন সিনেমা হলে এ ছবিগুলো মুক্তি না পেলেও বিভিন্ন স্যাটেলাইট চেনেলের কল্যাণে আমাদের অনেকেরই দেখা হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে আমরা জেনে গেছি মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীর ‘টেলিভিশন’ সিনেমাটি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এবং প্রতিযোগীতায় বিশেষ ভাবে সমাদৃত হয়েছে।

দর্শককে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানানোর দিন শেষ হয়ে গেছে। এখন যেন তেন করে একটা কাহিনী দাঁড় করিয়ে ক্যামেরা, লাইট, একশন বলে চিৎকার করলেই সিনেমা হবেনা। সিনেমা বানাতে চাই সিনেমা বিষয়ক জ্ঞান।

একজন সিনেমা দর্শক হিসেবে আমার দেশের সিনেমা নিয়ে প্রত্যাশার শেষ নেই। প্রাপ্তিটাও একেবারেই কম না। সেই ষাটের দশকেই কিন্তু সুভাষ দত্তের সুতরাং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভূয়সী প্রশংসা লাভ করে। মহিউদ্দিন সাকের এবং শেখ নিয়ামত আলীর ‘সূর্য দীঘল বাড়ি‘র আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ আমাদের স্বক্ষমতারই পরিচয় বহন করে। ৭১ সালে জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড‘ প্রামাণ্য চিত্রটি তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম পুরস্কার পায়। মোরসেদুল ইসলামের ‘আগামী’র পর ‘চাকা’ আন্তর্জাতিক উৎসবে পুরস্কৃত হয়। আবু সাইয়ীদ এর ‘শঙ্খনাদ’ আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ার পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডে বানিজ্যিক ভাবে মুক্তি পায়। ‘নিরন্তন’ সিনেমাটি ভারতের দুটি আন্তর্জাতিক উৎসবের পুস্কার ছিনিয়ে আনে একই ভাবে ‘স্বপ্নডানা’ সাংহাই চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হওয়ার পাশাপাশি ‘ফেস্টিভ্যাল অব ফেস্টিভ্যাল‘ বলে খ্যাত টরেন্টো উৎসবেও নির্বাচিত হয়। আমার বিস্ময়ের সীমা থাকেনা যখন দেখি তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ ফ্রান্সে চার মাস ধরে ৪৪ টি সিনেমা হলে প্রদর্শিত হয়েছে। আমাদের দেশেরই দু একটি বাদে কোন সিনেমা হলে সিনেমাটি মুক্তি পায়নি সেখানে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রইতালী, বেলজিয়াম, কানাডায় বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পেয়েছে। ‘আমাদের দেশের সিনেমা‘ নিয়ে কথা উঠলেই কেমন যেন নাক সিঁটকান ভদ্রলোকেরা। তারা জানেই না আমাদের তরুণেরা সিনেমা বানিয়ে বিশ্ব জয় করার পথে হাঁটছেন।

Paradise Nest বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী বা পাখি নিয়ে প্রথম একটি চলচ্চিত্র। এটি প্রদর্শিত হয়েছে ইতালিতে, রাজস্থানে এবং আমেরিকার ৪১তম ইন্টারন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। আর গত বছর কলকাতার ১৭ তম কাল্ট উৎসবে ‘বেস্ট ফিল্ম অব নেচার‘ পুরষ্কার জিতে নিয়েছে ছবিটি।পাখিদের জীবনযাপন, সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার গল্প নিয়ে সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে। এটির নির্মাতা আরিফ আহমেদ। সিনেমাটি আমরা দেখতে চাই। বাংলাদেশের মানুষকে সিনেমাটি দেখানো দরকার। এসব সাফল্যকে ছোট করে দেখার কোন অবকাশ নেই। বরং এমন সংবাদগুলো আমাদের আশান্বিত করে। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝখানে বাসা বেধে বসে আছে একটা বাঘডাস। এ বাঘডাস রাজনৈতিক হীনমন্যতা, আমলানির্ভর প্রশাসনিক জটিলতা, আর অতি বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি। এর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতেই হবে আমাদের। সেদিনটির জন্যই বসে আছি যেদিন আমাদের ‘বই’ সত্যিকারের চলচ্চিত্র হয়ে উঠবে।

সম্পাদনা: জোবায়েন সন্ধি

আজমত রানা। লেখক ও সাংবাদিক। নিম্নবিত্ত ঘরে জন্ম বলে জন্মের সঠিক দিন তারিখটা তাঁর জানা নেই। লেখাপড়াটাও এগোয়নি ইচ্ছের কমতি আর অভাবের কারণে। বাংলাদেশের মানচিত্রের একেবারে উত্তরের প্রান্ত শহর ঠাকুরগাঁওয়ে শ্রমিক বাবার ঘরে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। বয়স আঠার হতেই...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

স্বাধীনতা মুছে দেয়নি ভাই হারানোর ব্যথা

স্বাধীনতা মুছে দেয়নি ভাই হারানোর ব্যথা

৭১ এর মুক্তিযোদ্ধের গল্প বাঙালি প্রত্যেক পরিবারের মধ্যে কিছুনাকিছু জানার ইতিহাস রয়েছে।তখনকার বাংলাদেশের সাড়ে সাত…..