রুমি

মৌসুমী চৌধুরী
গল্প
Bengali
রুমি

– বিয়ে করতেই হবে কোথায় লেখা আছে মা!

– আবার কী কথা,এইসব আর বলিস না, তিরিশ বছর পেরিয়ে গেলো,শুধু তোর এইসব  কথা শুনে শুনে,এরপর আর কোনও ছেলেই পাবো না,

-মা প্লিজ! বিয়েতে আমার কোনও আগ্রহ নেই,শুধু আতঙ্ক আছে,কেন শুরু করলে আবার এইসব,

-তা বললে তো হবে না,চেষ্টা তো করতেই হবে তাছাড়া সারাজীবন কী তুই একা বাঁচতে পারবি,আমি আর কদ্দিন বাঁচবো,

-একা কেন বাঁচতে পারবো না বুঝলাম না, এখনও তো সেই অর্থে আমি একাই বাঁচি মা! সারাদিন ক’টা কথা বলি তোমাদের সাথে, এ বাড়িতে কে কার সাথে বসে দুটো কথা বলে বলতো!সবাই তো যে যার মতোই বাঁচছে,বৌদি বাবুন কে নিয়ে ব্যাস্ত থাকে,দাদা যখন ফেরে তখন শুধু খেতে দেওয়ার জন্যে বসে থাকো তাই কথা বলতে হয়, আর আমার সাথে তো কারোর কথাই হয় না ঠিক ভাবে, -তুই আর বিঘ্ন দিস না,অনেক হয়েছে,সোমুর অফিসের ওই কাজলের ভাই এর কথা বলছে, কাজলই বলেছে,তার নাকি মিউচুয়াল ডিভোর্স,বাচ্চা নেই,দেখতে শুনতে ভালোই,বয়েস চৌত্রিশ,

-তাই তুমি এঘরে এই সময়।আমিও তাই ভাবছি,হঠাৎ এতো সকালে কী ব্যাপার!আসলে তোমায় দাদা পাঠিয়েছে,

-দেখ রুমি,বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে কথা বলিস না,সহ্য হয়না আমার!দাদা তোমার ভালোর জন্যেই ভাবছে,

-না মা!দাদা আমার ঘরটা ভেঙে বারান্দা বের করবে,আর দাদার এই স্বপ্নটা আমি যতদিন এঘরে আছি,বাস্তবে রূপ পাবে না,তাই আমার বিয়ে নিয়ে দাদার এতো তাড়া।

-রুমি, একটু ভালো করে ভাবতে শেখ!সন্তু আর কেকা তোর জন্যে খুবই ভাবে,কাজল ওর ভাইকে নিয়ে রবিবার এখানে আসবে,ঝামলা করবি না,

-সব বলেছো? আমার একত্রিশ বছর বয়েস,আমি দেখতে বেশ খারাপ!তাই সবাই অপছন্দ করে চলে যায়।

এই অবধি বলেই রুমি তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলো,আজ এতো কথা বলতে গিয়েই তার সাড়ে আটটা বাজলো, বেরিয়েই ছুটতে হবে এখন,স্নান করে বেরিয়ে দেখলো রোজকার মতো টেবিলে গরম ভাত,পাশে মাছ ভাজা,কাঁচা পেয়াজ একটুকরো,ছোট বাটিতে অল্প ডালসেদ্ধ,তাতে কাঁচা সর্ষের তেল দেওয়া,ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্কুলে বেরোনোর আগে রোজ এটাই রুমেলার ব্রেকফাস্ট,দুপুরে আগে মা টিফিন বানিয়ে দিতো, কিন্তু এখন দাদার জন্যে, দাদার ছেলের জন্যে টিফিন বানিয়ে দিতে হয় বলে, রুমেলা তার টিফিন বাড়ি থেকে আর পায় না।সে স্কুলে গিয়ে গোপালদাকে দিয়ে আনিয়ে নেয়,আজ রুমেলার বেরোতে বেরোতে পৌনেদশটা বেজে গেলো,অটোর লাইন,এখানেই দেরি হলে দশ টা দশের ট্রেনটা মিস করবে,রুমেলা অটোয় ওঠার পর,সামনের ফুটপাতেই একটি ছোট্ট বাচ্চা মেয়ের দিকে চোখ গেলো,মেয়েটি রুমির দিকে তাকিয়ে হাসছে,ভারি মিষ্টি তো,রুমিও হাসলো,হঠাৎ মেয়েটি ফুটপাত থেকে নেমে টলমল পায়ে দৌড়ে  এদিকেই আসতে আরম্ভ করলো,রুমি হা করে তাকিয়ে রইল,কিছু বুঝে ওঠবার আগেই দেখলো উল্টো দিক থেকে একটি সাইকেল স্পিডে এসে মেয়েটির গায়ের পাশেই থামতে গিয়ে,সাইকেল আরোহী সাইকেল শুদ্ধ কাত হয়ে পড়লো, সাইকেলের সামনের চাকায় মেয়েটির ধাক্কা লেগে পায়ে চোট লেগেছে, সে তখন রাস্তার ওপর শুয়ে পরেছে,কাঁদতে শুরু করেছে,চারিদিকের মানুষ ছুটে এসেছে,মেয়েটির চারপাশে দেখতে দেখতে ভিড় জমে গেলো,

রুমি আর বসে থাকতে পারলো না,ঘড়িতে দশটা দশ,বাচ্চা মেয়েটির মুখ মনে পড়তেই ঘড়িকে অগ্রাহ্য করে রুমি অটো থেকে নেমে পড়লো,ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলো একটি ছেলে মেয়েটিকে হাত ধরে উঠে বসানোর চেষ্টা করছে,মেয়েটি উঠতে পারছে না, আর হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছে,রুমি এগিয়ে গিয়ে বাচ্চাটির পাশে বসলো,তারপর যে ছেলেটি বাচ্চাটির হাত ধরে তুলে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে, তার দিকে তাকিয়ে বলল,

-সঙ্গে কে আছে এর?

-বলছে তো আছে, কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না কাউকে।

বাচ্চাটির,পায়ের অনেক জায়গা ছড়ে গিয়ে রক্ত গড়িয়ে পরছে, হাতেকনুই এর কাছে অনেকটা ছড়ে গেছে,ছেলেটির দিকে তাকিয়ে রুমি বলল,

-আমাকে একটা রিক্সা ডেকে দেবেন!আমি ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছি,

ছেলেটি যেন নিশ্চিন্ত হলো,বলল,

-নিশ্চয়ই,এখুনি আনছি,

দশটা পঁচিশ,আজ বোধহয় স্কুলটা কামাই হয়ে গেলো,রুমেলা মেয়েটিকে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পাশেই  একটি ওষুধের দোকানে গেলো; দোকানেই একজন ডাক্তার বসেছিলেন,তাঁর  প্রাথমিক চিকিৎসায়,রক্ত পরা বন্ধ হলো,ছড়ে যাওয়া ছাড়া তেমন মারাত্মক কোনও আঘাত লাগেনি,তাও জানা গেলো,এখান থেকে পনেরো মিনিট লাগলো রুমির বাচ্চাটিকে নিয়ে তার বাড়িতে আসতে,সুন্দর বাড়ি,পাহাড়ি ডাকবাংলোর কথা মনে পড়ে গেলো রুমির।সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত হলো এই ভেবে,যে এই রকম একটি মিষ্টি মেয়েকে একা কেন ছেড়ে দিয়েছে রাস্তায়! এতক্ষনে হঠাৎই বাচ্চাটি প্রথম কথা বলে উঠলো,সারা গায়ে ব্যাথা নিয়েও এক গাল হেসে রুমির দিকে তাকিয়ে বলল,

-এতে গেলাম, এইতো বায়িটা আমদেয়,

রুমির মিষ্টি লাগলো শুনতে, অজান্তেই হেসে ফেলল সে,বাচ্চাটির গালে এক হাত রেখে বলল,

-এটাই তোমার বাড়ি!

-বাচ্চাটি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল,

রুমি তাকিয়ে দেখলো,অনেকটা জায়গা নিয়ে বেশ বড়ো বাড়ি,সামনে বড়ো বাগান,গেটে ফলক,”শান্তিনিকেতন” তারপর পর পর দুটি নাম,কঙ্কন চ্যাটার্জী,অনিমা চ্যাটার্জী,কিন্তু কোথাও কোনও মানুষ চোখে পড়লো না, রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে রুমি বাচ্চাটিকে নিয়ে গেট খুলে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো,এবার বলল,

-তোমার মা’কে ডাকো

বাচ্চাটা সঙ্গে সঙ্গে মা’মা’ বলে ডাকতে ডাকতে বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো,রুমি তার পেছন পেছন ঢুকতেই রান্নার খুন্তি হাতে একজন মধ্যবয়স্কা মহিলা বেরিয়ে এলেন,বাচ্চাটি ইতিমধ্যেই বাড়ির ভিতরে চলে গিয়েছে,রুমি খুন্তি হাতে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বলল,

-দরজা খোলাই ছিল তাই চলে এলাম,বাড়ির লোক কে আছে?আমি ওই যে বাচ্চাটি দৌড়ে ঢুকে গেলো বাড়ির ভেতরে,ওকে নিয়েই এসেছি,আজ ওই বাসস্ট্যান্ডের কাছে বাচ্চাটা একটা সাইকেলে ধাক্কা খেয়ে পরে গিয়েছিল। রুমির কথার মাঝখানেই খুন্তি হাতে ভদ্রমহিলা বলে উঠলো,

-রেবা ছিল তো সঙ্গে!সে কোথায়?

-না বাচ্চাটির সঙ্গে কেউই ছিলো না।তাইতো আমি এলাম,

রুমি শান্ত ভাবে বলল,

-আমি বলেছিলাম ওকে না রাখতে, দেখো এখন বাচ্চা ফেলে রেখে উধাও,

বলতে বলতে খুন্তি হাতে ভদ্রমহিলা আবার বাড়ির ভেতরের দিকে রওয়ানা দিলেন, একটু এগিয়েই পেছন ফিরে রুমির দিকে তাকিয়ে বলল,

-আপনি ওপরে চলে যান,মাসিমা আছে,বলুন গিয়ে সব,কী অসভ্য মেয়েছেলে,মাঝরাস্থায় বাচ্চা ফেলে চলে যাওয়া,আজ আসুক দাদা,এমন বলবো…

অবাক হলো রুমি,হতবাক হলো এই ভেবে যে বাচ্চাটার দুর্ঘটনা নিয়ে ভদ্রমহিলা এতটুকুও বিচলিত হলেন না,রুমি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে শুরু করলো,সে এতক্ষন যে ঘরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল,সেটি একটি বড়ো হল ঘর,ঘরের একপাশে সুন্দর সোফা, তার পেছনেই কাঠের সুন্দর কারুকাজ করা আসবাব ,যার ওপরে অপূর্ব সুন্দর একটি মেয়ের স্ট্যাচু, এতো বড়ো ঘরে আর বিশেষ তেমন কিছু নেই। সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা উঠতেই রুমি দেখলো ওই বাচ্চা মেয়েটি সিঁড়ির রেলিং ধরে নেমে আসছে,বাচ্চাটি দশ মিনিট আগেই ওপরে উঠেছে,তবু এখনো সেই বাইরের জামা পরনে,জামায় ধূলো,হাতেপায়ে কাটা ছেঁড়ার দাগ,যদিও রুমি ওষুধের দোকানে অনেকটাই পরিষ্কার করে দিয়েছে,

রুমিকে দেখেই বাচ্চাটি আবার সেই মিষ্টি হেসে,বলল

-মা তোমাতে দাচ্ছে ওপয়ে,তায়াতায়ি তলো,

রুমির হাত ধরলো সে,রুমি দোতলায় উঠে এসেই দেখলো,ঠিক নীচের মতোই এখানেও একটি বড়ো হল, আর একই ভাবে সাজানো,এমনকি স্ট্যাচু টাও যেন একই। মেয়েটি রুমার হাত ধরে টেনে পাশের একটি ঘরের দিকে নিয়ে চলল,ঘরে প্রবেশ করে রুমি দেখলো বিছানায় একজন বৃদ্ধা শুয়ে, একসময়ে  অসাধারন সুন্দরী ছিলেন বোঝাই যায়,কোমরের তলা থেকে চাদরে ঢাকা। রুমি সেই বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে বললেন,

-মা..মা দেথো,মিম টা এথ্থে,

ভদ্রমহিলার চোখে মুখে উৎকণ্ঠা,রুমিকে দেখেই জিজ্ঞেস করলো,

-কী হয়েছে বলুন তো,ও কোথায় পড়ে গিয়েছিল? বলছে সাইকেল ধাক্কা দিয়েছে,আপনি কী ওকে নিয়ে এলেন?আপনি কোথায় থাকেন!কোথায় দেখলেন,রেবা কোথায়?

-ওর সঙ্গে কেউই ছিলো না, আমি স্কুলে যাচ্ছিলাম,তখনই আসলে,

বৃদ্ধার একসঙ্গে এতো প্রশ্নে রুমি তাঁর উদ্বেগ যেন অনুভব করতে পারলো,তাই রুমি বৃদ্ধার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে কথাগুলি বলল,অথচ ইনি বাচ্চাটির কে হন সেটা বুঝতে পারছে না,

-আপনি বসুন ওই চেয়ার টা টেনে নিয়ে।আমি একেবারেই পঙ্গু বুঝেছেন তো!মানি আমার নাতনী,ইশশ আজ আমাদের আজ খুব বিপদের থেকে বাঁচালেন আপনি,

রুমি তাড়াতাড়ি একটু দূরে রাখা চেয়ার টেনে এনে বৃদ্ধার কাছে এসে বসলো।বলল,

-আপনি আমায় তুমি করে বলুন,আর একদম চিন্তা করবেন না।আমি ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছি।

শুধু ওর জামাটা একটু চেঞ্জ করিয়ে দিতে হবে,

সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা টা এসে রুমির কাছে দাঁড়ালো রুমি এক হাত দিয়ে তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলল,

-তোমার নামটাই জানা হলো নাতো!কী নাম তোমার সোনা?

-আমাল নাম?

বাচ্চাটি চোখ বড়ো করে জিজ্ঞেস করলো,

রুমি তার গাল ছুঁয়ে বলল,

-হ্যাঁ তোমার নাম

-মা বলে মানিত,পাপা বলে পুচু,নেবা বলে মনা,আন্না বলে মনি,

এবার বৃদ্ধা শব্দ করে হেসে করে হেসে উঠলেন,বললেন,

-ওর নাম অদ্রিজা।

শিল্পী: রিয়া দাস

দুই.

আজ আর স্কুলে আর যাওয়া হলো না রুমির,বাড়ি ফিরতে দুপুর বারোটা বাজলো,বাড়ি ফিরতেই মা আর বৌদির একরাশ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে সে জানতো,ওই চ্যাটার্জীদের   বাড়ি থেকে ফিরে এসে শুধু শিশু অদ্রিজার কথাই বারবার মনে পড়ছে,ওইটুকু শিশু তার মা তাদের সাথে থাকেনা,বাবা অফিস নিয়ে থাকে, ঠাকুমা বিছানা থেকে উঠতেই পারেনা,

-তুই ভাত খাবি তো?

রুমি জানতো অসময়ে বাড়ি ফিরে এলে এই প্রশ্নটা তাকে শুনতেই হবে,এইগুলোই অসহ্য লাগে রুমির,যদি তাকে খাওয়ানোর ইচ্ছেই থাকে তাহলে তো এক কৌটো চাল বসিয়ে দিলেই হতো,তা নয়, তার না’শোনার জন্যেই যেন এই প্রশ্ন মা করবেই। রুমি আস্তে করে বলল,

-না,পরে একটু চা খাবো,

-কোন বাড়িটা রে, কত বয়েস বাচ্চাটার,

বাড়ি ফিরেই পুরো ঘটনাটি মা আর বৌদিকে বিস্তারিত বলেছে রুমি,সে জানতো এরপর হাজার প্রশ্ন করবে মা,টানা সাতদিন ধরে চলবে সেই একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে,

-তুমি চিনবে না,এখান থেকে অনেকটা, রিক্সোতেই তো কতক্ষন লাগলো,

-ওহ তাহলে ঘোষ পাড়ার দিকে বোধহয়,আহা!অতটুকু শিশুর মা নেই,

-ছিলো,আলাদা থাকে,হয়তো ডিভোর্সও হয়ে যাবে।অদ্রিজার ঠাকুমা বলল,আর একজন আয়ার কাছে ও থাকে,তার সঙ্গেই নাকি বেরিয়ে ছিলো। কিন্তু আমিতো বাচ্চাটির সঙ্গে কোনও মহিলা দেখলাম না,একটা শিশুর এতো অযত্ন  ভাবা যায় না,

আজ তার জন্যে এতোবড়ো বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে কে জানতো,আজকের সন্ধ্যেটা রুমির জীবনের কিছু স্মৃতিকে এমন আলোকিত করবে তাই বা কে জানতো,

রুমি ভেবেছিল স্কুল থেকে ফেরার পথেই যাবে,কিন্তু স্কুল থেকে বেরিয়ে এই গরমে আর ভিড়ে সে যেন সব ভুলে গেলো,অগত্যা সন্ধ্যেবেলাই বেরোতে হলো,হঠাৎ করে কোনও অচেনা মানুষের বাড়িতে যাওয়াটা খুবই অস্বস্তিকর,কিন্তু কিছু করার নেই রুমির,কাল বাড়িতে ফিরে মনে পড়েছে,সে ভুল করে  ক্লাস নাইনের চারটে বই অদ্রিজাদের বাড়িতে ফেলে এসেছে ,ভেবেছিল আজ ফেরার পথে নিয়ে ফিরবে,কিন্তু আজ ফেরার পথে এতোবার ভেবে রাখা সত্বেও একবারও মনে পড়লো না,তাই এখন যেতে হচ্ছে, কিন্তু এই ভর সন্ধ্যাবেলা গেলে কী ধরনের ব্যাবহার পাবে একটি শিশুর মা বর্জিত সংসারে,তা ঈশ্বরই জানেন,

রুমি সজাগ হলো, তার রিক্সা শান্তিনিকেতনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে,কলিংবেলের আওয়াজে যিনি দরজা খুললেন,রুমি দেখলো তিনি কৌশিক চ্যাটার্জী,এতোবড়ো চমক আশাকরেনি সে,হতবাক এবং বাকরুদ্ধ হলো কয়েক সেকেন্ডের জন্যে,এ মুখ জীবনে দ্বিতীয়বার দেখতে হবে,এমনটা ভাবেনি কখনও,সেই দিন গুলি ভাবলে আজও অপমানে অসম্মানে দুচোখের পাতা এক করতে পারতে পারে না রুমি,কতরাত শুধু না ঘুমিয়ে কেটেছে এই অহঙ্কারি অসভ্য লোকটার জন্যে।কৌশিক রুমিকে দেখে নিশ্চয়ই চিনতে পেরেছে না হলে কোনও কথা না বলে শুধুই দাঁড়িয়ে আছে কেন!রুমি একবার ভাবলো ফিরে চলে যাবে কিন্তু সেটা ভীষনই নাটুকেপনা হবে,তাছাড়া বইগুলি তার প্রয়োজন,রুমি কিছু বলার আগেই গতকালের খুন্তি হাতে ভদ্রমহিলা একটি ব্যাগ হাতে বেরিয়ে এলেন,তারপর কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বললেন

-দাদা আমি গেলাম,সব করে দিয়ে গেছি,খাওয়ার সময় একটু গরম করলেই হবে,তারপরেই ভদ্রমহিলার রুমির দিকে চোখ যেতেই বলল,

-দাদা এই মেয়েটিই কালকে মনাকে নিয়ে এসেছিল,উনিই তো বললেন যে কাল রেবা ছিলই না মনার সাথে,

বলে রুমির দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে রুমিকে পাশ কাটিয়ে ভদ্রমহিলা বেরিয়ে চলে গেলো।

রুমি বুঝতে পারছে কৌশিকের দৃষ্টি তার মুখের ওপর,তারপরেই শুনলো কৌশিক বলছে,

-ভেতরে আসুন

রুমি পায়ে পায়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করলো,কৌশিক নীচেই হলের একপাশে পাতা সোফা দেখিয়ে বলল,

-বসুন,

রুমি এই কয়েক মিনিটে কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে,আর ঠিক সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো,নিশ্চয়ই অদ্রিজার বাবা কৌশিক,রুমি শুনেছিল অবশ্য যে কৌশিকরা এদিকেই কোথাও বাড়ি করে চলে এসেছে,কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় নেই,রুমি কৌশিকের দিকে না তাকিয়েই বলল,

-আসলে আমি কাল ভুল করে স্কুলের কিছু বই ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলাম,সেইটেই নিতে এসেছি,

কাল আপনাদের বাড়িতে আসতে হয়েছিল আমায়,

-আমি সব শুনেছি মায়ের কাছে,

-ওহ আচ্ছা

নিশ্চিন্ত হলো রুমি, স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পেরে

-আসলে অদ্রিজার দেখাশোনা করে যে মেয়েটি,তার সঙ্গেই ও বেরিয়েছিল,কিন্তু মেয়েটি আমায় ফোন করেছে,দুর্ঘটনার সময় চারপাশে মানুষের ভিড় দেখে সে ভয় পেয়ে ওখান থেকে চলে যায়।আপনি ছিলেন তাই,অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে,

কথাগুলি এক নিঃশ্বাসে বলে গেলো কৌশিক,

-মিমি এসেথে,

রুমি কিছু বলতেই যাচ্ছিল,তাকিয়ে দেখলো অদ্রিজা এক মাথা ঝাঁকড়া চুল নিয়ে লাফাতে লাফাতে ওপর থেকে নেমে এলো,সে অজান্তেই তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো,অদ্রিজা ছুটে রুমির কোলের মধ্যে চলে এলো,রুমি টের পেলো এই মেয়ের মিষ্টি হাসিটা দেখলে তার মন অদ্ভুত ভাবে ভালো হয়ে যাচ্ছে,কৌশিক কে দেখে দু মিনিটের জন্যে মনটা বিষিয়ে উঠেছিল কিন্তু এই মিষ্টি ফুলের শিশু যেন ম্যাজিক জানে,

রুমি দুহাতের পাতায় অদ্রিজার মুখ তুলে ধরে আদরের স্বরে বলল,

-আরে এইতো মিত্তি মেয়েটা,কোথায় ছিল এতক্ষন,

-আমি ওপয়ে,মা গল্ল বলতে,

-ব্যাথা কমেছে?

এবার অদ্রিজা ভ্রু কুঁচকে ঠোঁট সরু করে রুমিকে দেখাতে লাগলো তার কোথায় কোথায় খুব ব্যাথা হচ্ছে এখনও,অদ্রিজা যেখানে যেখানে দেখাচ্ছে রুমি ঠিক সেখানে সেখানে চূমু খেতে থাকলো,এতক্ষন কৌশিক রুমির ঠিক উল্টো দিকের সোফায় বসে চুপ করে দেখছিল,এবার বলল,

-আপনার বই কোথায় আছে,বলুন আমি এনে দিচ্ছি,

রুমি থমকালো,লোকটা আজও একইরকম আছে,রুমি খুব আস্তে বলল,

-ওপরে মাসিমা যে ঘরে শুয়ে আছেন, সেখানেই বসেছিলাম কাল,হয়তো ওখানেই, রুমির কথা শেষ হওয়ার আগেই কৌশিক বলল,

-আমি নিয়ে আসছি

বলেই সে ওপরে চলে গেলো,অদ্রিজা রুমির হাত ধরে টেনে তার দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা করছে দেখে রুমি বলল,

-কী হয়েছে মাগো!

এই কথা বলার সময় রুমি টের পেলো,এই বাচ্চাটির ব্যাপারে তার অদ্ভুত একটা ভালো লাগা কাজ করছে,

-তাতুন হবে ওপয়ে,তলো তলো,

রুমির হাসি পেলো এবার কার্টুন কে তাতুন শুনে,অদ্রিজার দুটো গাল ধরে টিপে দিল সে,ইতিমধ্যেই ওপর থেকে কৌশিক নেমে এলো,

হাতে রুমির স্কুলের বইয়ের ব্যাগ,

-এই যে আপনার ব্যাগ,

রুমি ব্যাগ হাতে নিল,ততক্ষনে অদ্রিজা হাত ধরে টানাটানি শুরু করেছে ওপরে টিভিতে কার্টুন দেখতে যাবার জন্যে,মা ছাড়া এই শিশুটির মুখের হাসি অমলিন থাক সেটাই চাওয়া রুমির,তার মনে হলো,সে ওপরে না গেলে অদ্রিজা কাঁদবে।রুমি কৌশিককে অগ্রাহ্য করে কৌশিকের দিকে না তাকিয়েই বলল,

-আমি একবার ওপরে মাসিমার সঙ্গে দেখা করতে যাবো!উনি কী ঘুমোচ্ছেন?

-কাল থেকে শুধু তোমার কথাই ভাবছিলাম,কৌশিক বলল তুমি এসেছো,বললাম একবার ওপরে আসতে বল,কিন্তু আবার এটাও মনে হলো ও হয়তো তোমায় কিছুই বলবে না,

রুমি দেখলো আজ ঘরের মধ্যে অন্য আর একজন মহিলা,সম্ভবত বৃদ্ধার আয়া হবে,

-আসলে আমি আমার ফেলে যাওয়া ব্যাগটা নিতে এসেছি মাসিমা,

-জানি তো,একটু বসে যাও মা,মানিক আমার তোমায় দেখলেই বড়ো খুশী হচ্ছে,

এবার বৃদ্ধা ‘মানিক’মানিক’ বলে ডাকতেই অদ্রিজা আবার ঝাঁকড়া চুলে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে কোথা থেকে দৌড়ে চলে এলো,

-তলো,ওইথানে তিভি তা,

রুমি শব্দ করে হেসে বলল,

-এখন এইখানে গল্ল হবে,এইখানে চুপটি করে বসতে হবে তোমায়।

-তুত্তি কয়ে?

-হ্যাঁ চুপটি করে।

অদ্রিজা ঘরের এককোনায় রাখা একটা ছোট্ট চেয়ারে গিয়ে বসলো,ঠোঁটে আঙুল দিয়ে।

এই নিয়ে মোট পাঁচদিন হলো রুমি অদ্রিজার বাড়িতে গিয়ে তার সাথে নানানরকম ভাবে সময় কাটিয়েছে,কখনও রুমি অদ্রিজা আর বৃদ্ধা অনিমা তিনজনে একসঙ্গে বসে গল্প হাসাহাসি করেছে,রুমির জীবনে কাছের মানুষ বা আত্মীয়ের সংখ্যা খুবই কম,হাতে গুণে বলা যাবে সেই সংখ্যাটি,

রুমির গায়ের রঙ সাধারন শ্যামবর্ণ মেয়েদের সঙ্গে তুলনা করলে তাদের তুলনায়ও সে অনেকখানিই পিছিয়ে,ফলত শুধু তার গায়ের রঙের জন্যেই কোনও পাত্রপক্ষই আজ অবধি তাকে পছন্দ করেননি,কৌশিকও তাদের মধ্যেই একজন, অথচ রুমির আজও মনে আছে দাদু বলতো রুমির মুখে নাকি মিষ্টি বাতাস আছে,যা সরাসরি হৃদয়ে বয়ে বেড়ায়,রুমির চোখ আর হাসিতে নাকি ভুবন ভোলানো মিঠাস… বিকেল থেকে আজ জোকারের মতো সেজে বসে আছে রুমি,আজ তার সরকারি ভাবে অসম্মানের দিন,কেউ কিছুই বলতে পারবে না, ভাবতেই হাসি পেলো তার, রুমি জানে আজও দাদার কলিগের ভাই তার অস্বাভাবিক কালো রঙের জন্য তাকে অপছন্দ করবে এবং বাড়ির সকলে সেটা জেনেও রুমিকে এই অসম্মানের মুখোমুখি হতে বাধ্য করবে,ভাবতেই মনটা বিষিয়ে উঠলো রুমির,

-আমার আগের ওয়াইফ কেও বলেছিলাম,আসলে আমার মায়ের সঙ্গে একটু মানিয়ে চলতে হবে এই আর কি?

রুমি মনে মনে ঈশ্বরকে ডেকে ফেলল,ঈশ্বর যেন তাকে ধৈর্য্য দেন,মাথা নীচু করেই রইল সে,

দাদার কলিগের ভাই ভাই সজল এবার রোমান্টিক গলায় বলল,

-আপনি লজ্জা পাচ্ছেন,আজকালতো এসবের পাট চুকেই গেছে,জানেন তো লজ্জাই নারীর ভূষণ,আচ্ছা এখন আপনার মায়না কিরকম?

রুমি বোধহয় আর ধৈর্য্য ধরতে পারবে না,এই ছাদে দুটো চেয়ার পেতে দাদা যে রোমান্টিক পরিবেশ তৈরী করে দিয়ে গেছে তার জন্যে  তার মান সে রাখতে পারলো না,মনে মনে দাদাকে সরি বলে নিল,তারপর মাথা নীচু করে ধীরে ধীরে বলল,

-আমি কিছু টাকা নিজের জন্যে রেখে প্রায় পুরোটাই একটি এন জিও কে দিয়ে দিই। তাই আমার মায়নার হিসেব খুব কাজে আসবে না,আর একটা কথা,

সজলের কোনও উত্তর কানে এলো না , তা সত্বেও রুমি বলে চলল,

-আপনার মায়ের সমস্যা কোথায়?

-মানে

-মানে মানিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন আসছে কেন!তাছাড়া এই ইস্যুতে উভয়ের সমান দায়িত্ব থাকে।

তিন.

-তুই কী চাস বলতো,

-শান্তিতে বাঁচতে চাই মা,

-কাজল বলছে এই মেয়ে কোথাও গিয়ে দুদিনও টিকতে পারবে না, এমন ট্যাঙস ট্যাঙস কথা

মায়ের কথার উত্তর দিতে গিয়ে দরজায়  বৌদিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রুমি বলল,

-একটা কথা বলে দিই তোমাদের,আমার বিয়ে নিয়ে দয়া করে তোমরা আর মাথা ঘামিও না,

-কেন!তোমার কী নিজস্ব পছন্দ রয়েছে?

বৌদির গলায় ব্যাঙ্গ

-ধরে নাও তাই…

-তোমার এই গায়ের রঙে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কাছে নাজেহাল হচ্ছি আমরা,তা তোমার ইনি টি কী অন্ধ?

-বৌদি,দাদাকে এমাস থেকে আরও দু হাজার টাকা বেশি দেবো না হয়,

-তোমার টাকার জন্যে আমার উনোনে হাঁড়ি চড়া থেমে নেই রুমি,টাকার গরম দেখিও না,

-কেন ! আমার টাকা আছে,গরম নিলে অসুবিধে কী? তোমরা হাত পেতে নিচ্ছো প্রতি মাসে,গরম টাও অভ্যেস করে নাও এখন থেকে

-চুপ করো তোমরা,কেকা তুমি ওঘরে যাও। তুই থাম রুমি

আজ আর অফিস যেতেই ইচ্ছে করলো না রুমির। মনটা একদম খারাপ হয়ে আছে।

শান্তিনিকেতনের সামনে দাঁড়িয়ে রুমি বুঝলো এটা নিতান্তই ছেলেমানুষি হয়ে গেছে হয়তো,কিন্তু কিছুতেই সে আজ স্কুলে যেতে পারবে না,মনটা এতো খারাপ লাগছে,রিক্সাওয়লাকে যেন অজান্তেই এপাড়ার ঠিকানা বলেছে সে,

-ভাবছিলাম একবার আপনাকে ফোন করবো কিনা,

বাড়িতে ঢুকতেই সামনে কৌশিককে দেখে হতচকিত  রুমি।

-আমার ফোন নাম্বার আছে আপনার কাছে?

রুমি না জিজ্ঞেস করে পারলো না

-না না সেটাইতো সমস্যা হলো,বসুন আসার জন্যে অনেক ধন্যবাদ

-সে সব ঠিক আছে,অদ্রিজা কোথায়?কী হয়েছে, সবাই ভালো আছে তো!

গত কয়েকদিন যাবত কৌশিককে একদম অন্যরকম লাগছে রুমির, এ মানুষটা যেন একেবারেই অচেনা,

-মেয়ের কাল থেকে জ্বর,আমার আজ অফিস যাওয়াটা জরুরী ছিলো,কিন্তু রেবা আসছে না তারপর থেকে,মায়ের আয়ারা বাচ্চার কাজ করতে চান না।মা আপনার কথা বলছিলো। আসলে মা আপনাকে অদ্ভুত ভাবে ভরসা করছেন। কিছু মনে করবেন না। জানি এটা অন্যায় শোনাচ্ছে।

আমি আমার ফোন নাম্বার দিয়ে যাবো,যখন দরকার ফোন করবেন, আমি একটু ওপরে যাবো?

কৌশিক কে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল রুমি,

-এখন দুজনেই ঘুমোচ্ছে, বরং এখনেই একটু বসুন, আপনি চা খাবেন?তাহলে বানাতে পারি,

-হ্যাঁ খাবো,

-একটু বসুন আসছি,

কৌশিক রান্নাঘরে চলে গেল।

-আপনি একজন শিক্ষিকা,আজ স্কুলে যাননি!

-না যাইনি,,আপনাকে একটা কথা বলবো?

-বলুন,

-আপনি অনুমতি করলে আমি এখানে কিছুক্ষনের জন্যে আছি,আপনি চাইলে অফিস যেতে পারেন,বলছিলেন দরকার আছে,

-অনেক ধন্যবাদ,কিন্তু একটু আগে জানলে সুবিধা হতো,তবে যাবোনা ডিসাইড করে ফেললে আর যেতে ইচ্ছে হয় না,

চা খেতে খেতে কথা হচ্ছিল রুমি আর কৌশিকের,

-যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা কথা বলবো,

কৌশিক যে এতো বিনয়ের সঙ্গে কথা বলতে পারে এটা এই প্রথম জানলো রুমি, বলল,

-নিশ্চয়ই,, কী কথা বলুন,

-আমার আসলে খুব খিদে পেয়েছে,আপনি খাবেন!তাহলে কিছু একটা বানাবো,

-আপনি সকালে ব্রেকফাস্ট করেন নি?

-না মানে, আজ গঙ্গা দিও আসেনি।আসলে আমি ডিসিশন নিতে পারিনা কী খাবো,

-আমি হেল্প করবো?

-করবেন?খুব ভালো হয় তাহলে,আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি,

এরপর একঘন্টা কেটেছে,শুধু নানানরকম গল্পে,এতটুকু একঘেয়েমি ছিলনা তাতে,এই প্রথম রুমি কারো সাথে এতক্ষন কথা বলল,বা বলা ভালো,এই প্রথম কেউ রুমির সাথে এতক্ষন কথা বলল,পাঁউরুটি টোস্ট ওমলেট মিষ্টি, মাঝে আর একবার চা,রুমি যখন ঘড়ির দিকে তাকালো তখন পৌনে বারোটা,কিছু না ভেবেই সে এখানে চলে এসেছে এখন কী করবে বুঝতে পারলো না,এই অসময়ে বাড়িতে ফিরে গেলে মা হাজার প্রশ্ন করবে স্কুলে না যাওয়ার জন্যে,

-মিমিটা কতন এলো

অদ্রিজার গলা রুমি সব সমস্যার সমাধান যেন এমনিই করে দেয়,

-এইতো আমি,এখানে বসে বসে ভাবছি কখন মানিক আসবে

এবার খিল খিল করে হেসে উঠল অদ্রিজা,রুমিকে হাত ধরে তার ঘরে নিয়ে যেতে লাগলো,

-আপনি এখানে লাঞ্চ করবেন!তাহলে খাবার আনাবো,

রুমি আর অদ্রিজা তখন রেললাইনের ওপর দিয়ে রেলগাড়ি চালাতে ব্যাস্ত।ঘুরে তাকিয়ে রুমি বলল,

-কী আনাবেন,

রুমি টের পেলো সে বেশ সচ্ছন্দ কথা বলছে,গত কয়েকদিন যাবত এই বাড়িতে সে যথেষ্ঠ স্বচ্ছন্দ,যা তার স্বভাব বিরুদ্ধ, বিশেষ করে কৌশিকের সঙ্গে সে এতো সহজভাবে কথা বলতে পারবে স্বপ্নেও ভাবেনি,

-আপনি সাজেস্ট করুন না প্লিজ!

কৌশিকের অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল রুমি,বলল,

-আচ্ছা দেখি মাসিমার সঙ্গে একবার কথা বলে আসি,

-মায়ের টা আমি বলতে পারবো, আপনি শুধু আমার আপনার আর মেয়ের টা বলুন,

-রুমি ভেবে ভেবে খাবার বলে দিল,

চার.

-আমাকে গত দশ বছরে দশ হাজার পাত্র দেখতে এসে অপছন্দ করেছে মাসিমা,তাহলে আর বিয়ে কী করে হবে বলুন!

অনিমা চ্যাটার্জী কৌশিকের মা, যার দুটো পা-য়েই কোনও প্রান নেই, তিনি এই মেয়েটির কথার ভেতরের লুকোনো কান্না টা বোধহয় ছুঁতে পারলেন,বললেন

-ভাগ্যিস কেউ পছন্দ করে নিয়ে চলে যায়নি,, তাই আমি তোমার মতো এমন মিষ্টি মনের একজন মানুষের দেখা পেলাম,

রুমির বোধহয় কান্না পাচ্ছে,সে মাথা নীচু করলো,

অনেক দিন পর দুপুরে এত খাওয়া হয়ে গেলো রুমির,অদ্রিজা খাওয়ার একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়লো,কৌশিকের ঘরে কৌশিক আর রুমির আড্ডা চলছে,

-থ্যাংকস,সকালে যখন গঙ্গা দি ফোন করে জানিয়েছে আসতে পারবে না, তখন সত্যিই ঘাবরে গিয়েছিলাম,আপনাকে কী যে বলি, খুব ভালো মেয়ে আপনি,আর খুব উপকারিও ।

বলেই হাসতে লাগলো কৌশিক,

-অথচ সেদিন সুপ্রিয়দা কে বলেছিলেন, এইরকম দাঁড়কাকের মতো একটা মেয়েকে বিয়ে করবো, কী করে ভাবলে?

কৌশিক চোখ তুলে তাকালো,এক মুখ বিষন্নতা,চৌখ এড়ালোনা রুমির বলল,

-আপনার কানে এ কথাটা পৌঁছনো উচিত হয়নি,তবে সেদিন আপনাকে ঠিক এই ভাবেই দেখলে এ কথার প্রশ্নই আসতো না,তবে যা বলেছি সেটা কোনও মেয়ের সম্পর্কেই বলা ঠিক নয়, আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি,অনুরাধা সুন্দরী তাই বিয়ে করেছিলাম,কিন্তু,

-কিন্তু কী

-আমরা কেউই মেয়ের জন্যেও একসঙ্গে থাকতে চাইলাম না,সাফার করছে মেয়েটা,

-আমি যদি আজ আর কিছুক্ষন থেকে যাই আপনি আপত্তি করবেন?

-আমি ভয় পাচ্ছিলাম বলতে,আপনি থাকলে ভরসা পাচ্ছি,কোথাও একটা নিশ্চিন্ত ভাব নিজে থেকেই ফিল করছি,

-বাড়িতে একটা খবরে দিতে হবে,

-কী ভাবে খবর দেবো বলে দিন,

-যেভাবে খবর দিলে ওরা আর চিন্তা করবেনা আমার জন্যে,

কৌশিক রুমেলার পাশে গিয়ে বসলো, বলল,

-রুমেলা,একবার আমি আপনাকে ফিরিয়েছি,আমি খারাপ তাই, আপনি ভালো,আমার মতো ভুল করবেন না প্লিজ। আমি ফিরতে চাইনা, আমি আবার নতুন করে বাঁচতে চাই।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..