লাইটার

সজল কুমার মাইতি
গল্প
Bengali
লাইটার

” স্যার, আমাদের প্রজেক্ট তৈরির জন্য আপনার হেল্প জরুরি। আজ আমরা সবাই আছি। যদি একটু ডিসকাস করে দেন, আমাদের সুবিধা হয়। আমরা প্রজেক্টের কাজ শুরু করে দিতে পারি।” রিয়া তার স্যার শিবরাম চক্রবর্তীর উদ্দেশ্যে কথা গুলি বলে।
শিবরাম চক্রবর্তী খড়্গপুর আই আই টির অধ্যাপক। থাকেন ক্যাম্পাসের টিচার্স কোয়ার্টারে। আসল বাড়ি কলকাতার সল্টলেকে আই এ ব্লকে। আই এ পার্কের ঠিক বিপরীতে একটি সুন্দর দোতলা ছবির মতো বাড়ি। ছুটি ছাটাতে বাড়ি এলে এই পার্কে মর্নিং ওয়াক করেন প্রতিবেশী বন্ধুদের সাথে। পার্কের সিনিয়র সিটিজেন শেডে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সময় ও কাটে। তা এই শিবরামবাবুর ফাইনাল সেমের ছাত্রছাত্রী হল রিয়া, সৌমী, অর্কদীপ, গুরদীপ ও নলিনী। গুরদীপ ও নলিনী অবাঙালি হলেও বাংলা বোঝে। ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতে ও পারে। সেই জন্য শিবরাম বাবু বাংলা ইংরেজি মিশিয়ে ক্লাসে ডিসকাশন করেন। ছাত্রছাত্রীদের বলেন ” ইউ সি, ইউ হ্যাভ টু ফলো রুলস অর ফর্ম্যাট ফর আ প্রজেক্ট। স্টাটিং ফ্রম ইনট্রোডাকশন টু রেফারেন্স। এভরি পয়েন্ট হ্যাজ টু বি টেকন কেয়ার অফ। অ্যান্ড দে হ্যাভ টু বি ডিসকাসড ইন ডিটেল।” “প্রতিটি স্টেপ যেগুলো বললাম তোমাদের প্রজেক্টে থাকতে হবে। প্রত্যেকটির আলোচনা ও জরুরি। ডু ইউ গেট ইট?” প্রফেসর চক্রবর্তীর অংশে পড়া এই পাঁচ ছাত্রছাত্রীর প্রজেক্ট কমপ্লিট করার দায়িত্ব তার। সেজন্য সবাইকে আলাদা আলাদা টপিক দিয়ে কিভাবে প্রজেক্ট করতে হবে সব বুঝিয়ে দেন। স্টুডেন্টরা স্যারকে বিদায় জানিয়ে নিজেদের হস্টেলে ফিরে যায়। এখানে ছাত্র শিক্ষক সবাই যাতায়াত করে সাইকেলে চড়ে। বিশাল এই ক্যাম্পাসে সাইকেলই পরিবেশবান্ধব যান।
প্রফেসর চক্রবর্তীর ছোট্ট সংসার। স্বামী স্ত্রী ও এক ছেলে। বিদুষী স্ত্রী ব্যাংকে চাকরি করতেন। কিন্তু ছেলে মানুষ করার জন্য চাকরি ছেড়ে দেন। ছেলের পড়াশোনার সব দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন। ছেলে ও মা বাবার মতো বুদ্ধিমান। তার প্রতিভার প্রমাণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে রেখেছে। তা সত্ত্বেও মায়ের আশঙ্কা থেকে যায়। ছেলেকে বলেন ” বাবু, দেখ বাবার মুখ রাখিস। ভাল রেজাল্ট না করলে কোথাও চান্স পাবিনা। জয়েন্টে ভাল Rank না করলে আই আই টিতে চান্স পাওয়া কঠিন।” ” হাঁ মা। আমার মাথায় আছে। তুমি চিন্তা কোর না।” ছেলের ভরসায় মা আশ্বস্ত হন। আই আই টি খড়্গপুর ক্যাম্পাস, সল্টলেক আই এ ব্লকের বাড়ি, পড়াশোনা এই সবের মধ্যে দিয়ে দিন কেটে যায়। বাবু আজ জয়েন্টে আশানুরুপ খুব ভাল Rank করেছে। খুব সহজে বাবার আই আই টি খড়্গপুরে চান্স পেয়ে গেছে। বাবা মায়ের আজ বড় আনন্দের দিন। খুশির হাওয়া আজ চক্রবর্তী বাড়ির আনাচে কানাচে।
শারদীয়া দূর্গা পূজোর ছুটিতে চক্রবর্তী ফ্যামিলি সল্টলেকের বাড়িতে ছূটি কাটাতে এসেছেন। সল্টলেকের প্রতিটি ব্লকেই দূর্গা পূজো হয়। এখানকার পূজোর আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য আছে। পূজোর চারদিন ব্লকের সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া দাওয়া করে। বাজার করা থেকে খাওয়া দাওয়ার সব দায়িত্ব পুরুষদের। আর পূজো সামলানোর সব দায়িত্ব মেয়েরা নিজেদের কাঁধে তুলে নেন। বাড়ির রান্না বান্না এই কদিন বন্ধ। আর একটি এখানকার বৈশিষ্ট্য হল প্রতি রাতে প্রতিটি মন্ডপে কালচারাল অনুষ্ঠানের আয়োজন। ব্লকের ছেলে মেয়ে বউরা সবাই এতে পার্টিশিপেট করেন। হইহুল্লোড়ে কখন যে চারটে দিন কেটে যায় কেউ বুঝতে পারে না। আর ভাসানের (বিসর্জন) আগে মহিলাদের সিঁদুর খেলা এই আনন্দকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয়। দূর্গাপূজোর বিসর্জন সে আর এক মিলনযাত্রা। ঢাকবাদ্যি সহযোগে উদ্দাম নৃত্যের বর্নাঢ্য শোভাযাত্রা। বিদায় ও যে এতো আনন্দের হয় না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। মিসেস চক্রবর্তী ও ব্লকের মহিলাদের পূজোর কাজে হাত লাগান। সবার সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন। ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে চেস খেলা ও আড্ডায় জমে ওঠে। আর, প্রফেসর চক্রবর্তী পাড়ার বন্ধু প্রতিবেশীদের সঙ্গে পূজোর আনন্দে মেতে ওঠেন। কাজের মেয়েরা মালতী ও আনন্দী। একজন বাড়ি ঘরের সবকাজ করে অন্যজন রান্না করে। মিসেস চক্রবর্তী কাজের মেয়েদের ডেকে বলেন ” মালতী, আনন্দী এই নাও। তোমাদের জন্য দাদা এই দুটি দামি শাড়ি এনেছেন। পূজোতে তোমরা পরবে। আর তোমাদের বাড়ির সবার জন্য এই মিষ্টির প্যাকেট। বাড়ির সবাইকে দিও। বাবুর রেজাল্ট খুব ভাল হয়েছে তো। বাবা যেখানে পড়ান সে জায়গায় ভর্তি হয়েছে।”
মালতী আনন্দী দুজনেই একসঙ্গে বলে ওঠে ” ও ও ও। এতো বড় আনন্দের খবর। বাবুতো ভাল করবে আমরা সবাই জানতাম। বৌদি তোমার ছেলে তো লক্ষীমন্ত। গর্ব করার মতো।” ওরাও সবাই খুশীতে ডগমগ। এই উপহার পেয়ে আনন্দ আর ধরে না। প্রতিবেশী ভট্টাচার্যবাবু তো একদিন বলেই বসলেন ” প্রফেসর চক্রবর্তী, ছেলের তো ফাটাফাটি রেজাল্ট। এবার ট্রিট না দিলে ছাড়ছি না।”
” তা আর বলার অপেক্ষা রাখে? একদিন আমরা সবাই মিলে একটা ভাল রেস্টুরেন্টে যাব। খাওয়া দাওয়া সব হবে।”
” ঠিক আছে তাই ভালো।” ভট্টাচার্যবাবুর সংযোজন।
এদিকে ব্লকের মহিলারা মিলে মিসেস চক্রবর্তীকে পাকড়াও করেছে। ব্লকের কালচারাল অনুষ্ঠানে ওনাকে গান গাইতে হবে। মিসেস চক্রবর্তীর গানের গলা খুবই ভাল। একসময় নিয়মিত চর্চা করতেন। ” মিসেস চক্রবর্তী, নবমীর রাতের অনুষ্ঠানে আপনার সোলো প্রোগ্রাম। আপনাকে গান করতে হবে। এবারে আমরা আপনাকে ছাড়ছি না।” ব্লকের মহিলাদের আব্দার।
” ঠিক আছে। ঠিক আছে। ছেলের পরীক্ষার চাপে আমার অনেকদিন চর্চা বন্ধ। তবু দেখব একবার চেষ্টা করে।”
অনুষ্ঠানের রাতে মিসেস চক্রবর্তী শুরু করলেন ‘এই লভিনু সঙ্গ তব’ দিয়ে এবং শেষ করলেন ‘ কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ দিয়ে। জমাটি আসরে শোতৃবর্গ মুহুর্মুহু করতালির মাধ্যমে তাদের প্রাপ্তির পূর্ণতা প্রকাশ করেন।
দূর্গাপূজোর সূখস্মৃতি সঙ্গী করে সল্টলেকের পাততাড়ি গোটাতে হয়। আবার খড়্গপুরের পথে রওনা দেন চক্রবর্তী ফ্যামিলি। সেই রুটিনে বাঁধা জীবন আবার শুরু। ক্লাস, প্রজেক্ট, পরীক্ষার চক্রবৎ পরিক্রমণ। দেখতে দেখতে ছেলে ক্লাসের পর ক্লাস সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যায়। ফাইনাল সেমের আগে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউতে নামী এক কোম্পানিতে চান্স পায়। কিন্তু ছেলের ইচ্ছে গবেষণা করা। অগত্যা, ফাইনাল সেমের ঝকঝকে রেজাল্ট নিয়ে বিদেশ পাড়ি দেয়। আমেরিকার ক্যালিফর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে গবেষণার জন্য জয়েন করে। অবশ্যই মাসিক স্টাইপেন্ড পাওয়ার ব্যবস্থা ও হয়। মেধাবী ছাত্র ধারাবাহিক উজ্জ্বল রেজাল্টের ট্রাক রেকর্ড নিয়ে কয়েক বছরের মধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে জয়েন করে। সান ডিয়াগোতে নিজের পাকাপাকি থাকার জন্য একটি বিশাল ফার্নিস্ট ফ্ল্যাট কিনেছে। চক্রবর্তী ফ্যামিলির বাবু আজ আমেরিকার গ্রীন কার্ড হোল্ডার।
এদিকে প্রফেসর চক্রবর্তী রিটায়ার করেছেন। আই আই টির পাততাড়ি গোটানো শুরু হয়ে গেছে। খড়্গপুরের এই ক্যাম্পাসের কোয়ার্টার ছেড়ে সল্টলেকের বাড়িতে পার্মানেন্টলি চলে আসেন। সল্টলেকের বাড়ি নতুন করে রঙ করানো হয়। নতুন করে সাজানো হয়। এটাই তো এখন স্থায়ী আবাস। এখন অফুরন্ত সময়। সকাল বিকেল দুবেলাই ওয়াক করেন। মর্নিং আর ইভনিং ওয়াক। শরীর ও ভাল থাকে আর বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে আড্ডায় সময় কেটে যায়। বন্ধুর সংখ্যা ক্রমশ বর্ধমান। পুরোনোরা তো ছিলই নিত্য নতুন সংযোজন হয়েছে।
প্রফেসর চক্রবর্তী কখনও বাড়ির সামনের পার্কে হাঁটেন, কখনও আবার ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলেন। সল্টলেক একটি প্ল্যান্ড সিটি হওয়াতে এর সবকিছুই মোটামুটি সিস্টেমেটিক। ফুটপাথগুলি চওড়া ও পরিচ্ছন্ন। এখানে লোকসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। রাস্তায় সেই কারণে লোকের তেমন ভিড় থাকে না। প্রফেসর চক্রবর্তী ও মিসেস চক্রবর্তী যখন একসাথে হাঁটতে বেরোন তখন ফুটপাথ ধরেই হাঁটেন। সল্টলেকের বাসিন্দারা নিজেদের বাড়ি সংলগ্ন ফুটপাথ গুলিকে বেড়ার বেষ্টনীতে ঘিরে নিজেদের পছন্দসই ফুল ও ফলের গাছ লাগিয়েছেন। তাদের যত্ন ও করেন। সেই শিউলি ফুলের সুবাসে বাতাস আমোদিত হয়। লাল সাদা রঙের কাঠ গোলাপের মিহি মিষ্টি দীর্ঘস্থায়ী সুগন্ধ গ্রীষ্মের দাবদাহ সহনে পথিককে কিঞ্চিৎ হলেও সাহায্য করে। মিষ্টি বকুলফুল ও এর দোসর। বিভিন্ন বাড়ির সামনে রকমারি পাতাবাহার নয়নাভিরাম দৃশ্য সৃষ্টি করে পথচারীকে থমকে যেতে বাধ্য করে। কেউ কেউ আবার ওই জায়গায় সব্জির ছোট্ট খাটো গাছ লাগিয়েছেন। কোথাও ঢ্যাড়স, বেগুন, টমেটো। আবার কোথাও লঙ্কা, লেবু, পেঁপে ইত্যাদি গাছের বিক্ষিপ্ত সমাবেশ। কোথাও আবার মাধবীলতার গুচ্ছ ফুলরাশি গৃহকর্তার গৃহদ্বার সজ্জিত করেছে। অর্কিড, মরসুমী রঙিন ফুল, দেওদারসারি পথিককে পথভ্রান্ত করে। প্রতিবারই স্বাস্থ্য চর্চা ভ্রমনে চক্রবর্তী পরিবার এই দৃশ্যরাজি নতুন নতুনভাবে উপভোগ করতে করতে ভ্রমনযাত্রা সম্পন্ন করেন।
প্রফেসর চক্রবর্তী একা ওয়াকে বেরুলে পার্কেই যান বেশি। তখন বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটেন। সিনিয়র সিটিজেন শেডে বসে আড্ডায় অনেকটা সময় কাটান। আজ প্রফেসর চক্রবর্তীর সঙ্গে আছেন ভট্টাচার্যবাবু, গাঙ্গুলি, চট্টরাজ, মনিরুল ও সামন্ত। এদের মধ্যে ভট্টাচার্যবাবু খুবই উইটি। তার রসরঙ্গে ভরা বার্তালাপ আড্ডায় অন্য মাত্রা এনে দেয়। ভট্টাচার্যবাবু গাঙ্গুলিকে বলেন ” আপনি তো মশাই এডস আক্রান্ত।” এই কথা শুনে গাঙ্গুলির চোখ তো কপালে ওঠার জোগাড়। জিজ্ঞেস করেন ” তার মানে? কি বলছেন আপনি?” গাঙ্গুলিকে রীতিমতো ক্রদ্ধ দেখায়।
” আরে রাগ করেন কেন গাঙ্গুলি? এতে রাগ করার মতো কিছু তো বলিনি। এডস মানে হল ‘অ্যাকিউট ইনকাম ডেফিসিয়েন্সী সিমড্রোম।” আপনি প্রায়শই টাকার অভাবের কথা বলেন। মেয়ের ট্রেনিং এর খরচ, ছেলের পড়াশোনার খরচ। এই সব খরচ সামাল দিতে আপনার মতো রিটায়ার্ড পারসনের পক্ষে নাভিশ্বাস। সেজন্যই তো এডস বলা।” এতক্ষনে গাঙ্গুলির মুখে হাসির রেখা দেখা যায়। অন্যেরা অট্টহাস্যে উদ্বেলিত।
ইতিমধ্যে চক্রবর্তী ফ্যামিলির বাবু দেশে ফেরার পর বাবা মা মিলে আগে থেকে ঠিক করা এক মেয়ের সঙ্গে ধূমধাম করে বিয়ে দেন। বিয়ের পরই বাবু বউকে নিয়ে বিদেশ পাড়ি দেয়। কিছু দিনের মধ্যে বউমা ও ঐ দেশে একটি চাকরি জোগাড় করে নেয়।
এরপর কয়েক বছর কেটে যায়। বউমা সন্তানসম্ভবা হয়। বাবা মার ডাক পড়ে ক্যালিফর্নিয়ার সান ডিয়াগোর ফ্ল্যাটে যাওয়ার জন্য। তড়িঘড়ি পাসপোর্ট রিনিউ করা হয়। ভিসার ইন্টারভিউর জন্য কলকাতার আমেরিকান সেন্টারে যেতে হয়। কপাল জোরে এক চান্সেই ভিসার ক্লীয়ারেন্স পাওয়া গেল। প্লেনের টিকিট বুকিং ও কমপ্লিট। জামাকাপড় গোছানো ও অন্যান্য কাজ ও শেষ পর্যায়। আমেরিকা যাওয়ার আগে আজ শেষ দিন। বন্ধুদের সঙ্গে পার্কে আড্ডার সময় বিদায় জানান প্রফেসর চক্রবর্তী। রসরাজ ভট্টাচার্যবাবু হঠাৎ বলেন ” প্রফেসর সাহেব, আপনারা তো ছেলের কাছে ‘আই এ এস’ হিসেবে যাচ্ছেন?” এইকথা শুনে প্রফেসর চক্রবর্তী হতবাক। জিজ্ঞেস করেন ” কি বল্লেন? আই এ এস? মানে?” হাসতে হাসতে ভট্টাচার্যবাবু ব্যাপারটা ভাঙেন ” আই এ এস মানে ইন্ডিয়ান আয়া সার্ভিস। ছেলের কাছে গিয়ে তো আপনাদের বাচ্চা সামলাতে হবে। বকলমে আয়ার কাজই করতে হবে। তাইতো আই এ এস।” আড্ডায় হাসির রোল ওঠে।
সান ডিয়াগোর ফ্ল্যাটে যখন মিস্টার ও মিসেস চক্রবর্তী পৌঁছন, তখনও বউমার বাচ্চা হওয়ার দুসপ্তাহ বাকি। এখনো বউমাকে অফিস যেতে হচ্ছে। ছেলে বউমা দুজনেই ব্রেকফাস্ট করে অফিস বেরিয়ে যায়। ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যায়। তখন সারাদিন বুড়ো বুড়ি একা। বিশাল ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে দুজনে সমুদ্র দেখেন। সামনে সুন্দর ভিউ। মুক্ত আকাশ। বিস্তৃত জলরাশি নিয়ে উত্তাল সমুদ্র। সেই সমুদ্রের জলে স্বল্প পোষাকের নারীপুরুষ রাফটিং করে। অনেকেই আবার প্রায় বস্ত্রহীন অবস্থায় সানবাথ নেয়।
মিসেস চক্রবর্তী এখানে কিচেনের দায়িত্ব নিয়ে ছেলে বউমার জন্য নিত্য নতুন পদের সৃজন করেন। একদিন দুপুরের খাওয়ার পর প্রফেসর চক্রবর্তী স্ত্রীকে বলেন ” চল। আজ একটু বেড়িয়ে আসি। ওরা ফেরার আগেই ফিরে আসব।”
” তুমি এখানকার কিছুই তো জান না। কোথায় যাবে?”
” একটা বাসে উঠে পড়ে যতদূর যাওয়া যায় যাব। আবার ওই বাসেই ফিরে আসব। একেবারে মূর্খতো নই? দরকার হলে লোককে জিজ্ঞেস করে নেব। আগে তো বের হও। তারপর দেখা যাবে।”
হেঁটে হেঁটে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর একটা বাসে উঠে বসে দুজনে। এই বাসে ড্রাইভার ও কন্ডাক্টর দুজনে মহিলা। এখানকার বাসগুলো অনেক ঝকঝকে। কলকাতার বাসের মতো এই বাসে ভিড় নেই। বাসের গতিও অনেক গুন বেশি। বাসে দুজনে পাশাপাশি সিটে বসে। বাড়িঘর মনুমেন্ট দেখতে দেখতে এগিয়ে চলে। বাসে হৈচৈ এর ব্যাপার নেই। নির্দিষ্ট স্টপে অল্প স্বল্প যাত্রী ওঠা নামা করে। কিছু বিশাল চেহারার নিগ্রো যাত্রী ও আছে। বাসের টার্মিনালে পৌঁছে দুজনে নেমে পড়ে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারে কাছাকাছি এক মিউজিয়াম আছে। সেখানে গিয়ে দেখে মন ভরে যায়। সেখানে কোন দেশের অ্যাবঅরিজিনালদের ব্যবহৃত সামগ্রী নেই? বহু দেশের জিনিস দেখে আপ্লুত হন। দেখা শেষে একই বাসে বাসায় ফিরে আসেন।
কয়েক দিন পর বউমা নার্সিংহোমে ভর্তি হয়। কোল আলো করে প্রমান ওজনের এক পুত্র সন্তান চক্রবর্তী ফ্যামিলিতে নতুন সদস্য হিসেবে জয়েন করে। দাদুদিদুর আয়া সার্ভিস শুরু হয়ে যায়। দেখতে দেখতে ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে আসে। কলকাতা ফেরার টিকিট কাটা হয়ে গেছে। ছলছল চোখে নাতিকে আদর করতে করতে দাদুদিদু দূজনে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ছেলে গাড়ি করে মা বাবাকে পৌঁছে দেয়। ভারাক্রান্ত মনে উভয় পক্ষ বিদায় জানায়। প্লেন আকাশে ওড়ে স্মৃতির বোঝা নিয়ে।
দিন মাস বছরের পর বছর অতিক্রান্ত। এখন প্রফেসর চক্রবর্তী অশিতিপর। মিসেস চক্রবর্তী ও প্রায় তাই। দুই বৃদ্ধ বৃদ্ধার বাড়ির সঙ্গী কেবল কাজের লোকেরা। ছেলে বউমা নাতির সঙ্গে যোগাযোগ কেবল ইমেইল, হোটাসআপ আর ফোন কলের মাধ্যমে। আমেরিকা ও ভারতের সময়ের বৈপরীত্যের জন্য সেই যোগাযোগ ও নিয়মিত সম্ভব হয় না। বার্ধক্যজনিত কারণে শরীর এখন বোঝা। মর্নিং কিংবা ইভনিং ওয়াক ও আর নিয়মিত সম্ভব হয় না। বেশির ভাগ সময় গৃহ বন্দি।
একদিন মিসেস চক্রবর্তী প্রফেসর চক্রবর্তীকে বলেন ” শুনছো? বাবুকে একবার ফোন কর না। অনেক দিন কোন খবর নেই। কত বছর হয়ে গেল দেখিনি ওদের সবাইকে। কত দিন হল বাড়ি আসে নি ছেলেটা।” স্ত্রীর কথামত প্রফেসর চক্রবর্তী ফোন লাগান। কয়েকবার রিং হয়ে কেটে যায়। নো রিপ্লাই। আবার ও ট্রাই করেন প্রফেসর চক্রবর্তী। অবশেষে অপর প্রান্ত থেকে উত্তর আসে। ” হ্যালো? হ্যালো?”
” বাবু, আমি বাবা বলছি। তোরা সবাই ভাল আছিস?”
” হ্যাঁ। এখন রাখ। আমার একটু তাড়া আছে।”
” তোর মা একটু কথা বলবে। ধর।” প্রফেসর চক্রবর্তী ফোন স্ত্রীকে দেন।
” বাবু, তোরা সবাই ভাল আছিস তো? দাদু ভাই কত বড় হয়ে গেল। কতদিন দেখিনি।”
” কি বলবে তাড়াতাড়ি বল। আমার আজ একটা ইমপর্টেন্ট মিটিং আছে। তুমি রাখ এখন।” ও প্রান্ত থেকে বাবু ধমক লাগায়।
” কত দিন দেখিনি তোদের সবাইকে। একটিবার বাড়ি আসতে ইচ্ছে করে না রে? বুড়ো মা বাবাকে একটিবার দেখতে মন চায় না? আজ না হোক কাল তো মা বাবার মুখে আগুন দিতে আসতে হবে রে। না তাও কি আসবি না?”
অপর প্রান্তে বাবু ফোন কেটে দেয়। এ প্রান্তে ফোন হাতে মা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের অদৃষ্টকে দোষারোপ করেন।
এই ফোনালাপের মাস খানেক পরে আমেরিকা থেকে বাবুর পাঠানো একটি পার্শেল আসে। প্রফেসর চক্রবর্তী পিয়নের কাছ থেকে পার্শেল নিয়ে স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেন ” ওগো শুনছো? দেখ তোমার ছেলে কি পাঠিয়েছে।”
মিসেস চক্রবর্তী ত্রস্ত পায়ে দৌড়ে আসেন। স্বামীর হাত থেকে পার্শেলটা প্রায় ছিনিয়ে নেন। অধীর আগ্রহে কম্পমান হাতে বন্ধ পার্শেল ছিঁড়ে ফেলেন। ভেতরে কয়েকটা পেপার রোল থেকে বেরিয়ে একটি ছোট্ট লাইটার। মিসেস চক্রবর্তী কিছু বুঝতে না পেরে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রফেসর চক্রবর্তী স্ত্রীকে বলেন ” কি হল? কিছু বুঝতে পারছ না? তোমার ব্যস্ত ছেলে মূখাগ্নির বিকল্প পাঠিয়েছে।” মিসেস চক্রবর্তীর ধীর বোধোদয় হয়। নিশ্চল শরীরে লাইটার হাতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন। দুচোখে অঝোর ফল্গুধারা ঝরতে থাকে…..।

সজল কুমার মাইতি, পিএইচডি। লেখক ও অধ্যাপক। জন্ম ও বাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতায়। তিনি মূলত গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে থাকেন। লেখালিখি শখের হলেও পেশাগত জীবনে তিনি ভারতের সরকারি কলেজ 'হুগলী মহসীন কলেজ'--এর বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান। এর...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..