লাইমুন নাহার সীমার কবিতা

লাইমুন নাহার সীমা
কবিতা
Bengali
লাইমুন নাহার সীমার কবিতা

নাগরিকত্ব

আমার ধসে যাওয়া কাদামাটি দিয়ে
তুমি গড়ে নিলে তোমার নতুন ঘরের স্তম্ভ
আমার স্বপ্নের ভগ্নাংশ জুড়ে জুড়ে বুনে নিলে নব্যপ্রাচীর
আমার চোখের সবটুকু সুখের মূলধন দিয়ে
অন্যকোন চোখের ভূমিজুড়ে আবার নতুন করে শুরু করলে কুঠিরশিল্প,
এভাবে আমার সীমানায় জুড়েদিলে ম্যাকনামারা লাইন
আমি তোমায় সায়ত্ত্বশাসনেরর নাগরিকত্ব হারালাম আমি,উদ্বাস্তুুর মত ভাবছো আমার সারসংক্ষেপ নিয়ে তোমার জানালায় মুসাফির হবো, গড়িয়ে পড়বো বেদনার দোহায়ে?
গড়িয়ে যাবো?তোমার ঘরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভদ্রা নদীটির মতো?
না!
তুমি যদি জলপোকার গান বুঝতে হে প্রিয়
তবে তুমি আমায় বুঝতে
যদি তুমি ভেঙে যাওয়া মৃৎশিল্পে স্রস্টার স্নেহের গন্ধ বুঝতে
তবে তুমি আমায় বুঝতে
যদি তুমি শেষ বিকেলের কন্ঠে স্বরচিত আত্মহননের মহাকাব্য শুনতে
তবে তুমি আমায় বুঝতে
আমায় বানান করে লিখে, জং ধরে যাওয়া পোষ্ট অফিসের হৃদয়ে যদিও সহজে প্রেরণ করে দিলে-
তবু যেন আমি সেই আদিম প্রেম,
যে প্রেম কেবল হাতে মেখে রাখে বর্ণের ধূপমাখা সুগন্ধি আবেগ,এতো চিরন্তন,
আমি চলে যাচ্ছি
চর্যাপদের কাহ্ন পার কাছে,কিংবা ভুসুকূপার সেই সান্ধ্যভাষার শ্লোকে
কিংবা কে বলতে পারে মৈত্রয়ী দেবীর নহণ্যতে, মির্চা এলিয়াদের, ন লুই বাঙালী
কিংবা সুণীলের রাণু ও ভাণুর সেই ভাণুদাদার হারানো বেদনা হতে
আমি চলে যাচ্ছি..
আমারও একটি স্বরচিত স্বায়ত্তশাসনের খোঁজে
আমার ভেতর আমারই নাগরিকত্ব আদায়ের আন্দোলন
আমি চললাম…

 

উন্মাদ প্রত্নতাত্ত্বিক

তুমি তাতে কি এসে গেল?
শুষ্ক হয়ে চির ধরে যখন কর্তব্যহীন ভালোবাসায়
যখন নিদ্রার কূল ভেঙে যায় গভীর রাতের নি:শ্বাসের গুমো শব্দে
যখন তোমার কথাহীন কথার বিভৎস চিৎকারে আমার উপস্থিতি জুড়ে বিভ্রাট জন্মে
আমি কোকিলের মৃত সুর শুনে কখনো বসন্তকে চিনিনি
কখনো বাসন্তী রঙা উর্বর দু:খ আমায় হাত ধরে নিয়ে যায়নি
কিংবা আমার পায়ের আঙুলে শীতের কঙ্কাল জেগে ওঠেনি বিদায়ী কান্নায়
আমি এসব কিছু মানিনা
এ ফুলের অপচয়, প্রকৃতির ক্যান্সার,হাতের ভেতর গুজে থাকা ইতস্তত ব্যাকুল প্রণয়ের সফেদ দলিল,পর্চা
এসব কিছুই আমার নেই ছিলোনা,থাকবেনা কোনদিন
আমার চতুর্থর্দিকে যে মায়ার ফর্দ,ক্যাকটাসের শরীরের মত ভয়াঙ্কর সুন্দরের ফাঁদ
সেসবে আমি তার চোখের গুহাচিত্রে খুঁজে ফিরি আমার আদিম জীবাশ্ম
যেন আমি কোটি বছরের এক বাউণ্ডুলে, উন্মাদ প্রত্নতাত্ত্বিক।

অসীম পিয়াশা

কেন যে বাড়াও তৃষ্ণা
আমি যে চাতক হয়েই জন্মেছি গো ধরাতে
কেন গো বাড়াও দুহাত,আমিতো জানি কেবল শূণ্যতায় ভরাতে।।

কেন কুসুম সাজাও গো হায়
আমি তো ঝরিয়াছি বৃন্তে
কেন গো হায় দেখাও সীমান্ত
আমিতো হারিয়েছি অনন্তে

আমার এ বেদন,কেবলই আমার
এ নয়ন কেবলই চায় তা ঝরাতে
জানি কেবল শূণ্যতায় ভরাতে।।

কেন আলোর অলোক মায়ায়
আমারে স্নান করাতে চাও
কেন আঁকা মোর যত বেদন চিহ্ন
প্রেমো ছায়ায় তাহা ঢাকিয়া যাও

কে তুমি আসিলে এমনো অকূলে
সাধিয়া নাকি গো মনেরো সে ভুলে
মোর অনলে যদিগো ভস্মিলে
কেন চাও তারেই জড়াতে?
জানি কেবল শূণ্যতায় ভরাতে।

 

বিসর্জন

কেন যাবার বেলায়
জড়ালে মায়ায়?
পিছু ডেকে চাহিলে-
দিতে গো থামায়।
যাইতে যদিগো হবে,এ মায়া মিছে তবে
রহিয়োনা রহিয়োনা এ পথে গো দাঁড়ায়।
কেন যাবার বেলায় -জড়ালে মায়ায়।

যবে চেয়েছিনু তোমায়, ভিখেরীর মত করি
তখন ফিরিয়াছি গো শূন্য এ দুহাত ভরি
সাঙ্গ এ বেলা মোর,আসিবেনা আর ভোর
দিয়োনাগো এ মরু হৃদ
তটিনী নয়নে ধোয়ায়।
কেন যাবার বেলায়,জড়ালে মায়ায়।

নিশি গভীর হলে,দিনরবি সবে ভোলে
আধারেরো বুকে খোঁজে আপনার ঠাই-
সব কাজ হলো সারা,আমি যে বাঁধনহারা
ডাকিছে বিষাদ সাগর,আমি চলে যাই

যা দিতে এতগো ক্ষতি,
তা দিয়ে কেন এ আরতি?
বিসর্জনের বেলা এলোযে ঘনায়
কেন যাবার বেলায় জড়ালে মায়ায়।

 

অচিন বেদনা

আমার আঘাতের ক্ষত, উত্তাল, রক্ত গঙ্গার উপর দিয়ে-
কি আয়েসি সেতু সংযোগ তোমার!
ক্লান্তিহীন হেটে চলে গেলে এপার থেকে ওপারে!
আমার দুপাশে সংযোগ ঘটালে তুমি,
কেবল মধ্যবর্তী আমার এ হাহাকার পদ্মার মত নির্বাক চেয়ে রয়,
অস্পৃশ্যর মত বোধকরে-
তোমার কাছে কি চেয়েছিলামআমি? শিল্পার্ঘ?
শ্রমিকের কায়িক শ্রমে বুকের ভেতর যেমন ধুকপুক জন্মে-
গরম পীচের গন্ধে যেমন মিলে যায় আদিমতার গোপন সত্য,
আমার অক্সিজেনে মিশে গেছে বিষাদের ছোটবড় বর্জ কণা,
ভিখেরীর মত নি:স্ব হবার নেশায় মাতিয়ে,
কোথায় হারিয়ে গেলে?
আমার গোপন সত্যের কঙ্কাল পাওয়া গেলে,
তোমার নাম উঠবে ইতিহাসের পাতায়-
তখন আমায় ডেকোনা।
জানো?
আমায় যা দিলেনা,তাইইতো বেশি করে রয়ে গেলো আমার হৃদ সভ্যতার প্রত্নতত্বে!
তুমি মায়া সভ্যতার নামে যত ইতিহাস শোন,
সব মিথ্যে,সব।
কারণ ও সভ্যতায়তে তুমি ছিলে,
মোহ মায়া,কেবল তুমি
আমায় ভালোবাসলে যে ক্ষতি তোমার হতো,
আমার শূণ্যস্থানে সে ক্ষতি পোষাবার মত শব্দ বসিয়ে নিও।
একশ হাজার কোটি বছর পর-এ জীবাস্মর উপর আবার কোন সভ্যতা গড়ে উঠবে,
আর কেউ না চিনুক -তুমি চিনবে আমায়-ঠিক চিনবে! চিনবেতো?

 

লাইমুন নাহার সীমা। কবি ও ফাইন আর্টিস্ট। জন্ম খুলনা, বাংলাদেশ। পড়াশুনো করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টস বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। আঁকাআঁকির পাশাপাশি সীমা নিয়মিত কবিতাচর্চা করছেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..