লালশাক

যুগান্তর মিত্র
গল্প
Bengali
লালশাক

সুন্দরনগরের নাম এ তল্লাটের সবাই জানে। গ্রামের নাম সুন্দর হলে কী হবে, অপরিষ্কার পুকুর, ডোবা, মেঠোপথের ধারের আবর্জনা সবমিলিয়ে সুন্দর বলা যাবে না কিছুতেই। তবে এই গ্রামের নামডাক ঠাকুরবাড়ির নামসংকীর্তনের জন্যই। সাতদিন ধরে সংকীর্তন হয়। প্রথম তিনদিন শুধুই নামগান। পরের চারদিন নামগানের পাশাপাশি নানা ব্যঞ্জনে খাওয়াদাওয়ার বিশাল আয়োজন থাকে। ভোজের প্রথমদিন থাকে সুন্দরনগর ও আশেপাশের অঞ্চলের গরিবগুর্বো, ভিখিরি আর ভবঘুরেদের পাতপেড়ে খাওয়ানো। তার পরদিন গৃহস্থবাড়ির লোকজন, এলাকার গণ্যমান্যরা, এবং সবশেষে থাকে ঠাকুরবাড়ির আত্মীয়-পরিজনদের আপ্যায়ন। নিরামিষ নানা পদের এলাহি আয়োজন থাকে। তিনদিনের আয়োজনে সামান্য এদিক-ওদিক হয়। ব্যঞ্জন আর মিষ্টির তারতম্য থাকে। প্রথমদিনের আয়োজনে প্রথমেই এসেছে ঘি আর ঝুরঝুরে আলুভাজা। এরপর একে একে ছোলা দিয়ে লালশাক, ডাল, বেগুনি, ধোকার ডালনা, পনির, চাটনি, পরমান্ন, সন্দেশ ইত্যাদি। আর থাকে ঝিঙাশাল চালের ধবধবে সাদা ভাত। এসব খবর দ্রুত চাউর হয়ে যায়।

ঠাকুরবাড়ির পাশের মাঠে ম্যারাপ বেঁধে ভোজের আয়োজন করা হয়েছে। প্রথমদিনের একটা ব্যাচের খাওয়া হয়ে গেছে। দ্বিতীয় ব্যাচের খাওয়া শুরু হয়েছে সবেমাত্র। লালশাক পড়েছে পাতে। পাশের জন লালশাক দিয়ে ভাত মেখে মুখে তুলেছে কি তোলেনি, জ্ঞানা পাগলা পাত ছেড়ে শুরু করল ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়। “অ্যাঁ, আইজ কি ৯ তারিখ ?” দৌড়নোর আগে এই ছিল তার স্বগতোক্তি।

দৌড়ে যাওয়ার সময় কারো ভাতে পা পড়ল তার, কাউকে ঠ্যালা মেরে চলে গেলো। মন্টু খুড়োকে তো ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দিয়েই দে দৌড় দে দৌড়। কেন যে সে এমন মরণপণ দৌড়োলো তা জানার আগ্রহ ছিল না কারোই। বরং তার কারণে আজকের মতো ভোজের আয়োজন বন্ধ হয়ে যায় কিনা সেটাই সকলে ভাবতে বসল। তবে কিছু সময় পরে, বড়কর্তার নির্দেশে আবার শুরু হল পরিবেশন। তখন সবার স্বস্তি ফিরে এলো।

ঠাকুরবাড়ির ছোটো ছেলে সুশান্ত কলকাতার নামী স্কুলে পড়ে। সেখানে মেসে থাকে। সেই মেসেরই এক বন্ধু বিবস্বান দত্ত এমনতর নামগান আর ভোজের আয়োজন নিজের চোখে দেখতে চায়। এই নিয়ে তার কৌতূহলও ভীষণ। তাই সে খাওয়াদাওয়ার জায়গায় প্রথম থেকেই হাজির। অতি উৎসাহে ভাড়ার ঘর ও ভোজের জায়গায় ছোটাছুটি করে দেখে নিচ্ছে সমস্ত বিষয়। জ্ঞানা পাগলার এই আচরণে প্রথমটায় হতচকিত হয়ে পড়ে বিবস্বান। তারপর আবার যখন ভোজ শুরু হল গোলমালের পর, তখন সে ফের মহা উৎসাহে আগের অবস্থায় ফিরে গেল। তবে খটকা একটা রয়েই গেল মনে। এর-তার আলোচনা থেকে তার কানে এল ৯ তারিখ শব্দটা। অদ্ভুত তো ! আজ যদিও ৯ তারিখ নয়, কিন্তু এই তারিখের সঙ্গে কি এমন কোনো ঘটনা জড়িয়ে আছে যার জন্য পাগলাটা এভাবে ছুটল ? ভাবনাটা পেয়ে বসল স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র বিবস্বানকে।  তারুণ্যের কৌতূহলে সে খোঁজখবর নেওয়ার কথা ভাবল।

বিবস্বান ধীর পায়ে বেরিয়ে এল ম্যারাপের বাইরে। লোকের মুখে মুখে জ্ঞানা পাগলার দৌড়ের কথা যেমন ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনই সে যে এখন তালতলা পুকুরপাড়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে আর বিড়বিড় করে কীসব বলছে, সে খবরও অনেকেরই জানা। বিবস্বানের কানেও খবরটা এল এক বালকের মুখ থেকে।

গ্রাম দেখা আর বিশাল ভোজনবিলাসের এই আয়োজন দেখতে সে দুদিন আগেই এখানে এসেছে। দুদিনই ঘুরে ঘুরে নানা জায়গা দেখেছে। তাই গ্রামের পথঘাট খানিকটা চেনাও হয়ে গেছে তার। তালতলার পুকুরপাড় খুব-একটা দূরের নয় বলেই বিবস্বান সেদিকে পা বাড়াল। সঙ্গী করে নিল সেই বালককেও।

নদীর পাড়ে গিয়ে বিবস্বান দেখতে পেল জ্ঞানা পাগলা সত্যিসত্যিই সেখানে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। অনেকেই দেখছে দূর থেকে। বিবস্বান খুব কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে বোঝার চেষ্টা করল কী বলছে পাগলটা।

“আইজ কি ৯ তারিখ ? উহ্, কত্ত রক্ত, কত্ত রক্ত ! ওরে শিবা রে, তর কী হইল রে শিবা !”

ঘুরেফিরে এই কথাই বলছে সে। আরও কী সব বলছিল। সব কথা বুঝতে পারে না বিবস্বান। কেমন যেন গোঙানির মতো মনে হল তার। তবে এর মধ্যেই আরও একটা কথা স্পষ্ট বুঝতে পারল সে। স্লোগানের মতো করে বলে উঠছে জ্ঞানা “বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো। বাংলাদেশ স্বাধীন করো।” একথা বলার সময়ই সে একটু মাথা উঁচু করছে। থেকে থেকেই কিছু একটা বলে উঠছে আর তারপরই গোঙানির শব্দ। বাংলাদেশ স্বাধীন করো মানে তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছে। ভাবে বিবস্বান।

শিবা কে ? ওকে জানতেই হবে। আর তার সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্ক কী ? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিবস্বান ও সুশান্তর চর্চার বিষয়। এই নিয়ে ওরা বেশ পড়াশুনাও করে। বাংলা ভাষার জন্য এই লড়াই, ভাষাকে কেন্দ্র করে একটা রাষ্ট্রের জন্ম ওদের আবেগ উসকে দেয়। তাই জ্ঞানা পাগলের আচরণ ও কথাবার্তা বিবস্বানের পরম আগ্রহের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে যা ছিল নিছক কৌতূহল, এখন তা হয়ে উঠেছে অনুসন্ধানের মতো বিষয়।

 

দুই.

ঠাকুরবাড়ি আর জ্ঞানা সম্পর্কে একটু জানানো দরকার। সুন্দরনগরের বহু পুরানো বাসিন্দা অধিকারীরা। এঁরা বংশপরম্পরায় বৈষ্ণব। এখনকার বড়কর্তা গৌরাঙ্গ অধিকারীর ঠাকুরদা মোহন অধিকারী তাঁর বাড়িতে রাধামাধবের মন্দির নির্মাণ করান আর বাৎসরিক চারপ্রহর, অর্থাৎ সকাল থেকে সন্ধ্যা নামগানের আয়োজন করতেন। তাঁর ছেলে শ্রীরূপ অধিকারী তিনদিনের নামগানের ব্যবস্থা করেন। তাঁর ছেলে গৌরাঙ্গ অধিকারী, মানে বর্তমান বড়কর্তা সাতদিনের নামসংকীর্তন আর তিনদিনের ভোজের ব্যবস্থা করেন প্রতিবছরই। এই বিশাল আয়োজনের জন্যই সুন্দরনগরের নাম মুখে মুখে রটে গেছে এ তল্লাটে। অধিকারী বাড়িও ঠাকুরবাড়ি নামেই পরিচিত হয়ে গেছে। মোহন অধিকারীর মা যখন মারা যান, তখন মোহনের বয়স মাত্র সাত। তাঁর মা নাকি খুব লালশাক খেতে ভালোবাসতেন। তাই মায়ের মৃত্যুদিনে নামগানের সূচনা করলেন এবং মায়ের প্রিয় লালশাক প্রধান ব্যঞ্জন হিসাবে স্থির করলেন। অন্য ব্যঞ্জন বদল হলেও লালশাক তাই নির্দিষ্টই থাকল।

এদিকে জ্ঞানার তেমন কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি। আগে কোথায় থাকত তাও জানা যায়নি সেভাবে। তার এক  জ্ঞাতী ভাই গতবছর তাকে এই গ্রামে নিয়ে আসে। তখনই তার মাথার ঠিক নেই। এখন তো আরও খারাপ অবস্থা। বাহ্যজ্ঞান প্রায় নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এদেশে চলে আসে সে। প্রাণ হাতে করে ঘরছাড়া আর যে-যেদিকে পারে পালানোর কারণে সবাই ছিটকে পড়ে নানা জায়গায়। পনেরো বছরের জ্ঞানানন্দ আলাদা হয়ে যায় সবার থেকে। এইটুকু খবর মোটামুটি অনেকেই জেনে গেছে। গতবছর কোন্‌ এক রেলস্টেশনে তাকে খুঁজে পায় সেই জ্ঞাতী ভাই। তখনই নিয়ে আসে নিজের বাড়ি। আজকাল জ্ঞানা তার ভাইয়ের ঘরে থাকেও না। পথই তার ঠিকানা।

বিবস্বানের রোখ চেপে গিয়েছিল। সে তাই খোঁজখবর শুরু করে। একে-তাকে জিজ্ঞাসা করেও কোনো হদিশ পায় না শিবার। অবশেষে চা-দোকানি লাল্টু প্রামাণিক জানাল জ্ঞানার এক ভাই থাকে কাছেই। সে নিজে সেই বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে কলকাতার বাবুটিকে।

বিবস্বান নানা কথা জিজ্ঞাসা করে জ্ঞানা পাগলের সম্পর্কে। সেইসময় আশেপাশে কিছু লোকও জুটে যায়। তারাও সম্ভবত এই প্রথম শুনছে জ্ঞানার আসল পরিচয়।

বছর দুয়েক আগে এক সকালে ব্যবসার কাজে বাগনান গিয়েছিল জ্ঞানার এই ভাই মণিরত্ন। সেখানে স্টেশনে একজন পাগলা গোছের লোকের গলার কাছে জড়ুলচিহ্ন দেখে অবাক হয়। তার মুখটাও অবিকল কাকা বিনোদবিহারীর মতো। একইরকম চুলদাড়ি দেখে চেনা চেনা ঠেকে বলে তাকে নানা প্রশ্ন করে বুঝতে পারে এ হল তার সেই হারিয়ে-যাওয়া খুড়তুতো দাদা। দুজনে পিঠোপীঠি ছিল সেদেশে। প্রায় সবসময়ই একসঙ্গে কাটাত দুজন। অনেক ভালোবাসা আর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই দাদাকে ঘিরে। তাই তখনই দাদাকে প্রায় জোর করে ধরে নিয়ে আসে নিজের ঠিকানায়। সেই থেকে জ্ঞানা এই গ্রামেই আছে।

বিবস্বান ফিরে এসে বড়কর্তা ও তার বন্ধু সুশান্তকে জ্ঞানার সম্পর্কে জানতে পারা সব গল্পই বলে। তার আগেই ডালপালা ছড়িয়ে সেই গল্প বড়কর্তাদের কানে পৌঁছে গিয়েছিল। তবু প্রকৃত অনুসন্ধানীর মুখে পুরো কাহিনী শুনতে চান তাঁরা। বিশেষ করে সুশান্তর জানার আগ্রহই বেশি। বিবস্বানও পরম উৎসাহে জ্ঞানার সব গল্প বলে যায়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেকেই নাম লিখিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধার দলে। জ্ঞানার মেজোভাই জীবানন্দও নাম লেখায়। এদের বাড়ি ছিল বিক্রমপুরের মুন্সীগঞ্জে। গ্রামের নাম গজারিয়া। জীবানন্দের কারণে তাদের পরিবারের  উপর নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে পাকসেনারা। চলে অত্যাচারও। জীবানন্দের হদিশ দিতেই হবে বলে চাপ দেয় ও মারধর করে বাড়ির লোকজনদের। তারা কিন্তু সত্যিই জানত না জীবানন্দের প্রকৃত অবস্থান। মুক্তিযোদ্ধারা গোপনে তাদের কর্মসূচি নিত। বাড়ির সঙ্গে প্রায় যোগাযোগই রাখত না জীবানন্দ।

অগ্নিবীণা সমিতিতে আগেরদিন মুক্তিযোদ্ধাদের এক সভা হয়। সে খবর পৌঁছে যায় পাকবাহিনীর কাছে।। ৯ মে কাকভোরে অতর্কিতে গুলি চালায় পাকসেনা দল। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই পান্তাভাত খাওয়া ছিল ছোটো ভাই শিবানন্দের অভ্যেস। সেদিনও সে খাচ্ছিল তখন। সেইসময় গুলি এসে লাগে তার বুকে। ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ে ভাতের থালায়। রক্তিম হয়ে ওঠে তার ভাত। সঙ্গে সঙ্গেই লুটিয়ে পড়ে সেখানে। সেই স্মৃতি সম্ভবত আজও টাটকা জ্ঞানানন্দের মনে। তাই পাশের কারো লালশাক মাখা ভাত চোখে পড়তেই চলকে ওঠে সেই স্মৃতি আর মনে পড়ে যায় ৯ তারিখের ঘটনা। জ্ঞানাও নিশ্চয়ই মনে মনে মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থন করত। তাই সেই স্লোগান ভোলেনি সে। বস্তুত সেই সময়কালেই আটকে আছে জ্ঞানানন্দ। ব্যাখ্যা দেয় ইতিহাসের ছাত্র বিবস্বান।

পুরো গল্পটা শোনার সময় কারো মুখে কোনো কথা ছিল না। যেন শিক্ষকের পড়ানো শুনছিল সবাই। চোখ ছলছল করে উঠল সুশান্তর। বড়কর্তাও উদাস হয়ে গেলেন খানিকটা। সুশান্ত প্রথমে তাকে না-জানিয়ে যাওয়ার জন্য অনুযোগ করে বিবস্বানকে। তারপর বলে, চল বিবস্বান, একবার জ্ঞানা কাকাকে দেখে আসি।

বিবস্বানও যেন এই ডাকের অপেক্ষায় ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই সে লাফিয়ে নেমে আসে উঠোনে। দুই বন্ধু তখন প্রায় ছুটে চলেছে জ্ঞানা পাগলের দিকে। তাদের যে অনেক কিছু জানতে হবে।

বড়কর্তা ভাবছেন আর কোনোদিন ভোজের আয়োজনে লালশাক রাখবেন না। লালশাক কি কোনো অমঙ্গলের বার্তা নিয়ে এল ?

ম্যারাপের ভেতরে তখন সম্ভবত শেষবারের মতো লালশাক পরিবেশন হচ্ছে।

যুগান্তর মিত্র। গল্পকার ও অনুবাদক। জন্ম ১৭ মে, ১৯৭১, ভারতের কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলে। শৈশব থেকেই কল্যাণী শহরের উপকণ্ঠে বসবাস। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থ: 'ধ্বংসের দিকে যাত্রা' (কাব্যগ্রন্থ), 'কাফকার গল্প' (অনুবাদ গ্রন্থ), 'আত্মহননের কথামালা' (অণুগল্পগ্রন্থ),...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..