লাস্ট বিড়িটা ধরানোর আগে

শীর্ষেন্দু দত্ত
গল্প
Bengali
লাস্ট বিড়িটা ধরানোর আগে

ফিসসুলাটা যে শেষ পর্যন্ত ক্যান্সারে মোটিভেট করবে বুঝিনি। ডাক্তার বলেছিল, মদ-মাংস কমান। কিন্তু জীবনের পঞ্চাশটা বছর কাটিয়ে কৃচ্ছসাধনে আত্মা কি রাজী হয়? ভেবেছিলাম বছর দশেক হুটপাটাং খেলে কাটিয়ে দেব। তারপর আর কি দরকার? ষাট বছর পর বাঁচার কোনো যুক্তি নেই। তাই দশটা বছর ডাক্তারের কথা শুনবোনা ঠিক করে নিলাম। কিন্তু এক বছরেই উইকেট পড়ে গেল যে!

রিপোর্ট টা নিয়ে ডাক্তারের চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। খুব মায়ের কথা মনে পড়ছে। মা থাকলে নিশ্চয় কিছু একটা টোটকা বাতলে দিত। একটা ফাঁকা বাসস্ট্যান্ডের বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম। শুনশান চারপাশ। কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কেন! মরবো বলে? তাও নয়। আসলে এতগুলো বছর এই গ্রহতে কাটালাম। কত স্মৃতি,ভালমন্দ,কত কি! সব ছেড়ে চলে যেতে হবে। সেই ক্লাশ টেনে স্কুল ছাড়ার শেষ দিনের মত। আর কখনো কি দেখতে পাব এসব? আমার পোষা কুকুরটার কি হবে? ওতো খাট ছাড়া শুতে পারেনা। আমি মরে গেলে কে ওকে খাটে নিয়ে শোবে? নাহ,একটু কেঁদে নই। কাঁদতে কাঁদতে মা-মা শব্দ বেরিয়ে এলো।

বসার সময় লক্ষ্য করিনি,একটা পাগলাটে বৃদ্ধ বেঞ্চির নিচে শুয়ে ছিল বস্তা পেতে। সে ঘুমচোখে উঠে বসল,আর অবাক হয়ে আমায় দেখতে লাগল। আমি লজ্জায় কান্না থামিয়ে দিলাম। বৃদ্ধ ওর জলের বোতলটা আমায় দিয়ে বলল,খা।

আগে হলে ঘেন্নায় খেতাম না। কিন্তু এখন কি বাতই আলগ। বোতলটা নিয়ে গলায় জল ঢাললাম। জলটা খেয়ে বেশ ভালই লাগল।

শিল্পী: রিয়া দাস

বৃদ্ধ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু নিরীক্ষণ করতে করতে বিড়ি ধরালো। রোগা প্যাকাটির মতো চেহারা,সারা মুখ গোঁফদাড়িতে ভর্তি,হাতে পায়ে নোংরা লেগে,তৈলাক্ত গন্ধমাদন জামা গায়ে। আমার চোখে চোখ রেখে বলল, কেউ মরেছে?

বললাম,না।

ক্ষণেক ভেবে আবারো প্রশ্ন করল, তুই মরবি?

বললাম,হা।

বৃদ্ধ একটা বিড়ি আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,ধরা।

ধরালাম।

বৃদ্ধ বলল,এটা টেনে নিয়ে চলে যা। কেঁদে টাইম নষ্ট করিসনি।

বিড়িটায় লম্বা সুখটান মেরে উঠে পড়লাম। পোদটা টন্টনাচ্ছে। বসার থেকে দাড়ানোই ভাল লাগছে। বাসস্ট্যান্ড ছেড়ে হাঁটা লাগালাম।

দূর থেকে একটা শব্দও ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। কিসের শব্দ কে জানে।

ব্রিজের উপর একটা মিছিল দেখতে পেলাম। আমিও ব্রিজের দিকে চললাম। গোটা পঞ্চাশ লোক বাজনা বাজিয়ে নাচতে নাচতে আসছে। সবুজ আবির মেখে সকলে। হাতে হিসহুশ পার্টির ঝান্ডা। আমি হিসহুশ  পার্টির কট্টর বিরোধী। আমার পাড়ার এক হিসহুস নেতা আমার বৌকে ফুসলে নিয়ে গেছিল। আবার ভোটার লিস্ট থেকেও আমায় বাদ করে দিয়েছিল। বহুত ক্ষার ওদের উপর। তবে মিছিলে যারা নাচছে তাদের কাউকে চিনিনা।

যারা নাচছে তাদের একজনকে সাইড করে জিগালাম,কাকা কিসের মোচ্ছব?

সে বলল,পঞ্চায়েতে জিতল কে হিসহুস আবার কে।

আমি বললাম,পঞ্চায়েত! সেতো দশদিন পর ভোট। এখন জিতল কী করে?

লোকটা নাচতে নাচতে জিভ ভ্যাংচালো, কোথাকার মাকাল ফল হে! ভোট কিসের? হিসহুস ছাড়া ক্যান্ডিডেট কৈ! ঝাট না জ্বালিয়ে চলো ড্যান্স ড্যান্স। – বলে আবার নাচতে লাগল ঢাকের চড়াম চড়াম মিউজিকের সঙ্গে।

ডাক্তার বলেছে সময় নাই। বাস স্ট্যান্ডের বৃদ্ধ পাগলটাও বলল,টাইম নষ্ট করিসনা। আমারো তাই মত। অতএব আমি ভিড়ে গেলাম আমার চির শত্রুর হিসহুশ পার্টির বিজয় মিছিলে। আমিও চড়াম চড়াম মিউজিকের তালে তালে শরীর দুমরে মুচড়ে নাচতে লাগলাম। একটা লোক এসে আমাকেও সবুজ আবিরে মাখামাখি করে দিল।

নাচতে নাচতে আমরা ব্রিজের থেকে নেমে নদির দিকে চললাম। নাচতে নাচতে মিছিলের মধ্যে আমরা চার পাঁচজন একটু আলাদা হতে লাগলাম। মানে একজন স্লোগান দিচ্ছিল,একজন তাসা পিটছিল,আরেকজন আবির ওড়াচ্ছিল,আর আমরা কজন ওদের ঘিরে ঘুরে ঘুরে নাচছিলাম। এতখনে মনটা একটু হালকা হালকা লাগছে। নাচলে দিমাক রিচার্জ হয়ে যায়।

পার্টি অফিসের সামনে এসে বিজয় মিছিল থামল। একটা কদম ছাঁট চুলের মোটা চেহারার নেতা এসে ঘোষনা করল,সবাই প্যাকেট নিয়ে অফিসের পিছনে চলে যাও। দলে ভিড়ে আমিও একটা প্যাকেট নিয়ে চলে যাবার তাল করলাম। যে লোকটা আমাদের সাথে নাচ করছিল সে বুঝতে পেরে বলল, গুরু কোর্স টা শেষ করে নাও। – বলে আমার হাত ধরে টেনে পার্টি অফিসের পিছনে নিয়ে চলল। সেখানে দেখি একটা বটগাছতলা থেকে বাংলা মালের বোতল ডিস্ট্রিবিউট হচ্ছে! দুজন পিছু একটা বড় বোতল আপাতত। শেষ হলে আবারো দেবে নাকি। বয়বস্থা অঢেল।

আমরা সেই পাঁচজন বোতল বুঝে নিয়ে ঘাটের কাছে বসলাম।

সামনে শ্মশান। চিতা জ্বলছে পরপর। প্লাস্টিকের গেলাশে মাল ঢেলে দিতে লাগল যে লোকটা ঢাক বাজাচ্ছিল। প্যাকেটটা খুলে ফেললাম। রুমালী রুটি আর মাটন চাপ।

দূরে একটা পার্টি বডি পোড়ানো কমপ্লিট করে নাভিকুন্ড ভাসাতে জলে নেমেছে। আমার ঠোটের ফাঁক দিয়ে এক পশলা উড়ান চলকে নেমে এলো থুতনি বেয়ে। সেই ক’ফোটা তরল আমার গলা,বুক,পেট ছাড়িয়ে নাভীতে এসে থামল। আমি কড়ে আঙুল দিয়ে নাভীটা শুকনো করলাম। ঢাকওলা বলল,ভাই তোর কিসের এতো দুঃখুরে?

আমি পরপর দু’গ্লাশ মেরে উল্লাশে বললাম,আমার পোয়া মারা গেছে।

যে লোকটা আবির ছড়াচ্ছিল সে বলল,সেতো জন্মের সময়ই বাপমা মেরেই বাজারে ছেড়েছে। নতুন করে আর কি মারাবি ভাই!

স্লোগানওলা লোকটা বলল,তা বটে,আমার নাম তোমার নাম হিসহুশ হিসহুশ।

যে আমাকে এখানে টেনে এনেছিল সে আস্ত পেঁয়াজে কামড় মেরে বলল,ধুত্তেরি থামা তোর স্লোগান।

স্লোগানওলা চুপসে গেল। দূরে শ্মশানযাত্রী যারা নাভী ভাসাতে নেমেছিল তারা স্লোগান তুলল,বল্লো হোরি হোরি বোওল…

আমি ওদের শুধালাম,তোমরা কি অনেকদিন ধরে পার্টি করছ?

কথাটা শুনে ওদের খিল্লি আর থামেনা! আমি একটু বমকে গেলাম। এতে হাসির কি আছেরে ভাই!

একজন বল্ল,বলো কি নন্দলাল!আমি তিনদিন। আবিরওলা দুদিন। ডান্সার দেড়দিন। আর ঢাকওলা প্রবীণ,একমাস।

আমার মদ খাওয়া শেষ হয়ে গেল। আর ভাল লাগছিলনা ফাঁকা পাঁয়তারায়। আমি ঘাট বেয়ে চিতাগুলোর দিকে চললাম।

পরপর চিতাগুলো জ্বলছে। বডিগুলো লালচে গৌর। আশ্চর্য দৃশ্য,বডিগুলো পুড়লেও মুখগুলো এখনো জ্বলেনি! অবাক চোখে দেখলাম চিতাগুলোয় পরপর সেই ঢাকওলা, আবিরওলা, স্লোগানওলা আর ডান্সারওলা শুয়ে আছে! ওদের বডি দাউ দাউ জ্বলছে! পিছনে ঘাটের দিকে ফিরে দেখলাম,সেখানে কেউ নেই! এক্ষুনি যেখানে মদ খাচ্ছিলাম! নেই পার্টি অফিসটাও! শুধু এক নিশুতি জমাট অন্ধকার বট গাছটার চাদ্দিকে! আমিও ক্লান্ত হয়ে একটা চিতায় রোগাক্রান্ত পোদটা ঠেকিয়ে বসে শেষ বিড়িটা জ্বালালাম।

শীর্ষেন্দু দত্ত। লেখক ও ঔপন্যাসিক। জন্ম ১৯৬৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ভারতের ইস্পাত নগরী জামসেদপুরে। পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বাবাকে চার বছর বয়সে হারান পথ দুর্ঘটনায়। মায়ের সাথে কলকাতায় চলে আসেন। মেজমামা অরুন আইন একজন পরিচিত লেখক ছিলেন। তার কাজে প্রাণিত হয়ে লেখা...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..