লা মিজারেবলস্ – মানববাদের এক মহতী বয়ান

আলী নাঈম
প্রবন্ধ, রিভিউ
লা মিজারেবলস্ – মানববাদের এক মহতী বয়ান

পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত চিঠি এবং সংক্ষিপ্ত প্রত্যুত্তরের ঘটনাটি অনেকেরই জানা। বই প্রকাশের সময় লেখক দেশের বাইরে ছিলেন। প্রকাশককে চিঠি লিখলেন: ‘?‘ অর্থাৎ বই বিক্রির হালচাল কেমন? প্রকাশক উত্তর পাঠালেন: ‘!‘। অর্থাৎ অভাবনীয়।

এই কাহিনী যে বইটিকে ঘিরে সেটির নাম ‘লা মিজারেবলস্’। লেখক ভিক্তর য়্যুগো। বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে তিনি ভিক্টর হুগো নামেই বেশি পরিচিত।

য়্যুগো জন্মেছিলেন ১৮০২ সালের ২৬ মে। প্রথম জীবনে তিনি কবি হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। য়্যুগোর প্রথম কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয় ১৮২২ সালে, যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০। এ গ্রন্থের কারণে তিনি সম্রাট অষ্টাদশ লুইয়ের কাছ থেকে রাজকীয় সম্মান ও ভাতা পান। ১৮২৬ সালে প্রকাশিত তাঁর পরবর্তী বইটিই তাঁকে একজন মহান কবি, সুরকার এবং গীতিকার হিসেবে খ্যাতিমান করে তোলে। ১৮৮৫ সালের ২২ মে ভিক্তর য়্যুগো প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন।

শুধু কবিতা বা উপন্যাস রচনা নয়, য়্যুগোর সম্পৃক্ততা ছিল রাজনীতিতেও। প্রজাতন্ত্র বা রিপাবলিকানিজমের সমর্থক হিসেবে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং রাজনৈতিক মনোভাবের কারণে তাঁকে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল। ‘লা মিজারেবলস্’, ‘দা হাঞ্চব্যাক অভ নটরডেম’ তাঁর জগৎবিখ্যাত উপন্যাস। তাঁর আরো কয়েকটি উপন্যাস হল: ‘এক দণ্ডিতের শেষ দিন’ (The Last Day of a Condemned Man), ‘দ্য ম্যান হু লাফস’ (The Man Who Laughs), ‘টয়লার্স অব দ্য সি’ (Toilers of the Sea) এবং ‘হিস্টোরি অফ এ ক্রাইম’ (History of a Crime)। য়্যুগোর শেষ জীবনের রচিত উপন্যাস (Ninety-Three) প্যারি কমিউনের ঘটনাবলীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত।

২.

লা মিজারেবলস্’ প্রকাশিত হয় ১৮৬২ সালে। ফরাসি ভাষায় ‘লা মিজারেবলস্’ কথাটির শব্দগত অর্থ দীন দুঃখীরা। মূল ফরাসি নামেই উপন্যাসটি সারা দুনিয়া জুড়ে পরিচিত। অনুবাদসূত্রে অন্য কিছু নামও ব্যবহৃত হয়েছে। উপন্যাসে বিধৃত সময় হচ্ছে ১৮১৫ থেকে ১৮৩২ সালের দ্বিতীয় ফরাসি বিপ্লব পর্যন্ত।

এই মহৎ উপন্যাসে ভিক্তর য়্যুগো উনিশ শতকের ফ্রান্সের সাম্রাজ্যতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের অধীনে সমাজের নিচের তলার সেই সব মানুষের জীবনের এক সকরুণ জীবন চিত্র এঁকেছেন যারা অভাব-দুঃখ-দারিদ্র্যের নিচে নিষ্পিষ্ট ও বিকৃত। আর এই মানুষদের জীবন তুলে ধরতে গিয়ে ভিক্তর য়্যুগো সমাজের নৈতিকতা-আইন এবং মানুষের আবেগ-কতর্ব্যবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আইন কীভাবে রচিত হয়, কাদের জন্য রচিত হয়? আইনসঙ্গত হলেই কি সেটা ন্যায়সঙ্গত হয়? ন্যায় কি? মানুষের নৈতিকতার ভিত্তি কি হবে?

ভিক্টর হুগো, ছবি – wikimedia

 

৩.

উপন্যাসের শুরুতেই পাঠক পরিচিত হবেন মিরিয়েল নামের একজন বিশপের সাথে। বিশপ মিরিয়েল জন্মেছিলেন এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। কিন্তু ফরাসি বিপ্লবে তাদের পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মিরিয়েল কর্মজীবন শুরু করেন এক পল্লীর যাজক হিসাবে। পরে সম্রাট নেপলিয়নের নজরে পড়ে পাহাড়-পর্বতে ঘেরা দিগন নামের একটি অঞ্চলের বিশপের দায়িত্ব পান।

বিশপ মিরিয়েল এক নির্লোভ, কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তি। একজন বিশপের অধীনে অনেকগুলো গির্জা থাকে। আর তখনকার দিনে এক একটি গির্জা যথেষ্ট সম্পদ এবং ক্ষমতা ভোগ করত। ফলে কোনো একজন বিশপ প্রায় মন্ত্রীদের মতোই সম্মান, ক্ষমতা ভোগ করতেন এবং সম্পদের অধিকারী হতে পারতেন। কিন্তু মিরিয়েল ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের। অন্য বিশপ বা যাজকরা যখন ভোগ-বিলাস আর আয়েশে মত্ত, মিরিয়েল তখন তাকে দেয়া রাষ্ট্রের ভাতা পুরোটাই গরিব-দুঃখিদের জন্য ব্যয় করতেন। মিরিয়েলের জীবনদর্শন হল খ্রিস্ট্রিয় নীতিবোধ – ইশ্বর তাকে বলেছে মানুষকে ভালোবাসতে, তাই তিনি মানুষকে ভালোবাসেন। যীশুই বিশপ মিরিয়েলের আদর্শ। যীশু দরিদ্র, নিপীড়িত, বিপদাপন্ন, পতিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন – ভালোবাসার এই দায় মেটাতে গিয়ে নিজের জীবন পর্যন্ত বিপন্ন করেছেন। মিরিয়েলও এই নীতি মেনে চলেন।

বিশপ মিরিয়েলের জীবনাদর্শ বোঝার জন্য একটা ঘটনা উল্লেখ করা যায়। তাঁর বসবাসের জন্য বরাদ্দ করা হয় প্রাসাদের মতো একটি বাড়ি। বাড়ির পাশেই হাসপাতাল। সেটি ছোট একটি ভবনে অবস্থিত, রোগির স্থান সংকুলান হয় না। মিরিয়েল বলছেন, আমরা মাত্র তিনজন মানুষ থাকব তার জন্য এতবড় বাড়ি আর হাসপাতালে রোগিদের ঠাসাঠাসি করে রাখতে হচ্ছে। সুতরাং মিরিয়েলের জন্য বরাদ্দ করা বাসভবন হয়ে গেল হাসপাতাল। পূর্বের হাসপাতাল হয়ে গেল মিরিয়েলের বাসভবন।

বিশপ মিরিয়েল হচ্ছেন খ্রিস্ট্রিয় নীতিবাদের এক আদর্শ নমুনা। সবার জন্য তাঁর মনে দয়া। এমনকি চোর ডাকাত, নাস্তিকদের জন্যও। নাস্তিক বলেই কাউকে তিনি অবহেলা করেন না। কিন্তু বিপ্লবী নাস্তিকদের প্রতি তাঁর মন বিরাগ হয়ে আছে। ফরাসি বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী একজন বিপ্লবীর মৃত্যুর সময় তাঁর পাশে উপস্থিত হয়ে বিশপ মিরিয়েল দ্বন্দ্বে পড়ে যান। এই বিপ্লবীরা একে তো ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, তার ওপর এরা রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করেছে, রাজপরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে (মিরিয়েলের নিজের পরিবারও এই নির্মমতার শিকার)। শুরুতে বিরূপ মনোভাব নিয়ে মৃত্যুপথযাত্রী বিপ্লবীর মুখোমুখি হলেও তার যুক্তি বিশপকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। বিশপ মিরিয়েল যখন ফিরে আসছেন, তখন তিনি নিজের পুরাতন বিশ্বাস থেকে খানিকটা সরে গেছেন।

মিরিয়েলের সংসার বলতে কিছু নেই। খুব স্বাভাবিক কারণেই তিনি অবিবাহিত।  এক বোন তাঁর সাথে থাকেন, তিনিও অবিবাহিত। এবং নিজের ভাইকে সে অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করেন ও ভালোবাসেন। এর বাইরে তাঁদের সাথে থাকেন একজন গৃহকর্মী যে তাঁদের সংসারেরই একজন হয়ে গেছে।
বিশপ মিরিয়েল তাঁর ঘরের দরজায় কখনো তালা দেন না। তাঁর ঘরের দরজা দরিদ্র বিপদাপন্ন মানুষের জন্য সব সময়ই উন্মুক্ত। সেই দরজায় একদিন এসে আশ্রয় প্রার্থনা করে একজন ক্লান্ত শ্রান্ত মানুষ। এই আশ্রয়প্রার্থীর নাম জা ভলজাঁ।

লা মিজারেবলস্’-এর কেন্দ্রিয় চরিত্র জা ভলজাঁ। আঠার শতকের দক্ষিণ ফ্রান্সের ব্রাই প্রদেশের এক গরিব পরিবারে ভলজাঁর জন্ম। তার বাবা একজন গরিব কাঠুরে। বাবা মার মৃত্যুর পর সে তার বড় বোনের আশ্রয়ে থাকে ও কাজ করে খায়। কিছুদিন পর ভগ্নিপতির মৃত্যু হলে ভালজাঁ তার বোন ও বোনের সন্তানদের নিয়ে মহা বিপদে পড়ে। পঁচিশ বছর বয়সী ভলজাঁ যৌবনের সব সাধ-আহ্লাদ উপেক্ষা করে কঠোর পরিশ্রম করেও বোন ও তার ভাগ্নে-ভাগ্নির জন্য খাবার যোগার করতে পারে না।

ফ্রান্সে তখন তীব্র খাদ্যাভাব। চারদিকে গরিব মানুষদের হাহাকার। একদিন ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে এক দোকান থেকে এক টুকরো রুটি চুরি করতে গিয়ে ভলজাঁ ধরা পড়ে। ফ্রান্সে সে সময় আইন খুব কঠোর। ক্ষুধার জ্বালায় এক টুকরো রুটি চুরির অপরাধে ভলজার পাঁচ বছরের জেল হয়ে যায়! চার বছর পর জেলখানায় বসে সে বোনের খবর পায়, তার ছয় সন্তানই নিখোঁজ, একটি মাত্র সন্তানকে নিয়ে বহু কষ্টে তার বোন বেঁচে আছে। এই খবর ভলজাঁকে অস্থির করে তোলে এবং সে জেল পালাতে চায়। কিন্তু সে ধরা পড়ে, আর তার সাজা বাড়িয়ে আট বছর করা হয়। আরো কয়েকবার পালনোর চেষ্টা ও ধরা পড়ার শাস্তি স্বরূপ ভালজাঁর মোট উনিশ বছর কারাগারে কাটাতে হয়। জেল থেকে যখন সে বের হয়, তখন সে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ। কয়েদী নাম্বার ২৪৬০১। তার হাতে দেয়া হয় হলুদ রঙের পরিচয়পত্র যা দেখে মানুষ বুঝতে পারবে যে সে একজন কয়েদখাটা দাগী আসামী।

দাগী আসামীর হলুদ পরিচয়পত্র দেখে কেউ আশ্রয় দেয় না, খাদ্য দেয় না, এমনকী কাজ করার সুযোগও দেয় না। ভলজাঁ অসহায়ের মতো ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে যখন তার মনে হয় সে সত্যিকার অর্থেই একজন জঘন্য পাপী, এবং এই সমাজ তার চেয়েও বড় অপরাধী — তখুনি সে হাজির হয় বিশপ মিরিয়েলের দরজায়।

৫.

জাঁ ভলজাঁর মতো এত বিবর্তনধর্মী চরিত্র বিশ্বসাহিত্যে আর দ্বিতীয়টি আছে কিনা সন্দেহ। সমগ্র উপন্যাসে কয়েকটি ঘটনায় এবং কয়েকটি চরিত্রের সাথে দ্বন্দ্বে ভলজাঁর জীবন, চিন্তাধারা পাল্টে যেতে দেখা যায়। ভলজাঁর জীবনে ছয়টি মোড় আসে। আর প্রতিটি মোড়ে সে একটি করে চরিত্র তাকে আলোড়িত করে এবং তার জীবনের গতিপথ পাল্টে দেয়। সেই চরিত্র এবং ঘটনাগুলো হল বিশপ মিরিয়েল, ফাঁতিনে, ইনস্পেকটর জেভার্ত, শ্যাম্প ম্যাথিউ, ফাঁতিনের মেয়ে কসেত্তে এবং কসেত্তের প্রেমিক যুবক মেরিয়াস।

জা ভলজাঁ যদি ‘লা মিজারেবলস্’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়, তাহলে মানববাদ হচ্ছে উপন্যাসের ভরকেন্দ্র। মানববাদ বা বুর্জোয়া মানববতাবাদ বলতে যা বোঝায় তার উত্থান বিকাশ এবং অন্তর্দ্বন্দ্বই এই উপন্যাসের দার্শনিক বিষয়বস্তু।

৬.

সমাজে মানুষের প্রতি দরদবোধ ও কর্তব্যবোধের ধারণা মূর্ত রূপে কখন কীভাবে এসেছে? এসবই এসেছে ধর্মের হাত ধরে। মানববাদ এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক চিন্তার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে খ্রিস্ট ধর্মের হাত ধরেই মানব-প্রেমের ধারণা এসেছে। তবে তার রূপ ছিল ধর্মীয়। একে আমরা বলতে পারি ‘ধর্মীয় মানবতাবাদ’। উপন্যাসে বিশপ মিরিয়েল এই ধারার প্রতিনিধি। এবং তার সাথে কনটিনিউয়েশন এন্ড ব্রেকের পথেই বিকশিত হয়েছে মানববাদ বা বুর্জোয়া মানবতাবাদ। জা ভলজাঁকে আমরা এই ধারার প্রতিনিধি হিসাবে পাই। আবার শিল্প-কারখানা ভিত্তিক অর্থনীতি বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে মানববাদের আরো একটি ধারা বিকশিত হয় – ‘আইন-বাদী’ ধারা। — কিংবা অন্য কোনো নামে একে অভিহিত করা যায়। আনুগত্য এবং আইন-শৃঙ্খলা মেনে চলাই এ ধারার মূল প্রবণতা। ইনস্পেকটর জেভার্ত হল এই ধারারই একজন। কিন্তু এই প্রতিটি ধারারই দ্বন্দ্ব ও বিবর্তন আছে।

বিশপ মিরিয়েলের চরিত্রটি দেখা যাক। ফরাসী বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী একজন বিপ্লবীর মৃত্যুর সময় বিশপ মিরিয়েল তার পাশে উপস্থিত হন। যে-কোনো মৃত্যুপথযাত্রীর প্রতি ঈশ্বরের অর্পিত দায়িত্ব হিসাবেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের প্রতি তার একটা বিরাগ ছিল। এই বিপ্লব রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করেছে, গির্জার ক্ষমতা উচ্ছেদ করেছে। ফরাসি বিপ্লবে মিরিয়েলের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার এই বিপ্লবীরা ঈশ্বরেও বিশ্বাস করেন না। কিন্তু তাঁর সাথে যুক্তিতর্ক শেষে, বিপ্লবীর মৃত্যুর পর বিশপ যখন ফিরে আসছেন তখন তাঁর মনোভাব অনেকটাই পাল্টে গেছে।

বিপ্লবীর সাথে বিশপের সাক্ষাৎ ও কথোপকথনের অংশটুকু আমরা দেখতে পারি।

বিপ্লবী এবং তাঁর সহযোগিরা কেন ফরাসি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন এবং রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ, গির্জার কর্তৃত্বের উচ্ছেদে আত্মনিয়োগ করেছিলেন সে সম্পর্কে বলছেন: “মানুষ আসলে শাসিত হয় এক অত্যাচারীর দ্বারা যার নাম হলো অজ্ঞতা। এই অত্যাচারীরই উচ্ছেদ আমি চেয়েছিলাম। অত্যাচারীই রাজতন্ত্রের জন্ম দেয়। রাজতন্ত্রের যা কিছু শক্তি ও প্রভুত্ব তা মিথ্যার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু জ্ঞানের যা কিছু শক্তি তা সত্যের ভিত্তিভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষ শাসিত হবে জ্ঞানের দ্বারা।

বিশপ: জ্ঞান আর বিবেক।

বিপ্লবী: ও দুটো একই জিনিস। বিবেক হচ্ছে জ্ঞানেরই অন্তর্নিহিত এক শক্তি।

আশ্চর্য হয়ে এই কথাগুলো শুনতে লাগলেন বিশপ। তাঁর মনে হলো এটা যেন জীবনকে দেখার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।”

রাজপরিবারের সদস্য বিশেষত শিশুদের হত্যা করা নিয়ে বিশপ বিপ্লবীদের অভিযুক্ত করলে বিপ্লবী জানান, রাজপরিবারের একজন শিশুর জন্য বিশপ যদি চোখের জল ফেলেন তাহলে একজন সাধারণ নাগরিকের শিশু সন্তান যে স্বৈরতান্ত্রিক নির্মমতার শিকার হয়েছে তার জন্যেও চোখের জল ফেলতে হবে।  রাজপরিবারের একজন শিশুকে হত্যা করা যতখানি অন্যায়, ঠিক ততখানি অন্যায় একজন সাধারণ শিশুকে হত্যা করা।  বিপ্লবী জানাচ্ছেন, মানুষ হত্যাকে তিনি বিন্দুমাত্র সমর্থন করেন না। কিন্তু বিপ্লবের সময় যেটা ঘটেছে সেটা হল শত বছরের চেপে থাকা অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এবং তিনি এও মনে করিয়ে দেন যে বিপ্লবের এই সহিংসতা হল ন্যায়ের স্বাভাবিক ক্রোধ।

বিশপ এবং বিপ্লবীর কথোপকথন থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে আধুনিক গণতান্ত্রিক মানববাদী ধারণা এবং মূল্যবোধের পার্থক্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।

ইনস্পেকটর জেভার্ত চরিত্রটি হল আইন-বাদী ধারার প্রতিনিধি। উচ্চপদস্থদের প্রতি অনুগত থাকা আর আইন মেনে চলাই তার জীবনের আদর্শ। আর যারা আইন মানে না তাদের প্রতি সে নির্মম নির্দয়। সে নিজেই জন্মেছিল সমাজের নিচু তলায়, তাই সে অপরাধী আইনভঙ্গকারীদের ঘৃণা করে। জা ভলজাঁ যতদিন তার চোখে সন্দেহমুক্ত ছিল ততদিন সে তাকে সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে বসিয়ে রেখেছিল। কিন্তু যখন থেকে জেভার্তে বুঝতে পারল যে ভলজাঁ একজন জেলখাটা আপরাধী, তার মনোভাব সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। ভলজাঁকে সে শিকারী কুকুরের মতো খুঁজে ফিরেছে। কিন্তু যখন ভলজাঁকে সে হাতের মুঠোয় পেল তখন তার মনে দ্বন্দ্ব – আইনের চোখে ভলজাঁ অপরাধী হলেও ভলজাঁর যে জীবন ও আত্মত্যাগ সে দেখেছে তাতে এই মানুষটিকে অপরাধী ভাবা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এই অনিরসনীয় দ্বন্দ্বের ফয়সালা জেভার্ত করতে পারে না – সে আত্মহত্যা করে।

৭.

উপন্যাসের গঠন নিয়েও কিছু কথা বলা যেতে পারে।

উপন্যাস কি শুধু কিছু ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ? উপন্যাস কি বাস্তবের যথার্থ প্রতিফলন তুলে ধরতে গিয়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন হয়ে উঠবে? উপন্যাস নিয়ে এমন নানা তর্ক ও মত সাহিত্য-বোদ্ধা মহলে প্রচলিত।

‘লা মিজারেবলস্’-এর গঠন এবং বিষয়বস্তু অর্থাৎ ফর্ম ও কনটেন্টকে ধরে যদি আমরা আলোচনা করি তাহলে দেখব এই উপন্যাসের দুটো গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট আছে। প্রথমত, এই উপন্যাসের ভাব বা কনটেন্টের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ভাবধারার সাথে আধুনিক বুর্জোয়া মানববাদের দ্বন্দ্ব এবং বুর্জোয়া মানববাদের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব আমাদের চোখে পড়বে।

আবার এই দ্বন্দ্ব আমাদের সামনে আসে উপন্যাসের চরিত্রগুলোর বিন্যাস ও বিকাশের মধ্য দিয়ে। এই যে চরিত্রে চরিত্রে দ্বন্দ্ব – এটা হল এই উপন্যাসের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। একটা চরিত্রের বিকাশের ধারায় অন্য একটি চরিত্রের আগমণ এবং দুটো চরিত্রের মধ্যে তুলনা পাঠকের মনোজগতে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। একজন পাঠক যখন বিশপ মিরিয়েলকে ভালোবাসতে বাসতে জা ভলজাঁর সাথে পরিচিত হন, এবং এ দুই চরিত্রের তুলনা করতে থাকেন তখন পাঠকের মনেও প্রতিক্রিয়া হতে থাকে।  চরিত্রকে ভালোবাসতে বাসতে বাসতে পাঠক চরিত্রের মূল্যবোধও খানিকটা আত্মস্থ করে নেন।

৮.

একজন সাহিত্যিক ১৮ বছর ধরে যে উপন্যাস লিখেছেন সেটা পড়তে আমাদের হয়ত কয়েক ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে না। ওই উপন্যাস লেখার পর দেড়শ বছরেরও বেশি সময় পার হতে চলল, আর আজও ওই উপন্যাসের মানবিক ও বৌদ্ধিক আবেদন ফুরোয় নি। এর মানবিক আবেদন আমাদের হৃদয়কে নাড়া দিয়ে চলেছে। আর এই উপন্যাসে উচ্চারিত প্রশ্ন এখনো মানুষকে ভাবিয়ে চলেছে।

এই উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠকের মনে অসংখ্য প্রশ্ন জাগবে : মানুষের আবেগ-মূল্যবোধ-নৈতিকতার ভিত্তি কি হবে? মানুষ কি তার বিবেক ও আবেগের দ্বারা পরিচালিত হবে? নাকি জ্ঞান ও যুক্তির দ্বারা? ব্যক্তি মানুষের সত্তায় সৃষ্ট আবেগ ও যুক্তির মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব সমাজ ও রাষ্ট্রিয় জীবনেও এসেছে ভিন্ন আকারে – আইন কীভাবে তৈরি হয়? আইনের ন্যায্যতার ভিত্তি কি? আইনসঙ্গত হলেই কি তা ন্যায়সঙ্গত হবে?

সারা বিশ্বের সাহিত্যের ইতিহাসে এই উপন্যাসের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী মহান রুশ সাহিত্যিক লিও তলস্তোয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ – আয়তনের বিশালতায়, কাহিনীর অসাধারনত্ব ও নিপুণ বিন্যাসে, ঘটনা সমাবেশের বিপুল সমারোহে এবং সর্বোপরি চরিত্রচিত্রণের বৈচিত্র্য ও গভীরতায়। আমাকে যদি এ দুটোর মধ্যে তুলনা করতে বলা হয়, আমি নির্দ্বিধায় ‘লা মিজারেবলস্’-কেই প্রথমে রাখব।

এবং শেষ পর্যন্ত এ পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আছে – যারা ‘লা মিজারেবলস্’ পড়েছেন, আর যারা পড়েননি।

আলী নাঈম। লেখক ও সংবাদকর্মী। জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকার নাখালপাড়ায়। স্কুলজীবন থেকেই পাঠাগার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কলেজজীবন থেকে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয়। বিজ্ঞান সংগঠন গড়ে তোলা, দীর্ঘদিন যাবৎ পত্রিকা সম্পাদনার কাজসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে সম্পৃক্ত। ছাত্রজীবন শেষে বামপন্থী রাজনীতির সাথে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ