লীলাচূর্ণ (এক)

মজনু শাহ
কবিতা
Bengali
লীলাচূর্ণ (এক)

লীলাচূর্ণ  (উপক্রমণিকা)

শব্দই অস্তিত্ব তার, বীজ, গর্ভঘুম, মেঘমালা—
কোনো বন্দি বুলবুল যত ধ্বনি তোমাকে পাঠায়
কোনো নটরাজ এই দ্যাবাপৃথিবীর কেন্দ্র ফুঁড়ে
উঠেছে যখন, ভাবো, সব আদি শব্দ মৃত্যুঞ্জয়ী;
গ্রহান্তরে তারা উড়ে যেতে যেতে পাখিদের ভাষা।
অতি ধূসরতা যদি শব্দরঙ মেনে নিতে পার
যদি পুনর্বার চোখ মেলো এই গুহা-শহরের
মধ্যে ঢুকে, শুধু বিচ্ছুরণ, শুধু নৈঃশব্দ্য প্রণয়,
তুমি তারই অপেক্ষায় বুড়ো হয়ে গেলে বাস্তবিক
হাঁটার দূরত্বে চাইলে ঝর্ণা, কোনো বিখ্যাত নির্বোধ
যেভাবে সংকল্প করে যে-রূপে সম্ভোগ করে শব্দ
সেই সুনির্মম পথ অপরূপ দস্যুমেঘেদের
ঝরাপাতার আসন বেছে নেয় গূঢ় কোনো ভাঁড়
আনারকলির মতো মরে যায় শব্দেরা তখন—

 

এক.

আমাকে নিক্ষেপ করো পৌরাণিক গল্পের অরণ্যে
একটি বিন্দুর মতো, শোনো, আর কিছু চাইব না।
কোথাও রয়েছে প্রশ্ন প্রহরীর স্খলিত নিদ্রায়,
সেইসব দেখি আর থমকে থাকি ঘাসের পাখায়
তারার ধুলোর মতো, তারারশ্মি, তুমিও নশ্বর!
আমি কি পেখম এত বয়ে নিতে পারি মহাকাল
যেখানে করুণ ছায়া ছায়াজাল আহা জালখানি
ক্রমশ জড়ায় অঙ্গে! যতিচিহ্ন ছড়ানো জঙ্গলে
আজ কোথা থেকে এত তুলো উড়ে আসে ওগো হেম
ওগো রক্তমাখা বীর, কোনো যোনিপুষ্প ঢেকে দিতে
আমাকে বলো না আর, শাদা স্তব্ধ পিয়ানোর কাছে
আমার কবিতা তবু মূর্চ্ছা যেতে যেতে জেগে ওঠে,
তখনও দূরের গদ্য থেকে অপরূপ ফুল্কি উঠছে
ধসে পড়ছে দেখো ধুলো হচ্ছে ক্রমে লেখার টেবিল।

দুই.

বিজেত্রীর ঘরে আমি যাইনি সেদিন, লোকে তবু
আমাকেই বেরুতে দেখেছে। ভ্রষ্ট সেই সন্ধেবেলা
গোলাপ ও আফিমের প্রজ্ঞাময় সংলাপের দিকে
হেঁটে গেছি এক স্বপ্নরিক্ত নটরাজনের মতো।
সেই হাড়-কঙ্কনের পথে, প্রভু, ভেবেছি বিস্ময়ে:
রঘু ডাকাতের মতো হয়ে যাই কেন যে আমরা
ওষ্ঠ চুম্বনের লগ্নে! মাটিতে অর্ধেক ডুবে থাকা
রথের চাকার গোঁয়ার্তুমি কীভাবে শরীরে জাগে!
নায়িকা-চূর্ণের রাতে, মৃত বেলফুলের ভিতর
তার গাঢ় কেশগন্ধ আমি পাই। বিজেত্রী বলেছে:
কাছে না এসেও এইভাবে নিকটে থাকার পথ
উন্মুক্ত রয়েছে, এইভাবে, বাক-বিভূতির দেশে
পৌঁছে গিয়ে দেখা যায় ঘুম-হারা কত মীনশব্দ,
কার স্পর্শ লেগে ওঠে ধীরে শিখীবর্ণ যবনিকা…

মজনু শাহ, জন্ম ২৬ মার্চ ১৯৭০, গাইবান্ধায়। এ পর্যন্ত প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ — আনকা মেঘের জীবনী (১৯৯৯), লীলাচূর্ণ (২০০৫), মধু ও মশলার বনে (২০০৬), জেব্রামাস্টার (২০১১), ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না (২০১৪), আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া (২০১৬), বাল্মিকীর কুটির(২০১৮)।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ