শেষ দেখা

কাজরী মজুমদার
গল্প
Bengali
শেষ দেখা

-হ্যালো….হ্যালো? শুনতে পাচ্ছিস?

-কে রত্না বলছিস?

-হ্যা,শুনতে পাচ্ছিস?

-পাচ্ছি, বল?

রত্না-তুই বলেছিলি যে আজ ওঁদের কথা বলবি!

-নেটের খুব সমস্যা চলছে রে,তাই বলছিলাম আরেকদিন না হয় বলবো

রত্না-দ্যাখ কুশল,তুই কথা দিয়েছিলি কিন্তু!

কুশল-হ্যা, কিন্তু!

রত্না-কোনো কিন্তু না,যতক্ষন নেট ঠিক চলছে,ততক্ষণ বল না?

কুশল-ঠিক আছে,কি জানতে চাস বল?

রত্না-সবটা জানতে চাই,শুরু থেকে বল!

কুশল-ঠিক আছে শোন তাহলে!আমি যখন ক্লাস নাইনের কোচিং ক্লাসে নতুন ভর্তি হয়েছিলাম,তখন অলরেডি ওরা দুজন দুজনের বেশ ভালো বন্ধু।তুই তো জানিস ,আমাদের কোচিংয়ের ফিসটা কম থাকায়,এই কোচিংয়ে এত ভিড় হয়।আমাদের এখানে নিম্ন মধ্যবিত্ত,মধ্যবিত্ত,উচ্চ মধ্যবিত্ত, সব রকমই স্টুডেন্ট ছিল এবং আছে।তরুণ আর ঝুমুর,দুজনেই যেহেতু নিম্ন মধ্যবিত্তের ছিল তাই নিজেদের স্ট্যাটাস নিয়ে ওঁদের কখনো কোনো দ্বন্দ্ব হয় নি।এদিকে বরাবরই আমার ঝুমুরকে খুব ভালো লাগতো।ও আসলে কখনো নিজের অভাবটা লজ্জায় লুকায় নি,আবার কখনো অভাবটাকে কারোর সামনে বেশি করে দেখিয়ে সহানুভূতি চায় নি।ক্লাসের সব মেয়েদের মধ্যে ওর কিছু না থেকেও যেন কি ছিল।আমি ওকে অনেক সময় সাহায্য করতে চেয়েছিলাম।পড়ার ব্যাপারে কিছু সাহায্য করতে চাইলে কখনো না করতো না,রাজি হতো।কিন্তু নোটস কিংবা পড়া ছাড়া যদি কিছু দিতে চাইতাম কিংবা কিছু করতে চাইতাম তখন ও নিতে চাইতো না।শুধু একবার ফ্রেইন্ডশিপ ডে তে, ওঁকে আর তরুণকে একটা ফ্রেইন্ডশিপ ব্যান্ড আর একটা ঘর সাজাবার শো পিস দিয়েছিলাম,ওটা নিয়েছিল।

ও বুঝতো,যে ওকে আমি খুব পছন্দ করি।ও চাইলে আমাকে আর তরুণকে,দুজনকেই হাতে রাখতে পারতো।কিন্তু একদিন আমাকে ও বলেছিল যে, তরুণকে ও খুব ভালোবাসে আর আমি নাকি ওর খুব ভালো বন্ধু,যেই বন্ধুকে খুব বিশ্বাস করা যায়।প্রথম প্রথম তরুণের ওপর আমার খুব রাগ হতো,কিন্তু তরুণ ছেলেটাও এত সাদাসিধে যে পরবর্তী কালে,আর ওর ওপরও আমার কোনো রাগ ছিল না।হয়তো ঝুমুর আমার ফিলিংসের কথা তরুণকে বলেছিল।কিন্তু তার জন্য তরুণ কখনো আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে নি।বরং ওরা মাঝে মাঝেই, আমি না করা সত্ত্বেও আমাকে জোর করে ওঁদের সাথে এদিক,ওদিক ঘুরতে নিয়ে যেতো।আমার সাথে ওরা বেশ কিছুক্ষণ গল্প করে,তারপরে আমাকে দুজনে একটু এগিয়ে দিয়ে,নিজেরা আরো কিছুক্ষণ গল্প করে বাড়ি চলে যেত।

কিরে,শুনতে পাচ্ছিস তো?

রত্না-হ্যাঁ হ্যাঁ!তুই বল,আমি সব শুনতে পাচ্ছি

কুশল-তরুণ আর ঝুমুরের দেখা করার একমাত্র মাধ্যম ছিল আমাদের কোচিং ক্লাস।তাই ঝড় জল যাই হোক না কেন,আমরা কেউ ক্লাসে যাই আর না যাই, ওরা দুজনে ঠিক ক্লাসে যেতো।স্যারের নিজের সমস্যার জন্য যদি স্যার কখনো ছুটি দিতেন,ওঁদের অবস্থা যদি দেখতি!আসলে ওঁদের তো দুজনের নিজের ফোন ছিল না।আর দুজনের বাবার যাও বা  ফোন ছিল তা তো স্মার্ট ফোনও না,তারওপর আবার তাতে সব সময় পয়সা ভরা থাকতো না।তাও এভাবেই সব ঠিক ঠাকই চলছিল।তবে ওঁদের ভালোবাসায় গ্রহণ লাগা শুরু হলো যখন থেকে আমরা করোনা রোগের কথা একটু আধটু শুনতে শুরু করেছিলাম।যখন থেকে টিভিতে করোনার জন্য সতর্ক বার্তা শুনছিলাম,তখনো কোচিং চলছিল।ঝুমুর বেশ সাবধানী মেয়ে ছিল তো,তাই ও তার কদিন পর থেকে ও মাস্ক পরে কোচিংয়ে আসতো।আমি আর তরুণ এই নিয়ে খুব খ্যাপাতাম ওঁকে।তবুও ও রোজ নিয়ম মেনে মাস্ক পরে আসতো।যেদিন কোচিং থেকে বলে দিলো যে,পরের দিন থেকে কোচিং বন্ধ থাকবে,কারণ তার ক’দিনের মধ্যেই হয়তো সরকার লক ডাউন ঘোষণা করতে পারে।সেদিন ওঁদের কিই অবস্থা।আমারও একটু মন খারাপ লাগছিল যে কোচিংয়ে যাওয়া হবে না,ঝুমুরের সাথে দেখা হবে না,ওঁদের সাথে মজা করা হবে না।ঝুমুর চুপ করে বসে শুধু চোখ মুছছিলো, আর তরুণ তো খাঁচায় আটকে রাখা সিংহের মতো ছটফট করছিল।আসলে ওরা তো এটাই জানতো না যে, ওঁদের আবার কবে দেখা হবে

রত্না-হ্যালো!

কুশল-হ্যালো?কিরে শুনতে পাচ্ছিস না?

রত্না-হ্যালো কুশল!তুই আমার কথা শুনতে পাচ্ছিস?

কুশল-হ্যাঁ পাচ্ছি

রত্না-কি রে,শুনতে পাচ্ছিস?

ফোনটা কেটে গেলো।

তরুণ বসাক,ঝুমুর চৌধুরী আর কুশল সেন,এই তিনজনই একসাথে ক্লাস নাইনে যাদবপুরের একই কোচিংয়ে পড়তো।কুশলের বাড়ির অবস্থা বেশ ভালো ছিল।তরুণের বাবার যাদবপুর স্টেশনের ধারে ওঁদের বাড়ির থেকে দু চার পা গেলেই পান,বিড়ি,চিপ্স,বিস্কুটের দোকান ছিল।ঝুমুরের বাবার কাজের সূত্রে ঝুমুররা যাদবপুরে থাকতো।ঝুমুরের আসল বাড়ি ছিল ক্যানিংয়ে।ক্যানিং স্টেশন থেকে নেমে,স্টেশনের উল্টো দিকে গিয়ে,অটোতে উঠে শিতলা বাড়ি যাবো বলে একটা লম্বা ঘুম দিলেও মন্দ হবে না।আসলে অটোতে যাওয়ার দূরত্বটা অনেকটা।সেখানে নেমে রাস্তার ওপারে গিয়ে কাঁচা রাস্তার গলি দিয়ে কিছুটা গেলে ঝুমুরের দেশের বাড়ি।

বিকালবেলায় কুশলের কাছে আবার রত্নার ফোন এলো…..

রত্না-কিরে!ঘুমাচ্ছিলি?

কুশল-না, একটা সিনেমা দেখছি

রত্না-ও,আচ্ছা!তুই সিনেমা দেখে নে, আমি পরে ফোন করবো

কুশল-পরে দেখবো,তুই বল।ওটা তো ইউ টিউবে দেখছিলাম,পরে যখন তখন দেখতে পারবো

রত্না-আসলে কথা বলতে বলতে তো তখন ফোনটা কেটে গেল,আর তো কথা হলো না,তাই আরকি….

কুশল-ও!হ্যাঁ তাইতো।কতটা যেন বলেছিলাম?

রত্না-ওই যে,লক ডাউন শুরু হলো,তোর বেশ ভালো লাগছিলো

কুশল-হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। লকডাউনে কষ্ট বলতে আমি জানতাম যে আমাদের কাজের মাসি, রান্নার মাসি আসবে না। আর তার জন্য মাকে সব কাজ করতে হবে, আর সেই কারণে মার সারাক্ষণ মুড খারাপ থাকবে। দেখলাম লক ডাউনে, ঘরে বসে বসে খিদে বেড়ে গেছিল। আমার এই লকডাউনটা খুব একটা খারাপ লাগে নি। আর যেহেতু ভালোই লাগছিলো তাই লকডাউন বার বার বাড়ছিল বলে সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথাও ছিল না। তবে লকডাউনের কষ্ট কাকে বলে তা প্রথম জানলাম যখন তরুণের সাথে ওর বাবার ফোনে কথা বললাম….

-কি রে তরুণ কেমন আছিস?

তরুণ-ঠিক আছি রে,তোর কি খবর?

-আমি তো বিন্দাস আছি।খাচ্ছি দাচ্ছি, মা ভালো ভালো রান্না,টিফিন বানাচ্ছে।ছবি তুলে ফেসবুকে দিচ্ছে।সারাদিনে আমি খুব টিভি দেখছি,বেলা বারোটার পর ঘুম থেকে উঠছি।আমার এই ছুটি খুব ভালো কাটছে।তোর কি খবর? ঝুমুরের সাথে কথা হয়?

তরুণ-না রে,এই লক ডাউনে একবারও ওর সাথে কথা হয় নি।আসলে বাবার ফোনে একেই পয়সা থাকে না।যাও বা থাকে ইনকামিং ফ্রী, আউট গোয়িং বন্ধ

-ও,তাহলে তো খুব মুশকিল।কাকুকে বল তোকে একটা কমদামি ফোন কিনে দিতে

তরুণ-ফোন? আমার জন্য ফোন? এই বাড়িতে?

-কেন? হতে পারে না?

তরুণ-তুই জানিস না কুশল!তোদের অবস্থা ভালো তো,তুই বুঝবি না

-তা না রে,আজকাল তো বারোশ টাকায় ভালো ফোন পাওয়া যায়

তরুণ-বারোশ টাকা?তাহলে শোন আমাদের কি অবস্থা তোকে বলি!তবে এসব কাউকে বলিস না প্লিজ

-না না,আমি কাকে বলবো!

তরুণ-বাবার দোকানে প্রতিদিনের যা আয় ছিল,তা খুব খারাপ না।আমাদের দোকানটা খুব ভালো চলে।আমার পড়াশোনার জন্য খরচ করে কম বেশি সংসার মোটামুটি ঠিক ভাবেই চলে যেতো।এখন লক ডাউনের জন্য এতোদিন ধরে দোকান বন্ধ।বাবার কোনো রোজগারই হয় নি।মাল কেনার জমা পয়সায় আমরা এখনও খাচ্ছি,কিন্তু তারপরে কি হবে বলতো?জমা পয়সা সব শেষ হতে চলেছে।আসলে রেলের ধারের আমাদের দোকানটা বেআইনি।মানে ওটা তো রেলের জমি,তার ওপর আমরা বেআইনি ভাবে দখল করে দোকান করেছি।তার জন্য বাবাকে লোকাল ক্লাবকে চল্লিশ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।সেই টাকা বাবা একসাথে দিতে পারবে না বলে,প্রতি মাসে তিন হাজার করে দেয়।এখনো ওখানে তেরো হাজার টাকা বাকি।ওদিকে দোকানটা বানানোর জন্য, ধারে জিনিস কিনে বাবার প্রায় তখন পঞ্চাশ হাজার টাকা দেনা হয়েছে।সেটার জন্য সিমেন্ট বালির দোকানেও প্রতিমাসে তিন হাজার টাকা করে দিতে হয়।আসলে বাবার দোকানটা খুব চলবে তা বাবা আগেই জানতো।কারণ ওখান দিয়ে লেবার,লোকজনের খুব আনাগোনা।তাই বাবা ধার দেনা করেও দোকানটা1 বানিয়েছিল।বাবা জানতো যে বাবা একটু কষ্ট করে যদি এই টাকাগুলো মিটিয়ে দিতে পারে,তারপর লাভটা পুরোটাই বাবার।সেই আশায় আমদের খুব হিসাব করে চলতে হয়।বাবা শুধু বলতো,আর একটা বছর কষ্ট করলেই আমাদের দুঃখ দূর হয়ে যাবে।কিন্তু এই লক ডাউন আমাদের সব শেষ করে দিলো।আমরা খেতে পারি, আর না পারি,বাবাকে ছ’হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।অবশ্য এত তো পারছে না,চার হাজারই দিতে পেরেছে।রোজগার না হলে বাবা এতোটাকা কোথায় পাবে বলতো?

-সে তো ঠিকই।তোদের ক্লাবের ছেলেরা আর দোকানদার জানে না তোর বাবার দোকান বন্ধ? তারপরেও চায় কি করে?

তরুণ-সরাসরি কি চায় রে,এমন ইনিয়ে বিনিয়ে বলে।বাবা গরীব হলে কি হবে,নিজে কষ্ট করবে,খাবে না তবুও,কারোর কথা শুনতে রাজি নয়।জানিস কুশল, বাবা খুব চিন্তায় আছে।সেদিন বাবার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল,বলছিল “এত পাপ করেছি ঠাকুর?যে এরকম দিন দেখতে হচ্ছে? আর পারছি না,আমার মরে যেতে ইচ্ছা করে”

-এ বাবা,সেকি রে!

তরুণ-হ্যাঁ, মা তো কথায় কথায় কাঁদে।ভয় পায়, যদি বাবার কিছু হয়ে যায়,আমাদের কি হবে?এসবের মধ্যে ঝুমুরের সাথেও কোনো যোগাযোগ নেই,কি যে হয়ে গেল সব

-ঝুমুরের কথা ভেবে মন খারাপ করিস না,আমি আজকেই ওর খবর নিয়ে তোকে জানাবো।তোর মতো ঝুমুরও নিশ্চয়ই কষ্টে আছে

তরুণ-ওদের অবস্থা তো আমাদের থেকেও খারাপ,কি জানি কেমন আছে?

-আমি তোকে সব জানাবো।এখন রাখছি,মা ডাকছে!রোজ মার কাপড় ধোয়া হলে ওই কাপড় ভরা বালতিটা ছাদে তুলে দিয়ে আসতে হয়।তারপর মা ছাদে কাপড় মেলে।তুই ঠিক থাকিস,পরে ফোন করবো

তরুণ-আচ্ছা

রত্না-তারপর তুই ঝুমুরকে ফোন করেছিলি?

কুশল-করেছিলাম অনেকবার,কিন্তু ফোন লাগছিলোই না।আমারও একটা জেদ চেপে গিয়েছিল।শুধু ঘন ঘন ওকে ফোন করছিলাম। তিনদিন টানা ফোন করে পাই নি।অবশেষে চার দিনের দিন দুপুরে ফোনটা লাগলো।ফোন ধরলো ওর বাবা।আমি খুব বিনয়ের সাথে বলেছিলাম,স্কুলের ব্যাপারে ঝুমুরকে কিছু কথা জানাবার আছে।ওর বাবা কেমন করে জানি কথা বলছিল,অনেকটা মদ খেলে যেমন হয়।কথা জড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছিল।এদিকে আবার মনে হচ্ছিল যেন কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে যাচ্ছে।আমার তো বেশ বিরক্তিই লাগছিলো,এই দুপুর বেলায় নেশা করেছে? অবশেষে ঝুমুরকে ফোনটা দিলো……

-কি রে ঝুমুর,কি খবর?

ঝুমুর-এতদিনে ফোন করলি কুশল?

-তুই হাঁপাচ্ছিস কেন? কি করছিস তুই?

ঝুমুর-একটু দাঁড়া

ঝুমুর বাবাকে বলছিল শুনলাম “বাবা!ঐখানে ছায়া আছে ,একটু বসবে?খুব পা ব্যাথা করছে”

আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না যে, এই লক ডাউনে ওরা ঘর থেকে বেরিয়েছে কেন!

ঝুমুর বললো…..

-অনেক অপেক্ষা করছিলাম তোর ফোনের।আসলে আমি তো জানি তরুণ আমায় ফোন করতে পারবে না

-আগে তুই বল,তুই ঘর থেকে বেড়িয়েছিস কেন?

……………

-কি রে ঝুমুর,কি হয়েছে তোর?তুই কাঁদছিস কেন?

ঝুমুর(চোখ মুছতে মুছতে)-না কাদঁছিনা।আমরা চলে যাচ্ছি রে

-চলে যাচ্ছিস? কোথায় যাচ্ছিস? গাড়ি কোথায় পেলি?

ঝুমুর-গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি।গাড়ি?উপহাস করছিস?

-উপহাস করবো কেন?

ঝুমুর-কথা না বলে আগে আমার কথা শোন।আমার ফোনের ইনকামিং ফেসিলিটি কতদিনের আছে, আমি জানি না

-আচ্ছা বল

ঝুমুর-আমার বাবা রাজ মিস্ত্রী। লকডাউনের জন্য এতদিন ধরে বাবার কাজ বন্ধ।বাবার সব পয়সা শেষ। এখানে আমাদের খাবার জুটছিলো না রে।কয়েকদিন লংকা দিয়ে পান্তা ভাত খেয়েছি।আর পারছি না।গ্রামের বাড়িতে গেলে ওখানে আত্মীয়দের ক্ষেত, ফসল আছে।বাবা ঠিক করেছে ওখানেই কম পয়সায় ক্ষেতে কাজ করবে।ওখানে অন্তত ভাতের সাথে একটু আলু কিংবা সব্জি অন্তত জুটবে

-ঠিক আছে কবে ফিরবি আর তোরা যাচ্ছিস কি করে?

ঝুমুর-আর ফিরবো না রে।বাবার আর আমার পড়া চালানোর ক্ষমতা নেই।অবশ্য আমাদের মতো ঘরে আমি যতটা পড়েছি সেটাই অনেক।বই তো বেচে দিচ্ছিলাম।আমাদের দুটো বাড়ি পরে এক কাকিমা কাকু আছে,ওরা খুব ভালোবাসতো আমায়।ওরা বই খাতাগুলো মাকে বেচতে দেয় নি।রেখে দিয়েছে ওদের বাড়িতে।আর নেওয়ার মতো তো আমাদের অনেক কিছু ছিল না।যে টুকু ছিল সেগুলো নিয়েছি সাথে।তবে প্লাস্টিকের বালতি,গামলা,বসার টুল সব মা পঁচিশ, তিরিশ টাকায় বেচে দিয়েছে।জানিস!মার একটা দেড়শো টাকার শাড়ি ছিল।ওটা মার খুব প্রিয় শাড়ি ছিল,সেটাও কুড়ি টাকায় বেচে দিয়েছে।কুশল একটা কথা বলবো রাগ করিস না রে,তুই যে ফ্রেন্ডশিপ ডে তে একটা ব্যান্ড আর একটা ঘর সাজানোর স্ট্যাচু দিয়েছিলি,সেই ব্যান্ডটা নিয়েছি সাথে তবে স্ট্যাচুটা বেচে দিয়েছি।ওটার জন্য ভালো টাকা পেলাম জানিস!পুরো নব্বই…. টাকা।আসলে ভাত খাওয়ার পয়সা নেই, সেখানে বাবার কাছে নিজের শরীরের জন্য প্যাড কেনার পয়সা চাইবো কি করে বল?এই সময় আমার ডেট চলছে,মা অবশ্য বলেছিল,টাকা নষ্ট না করে মার শাড়ি ছিড়ে নিতে।আসলে পেটে একটু বিদ্যা থাকায় যেখানে সেখানে খোলা জায়গায়,বাথরুমের কাজও যে করতে পারবো না,সেটাই মুশকিল।আমরা হেঁটেই গ্রামের বাড়ি ফিরছি।তাই রাস্তায় প্যাডটার খুব দরকার ছিল রে

-তোরা হেঁটে যাচ্ছিস মানে? তোর বাড়ি তো সেই ক্যানিংয়েরও অনেক ভিতরে

ঝুমুর-হ্যাঁ, আর উপায় কি বল? আজ তো দেড় দিন ধরে হাঁটছি। আমাদের সাথে আরো দুটো পরিবার আছে। তাও তো ভালো আমাদের সাথে কোনো ছোট বাচ্চা নেই। (কাঁদতে কাঁদতে) জানিস কুশল, আমার মার শরীরটাও ভালো নেই, কিন্তু মার মনের জোর অনেক। যতক্ষণ না আমরা ওখানে পৌঁছাচ্ছি, খুব টেনশান হচ্ছে। কি জানি মা, শেষ অবধি পৌঁছাতে পারবে নাকি

-তোরা কি পাগল হয়ে গেছিস?

ঝুমুর-বাবা একটু জিরোলো, আবার হাঁটা শুরু করলো।এবার ফোন ছাড়ছি রে!এই গরমে হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা খুব মুশকিল।গলা শুকিয়ে যাচ্ছে,আমাদের সাথে খাবার জলও খুব বেশি নেই

-তোরা কবে পৌঁছবি?

ঝুমুর-বাবা বলছিল,যদি পা চালিয়ে হাঁটতে পারি তাহলে আজ রাতে পৌঁছিয়ে যাবো।কিন্তু মা কি পারবে?

-ঠিক আছে সাবধানে যা।ইস কিইই কষ্ট তোদের।আমি তো ভাবতেই পারছি না

ঝুমুর-তরুণ কে বলিস আর কখনো(কাঁদতে কাঁদতে) দেখা হবে না।আমরা আর কোনোদিনও ফিরবো না।তোরা ভালো থাকিস

-আমি তোকে আবার ফোন করবো

ঝুমুর-আর হয়তো লাইন নাও পেতে পারিস।বাবা বলেছে আর ফোনে টাকা ভরতে পারবে না

-আচ্ছা রেখে দে

রত্না-কুশল?কি রে,চুপ হয়ে গেলি কেন?

কুশল-রত্না তুই ভাবতে পারছিস,ওদের কত কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল?ঝুমুরের ওরকম শারীরিক অবস্থা!উফ্ আমি ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।ওর মা-ও অসুস্থ ছিল।পরে আমি বুঝেছি ওর বাবা ওরকম মাতালের মতো করে কথা বলছিল।হাঁটতে হাঁটতে কষ্টে ঠিক করে কথাও বলতে পারছিল না

রত্না-তারপর কি হলো রে?

কুশল-তারপর আর শুনতে চাস না

রত্না-না!আমি শুনবই,সে যত খারাপই হোক না কেন,তুই বল

কুশল-দাঁড়া একটু জল খাই

রত্না-আচ্ছা খেয়ে নে

জল খেয়ে কুশল বলা শুরু করলো…..

-তরুণকে ফোনে জানিয়েছিলাম সব।তরুণ একবার ঝুমুরের সাথে কথা বলতে চেয়েছিল।কিন্তু উপায় ছিল না।ওর বাবার ফোনে শুধু ইনকামিং ফেসিলিটি ছিল,আউট গোয়িং বন্ধ ছিল।আমি তারপরে অনেকবার ঝুমুরকে ফোন করেছিলাম কিন্তু ওর ফোন সুইচড অফ বলছিল,বুঝেছিলাম ওর বাবা আর টাকা ভরে নি।ঝুমুরের আর কোনো খবর পেলাম না।জানলাম না ওরা ঠিক করে পৌঁছিয়েছিলো কিনা?ওর মা শেষ অবধি নিজের বাড়িতে পৌঁছাতে পেরেছিল কিনা? যাক তবুও ওরা যদি ওখানে ঠিক করে খেতে পায়,সেটাই ভালো।ভাবতে পারিস রত্না,আমার মা,বাবা ফোনে আলোচনা করতো,”লক ডাউনের জন্য কিচ্ছু পাওয়া যাচ্ছে না।কতদিন ট্যাংড়া মাছ খাওয়া হয় নি”। বাবা বলতো “কবে যে মদের দোকান খুলবে।আর এই সন্ন্যাসী জীবন কাটাতে পারছে না”। ওরা কেউ ভাবতেও পারবে না যে এই লক ডাউনে তরুণ,ঝুমুরের মতো কত কত মানুষ তখন অসহায়ের মতো লড়ে যাচ্ছে!

রত্না-সত্যি রে।আমরা টিভিতে অনেক কিছু দেখি,শুনি।কিন্তু বাস্তবে এসব শুনে….

কুশল-এখনো তো কিছুই শুনলি না

রত্না-বল

কুশল-লক ডাউনের এসব চলতে চলতে শুনলাম উম্ফুন না আমফান ঝড় আসছে।যেহেতু পাকা দোতলা বাড়িতে থাকি,ঘরে ইনভার্টার আছে,বাবা বেশি করে বাজার হাট করে এনেছিল,ব্যাটারি ফুল চার্জ দিয়ে রেখেছিল,ঝড়ের প্রকোপে আমাদের কিছু ক্ষতি হয় নি।তবে হ্যাঁ,কারেন্ট ছিল না পুরো চব্বিশ ঘন্টা।ব্যাটারিতে টিভি চলে না,তাই কোনো নিউজ দেখতে পাই নি।তারপরের দিন দেখলাম এই ঝড় সব তছনছ করে দিয়ে গেছে।ফেসবুকে,ওয়াটসঅ্যাপে অনেক ছবি,ভিডিও দেখলাম।আমার দাদাদের একটা গ্রূপে কয়েকটা ছবি দেখলাম।তারমধ্যে দেখলাম,রেল লাইনের ধারে একটা দোকানের ওপর বিশাল গাছ পড়ে আছে,আর একটা ডালের নীচে কেউ চাপা পড়ে মারা গেছে।দাদাদের জিজ্ঞেস করলাম,এটা কোথাকার ছবি? ওরা কেউ বলতে পারে নি।আমার কেন জানি তরুণের কথা মনে পড়লো,ওঁদের দোকানও তো রেল লাইনের ধারে।আমি তরুণের বাবার ফোনে অনেকবার ফোন করেছিলাম।বার বার রিং হচ্ছিল কিন্তু কেউ ফোন ধরছিল না।টেনশান হচ্ছিল,ওর বাবার কিছু হলো না তো?এদিকে একদিন সারাদিন কারেন্ট নেই তাতেই আমরা নাজেহাল হয়ে গেছি।ট্যাঙ্কে জল শেষ হওয়ার আগেই মার সব দুঃখ কষ্ট দূর করে বাবা প্রতিদিন হাজার টাকা হিসেবে জেনারেটর ভাড়া করলো।মা তো কিইই খুশি,কিন্তু তবুও খেতে বসে বাবাকে বললো,এসিটা চললে খুব ভালো হতো  বলো?  কিই গরম পড়েছে না?

একবার ভেবেছিলাম, আমার বন্ধুদের পরিস্থিতি মা’কে শোনাই; কিন্তু কি লাভ? মা কিন্তু বাইরে মহিলা সমাজ সেবীদের সাথে গরীব দুঃখী, নির্যাতিত মহিলাদের জন্য অনেক কিছু করে,অথচ ঘরে নিজে কত ভোগী। যাক আবার তরুণের বাবাকে ফোন করছিলাম। এক সময় ওর মা ফোনটা ধরলো। আমি বললাম যে আমি তরুণের বন্ধু, ওর মা তো হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকলো। আমি বুঝলাম যে, তাহলে আমি যা ভেবেছি, সেটাই হয়েছে। তরুণের বাবা আর বেঁচে নেই। ওমা তারপরে দেখি ওর বাবা ফোন ধরে বলছে “কে?” আমি বললাম, “কাকু আমি কুশল, তরুণের বন্ধু”

কাকু-তুমি, খবর পাও নি?

-কি খবর?

কাকু কাঁদতে কাঁদতে-তোমার বন্ধুকে ঝড় এসে নিয়ে গেল

-কি বলছো? কাকে? কি হয়েছে?

কাকু-তোমার বন্ধুর আজ তিনদিন

-কিসের তিনদিন? তরুণ কোথায়?

কাকু-ঝড়ের দিন আমার শরীরটা খুব খারাপ ছিল।সন্ধ্যায় সেটা আরো বাড়ে।কেমন যেন শরীরটা ঝিনঝিন করছিল,শরীরটা অবস হয়ে যাচ্ছিল।ওর মা আমায় দুবার নুন চিনির জল করে খাইয়েছিলো।তখন সাময়িক শরীরটা একটু ভালো লেগেছিলো।কিভাবে জানিনা ঝড়ের তান্ডবে রান্নাঘরের জানলার ছিটকিনি খুলে, হওয়ার জোরে নুন আর চিনির শিশি গ্যাসের স্ল্যাপের ওপর থেকে পড়ে ভেঙে যায়।ওর মা কাঁদতে লাগে যে আমার রাতে আরো বেশি শরীর খারাপ হলে কি হবে।ঘরে নুন আর চিনিও একটুও ছিল না।তখন তরুণ বলেছিলো,দোকানে তো নুন,চিনি সব আছে,ও দোকান থেকে নিয়ে আসবে।আমি আর ওর মা অনেক বার ওঁকে,ঘর থেকে বেরোতে বারণ করেছিলাম।ও শোনে নি।বার বার বলছিল,এই ঝড়ে যদি আমার বেশি শরীর খারাপ হয় তখন কি হবে? তার থেকে ও বরং ছুটে গিয়ে নুন আর চিনি নিয়ে আসলে,অন্তত রাতটা কোনো মতে আমরা কাটিয়ে দিতে পারবো।ও চাবি নিয়ে ছুটে দোকানে গিয়ে,তালা খুলে ঢুকে পড়েছিল।তারপর নুন, চিনি নিয়ে বেরিয়ে, প্যাকেট দুটো হয়তো বগলে চেপে দরজায় তালা লাগাচ্ছিল।সেই সময় আমার দোকানটা যে বিশাল গাছের ছায়ায় এতদিন ছিল,সেই গাছ পুরো উপরে আমার দোকানের একটা দিকে কাত হয়ে পড়ে যায়। ও যখন তালা দিয়ে সবে আসবে বলে ছুটতে গেছে,ঠিক তখন আরেকটা বিশাল গাছের ডাল এসে ওর মাথায় ওপর…..

-কাকু?….তরুণ….

রত্না-কি বলছিস রে কুশল?

কুশল-হ্যা রে………তরুণ……..সব শেষ হয়ে গেল।তরুণও হারিয়ে গেল আর ঝুমুরও হারিয়ে গেল।আসলে ওরা তো সব গরীব হয়ে জন্মেছিল,তাই ওদের হয়তো হারিয়ে যেতেই হয়।আমরা বড়লোকরা শুধু বাঁচার অধিকার রাখি

রত্না-এরকম করে বলিস না!

কুশল-কেন ,ভুল বললাম? দ্যাখ না,তোর কিছু হয়েছে? আমার কিছু হয়েছে? ঝড়ের পর এগারো মাস কেটে গেলো, এই এতদিন পরে আমরা আবার নরমাল স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি।অবশ্য এখনো কোচিংয়ে যাওয়া শুরু করি নি।তোর সাথে ঘরে বসে অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে আলাপ হলো,এখনো তোর সাথে সামনা সামনি দেখা হয় নি।এতদিন কেটে গেল,তাও এখনো ওদের ভুলতে পারি নি

রত্না-সেটাই তো স্বাভাবিক।তবুও বলছি,প্লিজ কাল কোচিংয়ে আসিস।অনলাইনে হলেও,তোর সাথে ছাড়া আমার আর তেমন কারোর সাথে আলাপ নেই

কুশল-দেখি,চেষ্টা করবো

রত্না-চেষ্টা না,তোকে কাল আসতেই হবে।দ্যাখ আমি বুঝতে পারছি ওরা তোর খুব ভালো বন্ধু ছিল।কিন্তু তরুণ আজ নেই আর ঝুমুর ওর জগতে ভালো আছে হয়তো

কুশল-আসলে শেষ যেদিন আমরা কোচিংয়ে গেছিলাম,ঝুমুর ভেজা চোখে তরুণের হাত ধরে বলেছিল, “আবার কবে দেখা হবে?” ওই ছিল আমাদের তিনজনের শেষ দেখা

রত্না-বুঝতে পারছি,কিন্তু তুই তো আর পড়া থামিয়ে দিতে পারবি না,বল

-হম

রত্না-আমি এখন রাখছি,কাল দেখা হবে

কুশল আর কোনো উত্তর দিতে পারে নি।পরের দিন কুশল কোচিংয়ে গিয়ে দেখে,সবাই খুব খুশি। এতদিন পর আবার কোচিং শুরু হয়েছে।ক্লাসে ঢোকার আগে প্রথম দেখা হলো রত্নার সাথে কুশলের।ক্লাস হলো।ক্লাস থেকে বেরিয়ে রত্না একটা বইয়ের ব্যাপারে কুশলকে কিছু বলছিল তবে কুশল সেই জায়গাটার দিকে তাঁকিয়ে ছিল,যেখানে তরুণ,ঝুমুরের সাথে ওর শেষ দেখা হয়েছিল।হঠাৎ সেকেন্ড ব্যাচের একটা ছেলে কুশলের সামনে এসে,কুশলের দিকে একটা ফ্রেইন্ডশিপ ব্যান্ড এগিয়ে দিলো।তরুণ ছেলেটাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ফ্রেইন্ডশিপ ব্যান্ডটার দিকে ভালো করে খেয়াল করলো।ওর সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো এরকমই তো সেইম দেখতে ও তরুণ আর ঝুমুরকে দিয়েছিল।কুশল বুঝতে পেরেই অস্থির হয়ে ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিল,ছেলেটার শরীরের থেকে নিজের দৃষ্টিটা সরিয়ে ছেলেটির অনেকটা পিছনে দেখলো,একটু অপরিস্কার কাপড়ে ঝুমুর দাঁড়িয়ে আছে। ঝুমুর? কুশলের যেন শরীর অবস হয়ে যাচ্ছিল,পা চলছিল না।ও রত্নার কথা থামিয়ে ঝুমুরকে দেখাতে গিয়ে ঝুমুরের নামটা উচ্চারণ করতে পারছিল না।রত্না কুশলের অবস্থা দেখে সামনের ছেলেটাকে পাশ কাটিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখে,অপরিষ্কার কাপড় পরা একটা মেয়ে দূরে দাঁড়িয়ে আছে। রত্না দেখেই কুশলের দিকে তাকিয়ে বললো “ঝুমুর?”

কুশল উত্তর না দিতে পারলেও, কুশলের অবস্থা দেখে রত্না যা বোঝার বুঝে গেছিল।কুশল কেমন হয়ে গেছে দেখে রত্না কুশলের হাত ধরে টানতে টানতে ঝুমুরের সামনে গিয়ে বলে…..

রত্না-তুমি ঝুমুর?

ঝুমুর মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়

রত্না হেসে বলে-কুশল ঝুমুর,তোর ঝুমুর!

কুশল -তু…ই এখানে? বলেই কুশল ঝুমুরকে জড়িয়ে ধরে

ঝুমুর কাঁদতে কাঁদতে-খাওয়ার লড়াই আজও যে শেষ হলো না রে।আমি আর বাবা এখনো লড়ে যাচ্ছি

কুশল-কাকিমা?তার মানে কাকিমা আর বাড়ি পৌঁছায় নি?

ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল ঠিক,ওখানেই একটা তালা বন্ধ বাড়ির সিঁড়ি ছিল।রত্নার ইশারায় ওরা তিনজনেই ওখানে বসলো।

ঝুমুর-না রে,মা বাড়ি পৌঁছিয়েছিল।কিন্তু ভেবেছিলাম এক, আর হলো এক

কুশল-মানে?

ঝুমুর-ওখানে পৌঁছিয়ে বাবা সবার সাথে দেখা করে বোঝে,ওখানের আত্মীয়রা সব্জির চাষ করে না,ফুলের চাষ করে।যে ফুল আমরা ঠাকুরকে দি।গাঁদা ফুলের চাষ।কিন্তু লক ডাউনের জন্য ফুলের ব্যবসা বন্ধ,তাই ফুলের চাষ ভালো হলেও,ক্রেতা নেই,বাজার বন্ধ তাই সব ফুল বেকার হয়ে গেল।তারপর ওরা ভাবলো চিনা বাদামের চাষ করবে।ওটা তো সঙ্গে সঙ্গে বিক্রী না হলেও নষ্ট হয়ে যাবে না।তাই বাবা আর কয়েকজন মিলে টাকা ধার করে,কত কষ্ট করে চিনা বাদামের চাষ করলো।এদিকে আমফান ঝড় আসার আগেই আমাদের মতো কাঁচা বাড়ির মানুষদের সরকার থেকে সুরক্ষিত আশ্রয়ে নিয়ে রাখলো।পাকা উঁচু লম্বা হল।ওখানে মেঝেতে চাদর পেতে শুতে হতো।দুবেলা ওরা ভাত ডাল খেতে দিতো।ওখানে ভালোই ছিলাম। নিজেদের বাসন পত্র নিজেদেরই মাজতে হতো।বাথরুমে সবসময় জল থাকতো তবে সকালে কে আগে বাথরুমে যাবে সেই নিয়ে একটু ঝামেলা হতো।তবে সারাদিন তেমন কোনো কাজ থাকতো না ।ঝড় এসে যখন চলে গেল,তখন আমাদের বাড়ির চাল উড়ে গেল,ঘরের ভিতর জল ভর্তি।পুরো এলাকা জলে ডুবে ছিল।মা আর বাবা এই জলের মধ্যে গিয়ে ঘরের যতটুকু বাঁচাতে পেরেছিল,বাঁচিয়েছিলো।জল সরে যাওয়া অবধি আমাদের ওই আশ্রয়েই থাকার কথা ছিল।মা সারাদিন জলের মধ্যে থেকে থেকে অসুখে পড়লো।সেই লড়াইটা আর মা লড়তে পারে নি।ওদিকে ঝড়ের জলে বাদামের চাষ জলের তলায়।লাভ হওয়া তো দূরের কথা,প্রচুর দেনা হয়ে গিয়েছিল।যার জমিতে চাষ করেছে তার কাছে দেনা,বীজ কেনার দেনা,উন্নত মানের সার কিনেছে তার দেনা।সব দেনা নিজেদের ভিটে মাটি সব বেঁচে বাবা শোধ করে দিয়েছে।আবার ফিরে আসলাম শহরে।বাবা রাজ মিস্ত্রীর কাজ ভালো জানে,আমি যদি দু একটা ছোট বাচ্চাকে পড়াতে পারি।আমাদের দুজনের চলে যাবে।আসলে গ্রামে তো অত পড়তে যাওয়ার চল নেই,তাই জানি ওখানে আমি কোনো টিউশনি পেতাম না।পেলেও কেউ বেশি টাকা দিতো না

কুশল-তোরা এখন কোথায় আছিস?

ঝুমুর-যেই কাকু কাকিমার বাড়িতে আমার বই খাতা আছে,সেই কাকিমার বাপের বাড়ির পাড়ায় একটা বড় ফ্ল্যাট হচ্ছে।ওখানে বাবা কাজ পেয়েছে।আমরা ওই ফ্ল্যাটের নিচে টেম্পোরারি আছি এখন

রত্না-তুমি আর পড়াশোনা করবে না?

ঝুমুর-ওসব আর আমার দ্বারা হবে না

কুশল-তুই তরুণের কথা…..

ঝুমুর-(একটু থেমে,দীর্ঘশ্বাস ফেলে)শুনেছি সব।কালও তোর খোঁজে এখানে এসেছিলাম তখন পিনাকী সব ….

কুশল-ও

ঝুমুর-কি জানিস কুশল,গরীব হওয়াটাই পাপ।গরীব হয়ে যখন জন্ম নিয়েছো তোমাকে অনেককিছু হারাতেই হবে।তোমাকে নিজেও হারতে হবে।আমাদের ঘর ভেঙে যাওয়া,সর্বস্ব চলে যাওয়া এসব নতুন না।গ্রামের দিকে যেখানে কাঁচা বাড়ির এলাকা,সেখানে বন্যায়,ঝড়ে এরকম হয়েই থাকে।তাই এতোকিছু বার বার হওয়ায় পরেও আমরা বেঁচে থাকি।ওই খড় কুটো যে টুকু বাঁচে সেগুলো নিয়ে আবার নতুন করে লড়াই শুরু করি

কুশল-তোকে পড়তে হবে

ঝুমুর-না রে! সে ক্ষমতাও নেই আর ইচ্ছাও নেই

কুশল-এক্ষুণি বললি না নতুন লড়াই।আজ থেকে আমিও আছি তোর এই লড়াইয়ে।চল,ওঠ! কাল থেকে কোচিংয়ে আসবি।আমি মাকে বলে এমাসের ফিস দিয়ে দেবো।মাকে সব বলবো,আমার মা মহিলা সমাজ সেবার সাথে যুক্ত,মা তোর রোজগারের একটা কিছু ব্যবস্থা করবে,যাতে তুই নিজেই নিজের পড়ার খরচ চালাতে পারিস

কথা বলতে বলতে ঝুমুর আর কুশল একটু এগিয়ে গেছে।রত্না বুঝলো,রত্না যে ওদের সাথে নেই তা কুশল খেয়ালও করে নি।তাও রত্না হাসি মুখে পিছন থেকে কুশলকে একটা ডাক দিলো…..

-এই কুশল, দাঁড়া…..!আমিও আসছি

ছুটে গেলো রত্না।

রত্না-কিরে!তোদের লড়াইয়ে আমায় নিবি না?

কুশল-তুই?তুইও থাকবি? খুব ভালো।কিরে ঝুমুর! রত্না থাকলে ভালোই হবে, বল?

ঝুমুর-তোরা কেন শুধু শুধু আমার জন্য

কুশল -তোর জন্য মানে?এবার আমরা প্রমাণ করে দেখাবো, গরীব হলেই হেরে যায় না,চেষ্টা করে জেতা যায়

রত্না-ঝুমুর,আমি তোকে আমাদের এতদিন অনলাইনে যে ক্লাস হয়েছে ,সেই নোটস গুলো দিয়ে দেবো

কুশল-কাল আমি আমাদের তিনজনের জন্য টিফিন নিয়ে আসবো

ঝুমুর-আমিও তোর পছন্দের কালো হজমি নিয়ে আসবো।রত্না, তুই ভালোবাসিস কালো হজমি?

রত্না-সেগুলো আবার পাওয়া যায় নাকি এখন?

ঝুমুর-গরীবদের দোকানে এখনো পাওয়া যায়

কুশল-আর যদি কোনো দিন শুনেছি না, তুই গরীব গরীব বলেছিস,দেখবি তোকে কি করি?

ঝুমুর-আচ্ছা বাবা! আর বলবো না কখনো…..

কোচিংয়ের সেই শেষ দেখা হওয়ার জায়গাটা একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো।তখনও ছিল তিনজন তরুণ,ঝুমুর আর কুশল।এখনও তিনজন রত্না,ঝুমুর আর কুশল।তিনজন নতুন লড়াইয়ের সূচনা শুরু করতে করতে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল…..সাক্ষী হয়ে রইলো, সেই একই গলি আর সেই গলির সব ঘর বাড়ি ইট পাথর…..

কাজরী মজুমদার। লেখক। জন্ম ও ভিটেমাটি ভারতের কলকাতায়। বর্তমানে স্বামীর কর্মস্থলের সূত্রে দিল্লিতে বসবাস। গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও সামাজিক বিষয়ে সরল ভাষায় লেখালিখি করেন। তিনি বিশেষত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এছাড়া বিভিন্ন ম্যাগাজিন আর পত্রিকায় নিয়মিত লেখালিখি করে...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..