শ্রীযুক্ত বনলতা সেন

উজান উপাধ্যায়
কবিতা
Bengali
শ্রীযুক্ত বনলতা সেন

মৃত্যুদণ্ড

কবিতার বাড়িঘরে আসলে হেঁটেছে এক মেয়ে-
জীবনানন্দ হেঁটেছেন বুকের ভিতরে রাখা ম্যাজিক শিখরে, কলমের ঠোঁটে এক পাখি হুশ-
কবিতা শব্দের স্নানঘরে ভ্রমণের আলো খোঁজে।
নীল চুল বাদামী চোখে সবুজ কোমল এক অন্ধকার নামে-
কবিতা কী আদৌ কোনও যতিচিহ্নে থামে-
তোমাদের ভাষা ছিল, চেতনার রঙ, বোধের আখর।

কখনও কখনও তাই ছবি ছেড়ে, জন্মের প্রয়োজন জড়ো করে আগেভাগে না মরার সতর্ক বাসরে-
কবিতা লিখেছো- হেঁটে গেছো এলিয়টে, শেলী ও নেরুদায়- বোদলেয়ার লোরকায়-
বারবার অশ্বমেধ, প্রিয়মুখে আদুরে গাধার ডাকনাম-শুনে শুনে বুঝে নিই এই জন্ম ঘাস জল মাটি আগুনের চেয়ে মৃত্যুর কাছে অনেক আদরনীয়-

আমার তো ভাষা শব্দ ধ্বনি মাত্রা ছন্দ নেই-একদম বেবোধ অসংযত বেপরোয়া ভালোবাসাটুকুই মাত্রাজ্ঞানহীন যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
আমার যে কবিতা লেখা ছাড়া এই বেয়াক্কেলে জন্মটাকে মিথ্যে করে দেওয়ার অন্য কোনও পথ খোলা নেই!
তাই তো একটি মেয়ে রোজ রোজ হেঁটে যাচ্ছে একা-
শুধুমাত্র আমার জন্যেই, মৃত্যুদন্ড বয়ে নিয়ে।

 

শ্রীযুক্ত বনলতা সেন

আরও কিছু প্রসন্নতা, মিলন প্রস্তাব..
আরও অগনন জাহাজডুবির শেষে বিপন্নতার বাঙ্ময় হ্রেষা, আরও শক্ত করে বুঝে পাওয়া নৈঃশব্দ্যের গোপন প্রিন্টআউট।
আরও এক অরূপকথন, আরও এক আখ্যানের চিত্রনাট্য, নারীজন্মের –
মেয়েদের এখনও খুঁড়ে ফেলা বাকি নিজের বাড়ির ভিত, পোক্ত করে —
সাতপাকে শুভদৃষ্টি সেরে পুরুষের
শরীরস্বাদ চুকে গেলে একা একা ভ্রাম্যমাণ নদী।
পুরুষেরা মোহানার অনেক আগেই বেমক্কা উধাও, ঢেউ- তাদের মধ্যে কেউ কেউ কক্ষপথ অভিন্ন রেখে অন্য বৃত্তে নিশিযাপনের গুপ্ত প্রয়াসে ব্যাপ্ত অনুচর, বাকি যারা যারা, কক্ষপথ পালটে ফেলে, প্রাচীন ব্যবসার অনুসারী।
মেয়েরা সেলাই করে ছিদ্র ঢেকে দিতে, মেয়েরা স্কুল কলেজ আর অফিসট্রেনে , মেয়েরা বাড়ি বাড়ি ছাত্র ঠেঙায়, ঘর মোছে আর কারখানা যায়, অটো টোটো রিকশা চালায় ..
পানের দোকানে মেয়ে কামুকের চোখে চোখে সুপুরি সাজায়, ঘরভাড়া ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে পুরুষের মহার্ঘ্য দানটুকু পেটের ভিতর থেকে উপড়ে তুলে এনে বুকের রক্ত আর সামুদ্রিক ঘামে গাছের শাখার মত , গাছের পাতার মত, গাছের গুঁড়ির মতো রস টানে, রস টানে-
তবুও সেখানে কচি পাতা, কুঁড়ি ফুল, বৃন্তে বৃন্তে শীতলক্ষ্যায় , অলকানন্দায়….
উচ্ছিষ্টের উঠোনে হিরণ্য বিচ্ছুরণে , জোনাকবাড়ির মেঝে জ্যোৎস্নায় , জ্যোৎস্নায় ….
মেয়েদের গোটা দিন ফুটপাত থেকে অট্টালিকা —
বিশ্রী ইঙ্গিত , ধর্ষকের চোখ ,
নষ্ট, ইতর আর খারাপ ভ্রমর —
এসব সামাল দিতে দিতে অস্থি , পাঁজর- ধাতব বর্মে ঢেকে নিয়ে মেয়েদের হাতে ওঠে সিগারেট , বিড়ি, গাঁজা, রঙিন গেলাস আর অশ্রাব্য শব্দের প্রকান্ড ক্ষয় — যদিও একাই মেঘ, একাই এক নদী আকাশে আকাশে ঠিকঠাক মুক্তির লাস্যময় স্বর বেছে নেয় ।
দিনের অন্ধকার, রাতের আলোয় তবু কিছু পুরুষের মুখে ওরা আচম্বিতে পেয়ে যায় অমলিন, অনায়াস নারীজ প্রণয়।
হয়তো অলীক তারা , হয়তোবা ছায়াময়, তবুও দুদন্ড শান্তি কি নারী
পেতে পারে পাখির নীড়ের মত চোখে কোনো এক অবিচল, শান্ত পুরুষের! স্নিগ্ধ কোটরে যে পুরুষ বুনে দেয় মায়াবী চাদর এক পরম আশ্রয়ের , অনাবিল অনাসক্ত প্রেমে।
পুরুষও তো হতে পারে শ্রীযুক্ত বনলতা সেন !
পুরুষও বলতে পারে ,” এতদিন কোথায় ছিলেন ? ”

 

একটি মৃত্যুর খবর এলে

এলিজা তোর শরীরে গড়িয়ে একটা ভোর নামে রাত্রি ভেঙে ভেঙে।
অনন্তে সাঁতরায় ঈশ্বরকণার মতো অনর্গল স্নেহময়ী শীতলতা-
বিপুলদের ছাদ থেকে যে রাতের মরণ দেখেছি
ছটফটে মণীষার ড্রয়িং রুমের কাচে ডুকরে ওঠে তারই যেন যমজ প্রত্যয়।
এলিজা তোর পিঠে ভ্রমর এঁকেছে গান, ভোরের নৌকায়-
তছনছ হয়ে গেছে শতশত চাঁদ পাহাড়ের কোলে রাখা আদুরে দোলনায়।

এই ভোররাতে তবুও কোথাও এক হতভম্ব রাস্তার মুখে বুকে নৃশংস মৃত্যুর নাচ-
প্রতিরাত সরাইখানার মতো, উদোম নেশাচ্ছন্ন
স্রোতের পায়ে পায়ে –
এলিজা জানিস তো, এমন এক আততায়ী ভোরে আলোকিত ফোটনের নাচের আড়ালে কত শ্মশানভূমিতে চিতা সেজে ওঠে, বৃষ্টি অপেক্ষা করে শেষকৃত্যের-
জীবন আর মৃত্যুর সঙ্গমে শুধু এক মুখাগ্নির মাহেন্দ্রক্ষণ-

 

হোমার

নরম কলিজা দেখে, ঠোঁটেও অলিভ দেখে আঙুলে হৃদয় দেখে ছুটে ছুটে এসে গেছে ঘাই হরিণীরা
দূরবীনে চোখ রেখে আগা মাথা মেপে নিয়ে তুমিও তো বুঝে গেছ তুলতুলে মাটির গড়ন
ভালোবাসা নিয়ে এসে, উপাসনা নিয়ে এসে, ভজন স্তবের পেশা ছকে গেছ, ফন্দিতে নন্দিত বাঘবন্দী খেলা-
সেই তো গোছাতে এলে, বিনয়ের কূট অবকাশে-
ভালোবাসা, নখের অভ্যাসে!
এতে যে পাগল মরে, এতে যা সাধক হারে, চিবিয়ে চিবিয়ে যার নাভিবৃক্ষ
ছিবড়ে করে গেছ!
এত রঙে প্রতারণা, এত ঢঙে প্রবঞ্চনা- পুড়ে যাচ্ছে ছায়ার বিভব!
ভালোবাসলে খুন করবে, স্নেহ ও মায়ার দর্পে –
চুম্বনে গিলে ফেলবে মুখর সংস্তব।
একবারও অনুতাপ জাগেনা তোমার-
এভাবে খুবলে খেলে, নষ্ট মহাকাব্য হাতে, অবশিষ্ট মৃতদেহে, আমিও যে নবাগত অন্ধ হোমার!

৬৫

যোদ্ধাদের ভালবাসা অস্ত্রে কুচকাওয়াজে প্রচণ্ড বোমারু বিমানের ধাক্কায়
ঘাড় গুঁজে ফেলে-
যুদ্ধের মাঠে তিতাস কোপাই আসে!
যদিও রক্তদাগে পলিমাটি দমবন্ধ করে ছায়াবাঁকে তন্নতন্ন লেবুগাছ, জলপাই, পানিফল, বাদামী আঙুর
খোঁজে, আমাদের ঘরে ঘরে ড্রয়িংএ, কিচেনে ফেব্রিক এর টোনে শাল সেগুন দারুচিনি-
যোদ্ধাদের জন্য দেবদারু, মহুয়া, সিমল – এসব ভাবার জন্য রাষ্ট্রসংঘ নয়।
বিজ্ঞাপনে কর্ডলেসে রেডিও ও টিভি স্ক্রিনে সোচ্চারে ভালবাসা বলতে বলতে –
প্রাচীনতম মাটির ভিতরে কত নিরুচ্চার প্রেম গুম হয়ে গেছে, হারিয়েছে অনন্ত আগুন তার
কোমলমতি ঠোঁটে, নিরুদ্দেশ
হয়ে গেছে ভাষা ও প্রজ্ঞান-
বুদ্ধ ও আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ ও গোদার্ড-
তোমাদের কারোরই তো ব্যারিটোন ভয়েস ছিল না।
ভালোবাসা বলে দেবার জন্য ডেসিবেলের উচ্চসীমা কত?

 

চুক্তিকুটির

আজকাল এটা হচ্ছে, তুমি পশ্চিমে ফিরে শুলে
আমি পূর্বদিকে ফিরে শুই।
তুমি বারবার ফ্যানের স্পিড বাড়াও-
আমি বারবার কমাই।
তুমি “খুব দরকার তাড়াতাড়ি বাড়ি এসো” বললে
আমি নতুন করে কাজ খুঁজে নিয়ে যতটা সম্ভব দেরি করে বাড়ি ফিরি।
আমাদের বিছানা আলাদা হয়েছে, আমাদের পছন্দগুলোও ইচ্ছাকৃতভাবে আলাদা হয়ে উঠছে
দিনে রাতে
আমাদের নেহাতই নিয়মে গড়া সাদাভাতে
আমাদের ক্রমাগত আস্বাদন কম
আমাদের প্রিয় গান, প্রিয় রঙ বরাবর আলাদা হলেও, প্রিয় খাবার বরাবর ভিন্ন হলেও
আমরা একে অপরেরটা গোগ্রাসে গিলতাম একদিন
পার্টিতে, আড্ডায় তাক লাগিয়ে বলে দিতাম –
একে অপরের সমস্ত গোপন জানালা ডাকঘরের ঠিকানা ভিজে চিঠির গন্ধের নাম।
কোথায় হারিয়েছে কার কটা লুকনো বোতাম!
বলতাম অনায়াসে।
এখন প্রতিরাতে আমাদের মধ্যে কাঁটাতার বেড়ে উঠছে মৃত দীর্ঘশ্বাসের পরমায়ু নিয়ে!
আজ হঠাৎ মধ্যরাতে জেগে বললাম-
চলো, এবার একটা গোলটেবিল হোক। দেরি হয়ে যাচ্ছে ভীষণ।

আমরা একটা মৌ চুক্তি করি।
আমরা তো নিহত শামুক –
আমাদের জুড়ে যাওয়া হৃৎপিণ্ড দুটোকে আলাদা করা এবার কিন্তু সত্যি জরুরী।

তার আগে একটা প্রস্তাব আছে-
শেষবারের মতো এতে আমাদের একমত হতে হবে। অনুরোধ রইলো আমার-
সাতজন্ম ধরে যৌথখামার আঁকবার প্রতিশ্রুতি ছিঁড়ে ফেলে মুখোমুখি ফিরে এলে- হয়তো শেষবার।
বললে, সহমত আমি , বলো কী করতে হবে-
ফিসফিস করে বললাম-
তারকাঁটা না বসিয়ে চলো আমাদের পৃথক হয়ে যাওযা অঞ্চল দুটোর মাঝখানে কিছু গাছ লাগিয়ে দিই পরপর, সারি ধরে।
তারপর জলসেচ-
একটা নদীর ব্যবস্থা করি, একটা লোকদেখানো সাঁকো-
ভালোবাসা নামের কিছু নকল কাগুজে ফুল জলরঙে বা তেলরঙে এঁকে রাখো।
তারপর, চেয়ে চিন্তে কিছু মেঘ রেখে দেবো
ঝাউছায়া আর দেবদারুর গভীর নরমে-
বৃষ্টি এলেই জলের কাছে আগাম জামিন নেবো।

আমরা তো ক্রমাগত দ্বিমেরুবর্তী । আমাদের ঘুম মানে তো চোর পুলিশের খেলা।
কিন্তু আত্মজা ওর যে এখনও আঁতুর ঘ্রাণ লেগে আছে ঠোঁটে।
ঘুম থেকে উঠে দেখবে বিছানায় মাছ, শঙ্খচিল , নানা ঢঙের ঘুড়ি- জানলায় গাঙশালিখেরা
ওর সারা গায়ে অলিভের পাতা, জরিবোনা শিশিরের মায়া-
হলুদ পাখিটাও চোখের আড়ালে কখন ঠিক ফিরে এসেছে, ঠোঁটে স্বপ্ননীল চিঠি একগোছা-
অবলীন নদীতীরে-
আমাদের দুই পৃথিবী হোক না যতই ধূসর –
ও তো জানুক আমরা প্রতিরাতে মোহানাতে নৌকা ভেড়াই-আর যে বাকিটা, সে এক অনিবার্য দেশান্তর-
শ্বাসবায়ু স্বয়ংক্রিয় হওয়ার খাতিরে আমাদের নিরুপায় যৌথ গ্রহান্তর-
নাট্যমঞ্চের আদলে গড়া চুক্তিকুটিরে।

 

অসদো মা সদগময়ঃ

আমার পন্ডিতমশাই। ভালো নাম কখনও মনেই রাখিনি। পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি উচ্চতার মানুষ।
আমার দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখলাম স্যর হেঁটে যাচ্ছেন। এই প্রচন্ড দাবদাহ অতিক্রম করে বোধহয় নিরুপায় হেঁটে যাওয়া সংসারের অনস্বীকার্য প্রয়োজনে।
কুঁকড়ে গেছেন বয়সের ভারে। কুঁজো হয়ে গেছেন।
এমন প্রায়ই হেঁটে যান।
আমার সামনে দিয়ে।
বারবার মনে হয় ডাকি, স্যর – কেমন আছেন।
ডাকিনা, আজও ডাকিনি।
কারণ-
আমাকে দেখতে হলে তাকে মাথা উঁচু করতে হবে- তার চেয়ে যে এখন উচ্চতা আমার বেশি- এ বড় বিড়ম্বনা, অসহ যন্ত্রণা।
ফাইভে উঠতেই হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলেন স্কুলে। গেটে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন-
বল আমার সাথে –
অসদো মা সদগময়ঃ
তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ
আমি দেখছিলাম – অগুনতি কাগুজে হাওয়াই জাহাজ উড়ছে স্কুলের আকাশে
তিনি বলে যাচ্ছিলেন –
বল, মা মাগো আমাকে অসত্যের পথ থেকে সত্যের পথে- অন্ধকার থেকে আলোর পথে- আলোর পথে নিয়ে চলো।
তেতাল্লিশটা বর্ষবলয় পেরিয়ে গেছি, স্যর – পেরেছি কী!
আমিযে দেখতে পাচ্ছি, ওই কথাগুলো মেনেও আপনি নিজেই আজ তীব্রতম অন্ধকারে ডুবে আছেন।
মানুষের মতো মানুষ করতে আপনি প্রতি রবিবার ছুটির দিনে আমাদের হাত ধরে বসে আঁকো, ক্যুইজ কনটেস্ট, আবৃত্তির প্রতিযোগিতার আসরে নিয়ে যেতেন।
চোখ বুজে বলে যেতেন গীতা, কোরাণ জেন্দাবেস্তা বাইবেল নানক কবীর লালন গোঁসাই এর গল্প।

বলতেন আপনার বাল্যবন্ধু আবদুল চাচা আর মাইকেল মশির গল্প।
বলতেন আপনার মায়ের সত্যনারায়নের মন্দিরে, প্রতি পুজোয় ওনাদেরকে নিজের হাতে খাইয়ে দিতেন আপনার মা।
ঈদে, মহরমে আপনারা কিভাবে আনন্দে মাততেন আবদুল চাচার মহল্লায়, বড়দিনের কেক বানাতেন একসাথে আপনার মায়ের রসুইঘরে বসে।
স্যর, এত উচ্চতা হয়েছে আমার- সব আলো ঝরে যাচ্ছে কুয়াশার মতো, শিশিরে জড়িয়ে মরে যাচ্ছে আলোকিত স্মৃতি।
আপনার ছেলে এখন হিন্দু নেতা, আব্দুল চাচার ছেলেকে হুমকি দেন-
দেশছাড়া করবেন বলে। চাচার ছেলেও ধাতব অস্ত্রে ধার দিয়ে চলেছেন দিনরাত।
চাচা নেই আজ পৃথিবীতে, নেই মাইকেল আঙ্কলও-
সমস্ত ক্ষত একা আপনার হৃদয়ে – পুঁজরক্তের ভয়াবহ শোক-
তবুও জানি আপনার সামনে গেলেই অষ্টআশি বছরের পন্ডিত মশাই খুব জোর খাটিয়ে মাথা উঁচু করবেন-
মাথার পিছনে আগুনের গোলা, পতপত করে উড়বে ভারতের জাতীয় পতাকা-
বলবেন-আজও
শোন – অনন্ত –
তোকে বড় আদর করে এ নামে ডাকতাম-
শিক্ষক হয়েছিস বাবু, প্রতিটি সূর্যোদয়ের আলোরেখা মাটিতে পড়তেই একটুও ভুল যেন না হয়-
বুক চওড়া করে
মাথা সোজা করে-
ছাত্রদের চোখে চোখ রেখে বলবি-
অসদো মা সদগময়ঃ
তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ
আমি বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছি, কী বলছি কিছুই বুঝছি না-
অস্পষ্ট ঝাপসা চোখে দেখছি- আপনি হাঁটতে হাঁটতে সমতল ছেড়ে নদী পেরিয়ে মালভূমি ডিঙিয়ে মরুভূমি পার হয়ে হিমালয় পাড়ি দিচ্ছেন-
উঠে যাচ্ছেন ধাপে ধাপে –
আমি দেখছি এভারেস্টের উচ্চতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে আপনার মাথা-
আবদুল চাচা, মাইকেল আঙ্কল।আপনার হাতে হাত এগিয়ে দিচ্ছেন-
আকাশ জুড়ে পতপত করে উড়ছে
তিনটে রঙ-
আমার মেয়ে মাটি স্কুল থেকে ফিরছে- গেটে দাঁড়িয়ে বলছে –
জানো বাবা আমাদের রাস্তার মুখে একটি পাহাড় এসে দাঁড়িয়েছে-
আমাকে আদর করতে এগিয়ে এলো, বললো চোখ বোজ দিদিভাই-
বল আমার সাথে-
অসদো মা সদগময়ঃ
তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ-
এর মানে কী বাবা, ওনাকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন- বাড়ি যাও, বাবা বলবে-
আমার ভারতবর্ষে আজ খুব বৃষ্টি নামছে- খুব- আমার মেয়ের চোখে চোখ রাখতেই বুঝতে পারলাম স্যর আমাকে এক লহমায় আট হাজার আটশো আটচল্লিশ মিটার উঁচু করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেছেন, পথ বেড়ে যাচ্ছে বেড়েই যাচ্ছে, ক্রমাগত দেশ ছাড়িয়ে মহাকাশে- মহাকাশ থেকে মহাশূন্যে-

উজান উপাধ্যায়। কবি। কবিতাপুরুষ। জন্মের আগেই প্রথম দোয়াত শূন্যে কুড়িয়ে নেওয়া। যাপনের প্রতিটি কার্নিশে, ভ্রমণের প্রতিটি আক্ষেপে কবিতার মেয়ে কবি উজানের অক্ষরবৃষ্টিকে ছুঁয়ে থাকে প্রেমে-অপ্রেমে। শুষ্ক নগরীতে ভালোবাসা লিখতে এলাম - এই উচ্চারণে একাকীত্বের গর্ভে লালিত তার নির্জন, ম্যাজিকাল, অভিকেন্দ্রীয় রূপান্তর।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ