সংগীত পরিচালক হিসেবে সত্যজিৎ

রেজা ঘটক
প্রবন্ধ
Bengali
সংগীত পরিচালক হিসেবে সত্যজিৎ

পুরোপুরি একটি সংগীত পরিবারে সত্যজিৎ রায়ের জন্ম। সত্যজিতের দাদু উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন একজন মিউজিক কম্পোজার। তিনি ভায়োলিন বাজাতেন, বাঁশি বাজাতেন, মৃদঙ্গ বাজাতেন, করতল বাজাতেন। এই চারটি মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টে তিনি অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। এছাড়া তিনি পিয়ানো বাজাতে জানতেন। পিয়ানো বাজিয়ে তিনি নতুন গানের সুর করতেন। সত্যজিতের মায়ের ঠাকুর দাদা কালী নারায়ণ গুপ্ত ছিলেন একজন বিখ্যাত মিউজিক কম্পোজার। সত্যজিতের মায়ের দিকের প্রায় সবাই ন্যাচারাল সিঙ্গার ছিলেন। সত্যজিতের নানী ও তার সকল বোন গান গাইতেন। সত্যজিতের মা গাইতেন। মায়ের ভাই বোনেরা, চাচাতো ভাই-বোনেরা সবাই ছিলেন ন্যাচারাল সিঙ্গার। যে কারণে সংগীতের ভেতরেই সত্যজিতের বড় হয়ে ওঠা। রবীন্দ্রসংগীত ও শ্যামাসংগীত ছিল পরিবারের নিত্যদিনের বিষয়।

সত্যজিত খুব ছোটবেলা থেকেই ওয়েস্টার্ন মিউজিক কম্পোজ করা শিখে ফেলেন। ঘরে ওয়েস্টার্ন মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট ছিল। সেগুলো কোথা থেকে কীভাবে এসেছিল, তা সত্যজিতের অজানা। কিন্তু সংগীতের টানে তিনি সেসব মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টগুলোর ব্যবহার খুব দক্ষতার সঙ্গেই শিখেছিলেন। খুব ছোটবেলায় সত্যজিত জন্মদিনে উপহার হিসাবে পেয়েছিলেন গ্রামোফোন রেকর্ডার। যে কারণে ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর এক ধরনের টান তৈরি হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই বাংলা ও ওয়েস্টার্ন মিউজিক শুনতেন সত্যজিত।

ছোটবেলায় সত্যজিতের বয়সী ছেলেমেয়েরা যখন কবিতা লেখার চেষ্টা করছে, তখন তিনি মিউজক নিয়ে সিরিয়াসলি ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। স্কুলের এক বন্ধু ছিল ওয়েস্টার্ন ফ্যামিলির। সেই বন্ধু’র বাড়িতে মিউজিক রেকর্ডার ছিল। দুই বন্ধু মিলে মিউজিকের উপর বিস্তর পড়াশুনা করে, লাইব্রেরি ঘেটে নতুন নতুন ওয়েস্টার্ন সুর বাজানোর চেষ্টা করতেন। সেই সুরগুলো কতোটা পারফেক্ট হচ্ছে তা বোঝার জন্য বন্ধু’র বাড়িতে বসে রেকর্ড করতেন। মিউজিক কীভাবে কম্পোজ করতে হয়, কী কী মিলিয়ে মিউজিকে সুর হয়, সুরে ভ্যারিয়েশান আনতে কী কী করতে হয়, এসব নানান কৌশল ছোটবেলাতেই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই সত্যজিৎ আয়াত্ত করেছিলেন।

‘পথের পাঁচালী’ করার সময় সত্যজিৎ রবীশংকরকে নিয়ে ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিকের সঙ্গে ওয়েস্টার্ন মিউজিকের একটা যোগসূত্র করার চেষ্টা করেন। যেটি ছিল ইন্ডিয়ান সিনেমায় সংগীতে প্রথম ইস্ট-ওয়েস্টের সফল কম্বিনেশান। এরপর সত্যজিতের অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলোতে ইস্ট-ওয়েস্টের এই যৌথ কম্পোজিশান ভারতীয় সিনেমায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ‘জলসা ঘর’ ছবিতে সত্যজিত কাজ করেন ওস্তাদ বেলায়েত খাঁ’র সঙ্গে। আর ‘দেবী’ ছবিতে তিনি ওস্তাদ আলী আকবরের সঙ্গে কাজ করেন।

কিন্তু রবী শংকর, ওস্তাদ বেলায়েত খাঁ ও ওস্তাদ আলী আকবররা তখন আন্তর্জাতিক খ্যতিসম্পন্ন মিউজিসিয়ান। সত্যজিতের সিনেমায় যখন তাঁদের প্রয়োজন অনুভব করতেন, তখন এসব ওস্তাদরা বিদেশে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যস্ত সময় পাড় করতেন। সিডিউল সমস্যার কারণে তাই ১৯৬০ সালের দিকে ‘তিন কন্যা’ ছবি করার সময় সত্যজিৎ নিজেই সংগীত পরিচালনার দায়িত্ব নিলেন। শুরুতে একটু কঠিন হলেও ধীরে ধীরে সত্যজিৎ এটা মানিয়ে নিতে পেরেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পোস্টমাস্টার, মণিহারা ও সমাপ্তি গল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ নির্মাণ করেন ‘তিন কন্যা’।

১৯৬২ সালে সত্যজিৎ নির্মাণ করেন ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। যেখানে তিনি ন্যাচারাল সাউন্ড এবং পার্টিকুলারলি নৈঃশব্দ্যকে খুব দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেন। যা ভারতীয় সিনেমায় সংগীতের একটি নতুন দিক উন্মোচন করেছিল। ন্যাচারাল সাউন্ডের সঙ্গে নৈঃশব্দ্যের মিশ্রণ ভারতীয় সিনেমা সংগীতের একটি নতুন আর্ট হিসাবে তখন থেকেই বিবেচিত। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিতে ছোট্ট পাহাড়ি ছেলেটি যখন বাবুকে দেখে বলল, ‘বাবু পয়সা আমায় দাও না’। তখন বাবু পকেট হাতিয়ে একটা খেলনা মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট বের করে শিশুটির হাতে দিয়ে বললেন, ‘নে, তোরই জিত’। তারপর সেই ছোট্ট শিশুটি খেলানাটি নিয়ে খুশিতে দৌড় দেয়। তারপর পথের ধারে বসে পাহাড়ি শিশুটি একটি গান করে। নেপালি ভাষার গান- সিন্দা সিন্দা সিন্দারা, সিন্দা মেরে আজিরা, সিন্দা সিন্দা সিন্দারা… এখানে গানটির ব্যবহারে সত্যজিৎ দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছেন।

কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিতে সত্যজিৎ হিমালয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কাঞ্চজঙ্ঘাকে প্রপস এবং মেটাফোর দুটো অনুসঙ্গ হিসাবেই ব্যবহার করেছেন। গল্পটি এখানে দার্জেলিংয়ে বেড়াতে গিয়ে কলকাতার একটি ধনী পরিবারের শেষ দিনের ঘটনা নিয়ে। ছবিতে ইন্দ্রনাথ রায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন ছবি বিশ্বাস। সবচেয়ে দুঃখজনক যে ঘটনাটি তখন ঘটেছিল সেটি হলো- ১৯৬২ সালে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিটি মুক্তি পাবার পাঁচ সপ্তাহের মাথায় একটি গাড়ি ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ছবি বিশ্বাস মারা যান। ছবি বিশ্বাস ছিলেন সত্যজিতের অত্যন্ত প্রিয় অভিনেতাদের একজন। যে ঘটনায় সত্যজিৎ ভীষণ কষ্ট পেয়ে লেখালেখি পর্যন্ত তখন ছেড়ে দিয়েছিলেন।

নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ নির্মাণ করেন ‘মহানগর’। মহানগরে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন অনিল চট্টোপাধ্যায় ও মাধবী মুখোপাধ্যায়। সেখানে মাধবী’র একটা ডায়লগ আছে এরকম- ‘এত বড় শহর। এত রকম চাকরি। দু’জনের একজনেও কী পাবো না একটা’? প্রশ্ন শুনে অনিল চট্টোপাধ্যায় জবাব দেন- ‘চেষ্টা তো করি। আমার বিশ্বাস দু’জনেই পাবো’। এরপর মাধবী বলে- ‘জানো, আজ এত দুর্দিন, কী আছে কপালে কিচ্ছু ঠিক নেই। তবু আমার ভালো লাগছে’। জবাবে অনিল জানতে চায়- ‘আর ভয় নেই তো’? তখন মাধবী হাত এগিয়ে দিয়ে বলে- ‘দ্যাখো’! অনিল মাধবী’র হাত ধরে তখন কিছু একটা বুঝতে পেরে বলে- ‘চলো’। মাধবীও সায় দিয়ে বলে- ‘চলো’। এখানে সত্যজিৎ শহরের যান্ত্রিক শব্দকে অনুসঙ্গ করে এক ভিন্নমাত্রার মিউজিক করেন।

সত্যজিৎ সিনেমার প্রেমে পড়ার আগে সংগীতের প্রেমে পড়েছিলেন বলেই তাঁর সিনেমাগুলোতে মিউজক একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। সত্যজিৎ যদি চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবে আবির্ভূত না হতেন, কে জানে তিনি হয়তো একজন বড় মাপের সংগীত গুরু হিসাবেই জগৎ জয় করতেন। সত্যজিতের ছবিতে সংগীতের নানান কৌশলী ব্যবহার আমাদের সেই বিষয়টির কথাই মনে করিয়ে দেয়।

সত্যজিৎ মনে করতেন- ‘একজন ফিল্ম ডিরেক্টর খুব ভালো করেই জানেন, তাঁর ফিল্মে কোথায় কী ধরনের সংগীত ব্যবহার করবেন। সেক্ষেত্রে একজন ফিল্ম ডিরেক্টরকে সংগীতের ব্যাপারে যেমন কনসাস থাকতে হয়, তেমনি সংগীতের যথার্থ ব্যবহারের জন্য তাঁকে প্রফেশনাল মিউজিসিয়ানদের স্মরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে যেটি হয়েছে, খুব ছোটবেলা থেকেই আমার সংগীতে হাতেখড়ি। সংগীত ছিল আমার প্রথম প্রেম। বিশেষ করে চলচ্চিত্রে আসার আগে। যে কারণে আমার চলচ্চিত্রে কোথায় কী ধরনের সংগীত কীভাবে ব্যবহৃত হবে, এ বিষয়ে আমি খু্বই কনসাস। এ জন্য আমার সুব সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও থাকে। সুনির্দিষ্ট সংগীতের জন্য কী ধরনের সেট থাকবে, তা আমি আগেই ঠিক করি’।

‘চারুলতা’ চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ প্রথম সংগীত পরিচালনায় নিজের স্যাটিশফেকশনের কথা স্বীকার করেন। ‘চারুলতা’য় সংগীতের সঙ্গে ফিল্মের একটি পূর্বপরিকল্পিত যোগসূত্র স্থাপনে সত্যজিৎ প্রত্যয়ী ছিলেন। ‘চারুলতা’ ছবিতে চারু (মাধবী মুখোপাধ্যায়) কাজিন অমল (সৌমেত্র চট্টোপাধ্যায়)কে নিয়ে গাছতলায় আড্ডা দিচ্ছে। অমল লেখালেখির চেষ্টা করে। অমলের লেখালেখিতে চারু এক ধরনের সহযোগিতা করে। এমনিতে চারু খুব নিঃসঙ্গ গৃহিনী। কারণ স্বামী ভূপতি বাবু (শৈলেন মুখোপাধ্যায়) একটি নতুন পত্রিকা বের করেছেন। পত্রিকার কাজে তাঁকে খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। তো সেখানে গাছতলায় পাটি বিছিয়ে অমল কিছু লেখার চেষ্টা করছে।

পাশে দোলনায় দোল খেতে খেতে চারু গান গাইছে। ”ফুলে ফুলে ঢ’লে ঢ’লে বহে কিবা মৃদু বায়, তটিনী হিল্লোল তুলে কল্লোলে চলিয়া যায়। পিক কিবা কুঞ্জে কুঞ্জে কুহু কুহু কুহু গায়, কী জানি কিসেরই লাগি প্রাণ করে হায় – হায়। ” এখানে সত্যজিৎ চারু’র খালি গলায় গানটি নেন। ব্যাকগ্রাউন্ড হিসাবে পাখপাখালির গুঞ্জন। ছবিতে এখানে রবীন্দ্রনাথের গানটির এমন চমৎকার ব্যবহার কেবল সত্যজিতের মত একজন দক্ষ সংগীত পরিচালকের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। কারণ সত্যজিৎ ছবিতে গানের কোথায় কেমন ব্যবহার হবে, এটা আগেই পরিকল্পনা করে নিয়েছিলেন। ‘চারুলতা’য় সত্যজিৎ সিনেমার সঙ্গে সংগীতের একটি আন্তঃযোগসূত্র তৈরি করেছেন, যা সিনেমাটিকে আরো সমৃদ্ধ করেছে।

১৯৩০ সালের দিকে যখন প্রথম সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজক ব্যবহার হতে শুরু করল, তখন কিন্তু সিনেমায় সংগীতের ব্যবহার ছিল না। ধীরে ধীরে সিনেমায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করার জন্য প্রফেশনাল মিউজিসিয়ানদের আগমন ঘটেছে। আর একটা সময় সরাসরি সংগীতের ব্যবহারও শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৪০ সালের দিকে সিনেমায় সংগীত একটা বিশেষ জায়গা দখল করে নেয়। অনেক সময় সিনেমার দর্শকের কথা বিবেচনায় নিয়ে ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড এবং মিউজেকর ক্ষেত্রে ডিরেক্টরগণ ভিন্ন ভিন্ন কিছু পরিকল্পনা করেন।

যেমন ১৯৮১ সালে সত্যজিৎ ৫২ মিনিটের হিন্দি ফিল্ম ‘সদগতি’ নির্মাণ করেন। এটি মূলত সত্যজিৎ নির্মাণ করেছিলেন টেলিভিশনের জন্য। মুন্সী প্রেমচাঁদের ‘সদগতি‘ গল্প অবলম্বনে এই ছবি। যেখানে ভারতীয় সনাতন ধর্মের রিচুয়াল দেখানো হয়েছে। যেখানে একজন গরীব ঋষি (জুতার কারিগর) দুঃখী (ওমপুরী) তার মেয়ের বিয়ের তারিখ ঠিক করার জন্য গ্রামের ব্রাহ্মণ পূজারীর (মোহন আগাসে) কাছে যান। সেই সুযোগে পূজারী দুঃখীকে দিয়ে তার হাতের কাজ করিয়ে নেয় কোনো ধরনের অর্থ ছাড়াই। এখানে ব্রাহ্মণ পূজারী দুঃখীর নিচুজাতকে প্রাধান্য দিয়ে সেভাবে সবকিছু ঠিকঠাক করেন। এখানে সত্যজিৎ সম্পূর্ণ রিচুয়ালকে তুলে ধরতে মিউজিক এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে তেমন সম্পর্কিত বিষয়গুলো বেছে নেন। অথচ গান হিসাবে সত্যজিৎ এখানে পিয়ানোতে রবীন্দ্রনাথের ‘আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে’ গানটি নান্দনিকতার সঙ্গে ব্যবহার করেন।

সত্যজিৎ ব্রিলিয়ান্টলি তাঁর চলচ্চিত্রগুলোতে গান ও লিরিকের ব্যবহারে উঁচুমাত্রার দক্ষতা দেখিয়েছেন। সত্যজিৎ ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম গান লেখেন। যদিও ‘দেবী’ ছবিতে সেই গানের সুর সত্যজিতের নিজের নয়, তিনি সুরারোপ করেন অনেকটা প্রচলিত রামপ্রসাদী গানের স্টাইলে। ‘মা বলে আজ চলে যাব না, মা মা বলে আর ডাকব না। দিয়েছো দিতেছো অতি যাতনা। মা মা বলে আর ডাকব না’। গানটিতে সত্যজিৎ প্রচলিত রামপ্রাসাদী ঘরানার সুরারোপ করেন। কিন্তু সত্যজিৎ ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে যে গান লেখেন, সেখানে সুর এবং অর্কেস্টা পুরোটাই নিজের। অর্থ্যাৎ ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিতে সত্যজিৎ নিজের সুর ও অর্কেস্টায় প্রথম গান কম্পোজ করেন, যা পুরোটাই মৌলিক। ‘ভালোবাসা তুমি কী জানো‘ গানটি। ‘পায়ের উপর পাটি তুলে, কে যাবেরে ঘটা খুলে। বসে রও আপন ভুলে, যত বলি ধির হয়েছে, না না না মানো। ভালোবাসার তুমি কী জানো।’

দেবী’ ছবিতে নিজের গানে নিজেই অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তী সময়ে সত্যজিৎ দাদু উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী’র কাহিনী অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘গুপী গাইন ও বাঘা বাইন‘। যেখানে গুপীর ভূমিকায় তপেন চট্টোপাধ্যায় ও বাঘার ভূমিকায় রবি ঘোষ অভিনয় করেন। ‘গুপী গাইন ও বাঘা বাইন‘ ছবিতে সত্যজিৎ সাত-আটটি গান লিখেছিলেন। ‘মহারাজা তোমারে সেলাম, সেলাম সেলাম সেলাম। মোরা বাংলাদেশের থেকে এলাম। মোরা সাদাসিদা মাটির মানুষ দেশে দেশে যাই। মোদের নিজের ভাষা ভিন্ন আর ভাষা জানা নাই। মহারাজা রাজামশাই। তবে জানা আছে ভাষা অন্য, তোমারে শুনায়ে ধন্য, এসেছি তাহারই জন্য, রাজা, মহারাজ। মোরা সেই ভাষাতে করি গান, তুমি শোনো ভরে মনপ্রাণ। এ যে সুরেরই ভাষা, ছন্দেরই ভাষা, তালেরই ভাষা, আনন্দেরই ভাষা, ভাষা এমন কথা বলে বোঝেরে সকলে, উঁচানিচা ছোট বড় সমান, মোরা এই ভাষাতেই করি গান ‘ এই গানটি সত্যজিৎ প্রথমে পিয়ানোতে সুর তোলেন। গানের সুর করার সময় সত্যজিৎ সবসময় নোট লিখতেন। কখনো কখনো স্বরলিপিও লিখে রাখতেন।

হিরক রাজার দেশে’ ছবিতে একটা মজার দৃশ্য আছে। গুপী আর বাঘাকে একটা বাঘের ঘরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাঘের সাথে চোখাচোখি হতেই গুপী কিছুটা ভয় পেয়েছে। চেয়ে দেখে দরজায় বিশাল বিশাল তালা। বাইরে প্রহরী অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে। তখন গুপীকে সাহস যোগাতে পেছন থেকে বাঘা বলে, ‘গান গাও। গান কই’? গুপী তখন শুরু করেন- ‘সারেগা সাগাগা’, বাঘা তখন মনে করিয়ে দিতে চায়। বাঘ তখন ওদের ভালো করে দেখছে। কিন্তু গুপী’র কিছুতে গান মনে পড়ে না। আবারও বলতে থাকে- ‘সাগামাগা’। এবার বাঘা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে, ‘গান কই’? তখন গুপী বলতে থাকে- ‘পায়ে পড়ি’। এটুকু শুনে বাঘ কিছুটা যেন খুশি হলো। বাঘটি দাঁড়ানো অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে বসল।

তারপর গুপী গান ধরে- ‘পায়ে পড়ি বাঘ মামা, করো নাকো রাগ নামা, তুমি যে এ ঘরে, কে তা জানতো। এ যে বিনা মেঘে পড়ে বাজ, এসে বুঝি গেল কাজ, কেঁদে কেঁদে, দয়া করে থাকো ওগো শান্ত। ও বাঘ মামা, তুমি যে এ ঘরে, কে তা জানতো। যদি ঘাড়ে এসে পড়ে থাবা, কী হবে তা জানি পাপা, মারা যাবে তাজা দুটি প্রাণতো, হায় হায়, মারা যাবে তাজা দুটি প্রাণতো। দুটি তাজা প্রাণ আহা, যাবে হারা, আহারে হারা, জানি হারা যাবে তাজা দুটি প্রাণতো, তুমি যে এ ঘরে কে তা জানতো।’

গুপী’র গানের ফাঁকে বাঘা বাঘের মাথার উপর থেকে দেয়ালে ঝোলানো চাবি সংগ্রহ করে। চাবি দিয়ে দেয়ালের গুপ্ত বাক্সের তালা খুলে বাঘা হিরা আর মুক্ত পকেটে ঢুকাতে থাকে। তখন গুপী গানের সুরে বলে- ‘বাঘাদা বাঘাদা, বলি হিরে কত নিলে শুনি’, জবাবে বাঘা বলে, ‘নিয়েছি যথেষ্ট’। এরপর গুপী বলে- ‘তবে আর নিয়ে কাম নাই, এবারে চলো পালাই, বড় কষ্টে পাওয়া গেছে কেষ্ট, যথেষ্ট’। এখানে গানের সাথে বাঘ, গুপী ও বাঘার কারিশমা ছবিকে নতুন মাত্রা দান করেছে।

এরপর ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে সত্যজিৎ নিজেই গানের সুর করেন, অর্কেস্টা করেন। ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে রবীন্দ্রনাথের লেখা ভারতের জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’কে সত্যজিৎ অর্কেস্টা ও নিজের করা নতুন সুরের মাধ্যমে নতুন মাত্রা যোগ করেন। এভাবে ভারতীয় সিনেমায় সত্যজিৎ ওয়েস্টার্ন মিউজিককে ভারতীয় ক্লাসিক্যাল মিউজিকের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে এক নতুন মাত্রার সংগীত সেনসিবিলিটি তৈরি করেন। যা ভারতীয় সিনেমার সংগীতকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করে। আর ভারতীয় সিনেমায় সংগীতে এই নতুন মাত্রাটি যোগ হয় সত্যজিতের হাতে।

এরপর থেকে সত্যজিৎ গান লেখা, সুর করা ও গানে নিজস্ব স্টাইলে ওয়েস্টার্ন অর্কেস্টার ব্যবহার করে আনন্দ পেতে লাগলেন। যা তাঁর পরবর্তী ছবিগুলোতে আরো সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ভারতীয় সিনেমায় সত্যজিৎ একমাত্র নির্মাতা, যিনি সংগীত পরিচালনায় প্রফেশনাল মিউজিক ডিরেক্টরদের মত দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। যা ভারতীয় সিনেমার এক নতুন দিক উন্মোচন করে। যে কারণে সংগীত পরিচালনায় সত্যজিৎ রায় ভারতীয় সিনেমায় একটি নতুন অধ্যায়ের নাম।

রেজা ঘটক। লেখক। [বিস্তারিত আসছে...]   রেজা ঘটকের প্রকাশিত বইসমূহ:

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ