সতর্কবাণী

রাবেয়া রাহীম
কবিতা
Bengali
সতর্কবাণী

যাতনা বাড়ায় অহর্নিশি

একাকী একজন
দীর্ঘ রাত্রির নিস্তব্ধ প্রহরে
মুখোমুখি হই স্বপ্নাহত দিনলিপির
দুঃস্বপ্নের বীর্যে বেদনার গর্ভে জন্ম নেয়
কি অসহ্য হাহাকার!

কৃষ্ণপক্ষের মধ্যরাতে শরীরের নেশায় বুঁদ হয়ে
একজনই বলেছিল-এসো শিখিয়ে দেই ভালোবাসা কি…
এড়াতে পারিনি সেই কামার্ত আহবান,
তাই গিয়েছিলাম ভীরু পায়ে
পেরিয়েছিলাম নিষিদ্ধ সব দরজা,
অজস্র পাপগ্রস্থ জানালা।।

অবাক আমি নীরব খেলাতে,
গোপন মেলাতে
আপন খেয়ালে
বিলীন হয়েছিলাম–
সেই সর্বনাশা রাতে !

ছুঁয়ে দিলে কপাল থেকে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত–
বুকে জড়িয়ে রাখলে দীর্ঘক্ষণ !

কি ভয়ংকর সর্বনাশা ভালোবাসা দেখেছিলাম
তোমার দু’চোখের তারায় আর বুকের পাঁজরের গভীর খাঁচায় !!

কামনার আগুন সেদিন তুমিই জ্বেলেছিলে
নাজুক গোলাপের পাপড়ির মত আমার সমগ্র সত্ত্বায়!
অশরীরি তোমার আগমনে আন্দোলিত হয়ে
নিজেকে সাজিয়েছিলাম টকটকে লাল রঙে
আমি শুধু কান পেতে শুনেছিলাম চুমুর আহ্বান,
অতঃপর আমিও ঠোঁট বাড়ালাম।

ভালোবেসে সেই থেকে পুড়ছি আগুনে,
একাকী !

অনন্ত বিষাদের দৃষ্টিতে নির্বাক চেয়ে থাকা
আজ আমায় নেশাগ্রস্থ করে রাখে;
স্মৃতিটুকু রাখতে দিলে আমার কাছে-
দু’জনার স্মৃতি একাই বয়ে বেড়ানো
কি কষ্ট, বুঝতে পারো কি?
মৃত স্বপ্নরা অভয় দিয়ে বলে যায়
ফিরে আসবে সে,
কিচ্ছুটি হারাবে না!
তবুও হারায় সব,
যাতনা বাড়ায় অহর্নিশি!

 

সতর্কবাণী

থামার জন্য কোন সতর্কবাণী ছিলনা
কোথায় থামতে হয় জানা ছিলনা
কতটা কাছে এলে একাকীত্বের শ্বাস গুনে
পাঁজরের টুকরোয় চিতা সাজাতে হয়
বলে দিয়ে গেলে না!

চিতায় প্রলম্বিত সময় আমার দীর্ঘ হয়ে
জীবনের সীমানা পেরিয়ে যায়
তুমি আর ফিরবেনা?

অনন্ত যাত্রা

** এতো রাতে একা বেঞ্চে বসে আছেন, বাড়ি যাবেন না?
— বাড়ি তো নেই।
** বাড়ী ছাড়া কি মানুষ আছে?
— হ্যা আছে , আমার মতন মানুষ ।
** রাতে তবে কোথায় ঘুমান, এখানে এই বেঞ্চে?
— না, এখানে ঘুমাতে দেয় না, খুব কম দামে একটা রুম ভাড়া করেছি সেখানেই কোনরকমে রাত ভোর হয়ে যায় ।
** এখানে বসে আছেন, কিছু খেয়েছেন ?
— হ্যা, খেয়েছি ।
** কি খেয়েছেন?
— এক মুঠ বাদাম আর এক লিটার জল । বাদাম খেয়ে জল খেলে অনেকক্ষণ ক্ষুধা লাগেনা তো তাই ।
** রাতে ভাত না খেলে কি ঘুম আসবে? ঘরে ভাতের ব্যবস্থা নেই?
— উনুন, চাল হাড়ি সবই আছে কিন্তু রান্না করার মতন ধৈর্য্যে নেই। ইচ্ছেও হয়না। বড্ড ঝামেলার কাজটি।
** আপনি কি কি খেতে পছন্দ করেন? মানে ভাতের সাথে আর কি ?
— পছন্দের খাবারের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। সারাদিনে মনে মনে বেশ কয়েকবার খাওয়া সেরে ফেলি।
** শুনিইনা আপনার পছন্দের খাবার?
— ধোঁয়া উঠা বাসমতী চালের ভাতের সাথে চিংড়ী মাছের দো’পেয়াজী, সর্ষে ইলিশ, বেগুন ভাজা, লাউ শাক ভাজা, মুলো শাক দিয়ে কুচো চিংড়ি, ডালের বড়ি দিয়ে সাজনে ডাটার চচ্চড়ি আর রুই মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল ।
** হি হি হি হি হি হি ।
— হাসছেন যে? জানতে চাইলেন তাই বলে দিলাম। আচ্ছা আপনি রাঁধতে জানেন?
** হ্যাঁ আমি রাঁধতে জানি।
— কিছু মনে করবেন না তো যদি একটা কথা বলি ?
** অদ্ভুত, অদ্ভুত! আপনার কথায় কিছু কি মনে করতে পারি!
— আপনার রান্না কি আপনার হাসির মতই মুগ্ধকর !
** আমার হাসিতে মুগ্ধ হয়েছেন বুঝি?
— এটা শুধানোর মতন কি কিছু?
** আমার আর কি মুগ্ধ করে?
— এই যে কথার মালা গেঁথে জানতে চাওয়া , আমার বিষাদগ্রস্ত দিনের অবসান।
** তাই বুঝি! আরও কিছু?
— গভীর মায়াবী চোখে আমার জন্য মমতার পানি ধরে রাখা ।
** নিস্তেজ চোখ , নির্বাক কণ্ঠ , নিস্তরঙ্গ মস্তিষ্ক আর নিঃশব্দ চারপাশে মমতাও খুব বেশী নিরর্থক হয় যে ।
ভোরের হিমেল বাতাসে হঠাৎ বেড়ে যাওয়া শীতে খুব কষ্ট হয় দুটি প্রাণের। কোথাও যাওয়ার কথা যদি থাকে তাদের, কায়ক্লেশে কোথাও না কোথাও পৌঁছে যাবে একদিন অথবা নিশ্চিত এই জীবনের অনন্ত যাত্রায়।

অচেনা হওয়ার বাহানা

আজ দুজনেই অচেনা হওয়ার বাহানায় ভীষণ ক্লান্ত;
ভান করি এমন যেন, কোন কালেই চেনা ছিলে না তুমি-
কোনক্ষণেই হৃদস্পন্দন দ্বিগুণ হয়নি-আমার জন্য তোমার-
বা আমার হৃদয় পোড়েনি তোমার প্রেমে!!
পরস্পরকে অবহেলা করার–
কি ভীষণ ছেলেমানুষিতে ব্যস্ত আজ দুজন!!
যেন, কখনো তোমার ভালবাসায়
আমি রঙ্গীন হইনি– তুমি কেঁপে ওঠনি আমার ছোঁয়ায়!!

একমুঠো আলো-আঁধার মাঠ, তুমি আর আমি
এক আকাশ নগ্নতাকে সাক্ষী রেখে-তারা ভরা রাতে
হারিয়েছিলাম-তোমার বুকের রুক্ষ জমিনে;
নোনা ঘামের রোমশ বুকে মুখ লুকিয়ে-
বলেছিলাম “জন্ম জন্মান্তরের সাথী”।।

সব কিছুতে আজ শক্ত পাথুরে দেওয়াল দিয়ে
দূরত্ব বাড়ানোর কত হাস্যকর কৌশল আটি-
যেন কখনো তোমার নিঃশ্বাস-
আমার নিঃশ্বাসের ছোঁয়াতে ব্যাকুল ছিলনা!
শুধু জেনে রেখো–
তোমার ছায়ার কাছে কিছু প্রশ্বাস আমার তবু থেকে যায়!!

রাবেয়া রাহীম। কবি। জন্ম ২০ মার্চ, ময়মনসিংহ; বাংলাদেশ। বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়। বর্তমান নিবাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। জীবনকে খুব সহজভাবে দেখতে ভালবাসেন। যা কিছু মন ছুঁয়ে যায় তাই নিয়ে তাঁর ভাবনা প্রকাশিত হয় গল্প, কবিতায়। কৈশোর থেকেই কবিতার সাথে তাঁর বন্ধুত্ব।...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..