মুনা চৌধুরীর কবিতা

মুনা চৌধুরী
কবিতা
Bengali
মুনা চৌধুরীর কবিতা

সবুজ ভালবাসা

চেপে যায় অস্থিরতা, অন্তরালে ঝড়ো হাওয়া।
দু’হাতের শাখা পলায় বিকট শব্দ! মুক্তি নয়, স্বাধীনতা চায়।
সাঁঝের বেলায় ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকে, দু’জনে একসাথে কাঁদে।
জানালার পাশে বসে, পানের বাটা হাতে,
লাল ঠোঁট জোড়া কাঁপে, নোনাজলে হাসে।
মেলাতে পারেনা তার সাথে অন্যের বুলি।
এতো ফাড়াক! কেউ বলে অপ্সরী, রূপেগুণে মায়াবতী।
প্রিয় শুনে হেসে মরে, বাঁকা চাঁদ ঠোঁটের কোণে।
মুখগহ্বরের চাকা কচাৎ কচাৎ শব্দ তুলে, ভেতরটা নয় বাহিরটা দেখে।
আড়াল হয়ে আয়না হাতে কেঁচোর মতো বসে থাকে।
তার হাসি দু’কানেতে ঝনঝনিয়ে বাজে।
হঠাৎ স্নিগ্ধ বাতাসে, পানপাতা আর তামাকপাতার সুবাসে, নীলগুলো পাতা হয়ে ঝাউবনে ওড়ে।
টুকরোটুকরো হয়ে যাওয়া আকাশে, নিরীহ কালো মেঘ, চাতক পাখির মতো সবুজ ভালবাসা খোঁজে।

 

জানিনা

টিনএজের মতো করে কেন করছি আচরণ!
অথচ আমি শান্ত জলেশ্বরী!
ব্যাকুল মন অস্হির চোখ, তারই অপেক্ষায়।
যেনো আবার ভালবাসা হবে, কুয়াশা মাখা ভোরে!
ক্লান্ত দুপুরে, উদাসী বিকেলে, গোধূলি সন্ধ্যারাতে, বাজছে সানাই! জীবন নদীর তীরে!

জানিনা কেন কিশোরীর মতো করে, ভাঙছে বয়সের আড়াল!
চুপিচুপি ডেকেছি, দেখা হবে কাল!
সবই আছে তবুও কেন মেটেনা স্বাদ!
উড়ে উড়ে ভালবাসা আসে,
যেনো ঘোর লেগেছে মনের দুয়ারে!
হৃদয়ের খিল খুলে, লাল ঠোঁটে ভালবাসা ছড়ালাম তাসেরঘরে।

আকাশ কাঁপিয়ে বলছি কাছে আসো!
জেগে উঠে আবেগ নিস্প্রাণ সাগরে,
প্রণয়ের জলরাশি, কালোমেঘ ধুয়ে মুছে এক হতে চায়!
সাজিয়ে রেখেছি যেনো ছায়পথ, পুঞ্জিভূত অনেক তারার প্রণয়ে!
বৈশাখি ঝড়ো হাওয়ার মতো হৃদয় উত্তাল,
হেমন্তের জপমন্ত্রে শিশিরে ভিজি,
বসন্তরঙে রাঙি, পাখির কুহুতানে সুর বাঁধি।
কি হচ্ছে! কি হচ্ছে এসব টিনএজের মতো করে!
এগুলো কি সত্যিই ভালবাসা! নাকি মিছে বসুন্ধরা!
তোমাকে ছাড়া আমার কখনো কি সকাল হতে পারে! এও কি ভাবা সম্ভব!
নাকি সব মিথ্যে প্রণয় অন্ধকার!
নাকি হঠাৎ দূম করে আবার ফিরে যাওয়া পরিচিত ঝাপসা আলোর আঙিনায়!

একান্ত আমার যা, সবই আছে,
তবুও কেন দূর বহুদূর হতে দেবদাসেরা আসে!
তবে কি ভালবাসা বাঁধ মানেনা?
এমনকি মানেনা কোন কঠিন সরল ফাঁদ!
যেকোন বয়সে এসে তোলে ঝড় নিবিড় প্রণয়ের!

নাম না জানা বুনোফুলগুলো ফুটে,
কিছু বেঁচে থাকে, কিছু হারিয়ে যায় অন্য কোথাও প্রণয়ভ্রমর হয়ে গুনগুনাবে বলে!
বুঝি, সবই বুঝি, তবুও মানেনা মন,
অথচ আমি শান্ত জলেশ্বরী!

রেখেছি গোপন প্রণয় সযতনে চুপিসারে।
একটা কথা কি জানো!
সময়রেখা সময়কালের অসাময়িক রুপ নেয়না মেনে,
অযাচিত নিয়মের বাইরে “তুমি” সম্পর্কিত মানুষগুলো বড়ই বিচিত্র!
হোক সে নক্ষত্র কিংবা তারা।
বাকি থাকে মাটি, যাকে ছোঁয়া যায়, ভেঙে চুড়ে গড়াও যায়।
কিন্তু সেটাও বা কতটুকুন সম্ভব, লেখা থাকে ঐ মাটির বুকে!

ইচ্ছেগুলোর ক্ষমতা বড়ই বিচিত্র!
বয়স নামিয়ে কখনও তেরো কিংবা চৌদ্দ!
কখনও সাহসী, কখনো বা বোকা ভালবাসা।।

 

মিষ্টি মেয়ে

ঠকঠক আওয়াজ শুনেই,
ছোট্ট ছোট্ট পায়ে, দৌড়ে আসে মেয়ে।
দরজার আংটা পায়না নাগালে,ত্রি পায়া টেবিলখানা টেনে।
তুবুও মেয়ে দরজা খুলবে,বাবা এসেছে ঠিক জানে!
পেছন ফিরে মেয়ে তাকিয়ে দেখে,মা হাসছে মুখ টিপে।
দরজা খুলতেই আনন্দে মেয়ে, এক লাফে বাবার কোলে ওঠে।
গলা জড়িয়ে চুম দু’গালে, চোখ হাসে দুলেদুলে।
বাবা তুমি এসেছো? আমার জন্য কি এনেছো?
মুচকি হেসে বাবা বলে, সব এনেছি তোর জন্য।
ফুটন্ত কলির চিবুক তুলে মায়ার পরশ মাখে।
বিকেলবেলা সরিষা ক্ষেতে,সন্ধ্যায় মেলার মাঠে,
হাতী ,ঘোড়া ,পালকি চড়ে বাবার কাঁধে চেপে।

হঠাৎ মেয়ে আবদার করে-বাবা, আমার একটা ছবি দিবে তুলে?
বিস্মিত বাবা! কারণ ছবি তোলা ছিলো মেয়ের বড্ড অপছন্দ ।
মেয়ে মিষ্টি হেসে বলে, এবার তুমি যাবার কালে ছবি নিয়ে যাবে সাথে।
খানিকবাদে ফের আবদার সাগর দেখবে বলে!
মেয়ের কপালে চুম এঁকে,জড়িয়ে ধরে বলে,
আর ক’টা মাস সবুর কর্ মা,তোক সাগরের কাছে যাবো নিয়ে!
অশ্রু ফোয়ারা আড়াল করে,বাবার হৃদয় গুমরে কাঁদে ।
জীবনের কিছু মুহূর্তে প্রয়োজনের তাগিদে,
অতি প্রিয়জনকে ছেড়ে চলে যেতে হয় দূর বহুদূর প্রবাসে ।
সেখানে গিয়েও ভাবিয়ে তুলে ,মেয়ের আবাদারে তোলা ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে।
গুণতে থাকে দিন, কখন যাবে দেশে!

একদিন রাতে ফোন আসে মেয়ের ভীষণ জ্বর।
মেয়ে শুধু কান্না করে,বাবাকে খোঁজে ফেরে।
অদ্ভুত পৃথিবীর অদ্ভুত খেলা,মায়ের এলোমেলো অবস্থা!
ডাক্তার বলে রোজ লাগবে চল্লিশ হাজার টাকা!
অস্হির বাবা ফোনে বলে,যতো টাকা লাগে দিবে,
দয়া করে মেয়েকে বাঁচান আগে।
ডাক্তার বাবুর সেই একই কথা– টাকা জমা হবে আগে।
ছোট্ট প্রাণটা ত্রিশ মিনিট ওভাবেই রইলো পড়ে।
অসুস্থ মেয়েকে কোলে নিয়ে মা হাসপাতালের বেডে।
প্রবাসী বাবা পারেনা, পাখি হয়ে উড়ে যেতে!
চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে,চিৎকার করে বাবা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
বিষাদের সাজে অসহায় বাবার আর্তনাদে পৃথিবী কেঁপে ওঠে।
ভগবানের আরেক রূপ বারেবার ঝোলার দিকে দেখে!
ছোট্ট মিষ্টি মেয়ে মুচকি হেসে পৃথিবী সীমান্ত অতিক্রম করে।

 

মোবাইল পর্দা

একজীবনের বৃষ্টি দিয়ে গেলে,
নাছোড়বান্দা তুমি একটা ছেলে।
সাজিয়েছিলে নিজের হাতে এঁকে,
স্মৃতি এলব্যাম খুঁজে দিলো আজ।

মোবাইল পর্দা খবর দিয়ে গেলো,
কাঁদছে আকাশ, ভিজছে পুরো রাত।
মন ঠিকানায় উড়ছি মেলে ডানা,
হঠাৎ তোমার কান্না পেলো কাল।

তোমার খাঁচায় চেনা আমি,
আজ খাঁচার অচিন পাখি।
রাতজাগা তারাগুলো আমার সাথী,
অনুভবের আকাশ জুড়ে তুমি।
ছিলে তুমি নাছোড়বান্দা ছেলে,
আর আজ শান্ত শীতল পাটি।
সুতোয় গাঁথা শিউলি মালা,
ঝুলে আছে ক্যালেন্ডারের বুকে।
তুমি নাওনি সেদিন তুলে!

মোবাইল পর্দায় স্টেচু আমি,
পড়ে রইলো খুন্তি বাটি।
টপটপ টপটপ অশ্রু ঘাম,
খুঁজে পেলাম হারানো খাম।
হঠাৎ দিন যেনো মুহুর্তে রঙিন!
ছবিতে আলিঙ্গন,
ছুঁয়েছি ঠোঁট, নীল শার্ট আর বুকের বোতাম,
বুকের গহীনে শ্রাবণ উত্তাল।
শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে তাকে,
ছুটে গেলাম স্বানঘরে।
ভেতরে খিল, নিঃশব্দ বিলাপ,
যন্ত্রপর্দায় বেহুদা প্রেম!

মুনা চৌধুরী। কবি ও বাচিকশিল্পী।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রতিভাস

প্রতিভাস

স্পষ্টতা অন্ধকারের মতো স্পষ্টতা আলোর মধ্যগগনে নেই। উত্তাপে ঝলসে যাওয়া চোখে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয় রাত…..

চিঠি

ক্ষোভ রোদের দোকানি হয়ে, ছুঁয়ে গ্যাছি দূর পরবাস আলোর ক্রেতারা দেখে, শূন্য ঝুলি খালি সর্বনাশ।…..