সমকালীন দৃষ্টিপাত ও একটি ধানখেত

আহমেদ রাজু
কবিতা
Bengali
সমকালীন দৃষ্টিপাত ও একটি ধানখেত

সমকালীন দৃষ্টিপাত ও একটি ধানখেত

নতুন করে গরীব হয়েছে যারা তাদের মধ্যে নতুন কোন অভিযোগ নেই, ঈশ্বরও তাদেরই দলে
প্রগতিশীল দাদা ধমক দিলেন—’শালা মৌলবাদী!’
নতুন করে যারা পাছা চাটতে শিখেছে তাদের মধ্যে একজন ধর্মান্ধ, দুইজন পূজারী, তিনজন লোভী আর অগণিত সুযোগ সন্ধানী
প্রযুক্তির দুয়ারে নতুন করে চারজন অভাগী মেয়ে বিচার খুঁজেছে
ভুল জন্মের ঘোরে টাকার পাহাড় পালিয়ে যেতে শিখিয়েছে যাদের,সুবিচার তাদেরও প্রতিনিধিত্ব করে
মিছিল আসছে —’ওমুক চাই তমুক চাই… চাই চাই।’
দ্রুত অন্যমনস্ক হয়ে পা বাড়াচ্ছি, জোর কদমে
বুকের মধ্যে একজন অলস মানুষেরও বাস
একজন নিভৃতচারী হওয়াতেই নির্লজ্জ সাজি!

দুই

অবিশ্বাসী শিল্পী নিরাপদ আশ্রয়ের জন্যে ভিক্ষা চেয়েছে
তোমরা তাকে দেশত্যাগী বলো
যে দেশ আজ তোমাদের সেটাও একদিন অন্যনামে অন্য কারোই ছিলো,পাঁচিল ঘেরা কাঁটাতারের আবদ্ধ ভূমিকে দেশ বলতে পারো,অথচ মাতৃত্বকে স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক,তোমাদের কাছে সেটাই মহান।
কারন তোমরা যতোটা মানুষ তার চেয়েও বেশী নাগরিক,তার চেয়েও বেশী তোমাদের অহংবোধ
বরং আমার কাছে মা-ই আদিমতম দেশ—একমাত্র মাতৃত্বই বিশ্বজনীন নিরাপদ আশ্রয়।

তিন

সমাজ দালাল হলে
কবি হয়ে পড়েন নিঃসঙ্গতম
তবু বেঁচে থাকার দৃঢ়তা পরিচ্ছন্ন সংস্কার তুলে ধরে—
মানুষ হও, মানুষ হও
মানুষ বন্দনায় ঈশ্বরও আছেন
যদি অস্বীকার করো তবে একদিন তোমাদের উঠোনে হবে মহা মাড়াই, মজা পুকুরে ভেসে উঠবে সভ্যতার নগ্ন কঙ্কাল
অজস্র ধানকাটা কল আঙুল আঁকড়ে ধরবে,রক্তের বন্যায় ভাসবে আরও কিছু বিচ্ছিন্ন মুন্ডু।
হাটু গেড়ে বসো,
একটি ধানখেতই বলে দিবে সমগ্র ইতিহাস
ভাতের জন্যে মরেনি মানুষ বরং মানুষের জন্যেই যতো মৃত্যু মিছিল।

 

জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে

স্থির দৃষ্টিতে তাকালেই স্বপ্ন গুলো ফানুস হয়ে উড়ে যায়,কেবল পাশে পড়ে থাকে একটি দাঁড়ি
আর বেশ কয়েকটি কমা

যতোই মানুষ দেখেছি ততোই একাকীত্ব জেকে বসেছে মৃত্যু নামক সত্যের অভিমুখে

তবু মায়াময় জীবনে বেপরোয়া বেঁচে থাকি

 

পথের পথিক

নির্বাকতম শ্রোতাদের ছদ্মবেশে
কথারা হারিয়ে যায়।
যেমন করে যায় আরও সবাই,তুমিও যাও
একযোগে হারাও
এক যোগে কথার সাথেই হোক তোমার দুরভিসন্ধি।
সংক্রমণ শেষে না হয় আমার এখানে থাকুক—
পরিণামগত শুদ্ধস্বর।
থাকুক হৃদয়ের অর্বাচীন মুখচ্ছবি
এই ধরো বেশ কয়েক সপ্তাহ
আরও কিছু মাস কিংবা বছর।

দুই

যে আলোর পিছনে ছুটে চলেছি
সেই আলোর পাঁচিল ঘিরে বুনেছি ঘর
বুনেছি মায়া।সংসার।ঘৃণা। প্ররোচনা। প্রহসন।

আমাকে আশ্বস্ত করে মহাকাল রেখে গেছে কর্ম
প্রেম রেখে গেছে শরীরের ভার, ইতিহাস রেখেছে অধর্ম।

তারপর থেকে সমস্ত বিশ্বাসযোগ্য প্রলাপে হেটেই চলেছি
অনন্ত সে পথ কখনোই ফুরাবার নয়

 

মূল্যহীন

শুধু গরীব হলো বলে—
বিশ্বাসটুকু কেড়ে নিলে ঈশ্বর।
স্বপ্ন দিলে,দৃষ্টি দিলে না
আলোর বিপরীতে বাঁচতে দিলে,মরতে দিলে না
স্বপ্নের হাটে হাঁক দেয় যে বহুমুখী স্বর্গ
সেই স্বর্গ নিলামে রেখে যৌবন বিক্রি করেছে পাগল,অথচ কখনো জানেনি দামদর!

 

ফেরা

নিজের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছি
যাচ্ছি আবার ফিরে আসছি
কিন্তু কোথায় যাচ্ছিলাম
আসলেই কি কোথাও যাওয়ার কথা ছিলো?
আজকাল তো বেশ ভালোই আছি
চলন্ত বাস-ট্রেন
চলন্ত মানুষ
মহামারী
এম্বুলেন্স
এতো সব কিছু এড়িয়ে নিজের মুখটাকে সবে দেখতে শিখেছি—এখনো আক্রান্তের তালিকায় আমার নামও উঠেনি।

পাশের বাড়ির নিলয় যাচ্ছে
অন্য গ্রামের লেবু মিয়াও যাচ্ছে
ডাক্তার-বৈদ্য, ওঝা,মাঝি, ইমাম,মুসুল্লি সবাই যাচ্ছে
সত্যের অভিমুখে একটি মিছিলে একে একে সবাই যাচ্ছে
সেই দূরের মিছিলটা দেখি
শ্লোগান ফিরে আসে প্রতিধ্বনিতে
শুধু মানুষগুলোই আসে না।
পত্রিকার শিরোনামে যার মুখচ্ছবি সে আমার পূর্ব পরিচিত,প্রতিবেদনে বড় করে লিখা—
আরও একজন আক্রান্তের নাম উঠেছে
লাশের মিছিলে!

বন্ধ চোখের সীমানা নাই
বন্ধ চোখে গাঢ় অন্ধকার জড়সড় হয়ে এমন ভাবে। ধেয়ে আসে,যেনো স্বপ্ন সমেত চোখ উপড়ে নিবে
অন্ধের মতো হাতড়ে বেড়াই
বেমানান পাঁচিল তুলে দেই —উঁচু উঁচু পাচিল ছুঁয়ে
অন্ধকার ভেবে আলোকেও তাড়িয়ে দেই।
তারপর অতলান্ত গহ্বরে কেবল ডুবে যাওয়া সময় মাথা তোলে

ফের পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেই
সঙ্গে রাখি কোন নারীর স্পর্শ,ক্ষীণ স্পন্দন কিংবা সরলতম বিশ্বাস….
ফিরে আসতে হবে বলে,
নিজেকেই ছাড়িয়ে নেই অন্য সব কিছু থেকে।

 

প্রত্যয়ী প্রলাপে

তোমার ভিতরে জমে উঠুক চায়ের প্রলাপ
জ্বরের ঘোর
রঙ লাগুক চোখের তারায়
সন্ধ্যে মুখরিত হোক আলোয় আলোয়
কিচিরমিচির শব্দ স্নানে জেগে উঠুক মানসপট
ঝরে পড়ুক দৃষ্টিবিভ্রম
রোজনামচায় উঠে আসুক কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব
কনডেম সেল ভাঙুক ইস্পাত-দৃঢ় প্রতিজ্ঞা
পিষ্ট হতে হতেই প্রতিবাদী কন্ঠস্বর মিনারে উঠুক
নিরাময় হোক মানসিক ক্ষত
কপটতার কটূ প্রবৃত্তিতে আঘাত হানুক সত্যের প্রসবণ
পরিবর্তনের কল্লোলে ভেসে যাক পঙ্কিল হৃদয়ের দুরভিসন্ধি
তোমার ভিতর শান্তির জ্বরে নতুন করে ফুটুক আরক্তিম ভোর —
মুক্তির স্বপ্নই হোক পরমানন্দ।

 

স্বপ্নাতীত

অবিশ্বাসের চোখে স্বপ্ন যেনো একটি ফানুস
যতো উড়ে, ততোই পুড়ে।
যদি বিশ্বাসী হও—
স্বপ্ন হবে এক আগুন পাখি।

যদি পূর্ণ করো ধ্যান
বিশ্বাসই হবে গিরিখাতের শীতল ঝর্ণা।

স্বপ্ন এক আহত পাখি
তার রক্তিম ডানায় চুইয়ে পড়ে মাহুতের ঘাম
নষ্টা মনে দ্রোহের দাগ শুকায় পূর্ণিমার ধ্রুব সঙ্গীত।
তীরন্দাজ মন স্বপ্নিল ক্যানভাসে আঁকে অতীতের মুখ। অথচ স্বপ্ন সে এক পোড়া অতীত

আহমেদ রাজু। কবি। জন্ম ঢাকায়, কর্মসূত্রে বর্তমান নিবাস দুবাই। প্রকাশিত বই: 'রুদ্ধ কণ্ঠের বাষ্প' (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৮)

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

কবুতর

কবুতর

অগ্নিকাণ্ড আমার চৌহদ্দিতে ধ্বংসস্তুপের ভীড় পুনর্বার নুয়ে পড়া অতীতের তীর জীবনের মাঝপথে রেখে যায় সম্পর্কের…..