সর্বত মঙ্গল রাধে

শ্বেতা সরকার
গল্প
Bengali
সর্বত মঙ্গল রাধে

মৃদুল সমাদ্দার মনোযোগ সহকারে হিসাব দেখছিলেন।তাকে ঘিরে রয়েছে কমিটির সদস্যরা।মৃদুলবাবু হলেন কমিটির সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ্য সদস্য। সব ব্যপারেই তার বিচক্ষণ মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাতৃমন্ডলীর সদস্যরাও আজ উপস্থিত।কোলে গিন্নি কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন,

“রাধামাধবের মন্দিরটা হলে পূর্ণিমার কীর্তনখানা ওই চাতালেই কোরো, বেশ অনেকটা জায়গা পাওয়া যাবে, কি বলো। “

“হ্যাঁ গো “

দাস গিন্নী সায় দেন।

“বেশ হাত পা ছড়িয়ে বসা যাবে , শীতকালে না হয় ভিতরে হবে। “

হিসাবের খাতা থেকে মুখ তোলেন সমাদ্দার মশায়। সবাই নড়েচড়ে বসে।

“তাহলে ওই কথাই রইলো, কাল থেকে মন্দিরের কাজ শুরু হচ্ছে, তাহলে পুজোর আগে রাধামাধব প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। “

চারপাশে বসা সকলেই হ্যাঁ হ্যাঁ করে মৃদুলবাবুর বক্তব্যকে সমর্থন করলো।

সম্পন্ন মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের পাড়া আদর্শ পল্লী। আশেপাশের সব পাড়ার মধ্যে সবথেকে পুরনো। পাড়ার দুর্গামন্দিরটিও পুরোনো। এই এলাকায় প্রথম পুজো শুরু হয়েছিল এই পাড়াতেই। তারপর পাড়ার লোকেদের মাসিক চাঁদা ও এদিক ওদিক থেকে সংগৃহীত দান নিয়েই একটু একটু করে সুন্দর মন্দিরটি তৈরি হয়েছে। পাড়ার লোকের অবদানই বেশী। নিজেদের মনের মত করে টাইলস মার্বেলে সাজিয়েছেন মন্দির। মন্দিরের চাতালে বাচ্চারা খেলে বেড়ায়, বয়স্করা গল্প করেন, পূর্ণিমায় কীর্তন থেকে শুরু করে রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তী, পয়লা বৈশাখ, বিজয়া সম্মিলনী ইত্যাদি হরেক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। রক্তদান বস্ত্রদানও আয়োজিত হয়। বেশ কিছুদিন ধরেই দুর্গামন্দিরের পাশের ফাঁকা জমিতে একটি রাধাকৃষ্ণের মন্দির তৈরির প্রস্তাব উঠেছে। আগামী কাল থেকে তারই কাজ শুরু হতে চলেছে।

দুই মেয়েকে টিউশনে ছেড়ে দিয়ে ঘরে ফিরলো কেয়া।হাত মুখ ধুয়ে চায়ের জল বসালো। ডোরবেলের শব্দ হলো। স্বস্তিক এর আসার কথা। হাসিমুখে দরজা খুললো কেয়া। স্বস্তিক বাইকটা গেটের ভিতরে স্ট্যান্ড করে ঘরে ঢুকলো। কেয়ার আর পাঁচটা বন্ধুর মত স্বস্তিকও প্রায়ই আসে। মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানির সেলস এক্সিকিউটিভ অজিত মাসের অর্ধেক দিন ঘরে অর্ধেক দিন বাইরে কাটায়। একা সংসার দুই মেয়ে সামলে কেয়া যেটুকু সময় পায় বন্ধুদের সাথে আনন্দ ফুর্তিতে মেতে থাকে। ওদের একটা স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপ আছে। রক্তদান বৃক্ষরোপন বস্ত্রবিতরণ মরণোত্তর অঙ্গদান এইসব ছোটখাটো কাজকর্ম নিয়মিত করে থাকে। কেয়ার বাড়ির সামনে রাধামাধবের ভিতঢালাই চলছে। মৃগেন সমাদ্দার যতীন বাগচী তদারক করছেন। লাহা গিন্নী ঘোষ গিন্নীও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। লাহা গিন্নীর চোখ সি সি টিভির ক্যামেরা। আড়চোখে কেয়ার বাড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,

” প্রায়ই আসে বুঝলে, বর তো ঘরে থাকেনা, যা খুশি করে বেড়ায়। “

“এই জন্য ঘরে ব্যাটাছেলের লাগাম থাকা দরকার বুঝলে, ছেড়ে দিয়েছে দড়ি খুলে, গোরু তো চরবেই। “

জবাব দেন ঘোষ গিন্নী।

“ছেলেটা বৌ বাচ্চা নিয়েও আসে, বৌটাকে দেখতেও ভালো, তাও কি অবস্থা। “

বলেন লাহা গিন্নী।

“শোনো দিদি, দুবাচ্চার মা হয়েও কারোর যদি পুলক জাগে তো ছেলেদের আর দোষ কি “।

কথা জোড়েন ঘোষ গিন্নী।

“যা বলেছো, যত্তোসব নষ্টামো আরকি “।

এইসব বকবক করতে করতে বাড়ির পথে হাঁটা দেয় দুজনে। সন্ধ্যা হয়ে আসে।

ঘড়িতে ঠিক বিকেল সাড়ে চারটে।ইতি মাথা আঁচড়ে জিন্স প্যান্টটা পরলো। তাড়াতাড়ি টি শার্টটা গায়ে দিয়ে ব্যাগ নিয়ে বারান্দায় এলো।

“মা আসছি আমি, ফিরতে ফিরতে দুটো হবে গো, বারোটা না সাড়ে বারোটার লগ্নে বিয়ে “।

মা ভিতর থেকে বলে ওঠে,

“আচ্ছা সাবধানে আসিস, দরজার লকটা টেনে যা।”

জুতো পরে ব্যাগটা আবার ভালো করে দেখে নেয় ইতি। লেন্স ক্যামেরা চার্জার ফ্ল্যাস সব ঠিকঠাক আছে। ছোটবেলা থেকেই তার ফটোগ্রাফীর নেশা। বেশ কিছু ছবি জাতীয়স্তরে পুরস্কার পেয়েছে। বর্তমানে সে আন্তর্জাতিক স্তরের প্রদর্শনী গুলোর জন্য তৈরি হচ্ছে। রোজগারের জন্য ফটোগ্রাফীকেই জীবিকা হিসাবে বেছে নিয়েছে ইতি। বিয়ের সিজনগুলোতে ব্যস্ততা তুঙ্গে থাকে। নাওয়া খাওয়া মাথায় ওঠে। অবশ্য আজাদ আর শুভ ছাড়া কাজটা করা তার পক্ষে সম্ভব ছিলোনা। পৌনে পাঁচটা বাজতেই আজাদের বাইকের হর্ণ শোনা গেলো। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে লকটা টেনে ছুটলো ইতি।

“মা আ আ চললাম “।

আজাদের বাইক রাস্তার বাঁক ঘুরে মন্দিরের সামনে আসতেই অভ্যাস বশতঃ “দুগ্গা দুগ্গা ” করে একহাতে প্রণাম করলো ইতি।আজাদ স্পিড বাড়ালো। শুভ এতক্ষণে স্পটে পৌঁছে গেছে।

বিকেলের হাঁটাহাঁটি শেষ করে মাতৃমন্ডলীর জনা কয়েক সদস্য হরিমঞ্চের সামনের চাতালে বসে আছেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সুখদুঃখের গল্প চলবে। রাধাকৃষ্ণের মন্দিরের ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে। চাতালের উপর কচিকাঁচাদের হৈ চৈ চলছে। অন্যদিকে পা ঝুলিয়ে বসে বকবক করছে রুমকি ইশিতা কণা।

চাটুজ্জে গিন্নীকে খোঁড়াতে দেখে কোলে গিন্নী বলেন,

“কি গো, তোমার হাঁটুর ব্যাথাটা বাড়লো নাকি? “

“হাঁটুর আর দোষ কি গো, সারাদিন চলেই যাচ্ছে চলেই যাচ্ছে, রেস্ট নেই।”

জবাব দেন চাটুজ্জে গিন্নী।

“কেনো গো বৌ কি করে? “

জানাতে চান চৌধুরী বৌ।

” তাদের কথা আর বোলোনা, একটা বাচ্চা সামলেই উলটে যাচ্ছে, আমরা শ্বশুর শাশুড়ী সামলে তিনটে চারটে বাচ্চা মানুষ করে দিলাম।”

উত্তর দেন চাটুজ্জে গিন্নী।

“তা আর বলতে।”

পাশ থেকে কথা জোড়েন শেঠের বৌ।

“শ্বশুর ভাসুরকে সব সময়মত দিতে হয়েছে, কয়লার উনুনে রান্না, মশলা বাটা, এদেরতো কিছু করতেই হয়না, তাও মুখ হাঁড়ি করে থাকে।”

ইতিকে নিয়ে আজাদের বাইক হুস করে বেরিয়ে গেলো। প্রসঙ্গ বদলে শেঠ গিন্নী বললেন,

“ওই দেখো, এই গেলো, ফিরবে সেই মাঝরাতে।”

“যা বলেছো সোমত্ত মেয়ে বেজাতের ছেলের সাথে চরে বেড়াচ্ছে, বাপ মা ও বলিহারি। “

মুখ বেঁকান চৌধুরী বৌ।

“কালে কালে কত দেখবো গো রাধামাধব, মেয়েমানুষ আবার ফটো তোলে। “

হাতজোড় করে রাধামাধবের উদ্দেশ্য প্রণাম ঠোকেন শেঠ গিন্নী।

ইতিকে বেরিয়ে যেতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কণা। রুমকিও তাকিয়ে থাকে রাস্তার দিকে। কণা বলে,

“ভালোই আছে নিজের মতো, ভালোই রোজগার করে।”

“আবার প্রাইজ টাইজও পায়, দেখোনা ফেসবুকে দেয়, বাবা মা কত সাপোর্ট করছে বলো। “

কথা জোড়ে ইশিতা।

“আমাদের বাবা মা তো বিয়ে বিয়ে করেই অস্থির হয়ে গেলো, জানো ন্যাশান্যাল লেভেলে আঁকায় ফার্স্ট হয়েছিলাম। “

বলে ওঠে কণা।

“আর আঁকা, এখন শুধু খুন্তি নাড়ো। “

হেসে বলে রুমকি।

“এই যে ঘরে ঢুকবো, টিফিন দাও চা দাও বাচ্চাকে পড়তে বসাও রাতের রান্না বসাও খেতে দাও সব গুছিয়ে চোখ বুজলেই রাত কাবার, আবার সকালে চা দাও টিফিন দাও এই চলছে, তাও শুনবে আমরা নাকি কিছুই পারিনা, যত কাজ আমাদের শাশুড়ীরা করেছেন, বেশ করেছে ইতি নিজের মত লাইফ কাটাচ্ছে, ওটাই ভালো। “

ইশিতার ফোন বেজে ওঠে। নাম দেখে উজ্জ্বল মুখে ফোন ধরে ইশিতা। রুমকি আর কণা ঠোঁট টিপে হাসে। তারপর দুজনে কান পেতে ইশিতার মৃদু স্বরে গাঢ় কথাবার্তা শুনতে থাকে। ফোন বন্ধ হলে কুনুইয়ের গোঁত্তা মারে ইশিতাকে।

“উফ আর পারিনা।”

টেনে টেনে বলে রুমকি।

“এইবার যে বাপের বাড়ি গেলে দেখা করেছিলে বিএফ এর সাথে? “

জানতে চায় কণা।

“ধুর বাচ্চা নিয়ে আবার দেখা, ওই এসেছিলো দুদিন বিকেলে। “

উত্তর দেয় ইশিতা।

“তোমার তো তাও কেউ আছে, কথা বললে মন ভালো হয়, ফিলিং প্রেম প্রেম “।

বলে ওঠে কণা।

“আমাদের তো ওই থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর, আর ভাল্লাগেনা। “

শ্বেত পাথরের মেঝে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে। ডেকরেটার্সের লোকেরা আলোর কারুকাজে ব্যস্ত। মন্দিরের চাতাল ও পাশের মাঠ জুড়ে প্যান্ডেল হয়েছে। কাল প্রতিষ্ঠা হবে রাধামাধব। পুজোর দায়িত্বে থাকা চক্রবর্তী মশায় অত্যন্ত নিয়ম নিষ্ঠ মানুষ। চাতালে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের দলকে বারবার বলছেন,

” ঠিক দশটা পঁয়ত্রিশ এ পুজোয় বসবো কিন্তু, সব যেন রেডি থাকে, উপাচার সব আজই গুছিয়ে রাখবি। “

অতনু আশ্বস্ত করে বলে,

“কোন চিন্তা কোরোনা জ্যেঠু, সব রেডি আছে, কাল তুমি এলেই সব পৌঁছে দেবো, গুছিয়ে নিও। “

চক্রবর্তী মশায় আবার বলেন,

“হ্যাঁ রে রণ, তোর মা আসবে তো, আলপনা দিতে হবে যে। “

“হ্যাঁ জ্যেঠু আসবে গো, চিন্তা কোরোনা। “

মাঠের এককোণে মাতৃমন্ডলীর জটলা চলছে। শেঠ গিন্নী হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বললেন,

“দেখোতো, কোমরের বিছাটা কেমন হলো।”

“বেশ ভারী হয়েছে গো “

বিছাটা হাতে নিয়ে পাল গিন্নী বলে ওঠেন।

“লাহা বাড়ির বাঁশিটাও বেশ হয়েছে, আর তোমাদের হারটাও দারুণ। “

চৌধুরী গিন্নী উত্তর দেন,

“চারলরের হারই দিলাম, রাধারাণী পড়বে বলে কথা। “

“রণোর মা তো আজ আলপনাটা দিয়ে দিলে পারতো।”

বলেন চাটুজ্জে বৌ।

“ও এক্সপার্ট, কাল ভোর পাঁচটায় এসে সেরে দেবে বলেছে। “

দাস গিন্নী উত্তর দেন।

“ওই কেয়া, এদিকে আয়রে মা। “

মৃদুল সমাদ্দারের গলা শুনে ঘুরে তাকায় সবাই।

“কি গো জ্যেঠু “

কেয়া কাছে আসে।

“তুই তো আবার পুজোপাঠে নেই।”

বলেন সমাদ্দার বাবু।

“জানো তো জ্যেঠু, এসব ভালো লাগেনা। “

হাসে কেয়া।

“তা ভালো লাগবে কেন, নষ্টা কোথাকার, ঠাকুর দেবতায় মন থাকলে কি আর আকাম কুকামে মন যায়। “

দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে ওঠেন চৌধুরী গিন্নী।

“এয়োস্তিরি মানুষ শাঁখা নেই সিঁদুর নেই বেধবার মতোন চরে বেড়াচ্ছে। “

“আরে তোর যা ভালো লাগে সেই কথাই বলছি রে। “

বলে ওঠেন সমাদ্দার বাবু।

“আটটা কাপড় দিবি বস্ত্রবিতরণের জন্য। “

“আচ্ছা জ্যেঠু কাল বাজারে গিয়ে কিনে নেবো, দুপুরে পেয়ে যাবে। “

আজ সকাল থেকে মন্দিরে পাড়ার সবাই জড়ো হয়েছে। রাধাকৃষ্ণের চোখ জুড়ানো মূর্তি দোলনায় দুলছে। একপাশে দুপুরের রান্নার আয়োজন। পাড়ার লোক তো বটেই আশেপাশের অনেকেই ভোগ খেতে আসবে। বিকেলে বস্ত্রবিতরণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।পাড়ার কচিকাঁচাদের নিয়েই নৃত্যনাট্য “শ্রী রাধার মানভঞ্জন” পরিবেশিত হবে। চক্রবর্তী মশায়ের গোছানো শেষ। এইবার পুজো শুরু হবে। ঘন্টা নেড়ে নিষ্ঠা সহকারে মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন। শঙ্খ আর উলু ধ্বনি শুরু হলো।

আজাদ আর ইতি কম্পিউটারে বিয়ের ফটো লোড করছিলো। আলাদা আলাদা ফাইল করে অ্যালবামের জন্য পাঠাতে হবে। অ্যালবাম তৈরি হয়ে এলে পার্টিকে দেবার পর বাকি টাকা পাওয়া যাবে। ইতি ঠিক করেছে অনলাইনে ফটোশপের কোন কোর্স থাকলে করে নেবে। তারপর নিজেই অ্যালবাম রেডি করবে। ইতির বাবা মা তৈরি হয়ে মন্দিরে গেলো।মা পুজো দেবে বলে ফল আর মিষ্টির প্যাকেট পিতলের রেকাবে নিয়ে গেলো। ইতি আজাদের দিকে তাকালো। ছেলেটা  একমনে কাজ করে যাচ্ছে। জলজ্যান্ত ইতি পাশে বসে আছে সেদিকে খেয়াল নেই। ইতি বলে,

“বৌ কি তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে বলেছে?”

স্ক্রীন থেকে চোখ না সরিয়ে আজাদ জবাব দেয়,

” কেন বলতো? “

“আমি যে তখন থেকে একা একা বসে আছি, তাকাচ্ছোনা পর্যন্ত। “

জবাব দেয় ইতি।আজাদ হেসে বলে,

“ঠিক সময়ে কাজটা না হলে পার্টি তোমাকেই তাড়া দেবে।”

“সে কাজের মাঝে একটু অকাজ হলে এমন কিছু সময় নষ্ট হয়না বুঝলে। “

ইতি আজাদের গলা জড়িয়ে কাঁধে মাথা রাখে। আজাদ ফাইল সেভ করতে করতে বলে,

“পাড়ায় পুজো, এসব অকাজ করলে ঠাকুর পাপ দেবে কিন্তু। “

আজাদের কানে ফিসফিস করে ইতি,

“ওনারা প্রেমের দেবতা বুঝলে,ওনারা কিছু মনে করবেননা।”

কম্পিউটার শাট ডাউন করে আজাদ মুখ ঘোরায়। ইতির চোখের অমোঘ ইশারা উপেক্ষা করা কঠিন।

কেয়ার দুই মেয়েও সেজেগুজে তৈরি। পাড়ার বন্ধুদের সাথে আজ সারাদিন হুটোপুটি হবে। কিন্তু স্বস্তিক আঙ্কলের সাথে একদান লুডো না খেলে কিছুতেই যাওয়া হবেনা। তিনজনেই লুডোর ঘুঁটি চালতে ব্যস্ত।

“এই পুট পড় পুট, আমার ঘুঁটিটা উঠে যাক।”

“যাহ্ আমার পাকা ঘুঁটিটা খেয়ে নিলি। “

“এই দুছক্কা পড়েছে, তিন ছক্কা পড় তিন ছক্কা পড়। “

বসার ঘর থেকে তিনজনের এইসব বকম বকম শোনা যাচ্ছে। কেয়া ভাতের হাঁড়ি উপুর দিলো। ডিমটা ভাজলেই রান্না শেষ। আজ ঘি আলু সিদ্ধ ভাত আর ডিমভাজা স্যালাড। স্যালাড পরে কেটে নেবে। বসার ঘর থেকে চিৎকার এলো,

“আঙ্কল হেরো, আঙ্কল হেরো, আমি ফার্স্ট দিদি সেকেন্ড। “

“মা আমরা মন্দিরে যাচ্ছি ,আঙ্কল বিকেলে আবার খেলবো, তারপর তুমি বাড়ি যাবে।”

কেয়া রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললো,

” এ্যাই টুপি দুটো নিয়ে যা, রোদ আছে। “

টুপি মাথায় দুই মেয়ে বকবক করতে করতে বেরিয়ে গেলো।

দরজা বন্ধ করে কেয়া স্বস্তিকের কাছ ঘেঁসে বসলো। তারপর একটু একটু করে জড়ানো আদরে ডুব দিলো।

ঘন ঘন উলু ধ্বনি শঙ্খ ধ্বনি চলছে। চক্রবর্তী মশায় গুরুগম্ভীর স্বরে মন্ত্রপাঠ করে চলেছেন। মখমলি শয্যায় রেশমী কাপড়ে ফুল মালা গয়নায় সেজে রাইকিশোরী শ্রীকৃষ্ণের সাথে দুলছেন।মাইকে মৃদুস্বরে গান বাজছে,

 “সর্বত মঙ্গল রাধে বিনোদিনী রাই, বৃন্দাবনের বংশীধরী ঠাকুর কানাই… “

শ্বেতা সরকার। জন্ম ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি। স্থান, বাবার কর্মস্থল টিকিয়াপাড়া রেল কোয়াটার, হাওড়া,বাংলা, ভারত। পাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে হাওড়া নরসিংহ কলেজ থেকে বায়ো-সায়েন্সে স্নাতক। ছোট বেলা থেকেই নাচ,গান, আবৃত্তি, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফিতে ছিল শখ। বিবাহসূত্রে খড়্গপুরের বাসিন্দা। আঞ্চলিক...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..