সাদা পাতার সামনে

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিতা, প্রবন্ধ
Bengali
সাদা পাতার সামনে

খুব ছোটবেলায় যখন ক্লাস ফোর কী ফাইভে পড়ি তখন বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যেতাম। যেহেতু গ্রামেই জন্মানো এবং বেড়ে ওঠা তাই টাকা পয়সা লাগে না এমন খেলাগুলোই আমরা বেশি করে খেলতাম। বন্ধুদের সঙ্গে ভালোভাবেই মিশতে পারতাম। কিন্তু খেলতে খেলতে একটা সময়ের পর বুঝতে পারতাম আমি আর খেলার মধ্যে নেই। কোথাও একটা যেন হারিয়ে গেছি। তখনও খেলতাম কিন্তু খেলা থেকে আর আনন্দ পেতাম না। মাঠ থেকে উঠে চলে আসতাম। নির্জন আমবাগানে বসে থাকতাম। বসে থাকতাম নদীর ধারে আবার কখনও বা সাইকেলে করে উদ্দেশ্যহীন ভাবে বেরিয়ে পড়তাম। তখন নিজেকেই নিজে বুঝে উঠতে পারতাম না।

বর্ষাকালে বা অন্যকোনো সময় যখন আকাশ মেঘলা থাকত তখন আমার মনেও জমতো মেঘ। কিছুতেই সহ্য করতে পারতাম না, যেন দমবন্ধ হয়ে আসতো। কিছু ভালো লাগতো না। দিনের পর দিন পড়াশোনা করতে পারতাম না। বছরের সবকটা দিন তো আর রোদ ওঠা সম্ভব নয়। কিন্তু আমি যে মনকে মানিয়ে নিতে পারতাম না। মনে পড়ে, একটানা পাঁচদিন বৃষ্টি তখন সকালে চোখ খোলার আগে মাকে জিজ্ঞাসা করতাম রোদ উঠেছে কিনা। মা না বললে ঘুম থেকে ওঠার ইচ্ছেটাই চলে যেত। তারপর একদিন যখন আকাশ জুড়ে রোদ উঠতো সেদিন আমার কাছে তা উৎসবের মতো ছিল। খেতে পর্যন্ত ভুলে যেতাম আনন্দে।

মন খারাপ হলে কখনও আবার কোনো নির্জন স্টেশনে গিয়ে বসে থাকতাম। নিজেকে একাকী হাতের ওপর পেলে কি যে আনন্দ হতো তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। পরে যখন বড় হলাম তখন শুধু মনখারাপ হলে নয়, এমনি সময়েও স্টেশনে গিয়ে বসে থাকতাম। বুঝতে পারতাম অন্যের থেকে কোথাও যেন আলাদা হয়ে যাচ্ছি। আমার চারপাশে সবাই আছে কিন্তু তবুও আমি যেন কোথাও একা।

খুব ছোটবেলা থেকেই গ্রীষ্মের দুপুর আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। মায়ের চোখ এড়িয়ে রোজ দুপুরেবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তাম। না, কোনো ফল গাছের নিচে গিয়ে ফল চুরি করার পরিকল্পনা করতাম না। হয়ত পুকুরে কেউ মাছ ধরছে আমি তার পাশে গিয়ে বসে থাকতাম। এমন কতদিন হয়েছে চাষিরা মাঠে কাজ করছে আর আমি জমির আলে শুয়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিচ্ছি।

আমি কথা বলতে গেলে কেউ শুনতেই চাইতো না। ছোটবেলায় খুব পেটের রোগে ভুগতাম। আর খুব রোগা ছিলাম। আমার চেহারাটাই সেই সময় পাত্তা দেওয়ার মতো ছিল না। তবে সত্যি বলতে কি আমিও কি কথা বলতে চাইতাম? না, তবে কোনো কোনো সময় কথা বলতে ইচ্ছা গেলে মানুষ পেতাম না। মনের কথা মনেই জমিয়ে রেখে দিতাম।

আরও একটা জিনিস লক্ষ করতাম, আমার অবস্থাটা ছিল ঠিক রবীন্দ্রনাথের বলাইয়ের মতো। উদ্ভিদকে নিয়ে বলাইয়ের যে ভাবনা তার সঙ্গে তার চারপাশের মানুষজনরা কেউ তাল মেলাতে পারত না। আমার বেশ মনে আছে, আমাদের পাড়ায় একটা বড় অশ্বত্থ গাছ ছিল। কোনো এক কালবৈশাখীর ঝড়ে গাছটি ভেঙে যায়। পরের দিন সকালে যখন ঘুম থেকে উঠে দেখলাম, অশ্বত্থ গাছটা ঝড়ে ভেঙ্গে গেছে তখন আমার সে কি কান্না। অনেকেই সেদিন অবাক হয়েছিল, এটা কি কান্নার মতো কোনো বিষয়? চেনা জানা পরিধির বাইরে যেন আমার মানসিকভাবে বেড়ে ওঠা। যেখানে কারও কখনও দেখাই পাওয়া যায় না, সাড়া পাওয়া তো দূরের কথা।

খুব বেশি কথা বলতে পারতাম না, বন্ধুও খুব বেশি ছিল না, হৈ চৈ করার দলেও কোনোদিন পড়তাম না। তাই আমাকে নিজের সঙ্গে অনেক বেশি কথা বলতে হতো। খুবই লাজুক ছিলাম। বয়সের নিয়ম অনুযায়ী ছাত্রাবস্থায় প্রেম এলো। কিন্তু মেয়েটিকে বলবে কে? সেই জোর তো আমার মধ্যে তখন ছিল না। তাই এখানেও থাকতে হলো চুপ করে।

আস্তে আস্তে দেখলাম বুকের ভেতর কথার পাহাড় জমে গেছে। তারপরই একদিন সাদা পাতার সামনে বসি। এটা আমার কাছে একটা অদ্ভুত অনুভূতি। প্রথম কি লিখেছিলাম আজ আর মনে নেই। তবে সাদা পাতার সামনে বসে নিজেকে এতো হালকা মনে হয়েছিল… সে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। কখন যে সাদা পাতা আমার বন্ধু হয়ে গেল আমি নিজেই তা জানি না। মনে হল, এ আমার সব কথা শুনবে, মুহূর্তের জন্যেও আমাকে থামিয়ে দেবে না। সারা শরীর সে যেন আমার চোখের সামনে মেলে দিয়েছে, আর আমি সময় পেলেই তার কাছে গিয়ে বসছি আর এঁকে ফেলছি আমার যন্ত্রণার ইতিবৃত্ত।

আজ প্রায় ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লিখে চলেছি। ছেলেবয়সের যে বৈশিষ্ট্যের হাত ধরে মাথা তুলেছি আজ এই মধ্যবয়সে এসে সেই বৈশিষ্ট্যগুলোই চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছে আমার মধ্যে। কিছু না করতে পারার তালিকাটা আমার জীবনে এতটাই বিশাল যে এক একসময় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কদর্য রূপকে আর দেখতে পারি না। আর ঠিক তখনই গিয়ে বসি সাদা পাতার সামনে। সারাটা দিন রাত এইভাবেই অক্ষরের সঙ্গে এগিয়ে চলেছি আমি। আঁকি আর মুছি। কখনই মনোমতো হয় না। তবুও কলম ছাড়লে তো চলবে না। কে নেবে এই মহাভার? সারাদিন মোছামুছি করে একটা কিছু অবয়ব দেবার চেষ্টা করি। আগুন না জ্বলুক, আগুন জ্বলে ওঠার পরিবেশটা অন্তত তৈরি হোক। অথবা একটা আস্তানা, একটা নদী, খানিকটা রোদ্দুর… মুখোমুখি বসে থাকি সারাদিন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ