সান্টিং

আলী রেজা
অণুগল্প, গল্প
সান্টিং

শামীম একজন দুর্দান্ত এন্টারটেইনার। পাহাড়ের চূড়ায় কলেজ ক্যান্টিন, ওখানে কলেজের বখে যাওয়া ক’জন গ্রাস, মেনড্রেক্স, এলএসডি এগুলো নিয়ে নাচ-গানের আসর বসাত। শামীম সে আসরের প্রধান পারফর্মার। রেখা ও রেখা / যাবসে তুমে দেখা কিংবা বেদের মেয়ে জোস্না আমায় ফাঁকি দিয়াছে / আসি আসি বলে জোস্না চলে গিয়াছে, গানের সাথে শামীমের পারফর্মেন্স যেন ইরানের ভুবনমোহিনী বেলী নর্তকী প্রিন্সেস শেহারজাদ বাতুল।

সেই শামীম ক’দিন কলেজে আসে নাই। তখন মোবাইলতো দুরের কথা, হাতে গোনা কয়েকজনের বাসায় ল্যান্ড ফোন ছিল। তখন অবশ্য ল্যান্ডফোন শব্দটি অপরিচিত ছিল। আমরা শামীমের খোঁজ নিতে তার টাইগার পাশ রেলওয়ে কলোনীর বাসায় গেলাম। দুপুর বেলা চারিদিকে ছিমছাম নীরবতা, মাঝে মাঝে দাঁড়কাকের কা কা ডাক সেই নীরবতাকে আরো বাঙ্ময় করে তুলছিলো। শামীম এলো উদভ্রান্তের মত, চোখ ডলে বললো মাত্র তিন দিনের জ্বর আর ভেদ-বমিতে তার ছোট বোনটা চলে গেছে। আমরা সবাই দুঃখ দুঃখ মুখ করে দাঁড়িয়ে আছি, (নিয়ম এটাই দু:খের সময় নাকি এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়)। শামীমকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। শামীম তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললো, বন্ধু মনটা খারাপ, আড়াই বছরের পিচ্চিটা গেল’গা। তয়, তোরা রন্ধু ভাবিস না। বাবায় আর একটা নিয়ে আসব। আমার আরো একটা ভাইও মারা গেছে, নইলে আমরা ১১ জন হইতাম। খসরু ভাইয়ের “ওরা এগার জনের” মত।

— কস কি?! তোরা ১১ভাইবোন !

— হ দোস্ত আছিলাম, তয় আবারো ১১ জন হইয়া যামু।

–আমি কইলাম কেমতে কি?

— হোন, কইতাসি। আঙ্গো বাসাটাতো দেখছস, স্টেশনের লগে।, বাবায় সারাদিন ডিউটি কইরা খুব কাহিল হইয়া ঘরে ফিরত। বাবা ট্রেন এক্সজামিনার, খাঁটা-খাটুনির চাকুরী। বিছানায় পড়নের লগে লগে কাইত। কিন্তু মাঝ রাইতে, সান্টিংযের শব্দে বাবার ঘুম প্রায় ভাইঙ্গা যাইত। আর যত সান্টিং সব রাইতের বেলা। বাবায় আর কি করব!? ঘুম ভাইঙ্গা গেলে হেও মায়েরে সান্টিং শুরু করত। তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় আমরা একে একে ১১জন। তোরা ভবিস না, আব্বার সংসার আবারো কিচির মিচিরে ভইরা উঠবো।

আমরা সবাই হতবাক! কিভাবে শামীম গভীর শোককে পাশ কাটিয়ে গেল। কৌতুক-রঙ্গ-ব্যঙ্গের চাদর দিয়ে বেদনার মর্ম-যাতনকে শামীম কতটুকু আড়াল করতে পারল? আসলে শোককে কি কেউ মুছে ফেলতে পারে? আমি এখনো ভাবি। কিন্তু একজন অন্তত পেরেছিল। আসলে পেরেছিল কি?

আলী রেজা। জন্ম ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে। মুক্তিযুদ্ধে আলোড়িত কবি। সত্তরের দশকে ছোট কাগজে লেখালেখি তারপর যুদ্ধ, অনটন, আবারো বামপন্থার লড়াই - এগুলোতে জড়িয়ে দীর্ঘ বিরতি। ফেসবুকে পুনরায় পুরানো ভালবাসার চাষবাস। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ একটি, 'পাথরের গুহা'। কবি আলী রেজা মনে করেন, মানুষের...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মানুষ 

মানুষ 

মানুষ  অকৃতদার মাস্টার মশাই পাঁচজন ছাত্রীকে পড়ান নিজের ঘরে । প্রতিবেশীদের সন্দেহ ক্রমশ দানা বাঁধে…..

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..