সাপ্লিমেন্ট মিথ

জুঁই ইয়াসমিন
প্রবন্ধ
Bengali
সাপ্লিমেন্ট মিথ

যিম ম্যাকান্ট এর জন্য আর পাঁচটি দিনের চেয়ে অন্যরকম একটি দিন ছিল সেদিন। বসেছিলেন ছেলের গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠান উপলক্ষে ইউনিভার্সিটি অডিটরিয়ামে। অনুষ্ঠান শেষ হবার আগেই স্ত্রীর তাড়ায় ছুটতে হলো হসপিটালে কারণ তার স্ত্রী হঠাৎ লক্ষ করলেন তার স্বামীর পুরো ফেস হলুদাভ হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তারের কথায় মাথায় বাজ পড়ল। সর্বদা স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপনকারী যিমকে জানালো হলো তার লিভার ইনজুরী দেখা দিয়েছে এবং হাতে একসপ্তাহ সময়ও নেই অর্থাৎ লিভার ট্রান্সাপ্লান্ট প্রয়োজন। একসপ্তাহের মধ্যে লিভার ট্রান্সাপ্লান্ট করে সে যাত্রায় বেঁচে গেলেন যিম তবে জীবনটা আর আগের মত থাকল না। একসময় ভীষণ একটিভ জীবন যাপনকারী যিম এখন কাটান অলস সময় কারণ প্রতিনিয়ত তাকে লিভার, কিডনী আর পেট ব্যাথার সসম্যা নিয়ে চলতে হয়।

এখন কি কারণে লিভার ইনজুরী হয়েছিল যিমের? তিনি তো বছরে ছয় প্যাকের বেশী ওয়াইন খাননি। আর দিনে এক কাপ ওয়াইনকে তো মোটাদাগে স্বাস্থ্যকরই বলা হয়। তাই এ্যালকোহলকে কালপ্রিট বলা যাচ্ছিল না। অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসে যিম ৩ মাস যাবত গ্রীন টি সাপ্লিমেন্ট খাচ্ছিলেন তার হার্ট সুস্থ্য রাখার উদ্দেশ্যে। কারণ তিনি মাত্র ৫৯ বছর বয়সে তার বাবার হার্ট এ্যাটাক কে অনুসরণ করতে চাননি। হার্টকে সুস্থ্য রাখার জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করতেন যিম। গ্রীন টি শুরু সেই অভিযানেরই অংশ ছিল। কিন্তু গ্রীন টি সাপ্লিমেন্ট এর মত একটি আপাত স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক উপাদান থেকে লিভার ইনজুরী হওয়া বিষয়টি যিমের জন্য শকিং ছিল।

অনেক গবেষণা বলে গ্রীন টি তে বিদ্যমান এ্যা্ন্িটঅক্সিডেন্ট এর গুনাবলী বিশিষ্ট কাটেচিন নামক একটি ফেনলিক উপাদান এর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভুমিকা আছে। তবে, গ্রীন টি সাপ্লিমেন্ট নিয়ে এতটা গবেষণা হয়নি যাতে করে একে স্বাস্থ্যকর বলা যেতে পারে। আর তাছাড়া, এই আপাত উপকারী ক্যাটেচিন কারো কারো জন্য টক্সিকও হতে পারে যাদের দেহে একে সঠিকভাবে হজম ও শোষন করবার জন্য প্রয়োজনীয় জিন নেই।

গ্রীন টি সাপ্লিমেন্ট আমাদের দেশে ততটা প্রচলিত না হলেও এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্ট বসখানে পাওয়া যায় আর তা ক্রয় করবার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ পত্র দেখানোর ও প্রয়োজন পড়ে না। এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আমাদের কাছে ভাত মাছের মতোই একটি খাদ্য দ্রব্য। প্রায় সকল প্রকার প্রাকৃতিক খাবারেই কম বেশী এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে তবে সবচেয়ে বেশী আছে বোতলে ভরা সাপ্লিমেন্টে- আমরা এটা-ই বিশ্বাস করি। তাই আমরা অনেকে এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্টকে ভাত মাছের মতো নিরাপদ মনে করে গোগ্রাসে খাই। কেনণা কিছু গবেষণা বলছে এই এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুলো আমাদের শরীরে অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাওয়া ফ্রি রেডিক্যাল গুলোকে অকার্যকর করার মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে।

কোষের স্বাভাবিক বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ থেকে বাই প্রডাক্ট হিসেবে তৈরী হয় ফ্রি রেডিক্যাল। তবে সবচেয়ে বেশী তৈরী হয় শরীর যখন খাবার থেকে শক্তি উৎপাদন করে এবং যখন শারীরীক কসরত এর মধ্য দিয়ে যায়। এছাড়া ও এটি পরিবেশগত বিভিন্ন দূষণ যেমন ধুমপান, বায়ু দূষণ ও পেষ্টিসাইড থেকেও আসতে পারে। শরীরে বিভিন্ন প্রকার ফ্রি রেডিক্যাল তৈরী হয় তবে সবচেয়ে বিপদজনক হচ্ছে সেগুলো যেগুলো অক্সিজেন থেকে উৎপন্ন হয়। এরা ভীষণ অস্থিতিশীল হওয়ায় শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাক্রোমলিকিউল যেমন লিপিড, প্রোটিন এমনকি ডি এন এ অনুর সাথে বিক্রিয়া করে। যার ফলস্বরূপ সেল ড্যামেজ ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের মধ্যে বিভিন্ন রোগের সূত্রপাত ঘটতে পারে যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-অ্যাথারোসক্লেরোসিস, এ্যালঝাইমারস ডিজিজ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, মটর নিইরোন ডিজিজ ইত্যাদি।

বেটা-ক্যারোটিন নামের এ্যান্টিঅক্সিডেন্টটির ফ্রি র‌্যাডিকেল নিধনের বিষয়টি বিবেচনা করে ১৯৯৪ সালে ফিনল্যান্ডে ৫০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী ২৯,১৩৩ পুরুষ ধুমপায়ীদের নিয়মিত বেটা-ক্যারোটিন খাইয়ে তাদের মনিটর করা হচ্ছিল। আশা করা হচ্ছিল এরা অন্য ধুমপায়ী অপেক্ষা কম ল্যাং ক্যান্সারে আক্রানÍ হবে। কিন্তু ৫-৮ বছর পর দেখা গেল এরা বেটা-ক্যারোটিন খাইনি এমন ধুমপায়ী অপেক্ষা ১৮% বেশী ল্যাং ক্যান্সাওে আক্রান্ত হয়েছে এবং একই কারণে ১৯৯৬ সালে আর একটি স্টাডি মাঝ পথে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সেক্ষেত্রে বেটা-ক্যারোটিন সেবনকারী ধুমপায়ীদের অন্য ধুমপায়ী অপেক্ষা ২৮% বেশী ল্যাং ক্যান্সার দেখা দিয়েছিল। এবং ২০১১ সালে পঞ্চাশোর্ধ ৩৫,৫০০ পুরুষের উপর করা আর একটি স্টাডি থেকে দেখা যায় যে, দীর্ঘ মেয়াদে ভিটামিন-ই সেবন পুরুষের প্রোস্টেস ক্যান্সার ১৭% বাড়িয়ে দেয়। এরকম আরো শত খানেক স্টাডি এর তালিকা দেয়া যাবে যেখানে স্টাডির ফলাফল দেখে গবেষকদের হতবম্ব হতে হয়েছে আর এতদিন ধরে জেনে আসা এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর ক্যান্সার নিরোধী ধারণা থেকে সরে আসতে হয়েছে। কিন্তু যারা ইতিমধ্যে এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্টের উপর বিলিয়ন ডলার লগ্নি করে ফেলেছেন তারাতো সরে আসবে না। তারা এ্যান্টিঅক্সিডেন্টের পক্ষের গবেষণা গুলোকে বেশী বেশী করে সামনে তাদের এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রডাক্ট বিক্রী করে চলেছেন।

সম্প্রতি বেশ কিছু গবেষণা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, যেভাবে এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সুস্থ্য কোষকে ফ্রি র‌্যাডিকেল থেকে বাঁচায়, সেভাবে এটি টিউমার কোষকেও বাঁচায়। অর্থাৎ এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে না। আসলে এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্ট যে, কোন রোগকে প্রতিরোধ করতে পারে তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে এখনও প্রমান করা যায়নি। তবে, এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফলমূল ও সবজি গ্রহণ অনেক রোগকে প্রতিরোধ করতে পারে। এখন স্বাভাবিক ভবেই প্রশ্ন আসে আসলে কি এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এসব রোগ প্রতিরোধ করে নাকি অন্য কোন উপাদান করে যার সম্পর্কে এখনও যানা যায়নি। যাক, সে ভাবনা ভবিষ্যত গবেষকের উপর ছেড়ে দিলাম। আজকে শুধু বলতে চাই, যারা সুস্থ্য থাকার জন্য নামী দামী এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্ট খাচ্ছেন তারা শুধুই প্রতারিত হচ্ছেন এবং শরীরে যদি কোন টিউমার সেলের জন্ম হয়ে থাকে তাকে আরো বাড়তে সহায়তা করছেন। তাই, কোন ফ্যাক্টরীর বানানো এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট না খেয়ে বরং আপনার শরীরকে এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বানানোর ফ্যাক্টরী বানালে কেমন হয় বলুন তো?

পৃথিবীতে যখন মানুষের আবির্ভাব ঘটে তখন এত বড় বড় ক্যান্সার হাসপাতাল, এ্যান্টিবায়োটিক আর টীকা কর্মসূচি ছিল না। এগুলো ছাড়া তবে মানুষ কিভাবে পৃথিবীতে টিকে ছিল? মানুষ অস্থিত্ব বজায় রাখতে পেরেছিল, কারণ মানুষের শরীরে ছিল নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যা তাকে বাহিরের ভয়ংকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, তাপ, ঠান্ডা, খাদ্যাভাবসহ সকল প্রকার শত্রু থেকে রক্ষা করে আসছিল এবং সেই সাথে শরীরের অভ্যন্তরে তৈরী হওয়া ”ঘরের শত্রু বিভীষণ” এর মত ফ্রী রেডিক্যালকেও দমন করত। আমাদের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রতিটি ক্যালরী খরচে, প্রতিটি পেশীর নড়াচড়ায় আমরা ফ্রী র‌্যাডিকল তৈরী করছি। আর এই ফ্রী র‌্যাডিকল গুলোর কূটচক্রের বিষয়ে শরীর খুব ভালোভাবেই ওয়াকিফহাল। তাই একে প্রতিহত করতে শরীর উৎপন্ন করে গ্লুটাথায়নের মত এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট।

গ্লুটাথায়ন আমাদের শরীর নিজেই তৈরী করে। এটি তিনটি এ্যামাইনো এসিড (সিসটিন, গ্লাইসিন ও গ্লুটামিক এসিড) এর সংমিশ্রণে তৈরী। এর মূল কারিশমার জায়গাটি হচ্ছে এর ভেতরের সালফার ক্যামিকল গ্রুপটি। সালফার একটি ঝাঁঝাঁলো গন্ধযুক্ত আঠালো পদার্থ যা অনেকটা ফ্লাই পেপারের মত কাজ করে যার গায়ে শরীরের সব বিষাক্ত পদার্থ গুলো (ফ্রী র‌্যাডিকল, টক্সিক, ভারী ধাতু) আটকে যায়।

সুস্থ্য থাকবার পূর্বশর্ত হিসেবে গ্লুটাথায়ন শরীরের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কেননা এটি একাধারে ফ্রী র‌্যাডিকলকে নিষ্ক্রিয় করে, শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং যকৃতের টক্সিক উপাদান গুলোকে দূর করে। যকৃত হচ্ছে শরীরের প্রধান বিষ নিধনকারী অঙ্গ। তবে এই বিষ নিধন কাজটি খুব একটা সহজ নয়। এটি সম্পন্ন করতে প্রথমতঃ যকৃতের বিভিন্ন এনজাইম বিষাক্ত পদার্থ গুলোকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাঙ্গে। পরে গ্লুটাথায়ন এগুলোকে ধরে বজ্রপদার্থ হিসেবে শরীরের বাহিরে বের করে দেয়।

গঠনগত কারণে গ্লুটাথায়ন এতটাই অনন্য সাধারণ যে, একে সকল এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর মা বলা হয়। কারণ, অন্যান্য এ্যান্টিঅক্সিডেন্টের আয়ুষ্কাল সংক্ষিপ্ত হয়। অপরদিকে, গ্লুটাথায়ন পূনরাবর্তনের মধ্যদিয়ে নিজেকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং অন্যান্য এন্টিঅক্সিডেন্ট (ভিটামিন-সি, ই) কে ও পুনরুজ্জীবিত করে।

তবে সমস্যা হচ্ছে, আমাদের আধুনিক জীবন যাপনের বিভিন্ন অনুসঙ্গ যেমন- খাবারের প্রাকৃতিক অবস্থা থেকে পরিশোধন করা বিভিন্ন খাবার (সাদা আটা, সাদা টিনি), প্রেসক্রিপশন বিহীন ব্যাথা নাশক সেবন, স্থূলতা, মাত্রতিরিক্ত মানসিক চাপ প্রভৃতি আমাদের শরীরের এ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এর মাত্রাকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এদের ধ্বংশ করতে গ্লুটাথায়ন নিঃশেষ হয়ে যায়। এছাড়া, ৪৫ বছর বয়সের পর শরীরে গ্লুটাথায়ন উৎপাদনের মাত্রাটাও কমে যায়। এমন অবস্থায় যা করা উচিত তা হল-

১) সালফার সমৃদ্ধ খাবার যেমন রসুন, পেয়াজ, ক্রুসিফেরাস জাতীয় শাকসবজি (ফুলকপি, বাঁধা কপি, শালগম, মূলা, সরিষা শাক, মূলা শাক প্রভৃতি) খাওয়া। ক্রুসিফেরাস পরিবারের সকল শাকসবজিই সালফার সমৃদ্ধ।

২) শারীরীর ব্যায়াম করা। এতে গ্লুটাথায়নের পরিমাণ বাড়ে। প্রথমে হালকা ব্যায়াম দিয়ে শুরু করে আস্তে আস্তে দিনে ৩০মি. ঘাম ঝরিয়ে দ্রুত গতিতে হাটা, জগিং বা বিভিন্ন খেলাধুলা করা যেতে পারে।

সাপ্লিমেন্টের হাতছানি এখানেও আছে তবে আগেও বলেছি এর উপযোগিতা নিয়ে অনেক বিতর্কও আছে। আর ভিনদেশী গ্রীন টি সাপ্লিমেন্ট হজম করবার মত জিন আমাদের দেহে না থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষরা যেসব খাবার খেয়ে সুস্থ্য থেকেছেন তা হজম ও শোষন করবার মত জিন অতি নিশ্চিত আমাদের শরীরে আছে।

জুঁই ইয়াসমিন। লেখক ও গবেষক। পড়াশুনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে। পরবর্তীতে ইরাসমাস মুন্ডুস প্রোগ্রামের আওতায় 'ফুড সায়েন্স, টেকনোলজি ও নিউট্রিশন' স্নাতকোত্তর। বর্তমানে স্বাধীন স্বাস্থ্য প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। স্বাস্থ্য ও মেডিসিন বিষয়ে নিয়মিত লেখালিখি করেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ