সাবিনা স্পিয়েলরিন: বাংলা সাহিত্যে জিঘাংসা ও জিজীবিষার নতুন পাঠ

বল্লরী সেন
নারী, প্রবন্ধ
Bengali
সাবিনা স্পিয়েলরিন: বাংলা সাহিত্যে জিঘাংসা ও জিজীবিষার নতুন পাঠ

বিধবা রতিমন্জরী বুঝেছিল যে স্বামীবিয়োগজনিত দুর্নীতির পরিণাম পুরোটাই তার ওপর বর্তাবে। তার চাইতেও কঠিন হল, বৈধব্যের অযৌক্তিক নিয়মপালনের প্রথা। তাই সে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে অপেক্ষা করছিল আর যেদিন সত্যিই বয়স্ক বিপত্নীক বাবুটি সদর ফটকে উঠে এল, আর সে নিজেকে সাজিয়ে বৈঠকখানায় বার করে আনলো, জানতে পারলো পাঁচ পাঁচটা ছেলেমেয়ের দেখাশোনার পরিচারিকা হিসেবে তাকে নিয়ে যাওয়ার সুব্যবস্থার নাম বিবাহ— তখনই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে এহেন বিবাহের মুখোশ নয়, আসলে সে গণিকাবৃত্তিই করবে। পাড়ায় যখন যুক্তিহীনভাবে তাকে বারাঙ্গনা সাব্যস্ত করা হয়েছে, তখন সে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, অপর কোনো বাবুর গোলামি করবে না। জগদীশ গুপ্তের গল্পে বিবাহ ও দাম্পত্যের বিকার, নারীমনের অতলে চোরাগোপ্তা তরঙ্গের কথা জানিয়েছে নারীর নিজস্ব পার্সপেক্টিভ থেকে। অর্থপিশাচ স্বামী যখন সম্পত্তির লোভে শ্যালিকাকে ঘরে আনে, তখনও স্ত্রী বা মায়ের কোনো আপত্তি ওঠে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলা কথাসাহিত্যে যখন নারীমাংসলোভী শরীরসর্বস্বতা স্বামীচরিত্রের একটি প্রধান প্রবণতা, বিশ্বসাহিত্যের প্রাঙ্গণে পা দিলেন এমন এক মনোরোগী, যিনি ফ্রয়েড ও ইয়ুং এর মধ্যবর্তিনী। সাবিনা স্পিয়েলরিনের জন্ম ১৮৮৫ তে রাশিয়ায়, এক সম্ভ্রান্ত ইহুদি পরিবারে। ১৯ বছর বয়সে বিশেষ কোনও মনোরোগের কারণে তাঁকে জুরিখ পাঠানো হয় ইয়ুজিন ব্লিউলারের ক্লিনিকে নিরাময়ের জন্য। এখানে তাঁর আলাপ হয় কার্ল ইয়ুং এর সঙ্গে, যাঁর চিকিৎসায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হবার মধ্যেই ১৯১১ সালে মনোবিজ্ঞানে তিনি স্নাতক হন। মনে রাখতে হবে, ইয়ুং এর চিকিৎসাধীন অবস্থা থেকে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয় ১৯০৮-১৯১০ নাগাদ এবং সিগমণ্ড ফ্রয়েডের সঙ্গে মনোবিকলনের নানা আলোচনায় তাঁকে অংশ নিতে দেখা যায়। বলা যেতে পারে, বিশ্বের প্রথম মহিলা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের অন্যতম সাবিনার অবদান সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়েছে। ১৯৮০ সালের আগে কোনো গবেষণা বা চর্চাতে সাবিনার অবদানের কোনও উল্লেখ নেই। শিক্ষক, গবেষক, শিশুরোগবিশেষজ্ঞ এবং মনোবৈজ্ঞানী হিসেবে সুইটজারল্যাণ্ড ও রাশিয়ায় নিয়মিত কাজ করার মধ্যে ১৯১১তে ভিয়েনায় ফ্রয়েডের আমন্ত্রণে তিনি যে বক্তব্য রাখেন, তার মৌলিক ধ্রুবপদ ছিল নর-নারীর ধ্বংসকামিতা বা যাকে ফ্রয়েড বললেন Eros and Thanatos. ”Destruction as the cause of coming into being” শিরোনামের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় ১৯১২ সালে, যার প্রথম স্পষ্ট স্বীকৃতি এল ফ্রয়েডের লেখায়, যে বক্তব্য তাঁর নিজের লেখাতে নানা পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছিল। ফ্রয়েডকন্যার আকস্মিক মৃত্যু হয় স্প্যানিশ ফ্লু তে। সোফির এহেন চিরবিদায় এগিয়ে দিল নবতর বাঁক বদলের দিকে। নিজের লেখা বদলালেন ফ্রয়েড। নতুন করে লিখলেন সেই আশ্চর্য বইটি- Beyond The Pleasure Principle আর এখানেই স্বীকৃতি দিলেন প্রথম মহিলা মনোরোগ গবেষক সাবিনা স্পিয়েলরিনকে। প্রায় ৭০ বছরের নির্বাসনের পর তাঁর তত্ত্বকে আমরা তাঁর নামে স্বীকৃতি দিয়েছি।

Sabina Spielrein (Family photo, source: Wikimedia Commons)

সাবিনার কৈশোর কেটেছে মা বাবার সংঘাতের ছায়ায়, যার প্রকোপে অসুস্থ হয়ে হিস্টিরিয়া নিয়ে তিনি ঘর ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। মনে পড়ে কিশোরী শৈবলিনীকে, বিদ্বান তপস্বী চন্দ্রশেখরের কাছ থেকে পালিয়ে মুঙ্গের আসে শৈবলিনী। নাপিতানির ছদ্মবেশ ধরে সই তাকে বাঁচাতে এলেও তাকে ফিরিয়ে দিয়ে শৈবলিনী বলে, ফিরবো কার কাছে, ”ন মাতা ন পিতা ন বন্ধু!” অর্থাৎ সে নিজের গৃহে নিজে পরবাসী। বিবাহ নামক নির্বাসনদণ্ড কেটে প্রতাপের মুখোমুখি হয়ে সে বুঝলো, প্রতাপের মত নেই। কারাগার থেকে মুক্তির পথ এবার আরও জটিল ও নারকীয় রূপ নিল। প্রায়শ্চিত্ত ও নরকযন্ত্রণার পর প্রকৃত মনোরোগী শৈবলিনী বাংলা উপন্যাসের হয়ত প্রথম মানসিক অবসাদ, হিস্টিরিয়া ও বিকারগ্রস্ত স্কিৎজো ফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত, যাকে ত্যাগ না করে পুরনো ঘরে প্রতিষ্ঠা দিলেন তার স্বামী। এক নতুন মানুষ চন্দ্রশেখর। আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তর ডিঙিয়ে তাঁর শিক্ষক, চিকিৎসক ও প্রেমিকের পাশে নিজের গবেষণা চলেছে উন্মাদের পাঠক্রম নিয়ে, schizophrenia আক্রান্তের ভাষা নিয়ে, যা সারাবিশ্বে প্রথম। Christopher Hampton এর চিত্রনাট্য যা অনেক পরে বাকি দুনিয়ার সামনে সাবিনা, ফ্রয়েড এবং কার্ল গুস্তাভের এই ত্রিভুজ সম্পর্কে নতুন আলো ফেলবে, সেই চলচ্চিত্রের নাম ছিল— ‘A Dangerous Method’  তবু এই বিশেষ সতর্কতা কেন? ফ্রয়েড একটি চিঠিতে লিখেছেন সাবিনার উত্তরে,

”His behaviour was too bad.My opinion changed a great deal from the time I received that first letter from you.” – ‘Sex Versus Survival: The Life And Ideas Of Sabina Spielrein’

সম্প্রতি প্রকাশিত জন লনারের গবেষণার এক জায়গায় (পৃ ৪৯০-৪৯১) সাবিনার উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক বুঝিয়েছেন, বাধ্যতামূলক সম্পর্কের দাবি একদিকে কিশোরীমনে যে রোম্যান্টিক প্রণয়ের ফ্যান্টাসিব্যূহ নির্মাণ করেছিল, হয়ত তা ই সাবিনার স্বতন্ত্র চিন্তাচেতনার মৌলিক মননসূত্র। সাবিনার বক্তব্য ছিল-

“The instinct of self-preservation is a simple drive that is wholly positive,the instinct of the preservation of the species,which must dissolve the old so that the new may come into being”,

অতএব ব্যক্তির নিজের অবচেতনে নারী ও পুরুষ অস্তিত্বের যে দ্বৈত আলাপ স্বাভাবিকভাবে ক্রিয়াশীল, তাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রথম নারীকেন্দ্রিক যৌনতার পাঠলিপি উঠে এল তাঁর চিন্তাবিশ্বে ।বিশদভাবে সাবিনার মতবাদ ছিল এরকম,

“ The male part dissolves in the female part, the female part becomes agitated and acquires a new form as a result of the alien intruder.This transformation affects the entire organism as destruction and reconstruction… becoming corresponds with sensuous feelings in the reproductive drive and defense emotions like anxiety and disgust correspond to the destructive component of the sexual instinct”.

হিতবাদী পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম গল্প ‘ঘাটের কথা’, আমাদের মনে থাকবে কুসুমের আত্মহত্যার কথা। সন্ন্যাসী যে আসলে তার নিরুদ্দিষ্ট স্বামী, এই প্রমাণ পাওয়ার পরেই তার এই সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ প্রেমের প্রত্যাশার নতুন দিগন্ত যে অচিরে বিলীয়মান, সেটাই তার নিজেকে শেষ করে দেবার কারণ।কুসুমের মনের দ্বন্দ্ব, আশা, যন্ত্রণার সবটুকু প্রগলভতা অনুভব করেছে ঘাট নিজে। তাই ঘাটের অন্তর্লীন দ্বৈধতার সংজ্ঞানে বালিকার ক্রমবিবর্তন যেন ঘাটের নিজেরই নবজন্ম, নতুন সংবেদনে জগতকে গ্রহণ করবার সদর্থক মীমাংসা। কুসুম চলে গেলেও, ঘাটের কথা কোনদিন ফুরোবে না, পাতার ভেলায় দুটি খেলার ফুলের মতো তা কেবল ঘুরে আসবে। কিন্তু শৈবলিনী প্রতাপকে কথা দিয়ে কথা রাখতে পারেনি মৃত্যুভয়ে। বরং সে নিজে প্রতাপকে হারিয়ে সাঁতার দিয়ে মাঝগঙ্গা থেকে ফিরে এসেছে। কিন্তু বিবাহিত জীবনের গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা তাকে আবার যখন নতুন এক ফটকের সামনে এনেছে, তখন প্রতাপ তাকে নিজের জীবনের দিব্বি দিয়ে শপথ করিয়েছে। এখানে নতুন করে প্রত্যাখ্যানের সামনে এসে সে নিজের ভেতরে তীব্র দ্বন্দ্বের সম্মুখীন এবং মৃত্যুকামনাই তার একমাত্র উপায় মনে হল। শৈবলিনী বা নদী,জলেই তাদের সম্পর্কস্থাপন, জলেই প্রতিশ্রুতি আর জলে সাঁতারের মধ্যে অবচেতন কামনার লিবিডো সাবিনাকথিত “destructive component” এর রূপায়ণ দেখতে পাই। তাঁর এই গবেষণার কথা ইয়ুং কোনদিন জানাননি, তবু ফ্রয়েডের কিছু পৃষ্ঠপোষকতা জুটেছিল। যদি আমরা সতর্কতায় জানতে পারতাম, নারীমনের ভিন্ন অনুশাসনে হয়ত বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা, মতিবিবি বা রোহিণীহত্যার মীমাংসা আমাদের কাছে সহজ হোত। প্রেম সম্পর্কের কাছে নারীর কামনার আদ্যক্ষর হয়ত অন্য রাজপথ দেখাতে পারতো আমাদের।

Sabina Spielrein (Photo source: ABC, Historia)

 

সম্পাদনা: জোবায়েন সন্ধি

বল্লরী সেন। গবেষক, কবি। প্রকাশিত বই বাংলায় ৫ টি ইংরেজি ২ টি। 'বিহান রাতের বন্দিশ' কাব্যগ্রন্থের জন্য ২০১০ এ কৃত্তিবাস পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১২ থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা ভাষার নানা গবেষণায় যুক্ত। 'নারী বীক্ষায় পুরুষের কবিতা' তাঁর সাম্প্রতিক গবেষণা গ্রন্থ।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ