সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এইচ বি রিতার কবিতা

এইচ বি রিতা
কবিতা
Bengali
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এইচ বি রিতার কবিতা

ধর্মবিদ্বেষের বিষদাঁত উপড়ে দিতে হবে

জন্মেছিলাম এক মুসলিম পরিবারে,
তাই আমার ধর্ম ইসলাম।
আজান শুনে রোজ ঘুম ভাঙা আমার পারিবারিক রীতি।

সন্ধ্যা হলেই পাশের বাড়িতে শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনির শব্দ পেতাম
কিছু মহিলারা এ সময় প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা শুরু করতেন।
সে সময়টাতে আমাদের ফুল ভলিয়মে গান শোনা বারণ ছিল
বাবা বলতেন, এটা তাদের প্রার্থনার সময়।

এমন করেই আমি জেনেছি, সবার কাছে সবার ধর্ম সেরা।
জেনেছি, নিজ ধর্ম-বিশ্বাস, মূলনীতি মূল্যায়নের সাথে;
অন্যের ধর্ম-বিশ্বাসকেও সম্মানে রাখতে হয়।

আজ যখন দেখি, সর্বত্র ধর্ম নিয়ে বিরোধ-বিদ্বেষ
মন আহত হয়! নিজ অস্তিত্ব বিপদগ্রস্ত হয়।

সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই-
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই মূলমন্ত্র ভুলে কেন আজ
বিভেদের এই দুর্ভেদ্য প্রাচীর?

হীনস্বার্থ চরিতার্থে কুটিল ষড়যন্ত্রের নীল নকশায়,
বাংলাদেশ-ভারত
অথচ নিষ্পেষিত হচ্ছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।
আমাদের ভালবাসতে হবে,
প্রেম, মৈত্রী, শান্তি ও সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য স্থাপনে;
ধর্মবিদ্বেষের বিষদাঁত উপড়ে, বুকে বুক মিলাতে হবে।

 

তোমার আমার রক্ত; লাল-কালচে লাল

আমার জন্ম হয়েছিল এমন এক পরিবারে,
যেখানে আমি শিখেছিলাম জাত-ধর্ম-বর্ণ ভেদে
মানুষের শরীর ধারণ করে লাল-কালচে লাল রঙা রক্ত।
অ-আ-আলিফ-বা-তা এর সাথে আমার বাবা শিখিয়েছিলেন,
জাত, শ্রেণি, বর্ণ, বৈষম্য কেবল মানুষের তৈরী।

দাদীমা বলতেন, যাস নে ওদের ঘরে, খাস নে এক পাতিলে
আড়ালে থেকে বাবাকে বলতে শুনেছি,
মুখে পুরে খেয়ে এলাম পিঠাপুলি, নাড়ু, ঢেঁকিছাঁটা চালের চিড়া
লুচির সাথে পটল দোলমা, আলুর দম, শুক্তো আর চাটনি।
সেকেলে অক্ষর-জ্ঞানহীন দাদী-মায়েরা
এভাবেই তো বিশ্বাস ধরে রাখেন।

জন্মের পর বাবাকে দেখেছি মসজিদের দেয়ালে ইট গেঁথে দিতেন
দেখেছি পুজো মণ্ডপে নিরাপত্তা দিতে দলবেঁধে ছুটতেন।
ইমামের হুংকারে মসজিদে, পুরোহিতের চিৎকারে মন্দির;
দুটোই ছিল তাঁর কাছে বিশেষ ধর্মীয় প্রার্থনা-উপাসনাগার।
বাবাকে কখনো পূজা করতে দেখিনি;
দেখেছি,
নিরাপত্তা দিয়ে কেমন দায়িত্বের সাথে পূজা সম্পন্ন করাতেন।

এই তো মানুষ-মানুষে সৌহার্দ্য, মানবিক সম্পৃক্ততায় হৃদয়ের বন্ধন
অথচ হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বে আমরা গুলিয়ে ফেলি,
কোরআন-শ্রীমদ্ভগবদগীতা
উভয়েই সৃষ্টিকর্তার একেশ্বরবাদে বিশ্বাস রেখেছেন
বলেছেন,
‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কোন বাবা মা নেই,
তাঁর কোন প্রভু নেই, তাঁর চেয়ে বড় কেউ নেই’।
আকার নিরাকারে সৃষ্টিকারী একজনই; যিনি অবিনশ্বর।

কেটে দিলে তোমার-আমার হাত কিংবা ঘাড় মুণ্ডু
ফিনকি দিয়ে তাজা যে রক্তপ্রপাত নিঃসৃত হবে,
তা হিন্দু-মুসলিমের একই রঙ; লাল-কালচে লাল।
বাতিল হলে দেহ, পুড়ে যাবে তোমার, পচে যাবে আমার
থেকে যাবে শুধু কিছু কথা, ইতিহাসের পাতায় বাকি।
তবে কেন এত লড়াই?

সভ্যতার বিকাশে সময়, জ্ঞান-বিজ্ঞান অগ্রগতির যুগেও
কেন মানুষের মাঝে সহিংসতা, রক্তপাত, হানাহানি, বিদ্বেষ
ধর্ম নিয়ে ফিতনা-মতভেদ,
কেন আজ অহেতুক উন্মাদনার বীভৎস চিত্র ফুটে উঠে;
যা মানবতা বিপন্ন করে দেয়?

কেন আজ দলমতের বিরোধ-বিবাদ, মানুষে মানুষে বিভেদ?
বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে কেন আমরা শান্তি, সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি নষ্টে;
ইতিহাসের পাতায় ছাপ রেখে যাই বর্বরতার?
এমন তো হবার কথা নয়।
এমন তো হবার কথা নয়।

 

তোমার ভিতর আমি আমার ভিতর তুমি

ধর্ম বিরোধ-বিদ্বেষে মানবরক্ত চুষে খেয়ে যায়,
একদল শকুন
আগুনের লেলিহান শিখায় মানুষ, ঘরবাড়ি
স্বাধীনতা, সভ্যতা, কৃষ্টি পুড়ে ছাই হয় রোজ
এখানে জীবন বদলে দেয় জীবনের নানান ঘটনা।

অথচ দেরাদুনের হিমালয়
বিস্ময় জাগিয়ে তখনো অঙ্গ প্রতিস্থাপনে
চমকে দেয় জাতিকে; ধর্ম-হিসাব নির্বিশেষে।

হিন্দুর ভিতর মুসলিম নড়ে উঠে
মুসলিমের ভিতর হিন্দু
মোইজ সিদ্দিকি, নর্মদা সুরেশ;
ধর্মের বেড়াজাল ছিন্ন করে ভিতরে নিয়ে একে অপরকে;
জানান দিয়ে যায়; মানবতার কোনও জাত-ধর্ম নেই
‘সবার আগে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’।

 

আমরা কেউ সুস্থ নই

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় কে কাকে ছাড়ে
সংখ্যাগরিষ্ঠ, সংখ্যালঘু
সুযোগে এপার-ওপার সবাই সবার ঘাড়ে।

অমর্ত্য সেনের স্মৃতিকথায় উঠে আসে
মুসলমান দিনমজুর কথা।
বুকে-পিঠে ছুরিকাঘাত করে, জল তৃষ্ণায়
শেষ করা হয়েছিল যাকে হিন্দুপ্রধান এলাকায়;
নাম তার কাদের মিয়া।

কুমিল্লার পূজামণ্ডপে মুসলমানদের সহিংসতায়
আরো একটি হিন্দু প্রাণ ঝরে গেল,
নাম তার দিলীপ দাস।

ইতিহাসের পাতা উল্টাতেই এমন শত শত দিলীপ দাস,
কাদের মিয়াদের নিস্পাপ প্রাণের আহাজারি;
আমরা শুনতে পাই।
দেখতে পাই, ভেদাভেদ শত্রুতা কতটা তীব্র হতে পারে।

আমরা কেউ সুস্থ নই
আমাদের মস্তিষ্কে নতুন কোন কোষ তৈরী হয় না
তাই আমাদের চিন্তাশক্তি; কোন বৈদ্যুতিক সংকেত পায় না।

 

জগদীশ আমার বন্ধু

জগদীশ আমার বন্ধু।
হিন্দুর ঘরে জন্ম হলেও সে ঠিকই জানে,
মুসলমানকে সালাম দিতে হয়।

কোরআনের বেশ কিছু নিয়ম-নীতি, সূরা মুখস্ত তার
এক সাথে আছি আজ প্রায় তেরটি বছর,
ধর্ম নিয়ে বিরোধে জড়াতে হয়নি কখনো।
ইফতার-ঈদ পালন করেছি বহুবার তার সাথে
আলোচনায় ধর্ম এসেছে বিশ্বাস ভালোবাসা রেখে।

পূজায় নিমন্ত্রণ করেছিল! যাওয়া হয়নি।
আমার অবশ্য কখনোই পূজা মণ্ডপে যাওয়া হয়না
সে কথাও বন্ধু বেশ ভাল করেই জানে।
তবু, প্রশ্ন তুলেনি কখনো
সম্পর্ক বিপরীতমুখী হয়নি, টিকে আছে এখনো।

জীবনের ‌অনেকটা সময় লড়াইয়ের মাঠে আমি যখন;
একদম একা
তখন নিঃস্বার্থভাবে সবদিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে,
সাহস যোগানো মানুষটাই- জগদীশ!
আমার পাশে থাকা হিন্দু মানুষটাই সে।

আমি মানি কোরআন-সে মানে শ্রীমদ্ভগবদগীতা
উভয়ই সৃষ্টিকর্তার একেশ্বরবাদ বিশ্বাসে বলেছেন,
‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কোন বাবা মা নেই,
তাঁর কোন প্রভু নেই, তাঁর চেয়ে বড় কেউ নেই’।
আকার নিরাকারে সৃষ্টিকারী একজনই; যিনি অবিনশ্বর।

আজ তার হাত কেটে গেলে,
ফিনকি দিয়ে তাজা যে রক্তপ্রপাত নিঃসৃত হবে
আমার কাটা হাতে তাই হবে
হিন্দু-মুসলিমের রক্ত একই রঙ; লাল, কালচে লাল।
বিনাশ হলে পুতে দেয়া শরীর-পুড়ে যাওয়া শরীর;
গন্ধ একই হবে।

সভ্যতা বিকাশের সময়ে আজ ও আমরা ধরে রাখি
মানুষে মানুষে সহিংসতা, বিরোধ, বিদ্বেষ
ধর্ম নিয়ে ফিতনা-মতভেদে উন্মাদনা বাড়াই
বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে অন্তরনিহিত রক্তপাতে বিপন্ন করি;
মানবতা সভ্যতা।
বোঝাপড়ার বড় ঘাটতি আজ
শিক্ষার জ্ঞানীয় আলো থেকে বিতারিত আমরা ভুলে যাই,
একই বৃন্তে দু’টি ফুল হিন্দু আর মুসলিম!

 

অসাম্প্রদায়িকতার লেবাসে সি-স্টার আমি

অসাম্প্রদায়িকতার লেবাসে সি-স্টার আমি
এক চোখ খোলা, অন্যটা বন্ধ
হয়তো জন্মেছিলাম এভাবেই।

সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির মাইলফলকে ভাবনায় আসে,
মন্দিরে দেবীর পায়ের নিচে কোরআন:
স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
ধর্মীয় অনুভূতিকে আহত করে গরু নিষিদ্ধ, ঠিক আছে
‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা, এমন কি!
মন্দিরে ঢুকে জল খাওয়ার অপরাধে
বারো বছরের আসিফকে মাটিতে ফেলে পিটানো;
সবই ঠিক আছে।
এটাই তো আমি; অসাম্প্রদায়িক সি-স্টার।

আমি একচোখা, তাই সীমিত পথেই হাঁটি
মাথা ঘোরালেই দিক বদল হয়, তাও কম বুঝি।

এ শুধু হিন্দু বলে কথা নয়
মুসলিম, খ্রিস্টান কারুরই নিরাপত্তা নেই কোনো দেশে
আমার দেশে আমি পশু, তোমার দেশে তুমি।
এক চোখ খোলা; অন্য চোখ বন্ধ
‘অসাম্প্রদায়িক সাম্প্রদায়িকতা’ বৃদ্ধিতে নিরলস তাই
এভাবেই সাক্ষর রেখে যাই।

এইচ বি রিতা। কবি, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশের নরসিংদী জেলায়। বর্তমান নিবাস কুইন্স, নিউইয়র্ক। তিনি নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুল শিক্ষকতায় জড়িত রয়েছেন দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে। পাশাপাশি কাজ করছেন দৈনিক প্রথম আলোর উত্তর আমেরিকা ভার্সনে। এছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ