সাহিত্য ও রাজনীতি

আকাশ মামুন
প্রবন্ধ
Bengali
সাহিত্য ও রাজনীতি

সুপ্রাচীন কাল থেকেই মানুষের জীবনের সাথে সাহিত্য অঙ্গাঙ্গিক ভাবে জড়িয়ে আছে। গল্প-উপন্যাস-কবিতা, কিংবা গান-পালা এবং অনেক পরে যোগ হওয়া ভ্রমণ ও গোয়েন্দা কাহিনী ভিত্তিক সাহিত্যের মত আরও অনেক শাখা। যখন থেকে  মানুষ রাত্রি যাপন আর প্রকৃতির খামখেয়ালী থেকে বাঁচতে মাথার উপর একটা ছাউনির ব্যবস্থা করতে পেরেছে, খাবার জন্য শুধু পশু স্বীকার আর ফলমূলের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে কৃষিকে আয়ত্বে এনেছে-তখন থেকেই বোধ করি বিনোদনের প্রয়োজন খুব বেশি ভাবে অনুভব করেছেআর এই বিনোদনের প্রয়োজনই হয়তো মানুষের মনে সাহিত্য চর্যার একটা অনুষঙ্গ হয়ে থাকবে। তবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সেই অনুমানকে ধোপে টিকতে দেয় না। বরং মনে হয় মানুষের আধ্যত্মিকতা ও অন্তর্ধানের চিন্তা থেকেই সাহিত্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ প্রাচীন সাহিত্যগুলোর দিকে তাকালেই দেখা যায় ধর্মীয় ভাব গাম্ভীর্যের আবহ, অনুরাগ এবং ঐতিহ্য গাথা। তবে সেই ধর্মীয় ঐতিয্য গাথাও যে বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার হতো তা চর্যাপদ থেকে নাথ সাহিত্য হয়ে মরসিয়া সাহিত্যসব জায়গাতেই পরিদৃষ্ট হয়। যদিও চর্যাপদের রচনাকাল খুব বেশি পুরনো নয় এবং আবিষ্কার আরও অধুনা।

তবে সাহিত্যের উৎস কিংবা বিনোদনের উপযোগিতা হিসেবে সাহিত্যের মানদন্ড নির্ণয় আজকের আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। বরং আজকের আলোচনার উদ্দেশ্য সাহিত্য স্রষ্টার জীবন ও সমাজ সচেতনতা এবং রাষ্ট্র দর্শন। একটা সময় ছিল রাষ্ট্র পরিচালনায় কবি-সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণ ছিল। রাজ-রাজড়াদের আমলে রাষ্ট্রীয় সভা কবি থাকতেন। তবে সেই রাষ্টীয় সভা কবিদের স্বাধীন চিন্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা অংশগ্রহণ ছিল তা নিয়ে হয়তো প্রশ্ন থেকে যায়। নিকট অতীতে বাংলা সাহিত্যের পৃষ্টপোষক আরাকান রাজদরবারের দিকে তাকালে দেখা যাবে দৌলত কাজী, আলাওল ও আব্দুল করীমদের মত অনেক সাহিত্যিক পৃষ্টপোষকতা পেয়ে সাহিত্য চর্চায় ব্রতী হয়েছেন। তবে রাজ কাজে বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ প্রমাণিত নয়। রাজসভার কবি-সাহিত্যিকরা মূলত রাজাদের চিন্তাদ্বারা প্রভাবিত হতেন এবং  তাদের গুণ-কীর্তন করে সাহিত্য রচনা করতেন। যদিও আলাওল শাহ সুজার সাথে মিলে রাজদ্রোহের অভিযোগে কারাভোগ করেছেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী স্বৈরশাসক এরশাদের সময় অনেকটা সেই প্রাগৈতিহাসিক সভা কবিদের মত কবিদের একটি বলয় তৈরী হয়। ফজল শাহাবুদ্দীন, আব্দুল মানান সৈয়দ, সৈয়দ আলী আহসানের মত কবিরা সেই দলে ভিড়েছিলেন। আল মাহমুদের মত কবিকেও সে দলে ভেড়ানো সম্ভব হয়েছিল। 

অন্যদিকে এরশাদের রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ও মানবিক অধিকারের প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, মোহাম্মদ রফিক, রফিক আজাদ, রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুল্লাহদের মত কবিরা।  

এখন প্রশ্ন হল, কবি সাহিত্যিকরা কি শুধু সাহিত্য নিয়েই মজে থাকবেন? সমাজের অসঙ্গতি, পশ্চাদপদতা, অন্যায়অবিচার তারা কি এড়িয়ে যাবেন? তাঁরা কি রাজনীতি বিমুখ একটা জাড়্য সাধারণ জীবন যাপন করবেন? আমার তো মনে হয় না কবি সাহিত্যিকদের সেই সুযোগ আছে। কবি সাহিত্যিকরা সময়ের সচেতন, প্রাগ্রসর, চিন্তাশীল ও শিল্পিত মননেরজাগ্রত চিন্তার মানুষ। সমাজের অসঙ্গতি, অন্যায় অবিচার কোন ভাবেই তাঁরা এড়িয়ে যেতে পারেন না। একটা গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকের সংজ্ঞা হচ্ছে, রাজনীতি সম্পর্কে তারা সচেতন থাকবে এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের ও সমাজের দাবি দাওয়া আদায় করে নিবে। কবি-সাহিত্যিকরা সমাজেরই মানুষ। সমাজকে ঘিরের তাদের জীবন ও কর্ম আবর্তিত হয়। তাছাড়া রাজনীতি ছাড়া দর্শন অচল এবং দর্শন ছাড়া রাজনীতি অস্মপূর্ণএকটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি-জীবনাচরণ অনুধাবন করতে হলে সেই সমাজের রাজনীতি, সমাজনীতি ও বৈষয়িক ভাবদর্শন জানা জরুরী। তা না হলে একজন কবি বা সাহিত্যিকের পক্ষে সেই সমাজের দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গি তার লেখানীতে পরিপূর্ণ রূপে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। 

কবি-সাহিত্যিকদের সেই রাজনৈতিক সাবালকত্বের পরিচয় পাওয়া যায় দেশে দেশে যুগে যুগে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে আমাদের সোমেন চন্দ্র থেকে শুরু করে, নজরুল কিংবা রবীন্দ্রনাথ সবাই দেশ ও মানবতার কথা বলেছেন। সোমেন চন্দ্র আত্মত্যাগ করেছেন, নজরুল, শরৎচন্দ্র নিষিদ্ধ হয়েছেন এমনকি নজরুল জেলও খেটেছেন। তবুও তাঁরা দাসত্ব, সামন্তবাদ ও ঐপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়ে গিয়েছেনজালিয়ানওয়লাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাইট উপাধী বর্জন করেছেন। 

শোষণ, নিপীড়ন ও বৈষম্যহীন সমাজের কথা বলতে গিয়ে জীবনের অধিকাংশ সময় জেলে কাটিয়েছেন ইরানের কবি নাজিম হিকমাত। অভিজাততন্ত্রী দলের সদস্য হয়েও ফরাসি সাহিত্যিক বালজাক অভিজাত তন্ত্রের বিরুদ্ধে লিখেছেন সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। 

কিন্তু নিকট অতীত কিংবা সাম্প্রতিক বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উল্টোটা দেখা যায়। ব্যক্তিস্বার্থ, পদবী, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা পুরষ্কারের আশায় কবি সাহিত্যিকদের বড় একটা অংশকে শাসকদলের কাছাকাছি থাকতে দেখা যায়। কবিসাহিত্যিকরা সুশীল সমাজের প্রতিনিধি। তাই সামাজিক ও রাজনৈতিক অসংগতি এবং দীনতায় তাঁরা উচ্চকিত হবেন এটাই কাম্য। তাঁদের গঠন মূলক সমালোচনা এবং দিক নির্দেশনা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে আলোর মশাল হাতে সংশপ্তক হয়ে দৃঢ মানষিকতায় দাঁড়িয়ে থাকবে। তাঁরা প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও সকারের বিপরীতে ছায়া সরকার গঠন করে সরকারের ভুলগুলোকে ধরিয়ে দিয়ে সরকারকে সঠিক পথে চলার প্রণোদনা দিবেন। অথচ বর্তমানে দেখা যায় ছায়া সরকারতো দূরের কথা পদ-পদবী ও পুরস্কারের আশায় আদর্শচ্যুত হয়ে নিজেদের অস্তিত্বকে সরকারের ছায়ায় বিলীন করে দিতে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্বার্থের কাছে বিলীন হয়ে যেতে, নিষ্ক্রিয় থাকতে, এমনকি বিক্রি হয়ে যেতে। এই প্রবণতা কোন জাতীর জন্য একেবারেই কাম্য নয় বরং বিধ্বংসী। একটা সমাজ ধীরে ধীরে অবক্ষয়ের দিকে যেতে থাকে যখন তার সুশীল সমাজ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েস্বার্থের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তবে আশার কথা হচ্ছে স্বার্থের কাছে বলি না হয়ে এখনও কেউ কেউ উচ্চকিত আছেন। তাঁরাই আমাদের পথ দেখিয়ে একদিন স্বপ্নের সোনালী গন্তব্যে নিয়ে যাবেন এই প্রত্যাশায় প্রতিদিন ভোরে এখনও চোখ মেলি।

আকাশ মামুন। কবি।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ