সিন্ডেরেলা

বর্ণালী মুখোপাধ্যায়
গল্প
সিন্ডেরেলা

সোহনলাল বাহাদুরের দুটি বউ,তিনটি সন্তান এবং একটি অতলান্ত নাভিগহ্বর। এছাড়াও পুরুষানুক্রমিক আধ হাত লম্বা কুকড়ি ও অসম্ভব ছুঁচলো একটি গোঁফ তার আমানত।

তবু এই কল্প গল্পে সেহ বাহ্য মাত্র। এই গল্প রম্ভার। সে সোহনের প্রথম বউ। তার কোলে মেয়েটি এলো রক্তের বিমারি নিয়ে। তাজা মুরগি বা হাঁসের আন্ডা খাইয়েও তেমন লাভ হলো না। রোগটি থ্যালাসেমিয়া। ডাগ্দারি জাঁচে মালুম পড়লো রম্ভা হলো গিয়ে বাহক। আর বাচ্চা পয়দা করা চলবে না। সোহন চটজলদি অম্বাকে বিয়ে করে নিয়ে এলো। সে রম্ভার মামার মেয়ে। ঠিকাদারের কাছে তার বাঁধা মজদুরি। শরীরে ভরপুর তাকৎ। দু দুটি ছেলে ,তরতর করে বেড়ে উঠছে কদম গাছের মতো।

সমস্ত শরীরে কালশিটে নিয়ে রম্ভার ঘুম ভাঙে যখন,পাখিদের চোখে তখনও শেষ ঘুম। শুধু পিয়াল গাছের কোটরে জেগে থাকা প্যাঁচাটা দেখে, রম্ভা বিড়বিড় করতে করতে ওঠে,গুটিয়ে থাকা কাঁথাটা মেয়ের শরীরে চাপা দেয়। তারপর অম্বার বন্ধ দরজায় দিলোএকটি প্রবল ধাক্কা। অম্বা উঠে পড়ে। ক্লিন্ন বিছানায় হাত পা এলিয়ে শুধু সোহনলাল পড়ে থাকে। লালাতে জ্যাবজ্যাবে তার বালিশ।

বাঙলোর পিছন দিকে আউটহাউস গুলি। দুটি ঘর উঠোন নিয়ে ড্রাইভার সোহনলালের সংসার । অন্য ঘরটিতে বুড়ো মালী ফাগুয়া একা থাকে। এইবার কাকটি উঠে ডাক দিলে ফগুয়াও উঠবে। । তারপর ভয়ানক হুটোপাটি শুরু হবে ওদের মধ্যে এক বাথরুম আর পায়খানা নিয়ে । ঝগড়া টগড়া মিটেও যাবেএবং অম্বা তখন বাগানে জল দেবে। রম্ভা ঝাড়ু দিয়ে ঝকঝকে করে ফেলবে পোর্টিকো, ড্রাইভ ওয়ে ,পিছনের উঠোন, ওদিকের লন। সকালের সিকিউরিটির অপেক্ষায় গভীর হাই তুলে গুটকা মুখে ঢালে রাতের সিকিউরিটি। একে রম্ভা চেনে না। তবে কামিনা আদমি। খারাপ নজর। ঝাড়ু হয়ে গেলে যণ্ত্রের মতো দুই বোন ঘরে ফেরে। একজন চা বানালে অন্যজন বাচ্চাদের ঘুম ভাঙায়।

দুই বোন পালা করে সোহনের হাতে ঠ্যাঙানি ও গাল খেতে খেতে কাজ সারে নির্বিকার । রম্ভার মেয়েটির থ্যালাসেমিয়া। তাই সে দুটি গাল বেশি খায়। যখন সোহন গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে ঘড়িতে সাড়ে ছয়,রম্ভা গোপনে সেই ফ্যাকাশে বালিকার খাঁদা নাকে একটি গভীর চুম্বন আঁকে। এটি এক অলোক মুহূর্ত , স্বর্গ থেকে হঠাৎ খসে পড়া অথচ প্রতিদিন তৈরি হয়। অম্বা আর তার ছেলে দুটি এক সঙ্গে বের হয়। সে ঠিকাদারের সোহাগী মজদুর,সাত হাজার তঙ্খা। মাকে সাইকেলে বসিয়ে ছেলেরা তুরতুরিয়ে সরকারী স্কুলে পড়তে যায়। রম্ভা তখন বাঙলোর ভিতর,ফলের রস বানাতে বানাতে এই ছবিটা দেখে আর মোক্ষম গালি গুলি সব ঈশ্বরকে নিবেদন করে। তারপর আবার কাজ কাজ এবং কাজ। একটি কথাও না বলে সে কাজ করে। ডাস্টিং করতে গিয়ে কোনদিন মেমসাহেবের হীরের আংটি খুঁজে পায় কখনো বা কাপড় ধুতে গিয়ে সাহেবের পকেটে তাজা হাজার টাকা।কারোকে কিছুই বলে না সে । চেস্ট অফ ড্রয়ার্সের কোণে সব গুছিয়ে রাখে। রম্ভা চুরি করতে শেখে নি!! মেমসাহেব হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া জিনিস পেয়ে বড্ড খুশি হয়। উদার হাতে কোনদিন ওকে পঞ্চাশটাকা বখশিশ দিয়ে দিলো,কখনো বা খুব বেশি পেকে যাওয়া মুসাম্বি,ফেলে দেওয়ার আগের,ডালিম। রম্ভা হাত পেতে নেয়। তারপর ফলগুলো নিঃশব্দে পিছনের নালীতে ফেলে দিয়ে আসে।টাকাটা রেখে দেয় যদিও।

আজকেও সে একটা সোনার দুল পেয়েছে বাথরুমে। নির্দিষ্ট ড্রয়ারে রাখতে গিয়ে রম্ভা সেই আশ্চর্য পোষাক টি খুঁজে পেল। গভীর কালো সেই রাত পোষাক,এতো স্বচ্ছ তার নেট , শরীরের ভিতরে যে গভীর শরীর , তাকে তুলে আনে, যেন ভাসিয়ে রাখে। ওর শিড়দাঁড়ায় শিহরণ খেলে যায় কতো দিন পরে।

সোহনলাল সাহেবকে নিয়ে অফিস রওনা হলে মেমসাহেব গল্ফ খেলতে চলে গেল। এখন সকাল এগারোটার আগে আর কেউ আসবে না এখানে। রম্ভার মেয়েটি একা ঘুমিয়ে থাকে নিঃসাড় । ফাগুয়া লনের ঘাস বাছে মাথা গুঁজে। রম্ভা এই সময়টুকু নিজের তাঁবে টেনে নিল। সে তখন সেই খেলাটা খেলে। তার খুব নিজের সেই গোপন খেলা!

মেমসাহেবের বাথরুমে ঢুকে প্রথমে নগ্ন করে নিজেকে। এবং আয়নার মেয়েটির দিকে একনজর তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নেয়। ছিঃ! এতো শুকনো শরীর,এতো নিস্তেজ স্তন!সে যেমনটা ভাবে,তেমন তো নয়! বাথ জেল গুলে গুলে প্রচুর বুদ্বুদ বানিয়ে বাথটবে ডুব লাগায় মেয়েটা। অথচ জ্বালার শরীর শান্তি পায় না। অপরিমিত সুগন্ধী ,শৌখিন সামগ্রী ছড়িয়ে রয়েছে যেন বা তারই জন্য,তারই চারপাশে—এদিকে সময় বড় কম। বাবুর্চি কিশোর আসার আগেই সবটুকু না পাওয়ার আস্বাদ নিতে হবে রম্ভাকে। একলাফে উঠে পড়ে টাবের স্টপারটা আলগা করে দেয় সে। হুড়মুড় করে জল বের হয়ে যেতে থাকে,তখন অনেকখানি লোশন হাতের তালুতে ঢেলে শরীরে ঘষে। নীল কাজল লাগায় তার চেরা চোখে,ঠোঁটে মেহগনি লিপস্টিক। তারপর চেস্টের ওপরের ড্রয়ার খোলে,বের হয়ে আসে সেই অদ্ভুত রাত পোষাক। এতো গভীর কালো যাকে মনে হয় রাত্রিকালীন নীলাভ আকাশ। বিনা অন্তর্বাস রম্ভা সেটি শরীরে গলায়। প্রবল অনীহায় মেম সাহেবের রাত পোষাক তাকে ধারণ করে। তার অস্থি সর্বস্ব কাঁধ থেকে সিল্কের ফিতে দুটি পিছলে নেমে এসে বে আব্রুকে আরও বেশি আব্রুহীন করে দেয় জল প্রপাতের মতো।

এই ঘরের একদিকের দেওয়াল জোড়া আয়না। সেখানে ঢলঢলে পোষাকের মেয়েটিকে দেখেই আবার কেঁপে ওঠে রম্ভা। এতো কুৎসিত মেয়েটি কে?রম্ভা নয়। আর কেউ।জোরে এসি চালিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে সে। শীত বোধ প্রবল হলে মেমসাহেবের কায়দায় পা দুটি ঢুকিয়ে দেয় নরম তুলোর রাজস্থানী রেজাইটার ভিতর।আর ভাবতে থাকে।এই জীবন ,এই রেজাই, নরম বিস্তর ,আর নেটের গোলাপ বোনা এই কুহক রাত পোষাক ,অনায়াসে রম্ভার ও তো হতে পারে!হতে পারতো!কিন্তু সে গরীবের অঔরত হয়ে গেল। এতো খাটনির পরেও সে কি কম সুন্দরী? এখনও তাকে অপাঙ্গে দেখে দারোয়ান। এখনও সে যদি বাবুর্চি কিশোরকে ডেকে নিয়ে আসে এই ঘরে,এই নরম বিছানায়,প্রবল প্রেমে সে মর্দ কাবু হতে বাধ্য! কিন্তু সে বদ চলন থোরি!!কোন পাপ করলো না জিন্দেগী তে তবু তার রক্তে বিমারি বিজবিজ করে!!কোথা থেকে এলো অসুখ,তার সে কি জানে!খুব রাগ হয় তখন দুনিয়ার উপর। চিৎকার করে কাঁদতে গিয়ে সে দেখে এগারোটা বাজতে মোটে পনেরো মিনিট বাকি। কিশোরের আসার সময় হয়ে এলো প্রায়,দ্রুত হাতে বিছানা টানটান করে,এ সি বন্ধ করে জানলাগুলি হাট খুলে দেয়। চৈতি হাওয়া ও আলোতে ঘরের কোণায় জমাট বাঁধা ঠান্ডা ও গন্ধ গুলি উড়িয়ে নিয়ে যায়। কান্নাও। সেই অভিশপ্ত গাউনটি মুহূর্তে ধুয়ে ফেলে রম্ভা। শুধু চোখের নীল কাজলরেখাটি মুছতে তার ভুল হয়ে যায়।

কিশোরের খুব মেয়েলিপনা । বাঁকা বাঁকা হাসি হাসে রম্ভার মুখের দিকে তাকিয়ে। টিটকিরি মেরে বলে-আজ ফির সে মেমসাব বনি থি ক্যায়া?

রম্ভা ঠোঁট টিপে দাঁড়িয়ে থাকে। কিশোর ওর হাতে ফ্রেস লাইম সোডার ট্রেটা ধরিয়ে বলে-যা দিয়ে আয়। তোর মেয়ের খুন তো এবার থেকে ফ্রি তে পাবি,ম্যাডাম বন্দোবস্ত করছে,যা বারান্দায় গিয়ে দ্যাখ আর একজন এসেছে এন জিও ওয়ালি–’

নিঃশব্দে বাইরের বারান্দায় এসে সে দেখে,মেমসাহেবের সঙ্গে আর ও একজন। মেমসাহেব এখনও গল্ফের জুতোতেই। খুব নিবিষ্ট হয়ে আলোচনা চলছে। তার মেয়েটিকে নিয়েই। দুবার বেচারি শব্দ কানে এলো তার। মুহূর্তে আগুন জ্বলে গেল মাথায়। ওঃ!তার দুঃখে দুনিয়ার লোকের যেন দুখ। এতো রাগ হলো রম্ভার, পিছন ফিরে নিঃশব্দে গেলাস দুটির মধ্যে একদলা করে থুথু মিশিয়ে দিল সে–লে,শালী,লে মেরী বিমারী,ঝেল অব্—বেচারী!!

এ সব কথা কেউ শুনলো না। দেওয়াল ছাড়া কেউ কিছু দেখলো না।

এন জিও ওয়ালি বল্ল -তোর মেয়ের প্রতি মাসের ব্লাড,এবার থেকে ফ্রি। কেমন।

রম্ভা পাথরের মতো তাকিয়ে রইলো দেখে তার উৎসাহে ভাটা পড়লো।

মেমসাহেব বল্লো-কিছু মনে করো না। শি ইজ লাইক দ্যাট ওনলি। এক্সপ্রেশন লেস। নাইভ।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..