সিলেট গীতিকা ছইফা সুন্দরী: রূপ ও উপমার এক অনন্য গাথা

শ্যামল কান্তি ধর
প্রবন্ধ
Bengali
সিলেট গীতিকা ছইফা সুন্দরী: রূপ ও উপমার এক অনন্য গাথা

“দুই ভুরুর নমুনা যেমন ধনুকের বারা
পরাণ লইয়া কাড়াকাড়ি যে বায় পালায় তেরা।
এমন সুন্দর চউখদি কন্যা যারবা পানে চায়
দেহার যেগাত দেহা থইয়া পরাণ লইয়া যায়।”

বাঁকা ধনুকের মত ভ্রুযুগলযুক্ত কন্যার চোখের দৃষ্টির তীর যেদিকে পড়ে,সেদিকেই প্রাণ নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। এমন সুন্দর চোখে কন্যা যার দিকে তাকায়, তার দেহের স্থানে দেহ রেখে প্রাণ নিয়ে চলে যায়। তরুন জমিদার সুলতান জামালেরও সেই দশা হল। ছইফা সুন্দরীর চোখের তারায় তার প্রাণ স্বেচ্ছাবন্দি হল। ছইফার রূপের আলোকচ্ছটায় তিনি যেন কয়েক প্রহরের জন্য অন্ধ ও কালা হয়ে গেলেন। এ যেন ছইফার রূপ ও সুলতান জামালের মুগ্ধতার বজ্রপাত। প্রহর কেটে যায়,সময় বয়ে যায় কিন্তু সুলতান জামাল স্থির দাঁড়িয়ে থাকেন। তিনি কারো কথা শোনতে পাননা, কাউকে দেখতে পাননা। ভোরের লাল আলোয় দিঘির ঘাটে তিনি আজ এ কী রূপ দেখলেন।

“পূব দিকে সুরুয উঠে অইয়া লালে লাল
দীঘির ঘাটে আর সুরুয দেখে সুলতান জামাল”

বলছিলাম সিলেট গীতিকা ছইফা সুন্দরীর কথা। মূল কাহিনীতে প্রবেশ করার আগে সিলেট গীতিকা সম্পর্কে স্বল্পপরিসরে কিছু কথা বলে নেয়া আবশ্যক।

মধ্যযুগের সাহিত্যর এক অন্যতম উপাদান লোকসাহিত্য। এই লোকসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে জানা অজানা নিরক্ষর রচয়িতাদের রচিত অনেক মৌখিক কাহিনী।পদ্য ছন্দে রচিত এইসব কাহিনি ও গীতিকায় যেমন বিধৃত হয়েছে প্রেম ও ব্যার্থতার উপখ্যান,তেমনি উঠে এসেছে পারিবারিক দ্বন্ধ রাজনীতি ও সামাজিক বৈষম্যের কথাও। গীতিকার প্রসঙ্গ উঠলেই, বহুল প্রচারিত ও জনপ্রিয় “ময়মনসিংহ গীতিকার” কথাই মনে আসে। কিন্তু বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গীতিকাগুলো রয়ে গেছে আলোচনার বাইরে।সিলেট গীতিকার ক্ষেত্রেও তেমনি ঘটেছে।এমনকি গবেষকদের তথ্য ও উপাত্ত অনুসারে ময়মনসিংহ গীতিকায় স্থান পাওয়া কয়েকটি গীতিকা সিলেট অঞ্চল থেকে সংগৃহীত বলে জানা যায়। গীতিকাগুলো বিভিন্ন গবেষণার উপকরণ হিসাবেই শুধু ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু জনমানুষের কাছে এখনো সেভাবে পৌঁছেনি। লোকসাহিত্যের গবেষক মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর হিসেব অনুসারে ১২০ টি সিলেট গীতিকার কথা জানা যায়। তার কিছু পুস্তকাকারে প্রকাশিত হলেও তা আজ দুস্প্রাপ্য।বইয়ের মলাটের ধূলিমলিন পৃষ্ঠায় বন্দি হয়ে আছে ছইফা সুন্দরী,আলিফজান সুন্দরী, মঞ্জিলা সুন্দরী সহ আরো কত চরিত্র। আমরা শুনতে পাইনা তিলাই রাজা, চান্দ রাজা, কাল দুলাই, রংগমালার কথা। পালাগানে আর গীত হয়না মানিবিবি,চুরতজান বিবি,সোনামতি কন্যার পালা সহ আরো কত গীতিকা।

ময়মনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে যখন শ্রী দীনেশচন্দ্র সেনের কাছে গীতিকাসমূহ হস্তান্তর করছিলেন তখন তার সমকালেই সিলেটের মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন নামের একজন প্রতিথযষা লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও গবেষক গ্রাম গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়ে সংগ্রহ করছিলেন সিলেট গীতিকা।সিলেট গীতিকা সংগ্রহের ব্যাপারে আশরাফ হোসেনের কাছে আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন চিঠিও লিখেছিলেন । এরপর সিলেট গীতিকা সংগ্রহে যিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি চৌধুরী গোলাম আকবর। চৌধুরী গোলাম আকবর ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, তার পাশাপাশি তিনি দিনের পর দিন চষে বেড়িয়েছেন গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, লোকসাহিত্যের বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহে। তিনি বাংলা একাডেমির নিয়মিত সংগ্রাহক হিসাবে নিয়োজিত হন। তার সংগৃহীত গীতিকা থেকে দশটি গীতিকা নিয়ে ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমি থেকে বদিউজ্জামানের সম্পাদনায় সিলেট গীতিকার প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয় কিন্ত আজ পর্যন্ত পরবর্তী খন্ড প্রকাশিত হয়নি। মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন ও চৌধুরী গোলাম আকবরের সংগৃহীত গীতিকাগুলো প্রকাশে ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল সিলেটের প্রাচীন পত্রিকা“আল ইসলাহ”।তবে সিলেট গীতিকা সংগ্রহে অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি সংগ্রাহকদের মধ্যে ছিলেন পথিকৃৎ। তিনি পঞ্চদশ কিংবা ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত রাজা গৌড় গোবিন্দ বিষয়ক লোকগীতিকা “ পাগল ঠাকুরের ছড়া” সংগ্রহ করেন।

আমাদের আলোচ্য গীতিকা “ছইফা সুন্দরী” বাংলা একাডেমির “লোক সাহিত্য পত্রিকা ২য় খন্ডে ১৩৭০ বঙ্গাব্দে “ ছইফা সুন্দরীর পালাগান” নামে প্রকাশিত হয়। চৌধুরী গোলাম আকবর আল ইসলাহ পত্রিকার বৈশাখ শ্রাবন সংখ্যায় (১৩৭৫ বঙ্গাব্দ) “সিলেট গীতিকা – ছইফা সুন্দরী” নামে একটি প্রবন্ধও লিখেন। চৌধুরী গোলাম আকবর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রসুলপুর নিবাসী ওহাবউল্লাহর কাছ থেকে গীতিকাটি সংগ্রহ করেন। উল্লেখ্য, চৌধুরী গোলাম আকবরের বাড়ীও কমলগঞ্জ উপজেলায়। গীতিকাটির রচয়িতার নাম জানা যায়নি। গবেষকদের মতে এর রচনাকাল সপ্তদশ অষ্টাদশ শতাব্দী বলে অনুমান করা হয়।

 

দুই

গীতিকাগুলো সাধারণত বন্দনা দিয়ে শুরু হয়। ছইফা সুন্দরীর কাহিনি শুরুর আগেও রয়েছে একটি দীর্ঘ বন্দনা। স্রষ্টাকে স্মরণ করে শুরু এই বন্দনা মাতৃবন্দনায় শেষ হয়েছে। বন্দনা শেষ হয়েছে এভাবে-

“মায়ের পিস্তান বন্দি তুল নাহি যার
খেদায়ী নিয়ামত ভাই অক্ষয় ভান্ডার।
তন বান্দা যার খাতির না যায় সুজা ঋণ
মায়ের পদে ভক্তি রাখো রাইত কিবা দিন।
এই মতে বন্দনা করি মন কইলাম থির
অখোন কহিমু কথা ছইফা সুন্দরীর”

ছইফা সুন্দরী গীতিকায় ব্যবহৃত ভাষা লোকমানুষের মুখের নিত্যদিনের ভাষা যা হুবহুভাবে পুস্তকে লিপিবদ্ধ হয়েছে। রচয়িতা সহজ সরলভাবে ছইফার রূপ ও উপমার যে বর্ণনা করেছেন তা চিত্রকল্প, দৃশ্যের ডিটেলে আরো অনবদ্য হয়েছে।গ্রামের একজন নিরক্ষর কবির দেখার চোখ যে কত শৈল্পিক, তা ছইফা সুন্দরীর কাহিনি বর্ণনার প্রতিটি পংক্তিতে উঠে এসেছে।

জমিদার সুলতান জামালের বাড়ি গ্রামের মধ্যে একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। বাড়ির চারিদিকে সুপারী, নারিকেল গাছ সারিসারি। সাথে আছে আরো কত নানা জাতের গাছ। মূল বাড়ির সামনে বাংলো বাড়ি। বাংলো বাড়ির সামনের বাগানে নানা বর্ণের ফুলের সমারোহ, ভ্রমর যেখানে নিত্য খেলা করে।

“ফুলের বাগানে আসে ভোমরা বুলবুল
বেস্তের বাগান যেন সমস্ত বিলকুল”

বাড়ির সামনে বিশাল বড় দিঘি। এই দিঘির বর্ণনায় অনন্য এক চিত্রকল্প ফুটে উঠেছে।

শেওলা শালুক ফুল ফুটিয়াছে তায়
পানির তলে জাতে জাতে মাছেরা খেলায়
তলুয়া ভাউরি কতো মাছ জাতে জাত
সুন্দর সুন্দর গাছ পানির কাঞ্চাত।
গাছের কতক ডাল পানির উপর আইছে
মাছু রাখাল ডালে বইয়া খাপ যে ধরিছে।
ঢেউ নাচে তালে তালে, নীচে নাচে মাছ
গাছের ছায়া এর নীচে পানিত নাচিছে।

দিঘির স্বচ্ছ পানিতে ফুটে আছে শাপলা শালুক।পানি এতই স্বচ্ছ যে উপরের ও নিচের মাছেদের খেলা স্পষ্ট দেখা যায়। চারিদিকে সুন্দর সুন্দর সব গাছ। এসব গাছের কিছু ডাল পানির ঠিক উপরে এসে পড়েছে। মাছরাঙা মাছ শিকারের আশায় বসে আছে সেই ডালে। কি অপুর্ব ডিটেল। কত সুক্ষ্ম দৃষ্টিসম্পন্ন ও কাব্যভাবনা থাকলে দিঘির স্বচ্ছ পানির উপর ডাল এবং তাতে একটি মাছরাঙার বসে থাকার কথা কল্পনা করা যায়। পানির নিচে গাছের ছায়াও যেন ঢেউয়ের তালে নাছে, সাথে নাচে মাছেরা। কী অপূর্ব চিত্রকল্প, বোধের কত গভীর থেকে উঠে আসে এই ভাবনার প্রকাশ। এইসব গীতিকাকে যারা চাষার ভাষা বলে তাচ্ছিল্য করেন তাদের জন্য এই বর্ণনাটুকুই এক মোক্ষম জবাব।

এই দিঘির পারে তরুন জমিদার সকাল বিকাল হেঁটে বেড়ান। দিঘির শান বাধানো ঘাটে গ্রামবাসীদের জটলা লেগেই থাকে। তিনি তাতে বাধা দেননা। আপনমনে মৃদুমন্দ বাতাসে ঘুরে বেড়ান। তিনি জানেন-

দিঘি পুকুইর হকল মানষর কাটাইবার সাধ্যি নাই
বাধা দিলে মরব মানু, পানির নাম পরমাই

সুলতান জামাল বিয়েথা করেননি। পিতৃহীন সুলতান জামাল পরম মাতৃভক্ত। সুলতান জামালের বিয়ে নিয়ে তার মায়ের চিন্তার অন্ত নেই। চারিদিকে পয়গাম পাঠান কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়না। সুলতান জামালের এ নিয়ে অবশ্য কোন চিন্তা নেই। বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায়, মজলিশে তার দিন আনন্দেই কাটে। সুলতান জামালের মাতা প্রবীন নায়েবকে নিয়ে জমিদারি বেশ ভালোভাবেই সামলে নিচ্ছেন। কিন্তু

“আল্লার পাক কুমারর চাক, বুঝোন না যায়
লাগাইয়া মক্কর বান্দা বইয়া রংগো চায়।
সুলতান জামাল মিয়ার যত তারিফ আছিলো
এক এছকায় সব গুড় বালি অইয়া গেলো।”

সুলতান জামালের অনেক সুনাম কিন্তু অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে তার সব সুনাম হারিয়ে গেল। পুরো ঘটনা জানতে চলুন ঘুরে আসি সুলতান জামালের দিঘির পার থেকে।প্রতিদিনের মতই সেদিন ভোরবেলা সুলতান জামাল মৃদুমন্দ ঠান্ডা বাতাসে দিঘির পারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। পূবাকাশে ভোরের লাল সূর্য উঁকি দিয়েছে মাত্র। তখন সুলতান জামাল দিঘির ঘাটে যেন আরেক সূর্যোদয় দেখলেন। ভোরের লাল আলোর আভায় তিনি দেখলেন এক মোহনীয় রূপ। সুলতান জামাল অনেক বই পুস্তক পড়েছেন। কিন্ত এমন রূপের বর্ণনা তিনি কোথাও পাননি।

“শরীলের বর্ণ যেমন বিয়ানিয়া আপ্তাব
লালে লাল অইছে যেমন আছমানী ছাব
কিঞ্চিত কহিমু কন্যার রূপের বর্ণনা
গড়িছে মাবুদ আল্লা কেমন নমুনা।
চান্দের সমান মুখ করে ঝলমল
ঠোটের নমুনা যেমন পাকনা মাকাল ফল
দুধ সরোবরের মাঝে কালা দুই আংখি
ধলার মাঝে কালা রূপ করে ঝিকিমিকি।
দুই ভুরুর নমুনা যেমন ধনুকের বারা
পরাণ লইয়া কাড়াকাড়ি যে বায় পালায় তেরা।
এমন সুন্দর চউখদি কন্যা যারবা পানে চায়
দেহার যেগাত দেহা থইয়া পরাণ লইয়া যায়।
বেলাইনের মাঝার মত দুই হাতের পুছা
আষাঢ় মাইয়া বাশের করুল কন্যার পাওর গুছা।
শাওন মাসের মেঘের রং কন্যার ঔ যে চুল
বিয়ানী বাতাসে খায় এধার ওধার দোল।
দোল খাইয়া যেবলা চুল কন্যার মুখো পড়ে
পুন্যিমার চান যেমন আবয়ে আইয়া ঘুরে”

সুলতান জামালের জমিদারির এক প্রজার বউ ছইফা সুন্দরী।শীতের ভোরে সে কলসি নিয়ে দিঘিতে এসেছে। ভোরের আলোর স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে তার চারপাশ থেকে। তার চোখের গভীর কালো মনি যেন দুধের সরোবরে ভেসে আছে।কবি ছইফা সুন্দরীর রূপের বর্ণনার এক জায়গায় ছইফার পায়ের সাথে আষাঢ় মাষের বাঁশের অঙ্কুর অর্থাৎ কোঁড়লের তুলনা করেছেন। বৃষ্টি ভেজা কিংবা ভোরের আলোয় কোঁড়লের রূপ যারা দেখেছেন তারাই বুঝতে পারেন উপমা কতটুকু যথার্থ। হাতের উপমায় বেলাইনের মাঝার তুলনা এক নতুন মাত্রা যোগ করে। আমার মনে হয় পালাগানের দর্শকদের সহজ করে বুঝানোর জন্যই কবি দৈনন্দিন কার্যে ব্যাবহৃত এইসব উপমার ব্যবহার করেছেন। নারীর চোখের সাথে বাঁকা ধনুকের তুলনা, কালো মেঘের সাথে চুলের তুলনা, মুখের সাথে চাঁদের কমনীয়তার তুলনা সাহিত্যে অনেক হলেও হাতের সাথে বেলাইন ও পায়ের সাথে আষাঢ় মাসের কোঁড়লের ব্যবহার একেবারেই মৌলিক। যদিও ময়মনসিংহ গীতিকায়ও এই রকম কিছু বর্নণা পাওয়া গেছে।

এ রূপ নিয়ে কন্যা যখন হেলে দুলে চলে তখন সংসারী মানুষ দূরে থাক, মুনির মন টলে। তাই সুলতান জামালও নিজেকে সংযত রাখতে পারলেননা। তিনি ছইফা সুন্দরীর কাছে গিয়ে প্রেম নিবেদন করলেন।ছইফা সুন্দরী সুলতান জামালের জমিদারির এক সামান্য প্রজার বউ। তাই জমিদারের আকস্মিক এই প্রস্তাবে ছইফা হতবিহ্বল হয়ে গেল। জমিদারের কথার কোন জবাব না দিয়ে ছইফা কলসি কাঙ্কে নিয়ে বাড়ীর পথে রওয়ানা দিল।

“কাংখেতে কলসী লইয়া কন্যা ধীরে যায়
সুলতান জামাল মিয়া মোহ খাইয়া চায়।
ধীর ধীর করিয়া কন্যা বাড়ীত চলি গেলো
সুলতান জামাল সাহেব যিনোরহনো রইলো”

বেলা বয়ে যায়।প্রহর কাটে। সুলতান জামাল নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকেন। কারো কোন কথার জবাব দেননা। অবশেষে অন্দরমহলে সুলতান জামালের মায়ের কাছে খবর পাঠানো হল।খবর শুনে জমিদারমাতার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। তার নির্দেশে লোক পাঠিয়ে সুলতান জামালকে ধরে আনা হল। কিন্ত সুলতান জামাল যেন বোবা হয়ে রইলেন। এদিকে জমিদার মাতার চিন্তা ক্রমশ বাড়ছে। দোয়া দরুদ, কবিরাজের চিকিৎসা চলছে দিনরাত্রি কিন্তু

“অউষধের বেমার নায় অউষধে যাইব কেমনে
দারুণ পিরিতের ছেল বিন্ধিছে পরাণে।
পিরিতিয়ে ধইলো যারে কইলো তারে পাগল দেওয়ানা
দিনযামিনী বিরহিনী পানা বেপানা”

সুলতান জামাল আহার, নিদ্রা ত্যাগ করেছেন। আত্মীয় স্বজন কারো কথায় কোন উত্তর দেননা। তারপর অনেক পীড়াপীড়িতে বৃদ্ধ নায়েবের কাছে তার মনের কথা খুলে বললেন।

“যেদিন দীঘির ঘাটে দেখিয়াছি চান
সেই অবধি ধরে আমার না রইছে পরাণ”

সুলতান জামালের কথা শুনে নায়েব মশাই ভয়ে ভয়ে জমিদার মাতার কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। নায়েবের কাছে একমাত্র সন্তানের এমন অবস্থার কথা শোনে মাথায় চক্কর দিয়ে উঠল।

“দশ নায় পাঁচ নায় একনি দুলাল
চউখের পুতুলা যাদু সুলতান জামাল
রূপে গুণে সবার আলো উষ বুদ্ধি গিয়ানে
আছিয়ালোর খালো ডুবদি বাধিলায় পরাণে।

খানে বাড়ীর পরজার বউ ছাফছফা দেখি
দলা ছামড়ার লাগি পুত অইলা বৈরাগী
আর কিছু না থাকিলো গেলো জাতিকূল
গাও গরাম জুড়ি পড়ছে হুলুছথুল’

অর্থাৎ তার পুত্র বুদ্ধি ও জ্ঞানে আলোকিত ছিল কিন্তু তার প্রজার বউয়ের রূপের ফাঁদে পড়ে পুত্র যেন তার নর্দমার খালে ডুব দিয়ে বৈরাগী হয়ে গেল। জাত কূল আর কিছু বুঝি রইলনা। গ্রাম জুড়ে এ নিয়ে হুলুস্থুল শুরু হয়ে গেছে।

তিন

“ ছইফা ঘরেতে আসি কলসী মাটিত থইয়া
বসিলা মাটির মাঝে লেট্টাত করিয়া”

ছইফা সুন্দরীর রূপে মুগ্ধ হয়ে জমিদার সুলতান জামাল যখন পাগলপারা, তখন ছইফা সুন্দরীর জীবন থেকেও শান্তি পালিয়ে গেল। ছইফা তাই বাড়িতে এসে হাত পা ছড়িয়ে মাটিতে বসে পড়ল। সোনার এই দেহকে তার এখন জঞ্জাল মনে হচ্ছে, তাই মাটি দিয়ে দেহ ঢেকে সে তার রূপ মলিন করতে চাচ্ছে।এইসব দেখে ছইফার স্বামী খুব চিন্তাক্লিষ্ট হলে ছইফা জানায়, চাঁদ ও সূর্যের উপর গ্রহন লেগেছে, সীমের পাতায় ধরেছে “ হিদলিয়া” পোকায়, আমের ভেতরে পড়েছে “লেদা” পোকা, সুপারী গাছের বনে লেগেছে “ কুড়িলিয়া” তোফান, বৈশাখী তোফানে পেয়েছে যেন কলার বাগান। এইসব কথার মর্ম তার স্বামী বুঝতে পারেনা, তাই

“ ছইফার কথার মর্ম সুয়ামী না বুঝিয়া
হাগাঠাশুর লাখান বেটা চায় ভেক ভেকাইয়া।
কিবা কথার কথা কও বুঝিতে না পারি
কারণে তকদির কামনার অইয়া গেল বৈরী। “

তখন ছইফা জানায়,

“ তেতই(তেঁতুল) দেখিলে যেমন পেটুলীর(গর্ভবতীর) ঝরে লালা
গরীবের ছালন যেমন নুনে ঝলে ভালা।
এইমত জমিদার সাহেব চাইয়া রহিলা
ধীরে ভরে কাছাত আইয়া কহিতে লাগিলা।
আমারে দেখিয়া তান পরাণ নহে থির
পরাণে বিন্ধিছে তার আশকের তীর”

ছইফার প্রেমের তীর বিঁধেছে সুলতান জামালের প্রাণে! ছইফার মুখে এসব কথা শুনে শীতের সকালেও তার কপাল ঘামতে লাগল।সে “সায়েব বাড়ি” কাজ করে। সকালে কাজে গিয়ে রাতে ফিরে। সায়েব বাড়ীর সকলেই তার কাজকর্মে সন্তষ্ট। কাজ করে যা বেতন সে পায় তা দিয়ে দুজনের সংসার ভালোভাবেই কেটে যায়। সুখে শান্তিতে তাদের দিন চলে যাচ্ছিল। একদিকে সরকারি চাকুরী, আরেকদিকে ঘরে সুন্দরী বউ, ছইফার স্বামীর এজন্য কিছুটা গর্বও ছিল। কবির ভাষায়

“ হেবায় সরকারী নকরী ঘরো বউ সুন্দর
ভিতর ছিল মিয়ার কুমড়া বরাবর।

কিন্ত তাদের সুখের দিন বুঝি শেষ হয়ে এলো। যাদের ছত্রছায়ায় তারা আছে, তাদের কাছে বৈরী হয়ে এ রাজত্বে বাস করা অসম্ভব। এদিকে ছইফা পড়ল উভয়সংকটে।তার যৌবন তার পরাণের বৈরী। সে ভাবে,

“জমিদার না পাইলে মোরে পিরিতের দায় মরে
সুয়ামী আরাইলে মোরে মরিবো তিস্কারে।
পানিত কুমইর হুকনাত বাঘ উপায় কি করি
দারূন যৈবন অইলো পরাণের বৈরী”

ছইফার স্বামীকেও অভিশপ্ত এক নীরবতায় ঘিরে ধরে। ছইফাকে হারানোর ভয়ে সে চিন্তিত হল। মনের ভেতর চিন্তা তার “ চিরার বারা” কুটে। ধনের লোভে যদি ছইফাকে পায় তবে সে ছইফাকে কি দিয়ে আটকাবে? ছইফার স্বামীর মনের এই অবস্থাকে বুঝানোর জন্য কবি খুবই কাব্যগুন সমৃদ্ধ রূপকের ব্যবহার করেছেন-

“ ছইফা চলিয়া গেলে জীবন অসার
কয়ফলের গাছ যেমন বুকুতে নাই সার”

কী অপুর্ব রূপকের ব্যবহার! পেঁপে গাছের ভেতর ফাঁপা থাকে। তাই পেঁপে গাছের ডাল কেটে বেদনার বাঁশীও বাজানো যায়। ছইফাকে হারানোর ভয়ে স্বামীর বুকের শুন্যতাকে বুঝানোর জন্য কবি কত সহজভাবে পেঁপে গাছ দিয়ে কাব্যিক রূপকের ব্যবহার করেছেন। ঘটনার আকস্মিকতার হতবিহ্বলতা কাটিয়ে এবার ছইফা একটু স্থির হল। সকালের লাল সূর্য আবার পশ্চিমাকাশ রাঙিয়ে অস্ত যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন ছইফা তার স্বামীকে ভাত খেতে দিল, নিজেও খেল। তারপর পান খেতে খেতে ছইফা তার স্বামীকে জানায়, একটু পরে সূর্য ডুববে। সারা দিনও সায়েব বাড়ী থেকে কেউ যখন তাদের খোঁজ নিতে আসেনি, তখন রাতে তারা আসতে পারে। তাই রাতের অন্ধকারে তাদের এ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হবে। এ কথা শুনে ছইফার স্বামীর ভেতর খুশির তোফান বয়ে গেল। নিজের জন্মস্থান ছেড়ে চলে যাবার দুঃখ তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল এই জন্য যে ছইফা তাকে ছেড়ে যাচ্ছেনা। তাদের ভালোবাসার কাছে জমিদারের ধন সম্পত্তি পরাজিত হয়েছে। রাতারাতি তারা আরেক দেশে গিয়ে পৌঁছল।

জমিদারোর বেশাতোর ভায় ছইফা না চাইছে
যেমন আছিলো আগো এবো অমন রইছে।
ছইফার কথা কানাইন পছন লাগিলো
এদেশ ছাড়িয়া যাইতে পরামিশ ঠিক কইলো

তবুও তাদের চিন্তা দুর হলোনা। অবশেষে ছইফা তার স্বামীকে বলে

“দরিয়া না বান্ধা যায় দিয়া বালির আইল
আগুইন না ঘুরা যায় দিয়া ছালির টাইল।
আমার রূপ যৈবন আইছে আমার লগে অইয়া
তোমার আমার বিপদ আইছে পাওয়ো বেরা খাইয়া।
এর লাগি কই আমি হুনো দিয়া মন
বস্তি ছাড়ি চলি যাও যেবায় দেখো বন”

বালির বাঁধ দিয়ে দরিয়ার পানি আটকানো যায়না, ছাই ছাপা দিয়ে আগুন ঢেকে রাখা যায়না ঠিক সেভাবে ছইফার রূপও ঢেকে রাখা যাচ্ছেনা। তাই এই রূপের কারনে সে বেশীদিন নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারবেনা। অবশেষে ছইফার পরামর্শে তারা লোকালয় ছেড়ে বনে বসবাস করার সিদ্ধান্ত নিল। ভালোবাসার জন্য দুজন বনবাসে গেল।এখানে ছইফার রূপের পাশাপাশি তার বুদ্ধিমত্তা, বিচার বিবেচনার পরিচয় পাওয়া যায়। ছইফার স্বামী যখন চিন্তায় অস্থির হয়ে শুধুই দিশেহারা, তখন ছইফা রান্না করে তার স্বামীকে খেতে দিচ্ছে এবং আয়েশ করে পানের খিলি মানিয়ে দিয়ে সে নিজে খাচ্ছে তার স্বামীকেও দিচ্ছে। সে বুঝতে পারে জমিদার বাড়ির লোকজন তাদের খোঁজে আসবেই তাই সেই তার স্বামীকে বিভিন্ন পরামর্শ দেয়, স্বান্তনা দেয়। সে জমিদার সুলতান জামালকে দোষারোপ না করে তার নিজের রূপকেই প্রাণের বৈরী ভাবে। সুলতান জামাল সম্পর্কে তার মূল্যায়ন এই ভাবে

“কত আমলদার (সচ্চরিত্র) মানু সুলতান জামাল
কি কারণে অইলো তার এমন বদকিয়াল”

এমনকি তার স্বামীকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েও সে নিজেকে নিরাপদ ভাবেনা। তাই বনে যাবার পরামর্শ সেই দিচ্ছে। যেখানে তার স্বামী নীরব হয়ে শুধু হাহাকার করেই যায়, সেখানে ছইফাই সব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। পরবর্তীত যখন জমিদার বাড়ির লোকজনকে ছইফাকে তোলে নিয়ে যেতে তাদের বাড়ীতে আসে তখন ছইফার বিচক্ষনতারই পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল । সে তার স্বামীকে স্বান্তনা দেয়

“খাদা (পেট) অইলে খোশ খুশী অইন খোদা
ওই কথা নাল্লে(সর্বদা) কইতা আমার বাপ দাদা।
খোদা যদি খোশ অইন বিপদ কাটিবো
খোদায় জুয়াইয়া দিলে মুক্তি বারৈব।”

 

চার

ছইফাতো বনবাসে স্বামীর সাথে সুখে শান্তিতে আবার তাদের ভালোবাসার সুদিনে ফিরেছে। কিন্ত এদিকে সুলতান জামালের চরম দুর্দিন। তার মন থেকে ছইফা সুন্দরীকে মুছে ফেলা যাচ্ছেনা। পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন সবাই সুলতান জামালকে বুঝান

“খানে বাড়ীর পরজার বউ অউকনা সুন্দরী
তাহার পিরিতে পড়া সরমর কথা ভারী।
তার বাদে কুলেশীলে তুমি মহামতি
তোমারনি সাজে কভু ছোটর পিরিতি’

অউকনা পরীর ছুরত কিবা আইসে যায়
ছোটর পিরিতে মজা শোভা নাহি পায়।
ছোট লোকের ছোট মন ছোট তার দিল
অউকনা পরীর ছুরত করউক ঝিলমিল”

কিন্তু কিছুতেই সুলতান জামালের মন ফেরানো যায়না।

“কেউরুর বুঝ নাই মাইনন সুলতান জামাল
পিরিতির আগুনেই জ্বলি অইলা বেসামাল “

অবশেষে প্রহরী পাঠানো হয় ছইফার বাড়ীতে। সাথে তার স্বামীকে দেয়ার জন্য পাঁচশত টাকার কড়ি দেয়া হয়।এখানে সামজিক বৈষম্যের ও শ্রেনীদ্বন্দ্বের কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। সুলতান জামালের মন ফেরাতে গিয়ে পাড়া প্রতিবেশীরা খুব সহজেই ছইফাকে ছোটলোক বলছেন, এও বলছেন যে ছোটলোকের মন ছোটই হয়। তাই ছইফার প্রেমে পড়া খুব লজ্জার বিষয়। এমনকি “পাইক অধুয়া”র কাছে পাঁচশত টাকার কড়ি দিয়ে এটাও বুঝানো হচ্ছে যে এই টাকার বিনিময়ে খুব সহজেই ছইফাকে তার স্বামী ছেড়ে দেবে। তৎকালীন জমিদার শ্রেনীর লোকজনদের তাদের প্রজাদের সম্পর্কে একধরনের নীচু ধারনার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। আরো কয়েকটি পংক্তিতে কবি সামাজিক বৈষম্যের পরিচয় তুলে ধরেছেন –

সমান অয় কি কখন তিলে আর তালে
একদাম অয়নি কখন মাকালে আর লালে
তোমার আবেস্থা দেখি লাজে ঘিন্নায় মরি
একদরে কিয়ানো বিকায় আমন আর কাতারী

“পাইক অধুয়া” (হুকুমে চলার প্রজা)কে তো পাঠানো হল কিন্তু ছইফা কোথায়? খালি বাড়ি খালি ঘর, ছইফা নেই কোথাও! ছইফাকে না পেয়ে সবার প্রাণ কেঁপে উঠে। ছইফাকে না নিয়ে গেলে সুলতান জামালকে বুঝি আর বাঁচানো যাবেনা। কি জবাব দেবে তারা জমিদার মাতার কাছে। অবশেষে “পাইক অধুয়া” মন শক্ত করে জমিদার মাতার কাছে ফিরে গিয়ে সকল ঘটনা খুলে বলে। সকল কথা শুনে জমিদার মাতা হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। ছইফার পালানোর খবর শুনে তার প্রাণের যাদু বিবাগী হয়ে যাবে। তিনি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানান

“কি করো গো তক্তের আল্লা আরশে বসিয়া
কোন সুখ পারায় তুমি রাঢ়ীরে ছাতাইয়া”

যেই ঘড়ি শুনিবে যাদু ছইফা গেছে ভাগি
অমনি গুরুজ দিয়া মাথাত মারবো বাড়ি”

অদ্ভুত এক নীরবতায় ঘিরে ধরে পুরো জমিদার বাড়ি। সুলতান জামাল যখন দেখতে পেলেন ছইফাকে আনার জন্য পাঠানো পালকি শুন্য এসছে। বেহারা সব ফেরত এসেছে, তার কাছে মনে হল তার সাথে ছলনা করা হয়েছে, এ তার মায়ের এক কৌশল। তাই তিনি মায়ের কাছে গিয়ে বলেন

“মাফ করো মাইজিগো তোমার দুধের ধার
ছইফা বিহনে আমার দুনিয়া আন্ধিয়ার
থাকো থাকো মাইজিগো মান সম্মান লইয়া
তোমার যাদু বাহির হইলা ছইফার লাগিয়া”

ছইফার জন্য আর্তনাদ করে তিনি বলেন, পাহাড়ে জঙ্গলে তাকে পাতি পাতি করে খুঁজব, সমুদ্র সেচে তাকে খুঁজব, তাও যদি খুঁজে না পাই ছইফাকে খুঁজব নদী নালার বাঁকে,আগুন নিভিয়ে দেখব আগুনের ভেতর। তাকে খুঁজব গাছপাথর ভেঙ্গে, গাছের কাণ্ড চিরে। তাও যদি পাওয়া না যায় অজগর সাপের মুখের ভেতর প্রবেশ করব, সিংহের গর্তে যাব। পাহাড়, জঙ্গল, সাগর খুঁজে তাকে না পেলে খুঁজব সকালের সূর্যে, রাতের তারায়।

“চান্দের ভিতর চাইমু রাইত নিশা ভাটি
তেরায় তেরায় চাইমু করি আটাউটি।
তাতে না পাইলে চাইমু জমিন খুড়িয়া
এর মাঝে না পাইলে চাইমু আছমান ভাংগিয়া।
তাতে না পাইলে যাইমু কারীগরের বাড়ী
যে বানাইল ছইফারে এমন সুন্দর করি”

এইসব কথা বলে সুলতান জামাল ছইফার সন্ধানে বের হয়ে গেলেন। সুলতান জামালের মা নীরবে চেয়ে রইলেন তার ছেলের প্রস্থানের দিকে।

“মনে মনে কইলা বাচাও মালিক আল্লা সাই
ছিরজন করিছ তুমি তোমার ইচ্ছায় লয়।
চালাও তেমন করি যেমন মনে লয়।
আনিলে আনিয়া দিও নিলক্ষীর ধন
না অইলে তোমার মাল তোমায় সমর্পণ“

আদরের মানিক সুলতান জামালকে তার মাতা স্রষ্টার কাছে সমর্পণ করেন। এখানেই শেষ হয় ছইফা সুন্দরীর কাহিনি। কাহিনিটি মিলনাত্মক না হওয়ায়, পালাগানের আসর থেকে দর্শক শ্রোতাদের হয়তো বেদনার হাহাকার নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।কিন্তু এই কাহিনি এখানে সমাপ্ত হওয়াই যেন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। সুলতান জামালের আর্তনাদ থামাতে গেলে ছইফাকে তার স্বামীকে ছাড়তে হয়। এদিকে ছইফার প্রতি তার স্বামীর ভালোবাসার তীব্রতার কারনে দর্শক/ পাঠক মনে হাহাকার আরো তীব্র হয়ে উঠার সম্ভাবনা। কিংবা কবিকে হয়তো কাহিনিকে আরো ট্রাজেডির দিকে নিয়ে যেতে হত।তাই গীতিকাটি এখানে সমাপ্ত হয়ে যাওয়াই যেন বাঞ্চনীয় ছিল। কিন্তু আল ইসলাহ পত্রিকায় ছইফা সুন্দরীকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ শেষে চৌধুরী গোলাম আকবরের একটি মন্তব্য আরেকেটি প্রশ্নের সুত্রপাত ঘটায়। লেখার শেষে চৌধুরী গোলাম আকবর জানাচ্ছেন “পরবর্তী অধ্যায় কাহিনীতে অপ্রকাশ“। তাহলে কি গীতিকার পরবর্তী কোন অধ্যায় থাকার সম্ভাবনা আছে? যেখানে সুলতান জামাল খুঁজে পেয়েছিলেন ছইফা সুন্দরীকে! কি হয়েছিল তখন,যখন তারা তিনজন মুখোমুখি।হয়তো মৌখিকভাবে গীত হবার কারনে কাহিনির পরবর্তী অধ্যায় একসময় হারিয়ে গেছে। দু তিনশ বছরের পুরনো কাহিনির এ বিচ্যুতি স্বাভাবিক। যাইহোক, প্রকাশিত গীতিকাকেই সম্পূর্ণ কাহিনি ধরে নিয়েই আমাদের আপাতত সন্তোষ্ট থাকতে হবে।

ছইফা সুন্দরীর মত আরো অনেক সিলেট গীতিকা প্রচারের অভাবে,যথাযথ পৃষ্টপোষকতার অভাবে জনমানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছেনা। গীতিকাগুলো যেন শুধুই গবেষণার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। নগরের কোন মঞ্চ দূরে থাকুক, গ্রামের পালাগানের আসর থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে গীতিকাগুলো।জাতীয় স্বার্থে সাহিত্য ও সংস্কৃতিমোদীদের এ ব্যাপারে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে গীতিকাগুলোকে যথাযথ ভাবে উপস্থাপিত না করতে পারলে একদিন তা সময়ের বুক থেকে হারিয়ে যাবে।আর গীতিকাগুলোর কাব্যগুন বুঝতে হলে,প্রকৃত রসাস্বাদন করতে হলে তা পদ্যছন্দে পাঠ করা আবশ্যক।

 

তথ্যসুত্র:
১) সিলেট গীতিকা -ছইফা সুন্দরী, চৌধুরী গোলাম আকবর, আল ইসলাহ, ৩৭শ বর্ষ, সংখ্যা বৈশাখ- শ্রাবণ, ১৩৭৫ বাংলা।
২) লোক সাহিত্যে (দ্বিতীয় খণ্ড);বাংলা একাডেমি, ১৯৬৩, ঢাকা
৩) সিলেট গীতিকা (প্রথম খণ্ড), বাংলা একাডেমী, ডিসেম্বর ১৯৬৮।
৪) ফোকলোর চর্চায় সিলেট, নন্দলাল শর্মা, বাংলা একাডেমী, আগস্ট ১৯৯৯।
৫) লোক সাহিত্যে জালালাবাদ (প্রথম খণ্ড), মুহম্মদ আসাদ্দর আলী,তাইয়্যীবা প্রকাশনী, সিলেট, এপ্রিল ১৯৯৫।
৬)ময়মনসিংহ গীতিকা বনাম সিলেট গীতিকা, মুহম্মদ আসাদ্দর আলী, জালালাবাদ লোক সাহিত্যে পরিষদ, সিলেট, অক্টোবর ১৯৯৭।
৭) সিলেট গীতিকা :সমাজ ও সংস্কৃতি, ডঃ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, উৎস প্রকাশনী,ফেব্রুয়ারি ২০০৫।
৮) সতী ও স্বতন্তরা, বাংলা লোকসাহিত্যে নারী ( তৃতীয় খণ্ড), সম্পাদনা: শাহীন আখতার, দিব্য প্রকাশ ও ওয়াটার লিলি, সেপ্টেম্বর ২০০৭।

শ্যামল কান্তি ধর। লেখক ও ব্যাংকার। জন্ম ও বাস বাংলাদেশের সিলেট।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ