সূর্যরশ্মি ক্যানসার প্রতিরোধ করে

জুঁই ইয়াসমিন
প্রবন্ধ, বিজ্ঞান
Bengali
সূর্যরশ্মি ক্যানসার প্রতিরোধ করে

শিরোনাম পড়ে আমাকে নিশ্চয় পাগল ঠাউরে বসে আছেন। দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ যেখানে বলছে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকের ক্যানসার সৃষ্টির মূল হোতা, সেখানে এই ভদ্রমহিলা কিনা সেই ডিসপিকেবল ভিলেইন সূর্যের গুণগান গাইছে। আসলে শুধু আমি না, আমার সামনে আছেন অগণিত মহারথী গবেষক ও তাদের কাজ। যেই কাজগুলো প্রমাণ করে যে, সূর্যালোকের সংস্পর্শে কম আসার কারণে পৃথিবীব্যাপী ৩.৩ বিলিয়ন  The disability-adjusted life year (DALY)  বছর রোগের বোঝা বইতে হয়। এখানে, এক (DALY) -এর অর্থ এক বছর সুস্থ জীবনযাপন করা থেকে বঞ্চিত হওয়া। তবে এইসব লোকেদের কাজ সাধারণ জনগণ পর্যন্ত পৌঁছায় না, কারণ এরা ওষুধের সওদাগর না। এবার দেখা যাক কীভাবে সূর্যরশ্মি ক্যানসার প্রতিরোধ করে।

সূর্যালোক আমাদের শরীরে ভিটামিন-ডি উৎপাদনে সহায়তা করে। ভিটামিন-ডি’কে প্রায়ই সূর্যালোক ভিটামিন বলা হয়, কেননা এটি ত্বকের নিচে বিদ্যমান কলেস্টেরলের সাথে সূর্যরশ্মির বিক্রিয়ায় উৎপন্ন হয়। এই ভিটামিন অন্ততপক্ষে কোষের ১০০০টি গুরুত্বপূর্ণ জিনকে নিয়ন্ত্রণ করে, যাদের মধ্যে ক্যালসিয়াম বিপাক, নিউরোমাসকুলার ও শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কাজ করে এমন জিনও রয়েছে। ভিটামিন-ডি শুধু একটি ভিটামিন-ই নয়, এটি একটি হরমোনও। হরমোন সাধারণত ডিএনএ অণুর সাথে মিথস্ক্রিয়া করতে সক্ষম, যার মানে হলো এটি ডিএনএ অণুর বিশেষ অংশকে বা জিনকে অ্যাকটিভ বা ডিঅ্যাকটিভ করতে পারে। আর তাই ভিটামিন-ডি’র রয়েছে সুদূরপ্রসারী সব কার্যক্রম। ইউনিভার্সিটি অব মিয়ামি মেডিক্যাল স্কুলের গবেষকরা ব্রেস্ট ক্যানসারের হরমোনের থেরাপিতে তাই ভিটামিন-ডি ব্যবহার করছেন।

রক্ত প্লাজমাতে যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন-ডি বর্তমান থাকলে তা ক্যানসার প্রতিরোধ করে। আমাদের চারপাশের প্রতিকূল ভৌত পরিবেশ, পুষ্টি উপাদানের স্বল্পতা, স্ট্রেস এমনকি আমাদের নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা প্রভৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কিছু ভালো জিন কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং কিছু খারাপ জিন কাজ শুরু করে দেয় আর এর ফলেই বিভিন্ন ক্রনিক রোগের সূত্রপাত হয়। গবেষণা বলে যে, বেশির ভাগ ব্রেস্ট ক্যানসার এভাবে সৃষ্টি হয়। তবে গবেষকরা ৬৫ প্রকার প্রাকৃতিক বায়োঅ্যাক্টিভ উপাদান চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো পুনরায় ভালো জিনগুলোকে সুইচড অন এবং খারাপ জিনগুলোকে সুইচড অফ করে দেয়। আর ভিটামিন-ডি হচ্ছে এসব উপাদানের মধ্যে অগ্রগণ্য। ভিটামিন-ডি জানা প্রায় সব উপায়ে একটি ক্যানসার কোষকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কাজ করে। কিছু গবেষণাতে দেখা যায় যে, ভিটামিন-ডি প্রোস্টেট ক্যানসারকে সারিয়ে তুলতে পারে। কিছু গবেষণা বলে রক্ত প্লাজমাতে যথেষ্ট পরিমাণ ভিটামিন-ডি না থাকার কারণে  ব্লাড ক্যান্সার, প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার এবং লিম্ফোমা (লিম্ফাটিক সিস্টেমের ক্যানসার)-এর ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে যায়।

আবার ভিটামিন-ডি আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। আমাদের ইমিউন সিস্টেম যখন শরীরের ভেতর কোনো অস্বাভাবিক কোষের উপস্থিতি টের পায় তখন একে ধ্বংস করতে একঝাঁক টি-কোষকে পাঠায়। এই টি-কোষগুলো ততক্ষণ কাজ করতে পারে না যতক্ষণ না এরা অ্যাক্টিভেটেড হচ্ছে। আর এদের অ্যাক্টিভেট করতে প্রয়োজন ভিটামিন-ডি। শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেমই পারে প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরে সৃষ্টি হওয়া ক্যানসার কোষকে সারিয়ে তুলতে। ভিটামিন-ডি শরীরে আরো অনেক কাজ করে থাকে। এটি ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে কাজ করে আমাদের হাড়, দাঁত ও মাংসপেশির গঠন ঠিক করে। এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে বাইরে থেকে সরবরাহ পাওয়ার অপেক্ষা না করে শরীর নিজেই তা তৈরি করে। তবে এতে তার প্রয়োজন হয় সূর্যরশ্মি।

দেখা যায় যে, পৃথিবীর যে প্রান্তের মানুষ সূর্যালোকে বেশি সময় কাটায় তাদের ক্যানসার কম হয়। আর সম্প্রতি কিছু গবেষণা বলছে, শুধু ভিটামিন-ডি এতে ভ‚মিকা রাখে না, বরং সূর্যরশ্মি দেহের ভেতরে আরো কিছু সুরক্ষা প্রদানকারী সিস্টেমকে জাগ্রত করে, যা শরীরকে রোগমুক্ত রাখে। গবেষণায় দেখা যায়, গ্রীষ্ম অপেক্ষা শীত মৌসুমে অসুস্থ হওয়া বা মৃত্যুর হার বেশি এবং যারা সানবাথ অবকাশে যান, তারা অন্যদের তুলনায় বেশি সুস্থ থাকেন। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, দেখা যায় যে স্মোকাররা প্রচুর সূর্যের আলোতে যান তাদের মৃত্যুহার যে নন-স্মোকাররা মোটেও সূর্যের আলোতে যান না তাদের থেকে কম। অর্থাৎ সূর্যের আলোতে না যাওয়া স্মোকিং করা অপেক্ষা বেশি ক্ষতিকর। সূর্যরশ্মির কিছু ক্ষতিকর দিক আছে সত্য, তবে তাকে মিনিমাইজ করার সক্ষমতা তাদের শরীরে বিদ্যমান আছে, যাদের পূর্বপুরুষদের সূর্যরশ্মিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

যদিও আমাদের পূর্বপুরুষদের রোদে থাকার ইতিহাস আছে তথাপি সূর্যরশ্মি নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা ভয় কাজ করে যে, এটা ত্বকের ক্যানসার সৃষ্টি করে। আমরা নিরীক্ষীয় অঞ্চলে অবস্থান করেও আমাদের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক ভিটামিন-ডি’র অভাবে ভোগে। আর শহরাঞ্চলে এ চিত্র আরো ভয়াবহ অর্থাৎ ৭৫ ভাগ লোকের এই ভিটামিনের অভাব আছে। এ থেকেই বোঝা যায় যে, আমরা কত কম সূর্যের সংস্পর্শে যাই।

একটা খুব সাধারণ বিষয় হচ্ছে, পৃথিবী সৃষ্টির অনেক আগে থেকেই সূর্য তার জায়গায় ছিল। সূর্য যদি এত ভয়ংকরই হতো তবে তো পৃথিবীতে কোনো প্রাণেরই সঞ্চার ঘটত না বা সৃষ্টিকর্তা পৃথিবীতে কোনো জীব পাঠাতেন না। আসলে বিষয়টা ঠিক উল্টা। সূর্য আছে বলেই পৃথিবীতে প্রাণের সঞ্চার ঘটেছে অর্থাৎ সূর্য প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয়। তবে হ্যাঁ, অতিরিক্ত কোনো কিছুই আমাদের শরীর নিতে পারে না, এমনকি পানিও না। তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের উপকারিতা ও ঝুঁকির মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করে নিতে হবে। অর্থাৎ যে পরিমাণ সূর্যরশ্মি আমাদের ক্ষতি করতে পারে তা এড়িয়ে যেতে হবে।

আমরা অনেক দিন থেকেই জানি যে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি মাত্রাসাপেক্ষে আমাদের ত্বকের ক্যানসার সৃষ্টি করে। আবার এই অতিবেগুনি রশ্মি কিন্তু ১৪টি বিভিন্ন প্রকার ক্যানসারের ঝুঁকি কমায় এবং সেই সাথে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। ত্বক ক্যানসার ও মৃত্যুহারের সম্পর্ক দেখার জন্য ৪০ বছর ধরে সমগ্র ড্যানিশ জনগণের অর্থাৎ ৪৪ লাখ মানুষের ওপর করা একটি জরিপ থেকে উঠে আসে যে, মেলানোমা ত্বক ক্যানসারের সাথে মৃত্যুহারের তাৎপর্যপূর্ণ কোনো সম্পর্ক নেই। তবে নন-মেলানোমা ত্বক ক্যানসারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাদের নন-মেলানোমা ত্বক ক্যানসার হয়েছে তারা যাদের কোনো ক্যানসার হয়নি তাদের থেকে গড়ে ১০ বছর বেশি বেঁচেছে। অর্থাৎ এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে সূর্যরশ্মি ক্যানসার সৃষ্টি করলেও এর অন্যান্য কিছু উপকারিতা আছে, যাকে অবহেলা করা যাবে না। বিষয়টি কিন্তু খুব গোলমেলে আর সেই সাথে মজার। তবে, এই গোলমেলে বিষয়টির জট অনেকটাই খুলতে সক্ষম হয়েছেন কিছু বিজ্ঞানী।

সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির তিনটি ভাগ আছে, অতিবেগুনি রশ্মি-এ, অতিবেগুনি রশ্মি-বি ও অতিবেগুনি রশ্মি-সি। রশ্মি-এ কোনো প্রকার বাধাপ্রাপ্ত না হয়ে বায়ুমন্ডল ভেদ করে পৃথিবীপৃষ্ঠে চলে আসে। অন্যদিকে রশ্মি-বি ওজোনস্তর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ভগ্নাংশরূপে পৃথিবীপৃষ্ঠে পতিত হয়। রশ্মি-সি বায়ুমন্ডল ভেদ করে মোটেও পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছায় না। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, যেহেতু অতিবেগুনি রশ্মি-বি ওজোনস্তর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয় সেহেতু সকালে ও সন্ধ্যায় এর মাত্রা কম থাকে। কারণ এ সময় সূর্যরশ্মি তীর্যকভাবে পৃথিবীতে পড়ে বলে একে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ ওজোনস্তর পাড়ি দিতে হয়। এই অতিবেগুনি রশ্মি-বি ত্বকের ক্যানসার সৃষ্টিতে মূল ভূমিকা পালন করে। আবার এই অতিবেগুনি রশ্মি কিন্তু ভিটামিন-ডি তৈরিতেও মূল ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে অতিবেগুনি রশ্মি-এ ত্বকে বলিরেখা তৈরি করলেও ক্যানসার তৈরিতে তেমন ভূমিকা নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই অতিবেগুনি রশ্মি-এ ত্বকে নাইট্রিক অক্সাইড নিঃসরণ করে, যা মূলত মানুষকে দীর্ঘজীবী করতে ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ সূর্যরশ্মি শুধু ভিটামিন-ডি না, নাইট্রিক অক্সাইডের মতো রক্তনালির স্থিতিস্থাপকতা বর্ধনকারী কেমিক্যালও তৈরি করে। সেই  সাথে সূর্যরশ্মি আমাদের দেহঘড়িকে ছন্দে রাখে, ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে, বিষণ্ণতা দূর করে এবং আমাদের অজানা আরো অনেক উপকারে আসে।

আমাদের এ অঞ্চলে সূর্য খাড়াভাবে অবস্থান করে বলে তাপের তীব্রতা বেশি, তবে সে তীব্রতা সহ্য করার ক্ষমতা এ অঞ্চলের মানুষের ছিল। কিন্তু কয়েক দশক ধরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ছাতা, স্কার্ফ, সান-স্ক্রিন, কোমল পানীয় প্রভৃতির আগমনে আমরা হারিয়েছি আমাদের তাপ সহ্যের ক্ষমতা। তাই আমরা তাপকে এড়িয়ে চলি, আমাদের পরম বন্ধু সূর্যকে এড়িয়ে চলি।

শুধু সপ্তাহে ৩ দিন ১৫-২০ মিনিট মুখমণ্ডল, গলা, হাত প্রভৃতি স্থানে রোদ লাগিয়ে আমরা আমাদের ভিটামিন-ডি’র চাহিদা পূরণ করতে পারি। দুপুরের রোদ সহ্য করতে না পারলে সকালে বা দুপুরের পর রোদে যাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত ভিটামিন-ডি দেহে সঞ্চিত থাকে এবং পরে কাজে লাগে।
ভিটামিন-ডি সাপ্লিমেন্ট ডাক্তারের পরামর্শে খাওয়া যেতে পারে, তবে বিষয় হচ্ছে প্রাকৃতিক ভিটামিন-ডি’র যত গুণাগুণ পাওয়া গেছে ভিটামিন-ডি সাপ্লিমেন্ট থেকে তার অনুরূপ ফলাফল পাওয়া যায়নি। এর কারণ ভিটামিন-ডি ছাড়াও সূর্য নাইট্রিক অক্সাইডের মতো আরো অনেক কাজ শরীরে করে, যা হয়তো আমাদের পক্ষে এখন পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি। তাই ভয়কে জয় করে সূর্যের আলোতে নেমে যান যখনই সুযোগ পান। মনে রাখবেন আমাদের কৃষক, দিনমজুর, জেলে, রিকশাওয়ালা ভাইয়েরা সারা দিন সূর্যের নিচে থাকে, তাদের ত্বকের ক্যানসার বেশি হয় না। আমাদেরও হবে না।

জুঁই ইয়াসমিন। লেখক ও গবেষক। পড়াশুনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে। পরবর্তীতে ইরাসমাস মুন্ডুস প্রোগ্রামের আওতায় 'ফুড সায়েন্স, টেকনোলজি ও নিউট্রিশন' স্নাতকোত্তর। বর্তমানে স্বাধীন স্বাস্থ্য প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। স্বাস্থ্য ও মেডিসিন বিষয়ে নিয়মিত লেখালিখি করেন।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ