সে এক বিবর্ণ বিকেল ছিল

সৈয়দ মাহমুদ
গল্প
Bengali
সে এক বিবর্ণ বিকেল ছিল

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এয়ারপোর্ট, কলকাতা। আহমেদাবাদ গামী ইন্ডিগো এয়ারের ফ্লাইটে উইন্ডো সিটে বসে মনটা ফুরফুরে লাগছে। আমি সাধারণত যে কোন জার্নিতে জানালার পাশের সিটটা প্রেফার করি। মনে মনে বোর্ডিংপাস ইস্যুকারী কাউন্টার লেডীকে ধন্যবাদ দিলাম। ভাবছি এই শেষ বিকেলে জানালার ধারে বসে পুরো আকাশটাকে আপন করে নেব আর অস্তগামী লাল সূর্যটা সন্ধ্যের আড়ালে লুকিয়ে পড়লে মিটি মিটি জ্বলে ওঠা তারাদের সাথে কিছুটা সময় একান্তে কথা বলব। ভাবনার গভীরে ডুব দেয়ার আগেই মোহময় আবেশটাকে খন্ডিত করে দিল এক নারী কন্ঠ- May I have the window seat please? ফিরে তাকালাম, পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্নকারী এক তরুনী, গায়ে সাদা পোলো শার্ট, ব্লু জিনস, কপালে রোদ চশমাটা উঠিয়ে রাখা, এক কথায় সুন্দরী তরুনী, মিটি মিটি হেসে অনুরোধ জানাচ্ছে জানালার ধারের সিটটা পেতে। ক্ষণিক আগে যে তারাদের কথা ভাবছিলাম সেগুলো কি এই তরুনীর অধরে স্থান করে নিয়েছে! এমন এক স্মার্ট তরুনীর অনুরোধ উপেক্ষা করা কি সম্ভব? “Certainly” বলে আইল সিটে সরে বসে উইন্ডো সিটটা তাকে দিলাম।

তরুনীঃ Thank you so much!

আমিঃ You are most welcome!

তরুনীঃ Anyway, this is Drishty Roy from Kolkata বলে হাত বাড়িয়ে দিল। করমর্দণ করে নাম বলে বললাম I’m from Bangladesh.

দৃষ্টি রায়ঃ তাই! তাহলে তো আপনার সাথে বাংলায় কথা বলতে পারি।

আমিঃ নিশ্চয়ই।

ইতোমধ্যে বিমান সেবিকারা সীট বেল্ট বাঁধা সহ যাবতীয় সতর্কীকরণ উপদেশ দিয়ে ফেলেছে। জেটওয়ে সরে গেলে প্লেন রানওয়েতে দৌড়াতে দৌড়াতে টেক অফ নিয়ে নিল। পড়ন্ত বিকেলে আকাশের বুক চিরে ডানা মেলা প্লেনের জানালায় বসে আকাশটাকে আপন করে পাওয়া হলোনা বলে মনটা একটু বিষিয়ে গেল। তবে সহযাত্রী সুন্দরী স্মার্ট তরুনী দৃষ্টির সাথে কথা বলে সময়টা খারাপ কাটছে তা বলা যাবে না।

দৃষ্টির সাথে কথা জমে উঠল। পড়েছে স্কটিশ চার্চে পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাষ্টার্স শেষ হতে না হতেই সম্প্রতি একটা পরিবেশ সংরক্ষণ প্রজেক্টে দুই বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হযেছে। তাদেরই অল ইন্ডিয়া রিপ্রেজেন্টেটিভ ওয়ার্কশপে আহমেদাবাদ যাচ্ছে সে। ওর সুপারভাইজার এবং অন্য টীম মেট দুজন সকালের ফ্লাইটে চলে গেছে। এক পর্যায়ে ও বলল, আমাকে তুমি করে বলতে পারেন, আর আমি আপনাকে কী ডাকব? আমারও ওকে আপনি আপনি করতে বেশ অস্বস্তিই হচ্ছিল। ধন্যবাদ দিয়ে একটু রসিকতা করে বললাম, আমাকে মামা-কাকা-দাদু যা ইচ্ছে ডাকতে পার। ও হাসতে হাসতে বলল, এই যা, তোমাকে কাকা-দাদু ডাকতে যাব কেন? বলেই বলল, সরি ভুলে “তুমি” বলে ফেলেছি আর আপনাকে দেখে মামা-কাকা মনে হয়না। আমরা বন্ধুও হতে পারি। আমি বলি, তাহলে তো “তুমিই” ঠিক ছিল, আবার “আপনি” কেন? এবার সে বেশ খুশী হয়ে বলল, OK, অনেক ধন্যবাদ, আমি তাই চাচ্ছিলাম। পশ্চিম বঙ্গের লোকেরা তুমি সম্বোধনেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে তা আমি জানতাম।

এবার আলাপচারিতা আরও জমে উঠল। জানতে চাইল আমি আহমেদাবাদ কেন যাচ্ছি। বললাম, ওখানকার কিছু কোম্পানীর সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছে যারা BPO(Business Process Outsource) নিয়ে কাজ করে। আমি ওদের সাথে ট্যাগ হয়ে বাংলাদেশ থেকে কাজ করতে চাই। দৃষ্টি বললো গুড আইডিয়া। তা কতদিন থাকবে। বললাম আগামী দুই দিন বেশ ক’টা কোম্পানীর সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে, ওদের কাজ গুলো দেখব, তার পর শনিবার যাব রাজকোট, ঐ দিনই ফিরব, পরদিন রোববার কোন কাজ নেই। সোমবার অর্ধবেলা কাজ সেরে বিকেলের ফ্লাইটে যাব দিল্লী। ও জানতে চায় তার পর। বললাম, মঙ্গল-বুধ দিল্লীতে কাজ সেরে বুধবার বিকেলে কলকাতার ট্রেনে চাপব, দূরন্ত এক্সপ্রেসে টিকেট কাটা আছে। বৃহস্পতিবার বিকেলের ফ্লাইটে কলকাতা থেকে ঢাকা। দৃষ্টি বলে, বাবা এত টাইট শিডিউল। আমি বলি, কী আর করা, তবুও তো আজ সহ নয়দিন চলে যাবে।

আমাদের আলাপচারিতার মাঝে হঠাৎ প্লেনটা দুলে উঠল। ককপিট থেকে জরুরী ঘোষণা এলো, “আমরা খারাপ আবহাওয়ার কবলে পড়েছি, সবাই সিট বেল্ট বেঁধে ফেলুন, সেলফোন, ল্যাপটপ সহ সকল ইলেকট্রনিক ডিভাইস গুলো পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ করে রাখুন। সকলের সীটের নীচে লাইফ জ্যাকেট আছে কিনা দেখে নিন। দয়া করে কেউ ভীত হবেন না। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ দিয়ে ঝড়ের কবল থেকে মুক্তি পেতে চেষ্টা করবো।” মাত্র দেড়শ সীটের ছোট এয়ারক্রাফট তরতর করে কাঁপছে, যেন বাতাসের তোড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। দৃষ্টি ‘মা’ বলে আমার হাত দৃঢ় ভাবে আঁকড়ে ধরল। আমি ওকে অভয় দিচ্ছি কিন্তু আমার মনে সংশয়; আর কি ফেরা হবে দেশের মাটিতে! প্রিয়জনদের মুখগুলো চোখের সামনে ভাসতে লাগল। প্লেনটা বেশ ক’বার জেরে ঝাঁকুনি দিল। প্রতিবারই দৃষ্টি আরও দৃঢ় ভাবে আমার বাহু আঁকড়ে ধরছে আর ভয়ার্ত চাহুনিতে আমার দিকে তাকাচ্ছে। আমি ওকে শক্ত করে ধরে বললাম, ভয় পেওনা, বিপদের সময় মনে সাহস রাখতে হয়। কিন্তু কিছুতেই ওকে স্বাভাবিক করা যাচ্ছেনা, ও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বেঁকে এসে আমার বুকে মাথা গুঁজে দিল। সে যাতে জ্ঞান হারিয়ে না ফেলে এজন্য ওর হাতের তালুতে হাত ঘষতে লাগলাম।

অবশেষে ঝড়ের রাস্তা অতিক্রান্ত হলো। ঘোষণা এলো আমরা এখন নিরাপদ। দৃষ্টির ভয়ার্ত চেহারা স্বাভাবিক হতে সময় লাগলো। ততক্ষণে প্লেন এগিয়ে গেছে অনেকটা পথ। হঠাৎ জানালায় চোখ পড়তেই দেখি বাইরে আলোর বিচ্ছুরণ! চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে গোটা আকাশ, ভাসমান মেঘের উপর সে আলোর ঝলকানি অদ্ভুত এক বিচ্ছুরণের সৃষ্টি করেছে, যা আমার কিছু পূর্বের ভয়ার্ত মানসে এক মোহময় আবেশের জন্ম দিল। আমি অতি উচ্ছ্বাসে দৃষ্টিকে বললাম, দেখ দেখ বাইরেটা কী অদ্ভুত সুন্দর, চাঁদ মামা প্রাণ ভরে জ্যোৎস্না বিলাচ্ছে। দৃষ্টি এবার বাইরে তাকিয়ে অপরিসীম মুগ্ধতায় আমার হাত তার মুঠোবন্দী করে নিল। এখন সে একেবারেই স্বাভাবিক। আমি বললাম, তুমি আমাকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে। দৃষ্টি তারাদের মতোই মিটি মিটি হাসছে।

ঝড়ের কারণে এয়ারক্রাফটকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ উপরে তুলতে হয়েছিল তাই নির্দিষ্ট সময়ের পনের মিনিট আগেই আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল। নেমে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই বেল্টে লাগেজ চলে এলো। দৃষ্টিকে বললাম, তোমাকে কি কেউ রিসিভ করতে আসবে? ও বলল, না, হোটেলের ঠিকানা আছে, আমি ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাব। আমাদের সব পার্টিসিপেন্টদের একই হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি বললাম, তোমাকে আর ট্যাক্সি ডাকতে হবে না, আমার এ্যান্থনি আছে, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে আমি আমার হোটেলে যাব। দৃষ্টি অবাক হয়ে জানতে চাইল, এ্যান্থনি কে? আমি বললাম চলোইনা দেখা যাক। এক্সিট পয়েন্টে ট্যাক্সি নিয়ে এ্যান্থনি ঠিক দাঁড়িয়ে আছে। Good evening Sir and Madam বলে এ্যান্থনি আমাদের দু’জনের লাগেজ তুলে নিয়ে জানতে চাইল Sir, Hotel Park Residency?  আমি বললাম, না ম্যাডামকে আগে তার হোটেলে নামাতে হবে। দৃষ্টি ওর হোটেলের ঠিকানা বলে আমার কাছে জানতে চাইল, তুমি কি এ্যান্থনিকে আগেই জানিয়ে রেখেছিলে, ওকে চেন কিভাবে? আমি বললাম এ্যান্থনির সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে প্রথম বার এসেই। আজ কলকাতায় নেমেই ওকে ফোনে জানিয়ে ছিলাম আমি এই ফ্লাইটে আসছি আর ও জানে আমি বরাবর Hotel Park Residency পছন্দ করি। দৃষ্টিকে এবার এ্যান্থনির গল্প বলতে শুরু করলাম। সে হায়ার সেকেন্ডারী পর্যন্ত পড়েছে, বাড়ী মহারাষ্ট্রে কিন্তু এখানে সেটেল্ড হয়ে গেছে। ওর দুইটা মেয়ে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে, একজন ইলেভেন আর একজন ক্লাস নাইন। আমি হিন্দি একদমই বলতে পারিনা জেনে এ্যান্থনি বলেছিল, No problem Sir, I can communicate with you in English. তার পর থেকে এ্যান্থনি আমার বন্ধু হয়ে গেছে। আহমেদাবাদ এলেই আমি সারাক্ষণ ওকে সাথে রাখি। দৃষ্টি বেশ মুগ্ধ, এ্যান্থনিকে Congratulate করলো।

এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে হনুমান মন্দিরের পাশ ঘেঁষে রিভার ফ্রন্ট রোড ধরে এ্যান্থনির ট্যাক্সি এগিয়ে যাচ্ছে। রাতের আহমেদাবাদ যেন এক মায়াবীপুরী। এ শহর সারা রাত জেগে থাকে, কিন্তু শান্ত-নিস্তব্ধ, কোথাও কোলাহল নেই। চোখ ধাঁধানো আলোর তীব্রতা নেই আছে সহনীয় আলোর বন্যা। অনেক প্রাচীন বড় বড় অশ্বত্থ কিংবা সমগোত্রীয় গাছ চোখে পড়ে। পরিপাটি-পরিচ্ছন্ন আধুনিক শহর কিন্তু প্রাচীন ঐতিহ্য সমুন্নত রাখা হয়েছে। দৃষ্টি প্রথমবার গুজরাটের এই প্রধান শহর আহমেদাবাদে এলো। রাতের আহমেদাবাদ ওর মন ছুঁয়ে যাচ্ছে বলে জানাল। দেখতে দেখতে দৃষ্টির হোটেল চলে এলো। প্রায় দশ কিলোমিটার পথ আমরা ষোল মিনিটে চলে এলাম। এ্যান্থনি Hotel Royal Highness এ ট্যাক্সি পার্ক করলে দৃষ্টিকে আমরা লবিতে পৌঁছে দিলাম। ওর সাথে সেলফোন নম্বর বিনিময় হলো, এ্যান্থনির নম্বরটাও সে নিয়ে রাখল। ফোনে কথা হবে বলে পরস্পরের কাছে বিদায় নিয়ে আমার হোটেলের পথে চললাম।

দু’দিন ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করেছি। তবে রাতে যথারীতি দৃষ্টির ফোন এসেছে। ফোন করে প্রথমেই জানতে চেয়েছে, রাতের খাবার খেয়েছ? আজ জানতে চাইল, কাল তো রাজকোট যাচ্ছ, রাজকোট কতদূরে? বললাম, দুইশ বিশ কি.মি, যেতে চার ঘন্টা লেগে যাবে। কাজ সেরে রাতেই ফিরব। তোমার তো রোববার কাজ নেই, আমারও। ঐ দিন আমরা এক সাথে ঘুরবো। নিশ্চয়ই, বলে দৃষ্টি কথা শেষ করলো। পরদিন ভোর বেলা উঠে বাসে চেপে বসলাম রাজকোটের উদ্দেশ্যে।

আহমেদাবাদ শহর ছেড়ে বাসটা এগিয়ে যাচ্ছে,  অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্য চোখে পড়তে লাগল। প্রশস্ত রাস্তা, কখনো সোজাসুজি কখনো আঁকা বাঁকা। তুলনামূলক ভাবে রাস্তা ততটা ব্যস্ত নয়, গাড়ীর সংখ্যা কম। দুই পাশে সবুজ গ্রাম, অসংখ্য পাহাড় আর টিলা। মনে হচ্ছে এই বুঝি পাহাড়টাকে ধরা যাবে, আবার দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু জায়গা শহরের মতো মনে হচ্ছে, সেখানে স্বল্প উঁচু পাকা বাড়ী দুই কিংবা তিন তলা, তার বেশী নয়। রাজকোটেও বেশী উঁচু বিল্ডিং নেই। শহরটা অনেক প্রাচীন, একদম ভারতের পশ্চিম প্রান্ত, আরব সাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক জনপদ। ভাবছিলাম দৃষ্টি সাথে এলে হয়ত জার্নিটা আরও উপভোগ্য হতো। সেলফোনে ভাইব্রেশন হচ্ছে, দৃষ্টি ফোন করলো নাকি? না, অচেনা নাম্বার। রিসিভ করতেই নারী কন্ঠঃ Good morning Sir, this is Vani Chouhan from Rajkot, you have an appointment with us today. একটা কোম্পানীর Business Development Manager (BDM) বানী চৌহান, রাতে স্কাইপে আমার লোকাল নম্বরটা দিয়ে রেখেছিলাম, তারই সদ্ব্যবহার সে করছে। বললাম, Very good morning! Yes, I’m on the way, coming from Ahmedabad. OK, thank you, বলে সে ফোন রেখে দিল। বানী চৌহানের কোম্পানী বেশ ভাল আপ্যায়ন করলো। কাজ সেরে বিকেলে আহমেদাবাদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। রুমে ঢুকতে না ঢুকতেই দৃষ্টির ফোনঃ তুমি কী ফিরেছ? বললাম, মাত্র এসে পৌঁছলাম। ও বলল, তাহলে ফ্রেশ হয়ে ডিনার করে নাও। আজ আর কথা নয়। এ্যান্থনিকে বলেছি কাল সকালে এসে আমাকে নিয়ে যাবে, হোটেল থেকে তোমাকে পিক করে নেব। বেশ তাই হবে ম্যাম, বলে ফোন রাখলাম।

আহমেদাবাদে সকাল হয় বেশ দেরীতে। সাতটার আগে সূর্যের দেখা মেলেনা। রাতে ভারী ঘুম হয়েছিল। শেভ-গোসল সেরে নাশতা করে নিলাম। চায়ের পেয়ালায় চুমুক ‍দিতে দিতে একটা স্থানীয় চ্যানেল দেখছিলাম, চোখ ভারী হয়ে এলে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানিনা। ইন্টারকমের কর্কশ শব্দে চমকে উঠলাম। রিসেপশন থেকে বলছে, Sir, some Drishty Roy is waiting for you. Ok, I’m calling her বলে রিসিভার রেখে সেলফোন হাতে নিয়ে দেখি দৃষ্টির তিনটা মিস কল। ওকে ফোন করে বললাম দশ মিনিটে আসছি। দ্রুত রেডী হয়ে নীচে নেমে এলাম। লবিতে বসে দৃষ্টি একটা পত্রিকায় চোখ রেখেছে। দৃষ্টি আজ শাড়ী পড়েছে, শাড়ীটা ওকে ভীষণ মানিয়েছে। কাছে গিয়ে বললাম, সরি, তোমাকে বসিয়ে রেখেছি। ও বলল,  ফোন ধরছনা দেখে আমিতো তেমার রুমেই যাব ভেবেছিলাম, পরে ভাবলাম তুমি হয়ত শাওয়ার নিচ্ছ। বললাম, না, কেন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ও বলল, চলো বেরিয়ে পড়ি, এ্যান্থনি অপেক্ষা করছে। শাড়ীতে তোমাকে বেশ সুন্দর লাগছে, মানিয়েছে বেশ বলতেই ও বলল, কেন জিন্স টি-শার্টে কি পচা লেগেছিল। বললাম, মোটেও না, তোমাকে অনেক স্মার্ট দেখাচ্ছিল, দুভাবেই তোমাকে দু’রকম সুন্দর দেখায়।

ট্যাক্সিতে চেপে বললাম, কোথায় যাবে বলো, নেহেরু ব্রীজ, গান্ধী আশ্রম, মিউজিয়াম। দৃষ্টি বললো, যেখানে নিরিবিলিতে বসে কথা বলা যায় সেরকম একটা জায়গায় নিয়ে চলো। বললাম, তাহলে চলো সাবরমতির কাছে যাই। দৃষ্টি অবাক, সেটা আবার কে? আমি দুষ্টুমি করে বললাম তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী। ও বেশ সন্দিগ্ধ, হেঁয়ালী না করে বলে ফেল। হাসতে হাসতে বললাম, সেদিন এয়ারপোর্ট থেকে ওয়াটার ফ্রন্ট রোড ধরে আসতে একটা নদী দেখেছিলে, সেটাই সাবরমতি আর নদী মানেই নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী। দৃষ্টি হেসে বলে, ঠিক আছে, চলোইনা দেখা যাক কে কার প্রতিদ্বন্দ্বী। শহরের দুই প্রান্তকে সাবরমতি আটটি ব্রীজের মাধ্যমে সংযুক্ত রেখেছে। নদীর দুই তীরে চমৎকার বেড়ানোর জায়গা, বসার জায়গা, বিনোদন কেন্দ্র। প্রায় পনের কিলোমিটার জায়গা জুড়ে এমন সব সুন্দর ব্যবস্থা। এ্যান্থনিকে বললাম, আমাদের নামিয়ে দিয়ে তোমার ট্রিপ চালিয়ে যাও আমরা সময়মতো কল করবো।

সাবরমতির পরিচ্ছন্ন রূপ দেখে দৃষ্টি মুগ্ধ। প্রায় মধ্যাহ্ন, শান্ত রূপালী জলের উপর রোদ চিক চিক করছে, বাতাসে মৃদু ঢেউয়ের কল্লোল-সত্যিই এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। নদীর পানিতে কিংবা দুই ধারে কোন নোংরা আবর্জনার চিহ্ন মাত্র নেই। দৃষ্টি বলে, সাবরমতি সত্যিই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী। আমি জানতে চাই, তোমাদের ওয়ার্কশপ শেষ হচ্ছে কবে? মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে, আমরা বুধবার ফিরছি, তুমি তো বুধবার দিল্লী থেকে ট্রেনে চাপবে বললে সেদিন, বৃহস্পতিবার সকাল দশটার মধ্যে তুমি কলকাতায় থাকছ। আমি কিন্তু ষ্টেশনে ট্যাক্সি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো, আমার বাসায় উঠবেতো? আমি দুষ্টুমি করে বলি, কী খাওয়াবে? নাকি বলবে “খেয়ে এসেছেন-নাকি যেয়ে খাবেন?” দৃষ্টি রাগ করে বলে, আমাদেরকে তোমার ওরকম মনে হয়? আমি বললাম, না, একটু মজা করলাম। কলকাতার লোকেরা একটু হিসেবী বলে অনেকে এমন করে বলে। অবশ্য হিসেবী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। দৃষ্টি উৎসুক হয়ে কারণ জানতে চায়। বললাম, কলকাতা এক সময় মানবিক একটা শহর ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারত বর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে এসে বসবাস করছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও এমনটা ঘটেছে। কলকাতার মানুষ এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার উদার না হলে এই মানুষগুলো আশ্রয়হীন হয়ে পড়ত। এই যে এত এত মানুষের চাপ অথচ এখানে কল-কারখানা নেই, তাই অবর্ণণীয় সংগ্রাম করে তাদের টিকে থাকতে হয়েছে। এখানে একটা টাকা উপার্জন করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। তাই তাদেরকে হিসেবী হতে হয়েছে, ধীরে ধীরে চায়ের কাপের সাইজ ছোট করতে বাধ্য হয়েছে। দৃষ্টি গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছিল। বললাম, “দ্য সিটি অব জয়” পড়েছ? ও বলল, না পড়া হয়ে ওঠেনি, নাম শুনেছি, কলকাতাকে নিয়ে লেখা। বললাম, ঠিক কলকাতাকে নিয়ে লেখা নয়, সেই সময়কার কলকাতার মানুষের কষ্টকর জীবন যাপনের একটা বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন ফরাসী সাংবাদিক দোমিনিক লাপিয়ের।

কথা বলতে বলতে খিদে পেয়ে গেল। দৃষ্টিকে বললাম লাঞ্চে কী খাবে? বলল, এ ক’দিনে চাইনিজ আর দোসা খেয়ে খেয়ে পেট পচে গেল। আমারও একই অবস্থা, এখানে ভাত পাওয়া যায় না, বাঙ্গালীদের ভাত না হলে চলে! এর আগে এসে অনেক খুঁজে একটা ভাতের রেস্টুরেন্ট পেয়েছিলাম। দৃষ্টিকে বললাম, ভাত খেতে চাইলে চলো। ভাতের কথা শুনে দৃষ্টি চোখ যেন জ্বল জ্বল করে উঠলো, পাওয়া যাবে? পাওয়া যাবে তবে রান্না ভাল না, চিকেন মাটন পাওয়া যাবে, নদীর মাছ পাবে না, সব সামুদ্রিক আর ওরা রান্নায় খুব বেশী টোমাটো ব্যবহার করে। দৃষ্টির কথা যেমনই হোক তবুও তো ভাত খেতে পারবো, চলো যাই। এ্যান্থনিকে কল করতেই কিছুক্ষণের মধ্যে চলে এলো। রূপালী সিনেমা হল সংলগ্ন ছোট্ট রূপালী হোটেল, মালিক কিংবা তার ছেলে, নাম আহমদ। এর আগের বার এ্যান্থনির কাছে অনেক দূর-বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে বেশ আদর যত্ন করে খাইয়েছিল। এবারও তাই করল, মনে রেখেছে বলে ভাল লাগলো। সেবার খেতে খেতে এ্যান্থনি আমার কানে কানে বলেছিল, স্যার এখানে যারা বসে মাটন খাচ্ছে তাদের বেশীর ভাগই বাসায় নিরামিষ ভোজী। আমি হেসেছিলাম। সেই কথাটা মনে পড়ল।

লাঞ্চ শেষ হলে দৃষ্টির কাছে জানতে চাইলাম, তুমি কি রেষ্ট করতে হোটেলে ফিরতে চাও? বেশ দৃঢ়তার সাথে উত্তর এলো, Offcourse not, হোটেলের রুমে শুয়ে বসে আমি তোমার সঙ্গ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে পারিনা। ওর স্মার্টনেস আর বলার ভঙ্গিমা আমাকে মুগ্ধ করলো। এ্যান্থনি নদীর ধারেই একটা ভাল জায়গায় নিয়ে এলো। গোটা কয়েক কফি শপ, বির্স্তীর্ণ জায়গা জুড়ে গাছ-গাছালি, একটু দূরে বিনোদন কেন্দ্র-পার্ক পাশে বহমান স্নিগ্ধ সাবরমতি। অপূর্ব সুন্দর জায়গা। সময় হলে ফোন করতে বলে এ্যান্থনি বিদায় নিল। আমরা দুকাপ কফি নিয়ে বাঁধানো গাছের তলায় বসলাম। একটু বোধহয় আনমনা হয়েছিলাম। দৃষ্টির কথায় আমার শিরদাড়া সোজা হয়ে গেলঃ জানো, আমার জন্ম বাংলাদেশে হতে পারতো। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওর দিতে তাকিয়ে রইলাম। দৃষ্টি বলে যাচ্ছে, আমার দাদু আর দিদিমা ৪৭ এর দেশ ভাগের পর পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে চলে আসেন। আসেন মানে আসতে বাধ্য হন। দাদুর সাত পুরুষের ভিটে ছিল তোমাদের ময়মনসিংহের গৌরীপুরে। সেই সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে একই গ্রাম থেকে দাদু-দিদিমা সহ আরো কয়েকটি পরিবার সবকিছু ফেলে শুধু প্রাণটুকু হাতে নিয়ে এপারে পালিয়ে আসেন। দাদু তখন যুবক, বিয়েও করেননি। দিদিমাদের পরিবারের সাথে ভাল পরিচয় ছিল।

আমি বিস্ময় নিয়ে দৃষ্টির কথা গিলে যাচ্ছি। ওর দাদু স্বদেশী করতেন। অথচ স্বাধীন ভারতে তাকে ভিটে ছাড়া হতে হলো। দৃষ্টি আবার বলতে শুরু করলো, দাদু আর বাবার কাছে সব কথা আমি শুনেছি। এপারে এসে ওদের কষ্টের সীমা ছিলনা। নিজের দেশ ছেড়ে আসার কষ্টটা দাদু কখনোই ভুলতে পারেননি। সব সময় বলতেন এ কোন স্বাধীনতা পেলাম যে নিজ ঘর হারাতে হলো! একটু বিরতি নিয়ে দৃষ্টি আবার বলতে শুরু করলো, আমি এটাও শুনেছি যে এপার থেকেও অনেক মুসলিম পরিবারকে একই পরিণতি বরণ করে ওপারে যেতে হয়েছে এবং তাদেরকেও ভীষণ কষ্ট করতে হয়েছে। এজন্য অবশ্য সব মানুষকে দায়ী করা যায়না, যারা সাম্প্রদায়িক বিষ-বাস্পের আড়ালে নিজেদের আখের গোছাতে চেয়েছে তারাই এই কাজ গুলো করেছে, এখনো করে যাচ্ছে, দাদু এমন করে বলতেন।

দৃষ্টির কথা কেড়ে নিয়ে বলি, তুমি একদম ঠিক বলেছ। এগুলো কোন ধর্মের কাজ নয়, ধর্মের নামে যারা নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায় তারাই ধর্মকে ব্যবহার করে এসব করে চলেছে যুগ যুগ ধরে। তোমাদের স্বাধীনতা নিয়েও আমার একটু প্রশ্ন আছে। দৃষ্টি বেশ উৎসুক হয়ে নড়ে চড়ে বসে। আমি বলে চলি, মহাত্মা গান্ধী অর্থাৎ তোমাদের বাপুজী’র “কুইট ইন্ডিয়া” মুভমেন্ট সঠিক ছিল। কিন্তু শেষ কালে এসে তিনি তার দলীয় নেতাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল এটা সত্যি। কিন্তু তাঁর গড়া কংগ্রেসের নেতা পন্ডিত নেহেরু, বল্লভ ভাই প্যাটেল, মৌলানা আজাদ সহ মুসলিম লীগের জিন্নাহ যখন ভারত ভাঙার পক্ষে ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সাথে একাত্ম হলেন তখন তিনি তার প্রতিবাদে ভারতবাসীকে সাথে নিয়ে অনেক বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারতেন। ভারতের মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করত। প্রথমদিকে তিনি যে কথা গুলো বলেছিলেন সেগুলো সঠিক ছিল। বলেছিলেন, ইংরেজ ইন্ডিয়া ছাড়ো, ভারত কীভাবে চলবে তা ভারতের জনগণ ঠিক করবে। ভারত ঐক্যবদ্ধ থাকবে না টুকরো করা হবে সে সিদ্ধান্ত নেবার মালিক তোমরা নও। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সারা ভারতবর্ষে তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছিল। ভাগ হওয়ার পরও কি থেমেছিল? বরং সাম্প্রদায়িক চেতনাটা আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল। রক্তে ভেসে গেল পুরো ভারতবর্ষ। বাংলাকে এক রাখার দাবী করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী আর শরৎ বসু, সেটিও নেহেরু-প্যাটেল অগ্রাহ্য করেছে। একই বাংলাভাষী মানুষ কেউ হয়ে গেল পাকিস্তানী কেউবা ভারতীয়। তুমি-আমি ইংরেজ আর নেতাদের কলমের খোঁচায় দুইটা পৃথক দেশের বাসিন্দা হয়ে গেলাম। আমাদের মতামতের কোনো দামই রইল না।

দৃষ্টির চোখ ছল ছল করছে. তবুও আমাকে যেন বলার নেশায় পেয়ে বসলো। ৪৭ সালের দোসরা জুন আটজন ব্যাক্তি ৩৫ কোটি ভারতবাসীর মতামতকে উপেক্ষা করে ভারতকে কেটে টুকরো করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দলিলে স্বাক্ষর করলেন। গান্ধীজী সেদিন মৌনব্রত পালন করছিলেন, তিনি কথা বলবেন না। তাহলে তিনি এই অপকর্মের স্বাক্ষী হতে সেই মিটিংয়ে গেলেন কেন? সিদ্ধান্ত গ্রহণ শেষে ভাইসরয় গান্ধীজীর মতামতের জন্য তার দিকে তাকালে তিনি একটা কাগজে লিখলেন, “আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে, আমার দ্বারা আজ কোন কথা বলা সম্ভব নয়।” মাউন্টব্যাটেন সন্দিগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন, ধুরন্ধর ভাইসরয়ের ভয় ছিল এই বুড়োটা না সব ভন্ডুল করে দেয়। বাস্তবিক অর্থেই কিছু করার ক্ষমতা থাকলে একমাত্র তারই ছিল। অন্যদের মাথা ভাইসরয় আগেই কিনে নিয়েছিলেন। আমার প্রশ্নটা দৃষ্টি এখানেই, তিনি মৌনব্রত পালন করছিলেন ঠিক আছে, মিটিংএর তারিখটা পেছাতে বলতে পারতেন। তাছাড়া তিনি যখন কাগজে লিখলেনই তাহলে কেন লিখলেন না যে আমি এ সিদ্ধান্ত মানিনা। বের হয়ে এসে ভারতবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলতেন। সর্বভারতীয় পার্লামেন্টে সিদ্ধান্ত হতো ভারত কোন পথে চলবে। হয়ত দাঙ্গাটা কিছুদিন চলতো কিন্তু পরবর্তী সময় গুলোর মতো দীর্ঘস্থায়ী হতো না। সেদিক থেকে মনে হয় নেতাজী সুভাস বসুর “আজাদ হিন্দ ফৌজ” গঠনের লাইনটাই সঠিক ছিল। ইংরেজ আপোষে যেতে না চাইলে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে তাদের বিতাড়িত করতে হতো। সেটাই হতো প্রকৃত স্বাধীনতা, যেমনটি করেছিলাম আমরা-বাঙ্গালীরা পকিস্তানীদের তাড়িয়ে। বৃটেনের পার্লামেন্টে মে মাসেই প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সিদ্ধান্ত পাশ করালেন ভারতকে দুই ভাগে বিভক্ত করে স্বাধীনতা দেয়া হবে। ইংরেজদের নির্দেশিত পথে দয়ার দানের এই স্বাধীনতায় কি কোন গৌরব আছে বলো। ওরা নেতাজী সুভাষ চন্দ্রকে বুঝতে পেরে অর্ন্তধানের নাটক সাজিয়ে তাকে হাওয়া করে দিয়েছিল বলে আমি মনে করি।

দৃষ্টি একাগ্রতার সাথে আমার কথা শুনে যাচ্ছিল, আমি ওকে কিছুই বলার সুযোগ দিচ্ছিলাম না। আমার মুখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম, কী দেখছ? আমার দাদু, বাবা আর তুমি যে একই মাটি আর চিন্তা-চেতনার মানুষ সেটাই ভাবছিলাম, ঠিক একই কথা আমি ওদের মুখ থেকে অনেকবার শুনেছি-দৃষ্টির উত্তর। আমি বললাম, দেখ এই গুজরাট গান্ধীজী আর সর্দার প্যাটেলের জন্মস্থান, এখানে বসে আমি তাদের ঠিক সমালোচনা করতে চাইছিনা, আমার মনের প্রশ্ন গুলো বেরিয়ে এলো। হয়ত আমার ভাবনা গুলো সঠিক নয়, কিংবা আরো অনেক কিছু আমার জানা হয়নি তাই এমনটা ভাবছি। যাকগে আমরা এত সব গম্ভীর আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসি, তোমার ফ্যামিলির কথা বলো। দৃষ্টি উৎসাহী হয়ে উঠলো, তোমাকে আগেই বলেছি দাদু এখানে এসে বেশ কষ্ট করে দিন যাপন করেছেন, সব সময় নিজেকে উদ্বাস্তু মনে করতেন, দিদিমারও একই অবস্থা। ওনারা কেউ আর বেঁচে নেই। বাবা কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় এসে লেখাপড়াটা বেশ কষ্টে চালিয়ে গেছেন, বলতে গেলে অনেকটা খেয়ে না খেয়ে। ইঞ্জিনিয়র হয়ে বাবা টাটা মোটর্স এ ঢুকেছেন, মা কলকাতার মেয়ে। বাবা এখন জামসেদপুরে কিন্তু মা স্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে যেতে চাননি, তাই আমরা কলকাতায় থাকি। বাবা প্রতি শনিবার আসেন। আমার ছোট ভাই ইউ কে তে পড়তে গেছে- এই তো আমাদের পরিবার।

অনেক ভারী ভারী কথা হয়েছে, এবার একটু হালকা হওয়া দরকার। রসিকতা করে বললাম, এ পর্যন্ত কতটা প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছ? দৃষ্টি হাসতে হাসতে বলল, বেশ ক’জন পছন্দ করেছিল তা বুঝতাম তবে দু’জন বলার সাহস করেছিল আর সেই দু’জনকে আমারও পছন্দ ছিল-দৃষ্টির সরল স্বীকারোক্তি। আমি জানতে চাই, তা এখন কী অবস্থায় আছে সে সব? দৃষ্টি বলে, এক বেটা পালিয়েছে, আমার জবাব না পেয়ে অষ্ট্রেলিয়া গিয়ে অন্য একজনকে পছন্দ করেছে বলে জানিয়েছে। আর অন্যটার কথা কী বলব, আস্ত একটা হাঁদারাম। সে আবার জার্নালিষ্ট, আনন্দ বাজারে কাজ করে, লেখালেখি করে বেশ। কিন্তু আমি যেমনটা চাই তেমন ভাবে সে চলেনা। কবিতা লেখে বলে কি সব সময় কবি কবি ভাব নিয়ে চলতে হবে, কথায় কথায় কাব্য করতে হবে? রবীন্দ্রনাথ-মাইকেল কি কবি ছিলেননা, তারা কবে উস্কো-খুস্কো থেকেছেন, ওনাদের মতো স্মার্ট কবি-সাহিত্যিক ও কি হতে পারবে? তাহলে শুধু শুধু এই ভাব নেয়া কেন? ওকে দেখলে মনে হয় এক সপ্তাহ স্নান করেনা। গায়ে একটা ময়লা পাঞ্জাবী আর লুঙ্গির মতো ঢিলে পাজামা পড়বে সব সময়, কাঁধে যথারীতি ঝোলানো ব্যাগ। আমি এসব কথা বলতে গেলে ও বলে, তুমি যদি আমার হৃদয়কে উপলব্ধি করে ভালবেসে থাক তবে বাহ্যিক আমাকে নিয়ে ভাবার কী দরকার? তুমিই বলো, আমি কি ওর কাছে অযৌক্তিক কিছু চেয়েছি? আমি হাসতে হাসতে বলি, মোটেও না। দেখ চেষ্টা করে বদলানো যায় কিনা। দৃষ্টি বলে, ওকে দিয়ে হবেনা, ও মনে হয় বদলাবেনা, তবুও চেষ্টা করে যাচ্ছি।

কথায় কথায় প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এলো। দৃষ্টিকে বললাম একটা গান গেয়ে শোনাবে? ও বললো, এসো দুজনে গাই। আমি তো গাইতে জানিনা, বললাম তুমি গাও আমি একটু গলা মেলাতে চেষ্টা করছি। দৃষ্টির খালি গলায় রবীন্দ্র সংগীত “এই লভিনু সঙ্গ তব সুন্দরো হে সুন্দরো…” ভীষণ ভাল লাগলো। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে, পার্কের ভিতরটা বেশ জমজমাট আর আলোকিত হয়ে উঠেছে। আমরা যেখানে বসে ছিলাম সেখানে এখনো আলো আঁধারী। দৃষ্টিকে নিয়ে কিছুক্ষণ নদীর পাড় ধরে হাঁটলাম। ফুর ফুরে বাতাসে মনটা বেশ প্রসন্ন হয়ে গেল। দৃষ্টি বললো, হোটেলের খাবার ভাল লাগছে না, রাতে বাইরে খেলে কেমন হয়? আমি বললাম, নিশ্চয়ই, আমিও তাই ভাবছি। এ্যান্থনিকে আসতে বললাম, প্রায় ত্রিশ মিনিটের মাথায় সে হাজির হলো। দৃষ্টির কাছে জানতে চাইলাম রাতে কী খেতে চাও, একটু ভেবে নিয়ে বললো, চিকেন-তান্দুরী পাওয়া যাবে? এ্যান্থনির দিকে তাকাতেই সে মাথা নাড়লো, পাওয়া যাবে। চিকেন-তান্দুরী শুনে মনে হলো ক্ষুধায় পেট মোচড় দিল। এ্যান্থনি আমাদের নিয়ে ছুটলো।

রেস্তোরায় এ্যান্থনি সহ খেতে বসে মনে হলো মুসলিম-হিন্দু-খ্রিষ্টান এই তিন ধর্মের তিনজন মানুষ আমরা একই টেবিলে বসে মনের আনন্দে খাচ্ছি, আমাদের তো কিছুতে আটকাচ্ছে না, কোন ধর্ম, কোন সংস্কার কিংবা সামাজিক অবস্থান-কিছুতেই কোন সমস্যা হচ্ছেনা তাহলে ধর্মের নামে কেন এত এত রক্তের স্রোত বয়ে যায়, কেন ধর্মের নামে ভৌগলিক সীমারেখা টানা হয়, কেনইবা জীবন বাঁচাতে জন্মভূমি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়! আমরা কি কখনো মানুষ হতে পারবো না!

আহমেদাবাদ শহর বেশ নিরাপদ। মানুষের মানসিকতাও বেশ অগ্রসর। রাতভর মেয়েরা শোঁ শোঁ করে স্কুটি চালিয়ে বেড়াচ্ছে। যত্রতত্র স্কুটি ফেলে রেখে যে যার মতো কাজ সারছে। দৃষ্টিকে বললাম, জানো কাল ভোর বেলা আমি যখন বাস ধরতে বেরিয়েছি তখন সাড়ে পাঁচটা হবে, দেখলাম এক ভদ্র মহিলা স্কুটি চালিয়ে এসে রাস্তার ধারে চায়ের দোকানে চা খেয়ে গেলেন। এ রকম দৃশ্য আমরা কি দুই বাংলাতে কল্পনা করতে পারি? দৃষ্টি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, না, আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। কথায় কথায় দৃষ্টির হোটেলের সামনে চলে এসেছি। তোমার সাথে একটা অপূর্ব দিন কাটালাম, আজীবন মনে রাখার মতো, দৃষ্টির মন্তব্য। বললাম আমারও একই অনুভূতি, ভাল থেকো, কাল তো দিল্লী যাচ্ছি, বৃহস্পতিবার কলকাতায় দেখা হচ্ছে। দৃষ্টি হাত মিলিয়ে চলে গেল।

পরদিন দিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্টে নেমে হোটেলে পৌঁছতে রাত দশটা, দৃষ্টির ফোন এলো, ভাল ভাবে পৌঁছেছ? আমি সেদিনের প্লেন জার্নির কথা ভেবে টেনশন করছিলাম। জানালাম ভাল ভাবেই এসে গেছি। দৃষ্টি আক্ষেপের সুরে জানালো কাজ না থাকলে ও আমার সাথে দিল্লী হয়ে ট্রেনে কলকাতা যেত, তাহলে ওর ভীষণ ভাল লাগতো। একা আবার সেই প্লেনে ফিরতে ওর ভয় করছে। আমি অভয় দিলাম এই বলে, প্লেনে উঠে ভাববে আমি পাশে আছি, তাহলে আর ভয় পাবেনা।

কলকাতায় নেমেই দৃষ্টি ফোন করেছে, আমি নিরাপদে পৌঁছে গেছি, তুমি এখন কোথায়? বললাম, হোটেল থেকে বেরুচ্ছি, নিউ দিল্লী ষ্টেশন থেকে দূরন্ত এক্সপ্রেসে উঠব। ঠিক আছে, কাল সকালে দেখা হচ্ছে, Have a nice & safe journey! বলে দৃষ্টি ফোন রাখল। দিল্লী থেকে কেলকাতা ট্রেনে ষোল ঘন্টার এই জার্নিটা আমার কাছে বেশ উপভোগ্য। একটা বিকেল-সন্ধ্যা, একটা ভোর-সকাল আর সারাটা রাত একান্ত নিজস্ব ভাবনায় ডুবে থাকার অপূর্ব সুযোগ। কত যে গাছ-পালা, শহর-বন্দর, পাহাড়-নদী, ধু ধু প্রান্তর, জঙ্গল আর মেঠো পথ পেরিয়ে চোখের দৃষ্টি নেচে বেড়ায় – এই অনন্য পাওয়া অন্য কোথাও কি পাওয়া সম্ভব!

সকাল ন’টা বাজতে না বাজতেই দৃষ্টির ফোন, Goodmorning! How was the journey? দুরন্ত এক্সপ্রেস শিয়ালদায় আসে তবুও কনফার্ম হতে ফোন করেছি, হাওড়া নাকি শিয়ালদায় আসছ? বললাম শিয়ালদা আসছি। আমি থাকব বলে দৃষ্টি ফোন রাখল। শিয়ালদায় নেমে যথারীতি দৃষ্টিকে গেটে পেলাম, ট্যাক্সি ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল, দাদা নিউ আলীপুর। আমি দৃষ্টির হাতের উপর হাত রেখে অনুনয়ের সুরে বললাম, দেখ আজ ওয়ার্কিং ডে, তোমার মা নিশ্চয়ই বাসায় নেই, আমার এভাবে বাসায় চলে যাওয়াটা মনে হয় ঠিক হচ্ছে না। যদি আগে থেকে ওনাদের সাথে পরিচয় থাকত তাহলে এত ভাবতাম না হয়ত। দৃষ্টি কিছুটা গম্ভীর হয়ে ভেবে বললো, হ্যা বুঝতে পেরেছি, আসলে আমি এ ভাবে ভেবে দেখিনি, তাহলে কোথায় যাবে? জানতে চাইলাম তোমার আজ অফিস নেই? বললো, না, কালই তো ওয়ার্কশপ থেকে ফিরলাম, আজ রেষ্ট। আমি বললাম, ঠিক আছে আমার ফ্লাইট তো বিকেলে, হোটেলে গিয়ে তুমি একটু বোসো, আমি স্নানটা সেরেই ঘুরতে বেরুবো। দৃষ্টি অনুরোধ জানালো, আজ ঢাকায় ফিরে না গেলে হয়না। ভাবলাম একটা দিন থাকা যেতেই পারে। বললাম, ঠিক আছে তাহলে হোটেল থেকে বেরিয়ে প্রথমে এয়ার লাইন্স অফিসে যাই, দেখি কিছু করা যায় কিনা। দৃষ্টির বেশ খুশী খুশী ভাব, তাহলে রাতে আমার বাসায় আসছ কিন্তু। বলি, নিশ্চয়ই, যদি থাকা হয়।

এত দীর্ঘ জার্নির পর লম্বা একটা শাওয়ার নেয়ার ইচ্ছে করছিল কিন্তু দৃষ্টিকে বসিয়ে রেখেছি, তাই তাড়াতাড়ি সেরে নিয়ে নীচে নেমে এলাম। দৃষ্টি টোস্ট আর কফির অর্ডার দিয়ে রেখেছে। ওর কেয়ারিং এ্যাটিচিউট সত্যি মুগ্ধ হওয়ার মতো। হোটেল থেকে বেরিয়ে ইন্ডিয়ান এয়ার লাইন্সে গেলাম। কিন্তু কাজ হলো না। পরের দিনের ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে, উল্টো আজকের ফ্লাইটে রিকোয়েষ্ট বুকিং বাড়ছে। পাশেই একটা ট্রাভেল এজেন্সীতে গিয়ে বিমানের টিকেট পেতে চেষ্টা করলাম, সম্ভব নয় জানালো। একবার ভাবলাম বাসেই ফিরবো কিনা। কিন্তু এত এত জার্নির পর আবার প্রায় দশ-বারো ঘন্টার বাস জার্নির ধকলটা আর নিতে মন চাইছে না। তাই প্লেনের টিকেটটা আর ক্যানসেল করলাম না, রি-কনফার্ম করিয়ে নিলাম। দৃষ্টির মন খারাপ হয়ে গেল। শুধু শুধু প্রায় দুটো ঘন্টা নষ্ট করলাম। ওকে বললাম, চলো বাংলাদেশের রেষ্টুরেন্টে দুপুরে খাই। কোথায় সেটা, জানতে চাইল। বাংলাদেশ বাস স্ট্যান্ড নামে পরিচিত মারকুইস স্ট্রিট আর গালিব স্ট্রিট এর কোনায় “রাঁধুনী” তে গিয়ে বসলাম। এখানে যারা খায় তারা সবাই বাংলাদেশ থেকে আসা। সবজী, ভর্তা, ডাল, শুটকী, ছোট মাছ সবই পাওয়া যায়। নয় দিন পর বেশ তৃপ্তির সাথে খেলাম, দৃষ্টিও বেশ মজা পেয়েছে জানালো। জানতে চাইলাম, তুমিকি এখন বাসায় ফিরবে? নিশ্চয়ই না, তোমাকে সি অফ করে তবেই, দৃষ্টির উত্তর। তখনো বেশ সময় আছে হাতে। ওকে একটা চমক দিতে বললাম, চলো আমাকে কফি হাউসের কফি খাওয়াবে। It’s my pleasure বলে দৃষ্টি উৎফুল্ল হয়ে উঠল। কলেজ স্ট্রিটের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। পথে বইয়ের দোকানে থেমে “দ্য সিটি অব জয়” এর বাংলা অনুবাদ “আনন্দ নগর” কিনে কফি হাউসে বসে দৃষ্টিকে তা উপহার দিলাম। কিন্তু কিছু না লিখে দিলে সে কিছুতেই নেবেনা। তাই লিখলাম,“ আপনার চেয়ে আপন হয়ে ওঠা দৃষ্টি কে….বিদেশী এক ক্ষনিকের অতিথি”। লেখাটা পড়ে দৃষ্টি গোপনে চোখ মুছল।

কফি হাউস থেকে বেরিয়ে হোটেলে এসে লাগেজটা নিয়ে ছুটলাম দমদম। দৃষ্টি গম্ভীর। বললাম, তোমার বাসায় গেলাম না বলে কি রাগ করলে। বলল, আমার একটুখানি সংশয় ছিল যে তুমি যাবেনা হয়ত। যখন কারণটা বললে তখন বুঝলাম তুমিই ঠিক, আমি মন খারাপ করিনি। এর পর যখন আসব তখন তোমার বাবা-মা’র সাথে নিশ্চয়ই দেখা করবো আর তুমি একবার এসো, তোমাকে গৌরীপুর নিয়ে যাব-বললাম। দৃষ্টি বললো, বাবার ভীষণ ইচ্ছে একবার যাবে, আমারও। কিন্তু বাবা সময় করতে পাচ্ছে না। পড়ন্ত বিকেলে ট্যাক্সিতে চেপে একই ভাষাভাষী অথচ ভিনদেশী হয়ে যাওয়া দুটো মানুষ সুন্দর কয়েকটা দিন কাটাবার পর একে অপরের কাছে বিদায় নিতে যাচ্ছি, মনের ভিতরে চিন চিনে কষ্ট, যার কারণ শুধুই একটি সীমারেখা। যারা এই রেখাটি টেনেছিল তাদের আমি অভিসম্পাত করি।

এয়ারপোর্ট এসে পড়েছি। বোর্ডিং কার্ড নিয়ে দৃষ্টির কাছে বিদায় নিতে এসে দেখি ওর চোখ ছল ছল করছে, যে কোন সময় মহাপ্লাবণের আশঙ্কা। আমি একটু স্নেহের সুরে বললাম, এই পাগলী কাঁদিস কেন? এই কথার প্রতিক্রিয়া আরো মারাত্মক হলো। দৃষ্টি সেই জনারণ্যে আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। আমি ধীরে ধীরে বাঁধন আলগা করে নিয়ে বললাম, তোমার সাথে খুব শীঘ্র দেখা হবে, ভাল থেকো। ও পার্সের ভিতর থেকে একটা সাদাএনভেলাপ বের করে আমাকে ধরিয়ে দিয়ে বললো, প্লেনে উঠে খুলো। ওর ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। আমি হাতে হাত মিলিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। এক জোড়া অশ্রু সজল চোখ আমার পিঠ বিদ্ধ করে যাচ্ছে, অনুভব করতে পাচ্ছি কিন্তু পিছন ফেরার সাহস হলো না।

সিটে বসেএনভেলাপটা খুলে দেখি এক টুকরো মাটির সাথে একখানা চিঠিঃ

আপন জনের সংজ্ঞা আমি জানিনা, বুঝতেও চাইনা। সীমারেখা টেনে সে সম্পর্ক কে খণ্ডিত করা যায় কি না তাও জানিনা। নইলে দাদু মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তোমার দেশের মানুষ কে নিজের দেশের মানুষ ভেবে গেলেন কেন? শুনেছি ৭১ সালে যখন তোমার দেশ থেকে স্রোতের মতো মানুষ এ পারে এলো, দাদু তাদের পূনর্বাসনের জন্য প্রাণপাত করেছেন। স্বাধীনতার পর ফিরতে চেয়েছেন, গিয়েছিলেনও ভিটে মাটি দেখতে, তখনো সেসব দখলে ছিল। আশ্বাস পেয়েছিলেন ফেরত পাবার, বাবাও ভেবেছিলেন হয়ত এবার প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পাবেন। কাগজ চালাচালি চলছিল কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তি তা হতে দিলনা। ৭৫ এর মর্মান্তিক হত্যাকান্ড সে প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিল।

সেদিন প্লেনে ভয়ে তোমার বুকে মুখ রেখে যখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছিলাম, তখন এক ধরণের ঘ্রাণ পেয়েছি। অনেক ভেবে আবিস্কার করেছি এই ঘ্রাণটা সেই মাটির-যে মাটি দাদু চ’লে আসার সময় সাথে করে এনেছিলেন। সেই এক পুটলী মাটি এখনো আমাদের কাছে মহা মূল্যবান সম্পদের মতোই যুগ যুগ ধরে সংরক্ষিত হয়ে এসেছে। অমূল্য সেই সম্পদের একটি টুকরো তোমাকে দিতে পেরে আমার ভীষণ ভাল লাগছে। তোমাদের মুক্তিযুদ্ধের পর দাদু সব সময় এই মাটির উপর হাত রেখে একটা গান শুনতেন আর কেঁদে বুক ভাসাতেনঃ

যে মাটির বুকে ঘুমিয়ে আছে
লক্ষ মুক্তি সেনা
দে না তোরা দে না
সে মাটি আমার
অঙ্গে মাখিয়ে দে না।।

নিজেকে স্বাভাবিক রাখা আমার জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে গেল। প্লেনটা শূন্যে ডানা মেলেছে। গরম জলে দু’চোখ পূর্ণ। জানালার দিকে ফিরে চাইলাম। নীল চাঁদোয়ায় ঘেরা আকাশটা হঠাৎ বিবর্ণ মনে হলো। মনে এলো বিভক্তির রেখাটা কি পেরিয়ে এলাম, নাকি এখনো দৃষ্টির দেশেই আছি!

সৈয়দ মাহমুদ। কবি ও গল্পকার। উত্তর জনপদের এক ছোট শহর গাইবান্ধায় জন্ম মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে। ছোট বেলা থেকেই কিছুটা বোহেমিয়ান সৈয়দ মাহমুদ বেড়ে ওঠেন অনেকটা রক্ষণশীল পরিবারে। শৈশব থেকেই প্রকৃতি তাকে টানতো। বিরাণ প্রান্তরে, সারি সারি বৃক্ষের ছায়ায় হাঁটতে কিংবা...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..