সোনার মাকড়ি

জলি চক্রবর্ত্তী শীল
গল্প
Bengali
সোনার মাকড়ি

তন্ন তন্ন করেও খুঁজে কিছুই পায় না ফরিদা। কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে তার এই বালিশটার ভেতরেই সেলাই করে রেখেছিল সবকিছু। কুটি কুটি করে বালিশটাকে ছিঁড়ে ফেলেছে সে। একটা একটা করে ছিটের টুকরো সরিয়ে সরিয়ে দেখেছে‚ কিন্তু না কোত্থাও নেই জিনিসগুলো। মন মানে না‚ বারবার খুঁজে দেখে। উলটে পাল্টে দেখে তক্তার ওপর পেতে রাখা কাঁথাগুলোকে তুলে –নামিয়ে, ঘরের আনাচে- কানাচে‚ শোকেসের ভেতর -ওপর‚ ঘুলঘুলির ফাঁকে মায় চালের ড্রাম আর আনাজের ঝুড়িতে‚ মশলার কৌটোতেও। যদি ভুলক্রমে রেখে দিয়ে থাকে। বলা তো যায় না‚ আনমনে রাখতেও পারে। কিন্তু না কোথাও নেই। ফরিদা মাথায় হাত দিয়ে বসে। একটা ব্যাঙ্কের বই করতে বলেছে কর বাড়ির ছোটবাবু। আজ আর বের হবে না বলেই সেই অ্যাকাউন্ট খোলার তোড়জোড় করছিল।

বাবুদের বাড়িতে কাজ করে ফরিদা। সকালবেলা পান্তা খেয়ে বেরিয়ে যায়। তারপর দিনভর কাজ। বেশ কয় বাড়ি রোজের কাচাকাচি থাকে। যে বাড়িগুলোতে সে কাচে সবকটা বাড়িতেই আছে কাপড়কাচার মেশিন। কিন্তু তাদের কোনটাই ফরিদার থেকে ভালো পরিস্কার করতে পারে না। সেগুলো স্থবির হয়ে বসেই থাকে। শুধুমাত্র  বর্ষার দিনে কাপড় জামা আধ শুকনো করতে কাজে লাগে। ফরিদার বাজারদার তাই মন্দ না। এক বাড়ি কাজ ছাড়লে অন্য বাড়ি লুফে নেবার জন্য বসে আছে। সবাই আড়ালে আবডালে বলে ফরিদার হাতে জাদু আছে। এসব কথা যে ফরিদা জানে না তা নয়। কিন্তু তার জন্য অনায্যভাবে দর বাড়িয়ে ফেলার মানুষ সে নয়। যখন দর বাড়াবার হয় সে দর বাড়ায়।

শিল্পী: রিয়া দাস

তবে শুধু কাচাকাচি করে কি আর ছটা প্রাণীর পেট চলে? তাই অন্য কাজও করতে হয় ফরিদাকে। সবচেয়ে লাভ হয় তার উৎসবের মরশুমে। প্রতি বছর ঈদের সময়‚ দুর্গাপুজোর সময় ঘরদোর ঝাড়াঝুড়ি‚ ছাদ পরিস্কার‚ উঠোন পরিস্কার এসবও করে। তখন বলতে নেই বেশ কিছু টাকাপয়সার মুখ দেখে সে। এইরকমই বছর দুই ধরে টাকা জমিয়ে একজোড়া  সোনার মাকড়ি কিনেছিল। টাকার সাইজের কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু সোনার যা দাম‚ তাতে আধুলি সাইজের মাকড়িতেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। ছিলে কাটা মাকড়ির গায়ে যেন আলো পিছলে যেত। এক দুবার যা পরেছে। বলা যায় না কার কখন চোখ টাটায়। আর কিছু ক্যাশটাকাও জমিয়েছিল। সেগুলো সব একসাথে কাপড়ের ছিট দিয়ে তৈরি একটা বালিশে সেলাই করে ঢুকিয়ে রেখেছিল। আলগা ঘর পড়ে থাকে। নরলোকের তো আসা যাওয়া এই বারো ঘর এক উঠোন বাড়িতে। কার মনে কী আছে কে জানবে। ভেবেছিল একদম নিরাপদে থাকবে সবকিছু।  কিন্তু  রইল কই?

কে নিল কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না সে। ঘরের মানুষটাকে কিছুতেই সন্দেহ করা চলে না। অমন মানুষ লাখে একটা হয়। যা কিছু রোজগার করে বিড়ি আর চা খাওয়া বাবদ কিছু টাকা নিয়ে  বাকি টাকাটা ফরিদার হাতেই তুলে দেয়। সেই লোক আর যাই কিছু করতে পারে কল্পনা করলেও চুরি চামারিতে যেতেই পারে না। বাকি থাকে ছোট ছেলে আর ছোট মেয়ে। ওরা এখনো বেশ ছোট। ছেলেটার তো কথাই ফোটেনি। সন্দেহ অবশ্য একজনের দিকে যায় সে হল মেজো জামাই জামিল। বেশ কিছুদিন আগে দেশ থেকে এসেছে এখানে কাজের সন্ধানে। ফরিদাই ডেকে পাঠিয়েছে। কুঁড়ের হদ্দ এই জামাইটা তার। মেয়েটা খেটে খেটে মরে। কী দেখে যে গলে গেল ফরিদা‚ খোদাই জানে। বেশ কয়েক কাটা জমিতে চাষাবাদ‚ পুকুরে মাছ আর একটা মশলা পেষাই কল এসব দেখেই লোভ জেগেছিল মনে। গরীবের মেয়ে‚ পরের ঘরে গিয়ে সুখে শান্তিতে থাকবে‚  খাটবে খুটবে কিন্তু পেট ভরা খেতে পাবে‚ শুধু এতটুকুই চেয়েছিল ফরিদা। তাই তো আঠারো না হতেই মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছিল। তাদের দেশে তো অমন বিয়ে কত হয়।

বছর ঘুরতেই বুঝেছিল বড্ড ভুল করে ফেলেছে। তার অতটুকু মেয়েটাকে দিয়ে সংসারে কী না কাজ করায় জামাই বাড়িতে। মেয়েটা এলে আর যেতে চাইত না। পায়ে পড়ি মা‚ আমাকে তোমার কাছে থাকতে দাও। মন কেঁদে উঠত‚ তবু মনকে শক্ত করে জামাইয়ের সাথে পাঠিয়ে দিত। সংসার গড়া শক্ত ভাঙা সহজ। আস্তে আস্তে সব সয়ে যাবে। আর মেয়েরা তো হল সংসারের যুপকাষ্ঠের বলি‚ তাদের অত লাই দিলে চলে না। সে নিজেও কি একটা সময় কম জোয়াল বয়েছে। মনে মনে বলত সয়ে যা হামিদা‚ সব সয়ে যা। শুধু মনে না‚ মেয়েটা এলে এটাকেই মন্ত্র করে কানে দিত। কিন্তু মেয়েটা আসত আর কাঁদত। তোমার জামাই মা কিছু কাজ করে না। না ক্ষেতে যায় না মশলা পেষাই কলে‚ শাশুড়ি আমাকে উঠতে বসতে খোঁটা দেয়। অন্য ছেলেরা যায়‚ তাদের বৌদের অত খাটায় না‚ আর আমার বেলা গাধার খাটুনি। তার ওপর খেতেও দেয় না তেমন। পারি না মা‚ আমি পারি না।

ভেবেছিল ফরিদা জামাই নিজের ঘরে কাজ করে না‚ বাইরে এলে হয়ত করবে। কিন্তু কোথায় কী। যা কাজ দেখে দেয় দুদিন যায় তো দশদিন যায় না। মেয়েটা আবার এসে ঘ্যানঘ্যান করে। কাছকাছি একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। ভাড়া আছে‚ সংসারে দুটো মানুষেরও খাইখরচ কম নাকি?

মা আজ আপনার কাছে খাব। ভাবতে ভাবতেই জামিল ঘরে ঢোকে। হাতে বাজারের থলে থেকে উপচে পড়ে বাজার। প্ল্যাস্টিকের থলেতে টাটকা মাছ‚ রক্ত তখনও চুঁইয়ে পড়ছে।

বাজারগুলো রান্নাঘরে রেখে এসে শ্বাশুরির সামনে বসে জামিল। মুখে মৃদু হাসি।

গা যেন জ্বলে ওঠে। একটুও সন্দেহ থাকে না যে টাকা আর মাকড়িদুটো জামিলই সরিয়েছে।

টাকা পেলে কোথায় এত যে বাজার করলে? ঠান্ডা গলায় জানতে চায় ফরিদা।

জোগাড়ের কাজ করলাম কদিন। ভালো আয় রোজ আড়াইশো টাকা করে। আপনার মেয়ে আমাকে জোর করে পাঠায়। বলে মায়ের কাছে আর চাইতে পারি না। রোজ রোজ মায়ের দ্বারে ভিক্ষা যে ভালো লাগে না। কিছু একটা কর। তা পাড়ার এক চাচাতুতো ভাইয়ের সাথে দেখা‚ সে বলল রাজমিস্তির কাজ করে। বলল জোগাড়ের কাজ করবি? রাজি হয়ে গেলাম। কাজ না করলে যে খাবার জুটবে না‚ হামিদা এখানে এসে খেতেও দেবে না‚ খাবার নিয়েও যাবে না। কি আর করা। তা আজ ছুটি ভাবলাম মায়ের ওখানে গিয়ে খাই। রোজ রোজ তো মা খাওয়ায়‚ আমি আজ যখন হাতে টাকা পেয়েছি তখন না হয় আমি আজ কিছু কিনে নিয়ে যাই। আমারও তো ইচ্ছে করে।

বুকের ভিতরে একটা রাগ দলা পাকায়। কিন্তু কিছু বলতে পারে  না। মন বলে এসবই ঐ জমানো টাকা থেকে কেনা।

মা‚ একটু চা বানান।

হামিদা আসল না?

ও  ঘর দরজা পরিস্কার করে গোসল করে আসবে। আমাকে বলল তুমি মাকে বাজারটা দিয়ে এসো।

চা বানায় ফরিদা। জামিলকে ধরে দেয়। মাছ ধোয়‚ আনাজ কাটে। রান্না বসায়। বেলা গড়ায়‚ ভেতরে ভেতরে রাগও যেন ফুটতে থাকে। তার কষ্ট করে জমানো টাকা চুরি করল শেষে কিনা তার জামাই। সেই চুরি করা টাকতেই বাজার এনে আদিখ্যেতা। কোনরকমে রান্না করে।

মা ও মা ডাকতে ডাকতেই হামিদা এসে ঘরে ঢোকে। ফরিদা কাজ করতে করতে মুখ তুলে তাকায়। হামিদার কানের দুলে রোদ যেন পিছলে পড়ে। শুধু কানের দুল না‚ মুখের হাসিতেও যেন  মুক্তোর স্নিগ্ধতা। মেয়েটাকে খুব সুখী আর খুশী মনে হয়।

মা জান‚ এতদিনে আল্লাহ মুখ তুলে চেয়েছে। তোমার জামাই জোগাড়ের কাজ করছে। কদিন পরপর গেল কাজে। আজ তারা ছুটি দিয়েছে। আরও জানো কাল তোমার জামাইকে কথাটা বলাতে বলেছিল‚ তুমি যখন আমায় এমন অমূল্য ধন উপহার দিচ্ছ‚ তখন তোমাকেও আমার কিছু দেওয়া উচিত। আজ সকালে তোমাদের বাড়ি থেকে ফিরে এই কানের মাকড়ি উপহার দিয়েছে। দেখ কি সুন্দর দেখতে। বলেই হামিদা মায়ের মুখের কাছাকাছি মুখটা নিয়ে আসে। চিনতে ভুল হয় না হামিদার। এ তো তারই কানের মাকড়ি দুটো। কষ্টে চোখে জল চলে আসে। শেষে কিনা চুরি করল জামিল। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারে না। তার দুখিনী মেয়েটার মুখের হাসি ম্লান করতে ইচ্ছে করে না।

কেমন হয়েছে মা? সুন্দর না?

হ্যাঁ খুব সুন্দর। বলতে গিয়ে গলাটা ধরে যায় ফরিদার। হয়ত হয়ত বা নাতনী হলে এই মাকড়ি জোড়া সে তাকেই দিত মুখ দেখার জন্য কিম্বা নাতি হলে আংটি বানিয়ে দিত। সেইসময়টা দিল না হতচ্ছাড়াটা। রাগের দলাটা বুকের ভিতর ঘুরতে ঘুরতে কখন   যেন কষ্টের একটা দলা হয়ে গেছে।

হামিদার মুখ জুড়ে যেন বেহেস্তের হাসি‚ তৃপ্ত সে‚ পরিপুর্ণ। অনেক অনেকদিন পর সে মা হতে চলেছে। সাথে জামিলের এই পরিবর্তন যাকে হামিদা উন্নতি বলে মনে করছে‚ আসলে সে হল নীচে নামার প্রথম ধাপ।  এখনই রাশ ধরতে না পারলে‚ ভবিষ্যতে পাকা চোর হয়ে উঠবে জামিল আর তার সন্তান হবে চোরের সন্তান। ভাবতে যেতেই চোখে জল চলে আসে ফরিদার। ওদিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে শীতের রোদ পোয়াচ্ছে হামিদা। ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে তার সোনার মাকড়ির ছিলেকাটার সুক্ষ্ম কাজ।

জলি চক্রবর্ত্তী শীল। নেশা বই পড়া। জীবনকে কাছ থেকে দেখতে আর শব্দের পর শব্দ জুড়ে সেই জীবনকে বুনতে ভালো লাগে। সাধারণ মানুষের জীবন নিয়েই কাটাছেঁড়া।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..