সোলেমান পয়গম্বরের দেয়াল

জাকির তালুকদার
গল্প
Bengali
সোলেমান পয়গম্বরের দেয়াল

আমরা এসে দাঁড়ালাম পয়গম্বর সোলেমানের দেয়ালের পাশে। আমাদের সমস্বর তাঁর জন্য প্রার্থনা করল শান্তিবর্ষণ। এ শুধু রীতিমাফিক উচ্চারণ নয়। আমাদের হৃদয় যে আশ্বাস আর নিরাপত্তার স্পর্শ পায় এখানে এলে, সেই অনুভূতিদ্বয়ের উপজাত হিসেবেই উঠে আসে কৃতজ্ঞতার অশেষ প্রশ্বাস। আমাদের জন্য নিরাপত্তা আর শান্তির উদ্ভিদ রোপণ করে গেছেন তিনি। তাই আমাদের কণ্ঠনিঃসৃত তাঁর আত্মার শান্তি কামনা কার্যকারণসূত্রে নানাভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য হলেও এ আমাদের অন্তরেরই স্বতোৎসার।

আমরা মানে আমি, জামিল এবং ফারুক। তিনজন তিনটে গোত্রের প্রতিনিধি। অর্থাৎ আমরা কোনো অবিভাজ্য সত্তা নই। তবে পরিস্থিতি আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছে যে, আমরা আসলে এক অখ- সত্তারই স্বাধীন উত্তরাধিকারী। ত্রিভুজের তিন বাহুর মতো। অথচ আমাদের মধ্যেও খেয়োখেয়ি কম নেই। আসলে গোত্র মানেই রক্তের ভেতর ভিন্নমুখী স্রোত অর্থাৎ জীবনভেদে ব্যাখ্যানভিন্নতা। আমরা যখন বুকে বুক মিলাই তখনও পায়ের নিচে টের পাই চোরাবালির চোরাস্রোতের ছটফটানি। সেইসব চোরাবালি পেরিয়ে, কেন্দ্রাতিক স্রোতের কুহক এড়িয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে পেরেছি পয়গম্বর সোলেমানের দেয়ালের পাশে। একত্রে।

দেয়ালের ভিন্নপারে কী আছে তা আমাদের জানা। আছে ধ্বংসদূত। তাই আমরা যেকোনো মূল্যে অটুট রাখতে চাই দেয়ালটি। ওপারে রোধের অসাধ্য মৃত্যুপ্রতীক। লিউকেমিয়া যেমন যাবতীয় প্রতিরোধ আর জীবনতৃষ্ণাকে অগ্রাহ্য করে শিরায় শিরায় বইয়ে দেয় মৃত্যুশীত, তেমনি অপ্রতিরোধ্য ভিন্নপারের ধ্বংসদূতেরা।

ঈশ্বরকে আমরা আরেকবার ধন্যবাদ জানালাম। তিনি আমাদের প্রজাতির মধ্যে একজন অসাধারণ জ্ঞানীকে পাঠিয়েছিলেন। পাথরের পরমাণুর মানচিত্র তাঁর মুখস্থ ছিল। সাগরের ঘোলাটে অন্ধকার আর ভূগর্ভের মিশকালো অগম্য অন্ধকারও আপন রহস্য লুকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল তাঁর কাছে। তিনি জীবনের রহস্য জানতেন, জানতেন মৃত্যুর গন্তব্য। তবে সব কথা তিনি জানিয়ে যাননি তাঁর উত্তরপুরুষদের। আমরা অর্থাৎ তাঁর অধস্তন উত্তরপুরুষরা অল্প কিছু উত্তর আর অজস্র প্রশ্ন সম্বল করে আমাদের কাল কাটাচ্ছি সৌরম-লের এই গ্রহে। সর্বজ্ঞের উদারতম অনুদানসমৃদ্ধ সেই জ্ঞানী পুরুষ এই দেয়াল গাথার মন্ত্রণা এবং কলাকৌশল জানিয়েছিলেন পয়গম্বর সোলেমানকে। ধ্বংসদূতদের আড়াল করেছিলেন সভ্যতার একমাত্র আবাসভূমি থেকে।

দেয়ালের ওপার শব্দময়। আমাদের কানে তা অস্পষ্ট, ক্ষীণ। শব্দের চরিত্র বোঝা কষ্টকর। এমনকি অমনোযোগীকে তা প্রতারণার শিকারে পরিণত করতে পারে। তবে আমাদের কান এই শব্দরই অন্বেষণে ব্যাপৃত। আমরা জানি শব্দের চরিত্রের খুঁটিনাটি। আমাদের অব্যবহিত পূর্বপুরুষ শিখিয়ে দিয়েছেন। কোনো রসালো নরম জিনিসকে একটি রুক্ষ পাথরের বিপ্রতীপে পেষণ করলে যে ধরনের শব্দ উৎপন্ন হবে, সেটাই আমাদের শ্রব্য।

আমরা শব্দটিকে নির্ভুল সনাক্তে সক্ষম হই। ভৌতিক স্পর্শের মতো সেই শব্দ আমাদের মনে ছড়িয়ে দেয় শীতল ভীতি। আমরা তখন প্রাণপনে নিজেদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি। নিজেদের কল্পনা করতে থাকি চিড়িয়াখানায় সিংহের খাঁচার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকের মতো নিরাপদ। অবশেষে স্নায়ু আমাদের নির্দেশ মেনে নেয়। আমরা ভীতির শীতল বরফ গলাতে সক্ষম হই হরমোনের উষ্ণতা দিয়ে।

নিজেদের ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করি আমরা। বাক্যের ওম প্রভাবক এক্ষেত্রে।

‘‘আমি স্বৈরাচাবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস অনুপঠনে মগ্ন। এখন পর্যন্ত যতদূর জানা যায়, সৃষ্টির প্রথম স্বৈরাচারবিরোধী কণ্ঠস্বর হচ্ছে শয়তান– ডেভিল লুসিফার।”

জামিলের কথাগুলো আমাদের ভেতরে শিরশিরে অনুভূতির সঞ্চার করে। সে কি প্রলাপ বকছে? কিন্তু তার মুখে কোনো অপ্রকৃতিস্থ ছায়া নেই। চিন্তাশীলতার প্রভায় প্রদীপ্ত মুখমণ্ডল। তখন আমরা তার কথা নিয়ে মনে মনে নাড়াচাড়া করতে বাধ্য হই। লুসিফারের ডেভিল হবার পটভূমি স্মরণ করার চেষ্টা করি।

প্রত্যাদেশ হলো– “এই মৃত্তিকামানব আমার প্রতিনিধি। তোমরা একে ষাষ্ঠাঙ্গে প্রণিপাত করো।” কিন্তু অনড় দাঁড়িয়ে  রইল লুসিফার, যে পঞ্চাশ হাজার বছর ঈশ্বর নামোচ্চারণ করেছে অন্তহীন ঝর্ণার মতো অবিরল, তার বিনিময়ে অর্জন করেছে স্বর্গদূতদের অধিনায়কত্ব। এই প্রত্যাদেশ তার কাছে ছিল সীমাহীন জ্বালাময়, কারণ সে অর্জন করেছিল আত্মমর্যাদাবোধের অভিজ্ঞতা। তার এই ধৃষ্টতাকে অমার্জনীয় অপকর্ম হিসেবে চিহ্নিত করলেন ঈশ্বর, আর তাকে দিলেন স্বর্গ থেকে অনন্ত নির্বাসন। লুসিফার পেল শয়তানত্ব।

ফারুক আমার আগেই যোগাযোগ স্থাপন করল স্পর্শকাতর বিষয়টির সাথে। জামিলের যুক্তির ভিতকে সে আরও জমাট করতে চাইল ‘‘আসলেই ঈশ্বর তাঁর সমস্ত সদগুণ সত্ত্বেও একজন একনায়ক। তিনি আপিল বোঝে না, বোঝেন শর্তহীন আত্মসমর্পণ। তিনি যদি অঙ্গুলি-নির্দেশ পালনকারী চান তবে রোবট তৈরি করলেই পারতেন। কেন চিন্তাক্ষম প্রাণী তৈরি করলেন?”

আমার মনের ভেতরের অংশ ব্যগ্র-আগ্রহে সম্মতি জানাতে চাইল ওদের কথায়। কিন্তু শিরা বেয়ে শ্বাসনালীতে উঠে এলো দুর্লঙ্ঘনীয় তর্জনী। পুরুষানুক্রমিক রক্তবাহিত সংস্কার। “এভাবে বলা ঠিক না। এভাবে বলাটা যান্ত্রিকভাবে সরলীকৃত।’ অর্থাৎ… “ভুল” শব্দটিকে আমি উহ্য রাখি। তারপর কথাটা আরেকভাবে বৃত্তায়িত করি “এই প্রাচীরের কথাই ধরো। মানবজাতিকে লক্ষ বছর ধরে রক্ষা করে আসছে এই প্রাচীর। সে তো ঈশ্বরেরই অভিপ্রায়ের সদয়তায়।”

“কিন্ত তাহলে তিনি ঐ ধ্বংসদূতদের তৈরি করলেন কেন? কেন এই সভ্যতার প্রতিকূলে দাঁড় করালেন পাশবিক শক্তিকে? মানবজাতিকে সভ্যতার ত্রিলোকগামী অশ্ব বাধাহীন ছোটাতে দিলেন না কেন?”

আমি তখন নিরুত্তর, ভাবি। দেয়ালের ওপারে ধ্বংসদুত নখড় শানাচ্ছে। মানবজাতিকে তার প্রাকৃতিক শিকড়সহ উপড়ে ফেলতে চায়। এই অবিমিশ্র ঘৃণা কে পুঁতে দিয়েছে ওদের মনে? আর কে দিয়েছে লোমকূপে শিহরণতোলা ধ্বংসশক্তি?

আমরা তিনজন আবার নৈঃশব্দ ধারণ করে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকি। ওপারে ধ্বংসদূতদের লক্ষকোটি প্রজন্ম একযোগে ধারালো জিহ্বাকে হাতিয়ার বানিয়ে ক্ষইয়ে চলেছে দেয়ালকে। এই দেয়াল সূর্যাস্ত নাগাদ পরিণত হবে ঠুনকো ব্যারিকেডে। থাকবে শুধু প্যাপিরাসের পুরুত্ব। কিন্তু এখনও ঈশ্বর তাঁর মৃত্তিকা-মানবের প্রতি কিছুটা কৃপাফল্গু প্রবহমান রেখেছেন। তাঁর কৃপাই আবার পরবর্তী সূর্যোদয়ে দেয়ালকে দান করবে পর্বতপুরুত্ব।

এমন সময়ে আমাদের কানে এলো অন্তর্ঘাতের শব্দ।

এই দেয়াল-সন্নিহিত উপত্যকায় আমরা ভিন্ন অন্যকোনো প্রাণীর পদার্পণ ঘটে না। প্রকৃতির অলিখিত নির্দেশে মাথা তোলেনি কোনো উদ্ভিদও। শুধুমাত্র বিরান রুক্ষতা চারপাশে। আমাদের কণ্ঠধ্বনি ছাড়া আর অন্য কোনো উচ্চারণ আমরা শুনতে পাই না। ওপাশ থেকে শুধু ভেসে আসে জিহ্বায় পাথর লেহনের শব্দ। এছাড়া আর কোনো শব্দের উৎপত্তি নিঃসন্দেহে ভিন্ন তাৎপর্য বহন করে।

আমরা মৃগের মতো শ্রবণযন্ত্রকে তৎপর করি। আমাদের শ্রবণস্নায়ু রাডারের মতো শব্দকাতর হয়ে ওঠে। তখন আবার কানে আসে শব্দ। এবারে আমরা শব্দের প্রকৃতি এবং উৎপত্তিস্থলের সম্ভাব্যতা খুঁজে পাই। শব্দটি ধাতব। কোনো ধাতব হাতিয়ার আঘাত হেনেছে দেয়ালের পাথরে। কিন্তু আমরা জানি, ধ্বংসদূতেরা ধাতুর ব্যবহারে অজ্ঞ। জিহ্বা ভিন্ন তাদের আর কোনো অঙ্গ তারা দেয়াল ভাঙতে ব্যবহার করে না। আমরা তৎক্ষণাৎ বুঝে ফেলি, আমাদের প্রজাতিরই কেউ অন্তর্ঘাতকের ভূমিকা পালন করছে। সভ্যতার অগ্রগমনকে গতিহীন করতে চায় কেউ। তারাই পথ করে দিতে এসেছে ধ্বংসদূতদের।

ঘৃণায় আমাদের রক্তস্রোত চঞ্চল হয়ে ওঠে। আমরা আমাদের গতিকে সর্বোচ্চে তুলে ছুটতে থাকি শব্দের উৎসের দিকে।

দুটো বাঁক পেরিয়ে আমাদের চোখ খুঁজে পায় ওদের। আমাদের অনুমান ভুল হয়নি। ওখানে একদল মানুষ। হাতে গাঁইতি শাবল। আমাদের অনুমান সঠিক। তবু আমরা নিজেরা ভাবি, আমরা চাইছিলাম সর্বান্তকরণে, আমাদের অনুমান ভুল হোক। ঘৃণার জায়গায় কষ্টবোধ আমাদের শ্বাসরোধ করে। ওরা মানুষ! এই প্রকৃতির অন্নজলে-বাতাসে ভূমিষ্ঠ-বেড়ে ওঠা মানুষ! এই সভ্যতার সমস্ত সুফল ভোগকারী মানুষ! ওরা কেন স্বজাতির ধ্বংস চায়! যুগপৎ ঘৃণা, ক্রোধ, অবিশ্বাস, দ্বিধা জেগে উঠে কয়েক মুহূর্তের জন্য আমাদের নিক্ষেপ করে জড়ত্বের কবলে। আর তক্ষুনি সেই জড়ত্বের অভিশাপ ভোগ করতে হলো আমাদের। ওদের একজন মাথার ওপরে তোলা গাঁইতি সর্বশক্তিতে নামিয়ে আনল জামিলের প্রতিরোধহীন মাথায়। আরেজন সাঁ করে চালাল হাতের খড়গ। আমরা শুধু একটা সর্বনাশা ঝলকানি দেখতে পাই। পরক্ষণেই দেখি জামিলের জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে কবন্ধ একটি লম্বরেখা। এক মুহূর্ত স্থির। তারপর সভ্যতার আর্তনাদের মতো মাটিতে আছড়ে পড়ল মৃত জামিল। ফারুক ততক্ষণে নিজের হাতিয়ার বের করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। হাতিয়ার তুলতে যাই আমিও। কিন্তু দেখি আমার ডান হাত চরম বিশ্বাসঘাতকতা করছে আমার সঙ্গে। প্রয়োজনের মুহূর্তে সে নিজেকে সঁপে দিয়েছে যেন পক্ষাঘাতের কোলে। এদিকে চোখে পড়ে ফারুকের পিঠ লক্ষ্য করে ছুটে আসছে ধারালো বর্ষার ফলা। আমি বিমূঢ়ের মতো ওটা ঠেকাতে চাই বামহাতে। কিন্তু অনেক ধীর আমার গতি। আমার হাতের প্রতিরোধকে ফাঁকি দিয়ে রক্তলোলুপ ফলাটি আমূল গেঁথে গেল ফারুকের পিঠে। ততক্ষণে আমার মস্তিষ্ক পুরোপুরি কর্মক্ষম হয়েছে। সেই মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্তের সংকেত দিতে পারল সে। আমি সর্বকালের কাপুরুষত্বের রেকর্ড ভঙ্গ করে মুখ ফিরিয়ে ছুটতে লাগলাম লোকালয়ের দিকে। মস্তিষ্কে সাইরেনের ধ্বনি। বিপুলবেগে ছুটছি আমি ঘণ্টা বাজিয়ে রাজপথ চিরে ছুটে চলা ফায়ারব্রিগেডের মতো। লোকালয়ে পৌঁছুতে হবে। সেখানে সতীর্থরা আছে। আছে প্রতিরোধের উপায়।

এই দেয়াল ওঠার পর ইয়াজুজ মাজুজ জাতি তাদের ভাষাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। কেউ কোনো শব্দ উচ্চারণ করে না। ওরা শুধু একটি শব্দ চেনে। জিভ দিয়ে পাথর লেহনের শব্দ। যা তারা নিজেরা করছে। কতদিন ধরে, তার কোনো হিসেব নেই। ওরা সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত আর এই দেয়াল ছাড়া কিছুই চেনে না। শুধু জানে, এই দেয়াল তাদের ভাঙতে হবে। সেই লক্ষ্যে তারা জিভ দিয়ে খুঁড়ে চলেছে দেয়াল। সূর্যোদয়ে শুরু, সূর্যাস্তে বিরাম। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, অযুতাব্দীর পর অযুতাব্দী কেটে গেছে একই কাজে।

লক্ষ-কোটি জিহ্বা কাজ করে চলেছে একই তালে। সূর্যোদয়ে তাদের জিহ্বায় ভর করে অসুরশক্তি। কিন্তু সূর্যাস্তে তারা হয়ে পড়ে নবজাত শিশু কিংবা সঙ্গমক্লান্ত শিশ্নের মতো দুর্বল। ততক্ষণে দেয়াল হয়ে যায় কাগজের মতো পাতলা। আর মাত্র কয়েকবার লেহনের প্রয়োজন। কিন্তু সেই শক্তিটুকুও তখন আর সঞ্চয়ে থাকে না। তারা ঘুমিয়ে পড়ে পরবর্তী সূর্যোদয়ের অপেক্ষায়। সকালে জেগে ওঠে একবুক আশা নিয়ে। কিন্তু দেয়াল আবার আগের মতো পুরু, অভেদ্য। প্রতিদিন দেয়ালের এই পাথুরে প্রতারণা ওদের হতোদ্যম করে না। বরং বাড়তি ঘৃণা জাগায়। দ্বিগুণ উত্তেজনা এবং সংকল্পে ওরা আবার জিভ লাগায় দেয়ালে।

আজকের সূর্যোদয় ওদের কাছে অন্যরকম মনে হলো। সূর্য যেন লালচে রঙের হাসি ছড়িয়ে দিচ্ছে। ওদের ভেতর ধর্ষকামী রিপু জ্বলে উঠল বহুগুণ তেজে। এই রিপু ওদের চিরচেনা। জন্মমুহূর্তে ওরা এই রিপুতে আক্রান্ত হয়। এই রিপুই ওদের কর্মশক্তির অফুরন্ত জ্বালানি-উৎস। সূর্যের ধনাত্মক ইশারায় ওদের জিভ ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রতারক দেয়ালের গায়ে।

হঠাৎ দেয়াল পেরিয়ে এলো অচেনা এক শব্দ। ইয়াজুজ মাজুজ জাতি একটু থমকে দাঁড়াল। এ কি কোন নিষেধাজ্ঞা? নাকি এগিয়ে যাবার প্রত্যাদেশ? দ্বিধা ওদের কাজে এনে দিল সাময়িক বিরতি। কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই চিরচেনা রিপু আরও বর্ধিত শক্তিতে কামড় বসাল ওদের বুকে। উবে গেল সমস্ত দ্বিধা-সন্দেহ। ওরা আবার বিপুল উৎসাহে শুরু করল দেয়াল-লেহন। ভিন্নপার থেকে শব্দটা আসছে নিয়মিত। সেটা ছাদপিটানো গানের মতো উৎসাহিত করে চলল ওদের। যেন ডাকছেÑ ইয়াজুজ মাজুজ এসো! এসো ধ্বংসদূত! এসো!

এদিকে সূর্য একপাশ থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো আকাশের আরেক পাড়ে। বিদায়ী ডুব দেবার আগে ঝুলে রইল কিছুক্ষণ। যেন একচোখে তাকিয়ে আছে বিদ্রƒপের ভঙ্গিতেÑ “আজকেও ব্যর্থ হলে তোমরা!” সূর্যের এই নিরস বিদ্রƒপ ওদের ভেতরের বহ্নিকে উসকে দিল আরও। কিন্তু সূর্যাস্তে তারা শক্তিহীন, নিরূপায়।

হঠাৎ শত শতাব্দীর স্তব্ধতার পর্দা ছিঁড়ে বেজে উঠল বিস্মৃত ভাষা, একজন তরুণ ইয়াজুজ মাজুজের গলায়Ñ “পরবর্তী সূর্যোদয়ে আমরা সফল হবো! ঈশ্বরের অভিপ্রায় হবে। দেয়াল আর প্রতারণা করবে না।”

লোকালয়ে পৌঁছে দেখলাম চারদিকে সুপ্তির আদিগন্ত বিছানো গহন ঘোর। আমার কাঁপা কাঁপা চিৎকার শুনে দুয়েকটা ঘরে ঘুম ভেঙে কেঁদে উঠল কোল-আশ্রিত শিশুরা। তাদের কান্নায় আলো জ্বলল ঘরগুলোতে। হাতের উল্টোপিঠে চোখের ঘুম মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলেন অধিনায়ক।

“আমাদের প্রতিরোধী সতীর্থদের পূর্ণ প্রস্তুতির আহ্বান জানান!” আমার গলা থেকে আর্তি ঝরল বার বার।

তবু তিনি পুরোপুরি সজাগ হলেন না। আমি অন্তর্ঘাতকের কথা বললাম। জামিল আর ফারুকের পরিণতির কথা বললাম। অধিনায়কের ক্ষোভ তখন অধিনায়কোচিত। তবু প্রতিরোধ প্রস্তুতিতে তাঁর দ্বিধা। ইতস্তত করে বললেন “তুমি গৃহে যাও। পরবর্তী সূর্যোদয়ে আমরা কর্মপন্থা স্থির করব।”

পরবর্তী সূর্যোদয়ে ইয়াজুজ মাজুজের প্রথম দল দেয়াল অতিক্রম করল। রুক্ষ উপত্যকা এবং অনুচ্চ পর্বতশ্রেণী ডিঙিয়ে তাদের সামনে পড়ল সোহার্দ্য নামক জনপদ। তাদের ধর্ষকামের প্রথম লক্ষ্যবিন্দুতে পরিণত হয়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সৌহার্দ্য বিলুপ্ত হলো মানবজাতির মানচিত্র থেকে।

দ্বিতীয় দলটি এগুল আরও সামনে প্রথম দলকে পাশ কাটিয়ে। তাদের সামনে পড়ল মানবজাতির সবচেয়ে গর্বের হ্রদ। নাম ‘গণতন্ত্র’। ইয়াজুজ মাজুজরা তাদের রেচন ও অন্ত্রের যাবতীয় বর্জ্য ঢালতে লাগল হ্রদে। আগ্নেয় লাভা যেমন নিমেষে তরলতা ধ্বংস করে জমাটত্বে বন্ধ্যা বানায় জলাশয়, তেমনি তাদের বর্জ্য চিরতরে বুঁজিয়ে দিল হ্রদকে। মানবসভ্যতার সবচেয়ে গর্বের বস্তু বাষ্প হয়ে মিলিয়ে গেল বাতাসে।

ইতোমধ্যে প্রথম দলটি এসে পৌঁছুল। এখানে তাদের ধ্বংস করার মতো অবশিষ্ট ছিল না কিছুই। দুই দল একত্রে জান্তব শীৎকারে আদিগন্ত কাঁপিয়ে অগ্রসর হলো সামনের দিকে। তাদের লক্ষ্য এখন একটি চিরহরিৎ অভয়ারণ্য। তার নাম মানবতা।

তাদের হুংকারে একযোগে আর্তনাদ করে আকাশে উড়ল লক্ষ লক্ষ পাখি। অভয়ারণ্যে পাখিরা এই প্রথম টের পেল অচেনা এক অনুভূতিÑ ভয়। ইয়াজুজ মাজুজের দল প্রথমে আসুরিক বাহুর ঝাঁকুনিতে পত্রশূন্য করল বৃক্ষগুলোকে। নিমেষে চির বসন্তের বনে নেমে এলো শীতের রিক্ততা। তারপর শেকড়সহ উৎপাটিত করল শুধুমাত্র দানমন্ত্রে জন্মদীক্ষিত বৃক্ষগুলোকে।

এবার দুইদল ইয়াজুজ মাজুজ ছুটে এলো আমাদের প্রতিরক্ষাব্যূহের দিকে। আর এই সময়ে আমরা বিমূঢ় হয়ে দেখলাম, আমাদের মানবব্যূহের মধ্যে সৃষ্টি হলো বিশাল বিশাল ফোঁকড়। কিছু লোক ত্বরিতে সরে গেছে ব্যূহ ছেড়ে। ওরা নিজেরাই খুবলে খুবলে তুলছে নিজেদের মুখের চামড়া। আসলে সেগুলো ছিল মুখোশ। মুখোশ সরাতেই প্রতিভাত হলো তাদের আসল চেহারা। তৎক্ষণাৎ আমি চেঁচিয়ে উঠলাম সক্রোধে। কারণ আমি চিনতে পেরেছিÑ এরাই সেই অন্তর্ঘাতক।

আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইলাম ওদের ওপর। কিন্তু অধিনায়কের ইস্পাত কঠিন নিষেধাজ্ঞা আমাদের পা-গুলোকে গেঁথে রাখল একই অবস্থানে। আর অন্তর্ঘাতকের দল আমাদের ক্ষোভ লক্ষ করে ছুঁড়তে লাগল বিদ্রƒপ আর ব্যঙ্গ। এরপর তারা উপত্যকা পেরিয়ে এগিয়ে গেল সামনে। ঝটপট তৈরি করল একটা স্বাগত তোরণ। নিজেরা সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়াল দুই সারিতে। মাথা নত করে বিনীত ভঙ্গিতে গাইতে শুরু করল অভিনন্দনের গান। ইয়াজুজ মাজুজের উদ্দেশ্যে।

গতি বিন্দুমাত্র না কমিয়ে এগিয়ে এলো ইয়াজুজ মাজুজের দল। অন্তর্ঘাতকেরা অপেক্ষা করছে মুখে চওড়া হাসি নিয়ে। সহযোগিতার পুরস্কার কামনায় রতিউন্মুখ তরুণীর মতো। তোরণের কাছে এসে হঠাৎ অতিকায় ডাইনোসরের আকৃতি ধারণ করল ইয়াজুজ মাজুজের দল। তাদের পায়ের চাপে নিমেষে ধূলিস্মাৎ হলো তোরণ। যারা মাথা নত করে গাইছিল অভিনন্দনগীতি, তারা পিষ্ট হলো মাথা তোলার আগেই। যারা এখনও বেঁচে আছে, তাদের মুখের হাসি মুহূর্তে পরিণত হলো ভীতিতে। কেউ কেউ পেছন ফিরে ছুটতে লাগল আমাদের দিকে। কিন্তু কয়েক ধাপ এগিয়েই থমকে দাঁড়াল। কারণ মনে পড়ে গেছে, আমাদের মাঝে আর তাদের ঠাঁই নেই।

ইয়াজুজ মাজুজের দল ওদের দিকে এগুল।

আর আমরা আমাদের জানবাজি রাখা যুদ্ধ শুরুর পূর্বমুহূর্তে ফেটে পড়লাম প্রাণখোলা অট্টহাসিতে।

জাকির তালুকদার। বাংলাদেশের শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক ও চিকিৎসক। জন্ম ২০ জানুয়ারি ১৯৬৫, বাংলাদেশের নাটোরে। পিতা জহিরউদ্দিন তালুকদার ও মাতা রোকেয়া বেগম। এমবিবিএস ছাড়াও স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা, পেশায় চিকিৎসক। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ: গল্প: স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ (১৯৯৭), বিশ্বাসের আগুন (২০০০), কন্যা ও...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..