স্বপ্নটা কল্পনার

শাম্মী তুলতুল
গল্প
Bengali
স্বপ্নটা কল্পনার

চশমাটা কার?

কোন চশমাটার কথা বলছো?

বিছানার একপাশে পড়ে থাকা চশমাটা আগে খেয়াল করেনি কুহু; এতক্ষণে খেয়াল হয় তার, আমি কি করে বলব; কোন ছাত্র ফেলে গেছে হয়তো।
আমি যেদিন থাকিনা সেদিন কারা, কারা পড়তে আসে তোমার কাছে বলতো?

যা বলার স্পষ্ট করেই বল মিহির। কারা পড়তে আসে তুমি ভাল করেই জানো।

অনেক বড় একটা ফ্ল্যাট তাদের। দুইজনের বসবাস, কিন্তু মিহির নিয়মিত না। বড় একটা গেস্টরুম আছে। সেখানে বসেই কুহু ছাত্র ছাত্রী পড়ায়।
তাদের ঘিরেই কুহুর দিন যাপন।

অনেকক্ষণ পর কুহূ বলল, আবদিরে হতে পারে চশমাটা।

আবদি? আবার এসেছিল এই ছেলে? এখন তাহলে বছিানা পর্যন্ত গড়িয়েছে।

ছিঃ মিহির। দয়া কর আমাকে। পরীক্ষাটা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। সামনে ওর ফাইনাল পরীক্ষা। পক্ষ নেওয়াতে হাতে যা পেল তাই ব্যবহার করলো। সমস্যা নেই। কুহু অভ্যস্থ এতে।

মেয়েদের জীবন অভিনয়ে ভরা; মান সম্মান বজায় রাখার জন্য সমাজে তারা মিথ্যে অভিনয় করে বেড়ায়। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত গৃহিনীদের যতই গালে চড় থাপ্পড়ের দাগ থাকুক না কেন ভ্রু কুচকে হেসে বলতেই হয়, আর বলবেন না বাচ্চারা হাতে যা পায় তাই ছুড়ে মারে। কারণ আমরা মিসেস মিহির, মিসেস রহমান, মিসেস চৌধুরী- এসব নামে খ্যাত। এই নামগুলো অসম্মান করা যাবে না। স্ট্যাটাস নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু তৃনমূল পর্যায়ে রহিমন, করিমনরা এসব তোয়াক্কা করে না। প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। ভাল মানুষের শয়তানরুপী মুখোশ খুলে দেয়।

বিন্দু বিন্দু ভালবাসার সৃষ্টি মিহিরের প্রতি। ক্লাসে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতো। আমি মাঝে মাঝে খেয়াল করতাম। সময় অসময়ে জলপাখী ডাকতো। ভালই লাগতো। প্রথমবার ছিল দুষ্টমী, দ্বিতীয়বার পছন্দের মালা গাঁথি। তৃতীয়বার ভালবাসার দরজা খুলি।

আমাদের মধ্যে হাজার ঝড়- তুফান আসুক আমরা কেউ কাউকে ছাড়বো না কুহু। একে অপরকে ভুল বুঝবো না। ভালবাসার চাইতে বন্ধুত্ব থাকবে বেশি। সব কিছু আমরা ভাগাভাগি করবো। আমাদের বন্ধুত্ব, ভালবাসা হবে পৃথিবীতে সর্বশ্রেষ্ঠ। আমরা ইতিহাস গড়বো। হা হা হা। মিহিরের হাসিতে সেদিন বিশ্বাসে বুক বেঁধেছিলাম। বুঝতে পারিনি হাঁসিটা ছিল নিছক মজা করা।

না বুঝে আমিই সব ভাগাভাগি করলাম। কত বোকা আমি।

গ্লাস ভাঙ্গার শব্দ শুনে কুহু সম্বিত ফিরে পায়, ভাবনার জগৎ থেকে বাস্তবে ফিরে আসে।

আপা আমি খেয়াল করিনি।

সমস্যা নেই বুয়া। কাজ শেষ হলে চলে যেতে পারো।

জি, আচ্ছা।

কিছু খাবে মিহির?

না খাবো না।

কিছু বলবে?

কি অবস্থা তোমার?

শরীর না মনের কথা বলছো?

ভালো করেই জানো কি জানতে চাচ্ছি।

চেষ্টা চলছে।

টেবিল চাপড়ে মিহির বলল, তোমরা সবার চেষ্টা আর শুনতে ভাল লাগছে না।

কুহু বুঝল রতন দারও তাহলে একই অবস্থা। শরীরের ক্ষুধা মিটানো আর বীজ বপনের চেষ্টা। ভালবাসার লক্ষণ নেই।বার বার শুধু পৌরশত্তের মহান কাজটি করে মিহির চলে যায়। এইকাজে তার র্গবরে শেষ নেই। মিহির চলে যাওয়ার পর কুহু বারান্দায় বসে। বাইরে পূর্ণিমার আলো।চাঁদটাকে অনেক কাছে মনে হচ্ছে তার। পূর্ণিমার আলোয় কুহুর চোখে ভেসে উঠলো আবার সেই পুরনো জং ধরা সৃতি…

শুনো আজ রাতে ঘুমানো যাবেনা। সারারাত পূর্ণিমার আলো দেখে কাটিয়ে দিবো।

ধ্যাত, কি যে বলনা তুমি। আমি অসুস্থ। এত রাতে খারাপ বাতাস গায়ে ভর করবে।

আরে তুমি আবার এসব বিশ্বাস করো কবে থেকে? হা হা হা। কিছু হবেনা। এসো। আমি এসব ভাবিনা। নতুন কেউ আসলে আসবে না আসলে নাই। তুমি হলে আমার চলবে। তোমাকে নিয়েই আমার জগৎ। তোমার শাড়ির আঁচলে আমার শান্তি। তোমার কোলে আমার স্বর্গ।

চিকচিক করছে কুহুর চোখ। চিরতার পানি খেতে খেতে দোলনায় দোল খায় আর ভাবে। সরকারী মেডিকেল কলেজ থেকে ভালো ফলাফল করলাম। চাকরীও হলো সেখানে। বিনামূল্যে রোগীর সেবা করবো এই ভেবে সামনে এগোচ্ছিলাম। কিন্তু মিহিরের অফুরন্ত ভালবাসার কথা রাখলাম। কত সতী সাধ্বী নারী, নিজের শখ ইচ্ছা অনিচ্ছাসত্বেও শুধু বিছানায় বিসর্জন দিলাম। তাতে কি উল্টো দিন দিন সন্দেহের পাত্রী হয়েছি। অতচ নিজেকে আগলে রাখছি যত্নে। যতো চেষ্টা তার একটু ভালোবাসার জন্য। এই যে চিরতার পানি নাক টিপে পান করছি তারই জন্য। শুধু শুধু নিজেকে মিথ্যে শান্তনা দিচ্ছি। পেটে সন্তান ধরতে পারছি না। দোষটা কার সেটা খুব ভাল জানে সে। মানতে চায় না। এই বাহানায় নারীদের ভক্ষণের সুযোগ হাতছাড়া করেনা সে। নিজের কথা কোনদিন ভাবিনি। কিন্তু উচিত ছিল। উচিত ছিল একাকিত্ব দূর করতে হাল বের করা। জীবন যখন ভরে গেছে দিন-যাপনের গ্লানিতে, মন খুলে হাসতে ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু হাসতে চেষ্টা করছি, ভাবতে চাই ভালো আছি। চলতেতো হবে। বাকী পথটুকু পাড়ি দেওয়ার জন্য শক্তি দরকার। মাঝে মাঝে ভাবি গভীর কুয়োর মধ্যে পরে হাবুডুবু খাচ্ছি। অন্ধকার হলে ভয় পায়। সারারাত জেগে থাকি সকালের অপেক্ষায়। কখন সকাল হবে, কখন অন্ধকার দূর হবে। কিন্তু লাভ নেই, অন্ধকার ঘুরে ফিরে আসবেই। অন্ধকার পাশে এসে জানান দেয় এটাই তোমার ঠিকানা। প্রতিদিন এমন করেই আমার দিন রাত কাটে। ভাগ্যিস পড়ানোর অনুমতি ছিল বলে। নয়তো নিজেকে চিড়িয়াখানার জন্তু মনে হতো। এসব ভেবে ভেবে রাত শেষ হয় প্রতিদিন আমার। সকাল বলো দরজা খোলাই ছিল। মাত্র গোসল সেরে ড্রয়িং রুমে বসলাম। দরজায় চোখ পড়তেই দেখলাম আবদি দাড়িয়ে।

ম্যাডাম আসবো?

আবদিকে দেখতেই তরিঘরি করে তোয়াল দিয়ে বুক ঢাকলাম।

এসো আবদি। বস।

ম্যাডাম আমার কিছু অংক মিলাতে পারছি না। তাই সকাল সকাল আপনাকে বিরক্ত করলাম।

পড়ন্ত অবেলায় হঠাৎ আবদি বলে উঠল, এত সুন্দর কেন আপনি? কেন এতো কিছু সহ্য করেন? আপনি চাইলেতো…

আমার বড় বড় চোখ দেখে আবদিরে কথা মাঝখানে থেমে যায়। জানতাম ওর দূর্বলতা। ওর চোখদুটো অনেক আদরের, চশমার ভিতরেও ওর চোখের ভাষা আমি বুঝতে পারি।

ৱবললাম, ওসব তুমি বুঝবেনা। পরিস্থিতি অনেককিছু বাধ্য করে মানুষকে। জীবনের অনেক চাওয়া পাওয়া সব সময় পূরণ হবে এমন কথা নেই। ঝড় আসবে বলে ঘর থেকে পালাতে হবে? তাকে প্রতিরোধের চেষ্টা করতে হবে।

আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলল,  ঝড়ে যদি সেই ঘর ভেঙ্গে পড়ে ম্যাডাম, তখোনো কি আপনি আত্মরক্ষা করবেন না?

ওর কথা শুনে আমি আর কিছুই বলতে পারলাম না। ফ্যাল ফ্যাল করে ওর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। একদম বকা বনে গেলাম। আবদি চলে যাওয়ার পর ওর কথাগুলো মাথায় কাজ করছিলো বার বার। বড় বড় বুলি দিয়ে মনকে বোঝানো অনেক সহজ। কিন্তু বাস্তব কঠিনই। সত্যিতো ঠিকই বলেছে ও। কলিং বেল এর শব্দ শুনে মাথার কাজ বন্ধ হয়ে গেলো কুহুর। দরজা খুলতেই মিহির। ঘরে ডুকইে বলে চলো ডাক্তাররের কাছে।

বললাম, আজ থাক। শরীরটা চলছে না।

বুকে সাহস নিয়ে ভয়কে আজ কাছে ঘেঁষতে দিলাম না। এই প্রথমবার মিহিরকে না করলাম। শরীরের ওপর অত্যাচার আর না। যাই হোক। আজকে আমার এই সাহসের প্রশংসার দাবিদার আবদি। প্রাণপণ চেষ্টাই নিজেকে সামলালাম। হাত নামক অস্ত্রটা ব্যবহার করে মিহির চলে যায়।

মিহিরকে না বলতে পেরে আজ কুহুর সব কিছু ভাল লাগতে শুরু করলো।

পরদিন আবদি পড়তে এলে কুহু তাকে দেখে মিষ্টি একটা হাসি দিলো।

আবদি ম্যাডামকে হাঁসতে দেখে খুব অবাক হোল। এই প্রথম ম্যাডামকে হাঁসতে দেখল সে।

কুহুর মন ভালো আছে তা বুঝতে পেরে আবদি বলল, সারাদিন ঘরে বসে থাকেন। চলেন বাইরে ঘুরে আসি। যাবেন?

আবদি আমাকে অনেক বার এ প্রস্তাব দিয়েছিলো। আমিতো আবার সতী সাধ্বী। সুযোগ দিতাম না। এড়িয়ে যতোম। কিন্তু আজ ভিতরটা জেগে উঠছে। জিদও কাজ করছে। ওর কথায় যেন আমি জেগে উঠছি নতুন করে। ওর চোখের দিকে তাকাতেই পারছি না। সেটা আবেগে নয় লজ্জায় কারণ আমার গালে চড়ের দাগ।

যাবো।

সত্যি যাবেন?

আবদিরে উচ্ছাসিত চোখ। মনে হলো হাজার বছর ধরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিলো সে।

বাইরে একটা মিহি বাতাস বইছে। আবদিরে মতামতেই আজ শাড়ী পড়েছি। সময়টা আজ শুধু ওর। নতুন কিছু আবিস্কারের আশায় নেমে পড়লাম। বেজায় খুশি আমরা। মোটর সাইকেলে চড়ে পুরো বিশ্বটাকে হাতের মুঠোয় নিলাম। কখোনো পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরছি। কখোনো পানিতে ভাসছি। দুজনে ছুটছি আনন্দ আর ভয়ের মাঝখানে। মনের মাঝে উঁকি দেওয়া ভয় ছুড়ে ফেলতে চেষ্টা করলাম। নিরবে সাহস যোগালো আবদি আমাকে। সময় কে ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা। হায়, সময় তুমি থমকে দাড়াও। আজকের দিন তুমি সঙ্গী হও। আর কখনো মিনতি করবোনা তোমার কাছে। তুমি যা চাও তাই পাবে। আমি আবদিরে কাধটা আরো শক্ত করে হাত দিয়ে চেপে ধরলাম। আবদিও আমাকে পরম ভালোবাসায় নিজেকে ছেড়ে দিলো। সারাদিন আমাকে আগলে রাখল। জীবনের সব দিন শুধু সাদা- কালো নয়, রঙিনও হয় আজ উপলব্ধি করলাম। সন্ধ্যা হয়ে এলো। আনন্দের অবসান হল।

আমি বিদায় নিয়ে উপরে উঠতেই আবদি আমার হাত টেনে কাছে নিয়ে এলো। দুজন মুখোমুখি হলাম। আমি তার শরীরে মিশে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকালো। বিদ্যুৎ চমকানোতে হুশ ফিরল। আমি সতী সাধ্বী হয়ে গেলাম। মিহিরের মিথ্যে জলপাখী হয়ে আবদিকে দূরে ঠেলে দিলাম। জানি এখানেও আরো বেশি ধ্বংসের আবাস ভেসে আসছে…

 

সম্পাদনা: জোবায়েন সন্ধি

শাম্মী তুলতুল। ঔপন্যাসিক ও শিশু সাহিত্যিক। জন্ম বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহরে। শাম্মীর নানা ডাক্তার কাজী এজহারুল ইসলাম ছিলেন দৌলত কবির বংশধর। নানি কাজী লতিফা হক ছিলেন বিখ্যাত বেগম পত্রিকার লেখক ও গীতিকার। অপরদিকে দাদা আলহাজ্ব আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন সুপরিচিত লেখক,...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

মায়াবাড়ি

মায়াবাড়ি

‘বের হয়ে যাও আমার বাসা থেকে…’ স্পষ্ট, চাবুকের হিসহিস শব্দের মতো কণ্ঠ! বাবুই চমকে তাকাল।…..