স্বরভঙ্গির কাব্যতত্ত্ব ও মুরাত নেমেত-নেযাত (শেষ পর্ব)

রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়
অনুবাদ, প্রবন্ধ
Bengali
স্বরভঙ্গির কাব্যতত্ত্ব ও মুরাত নেমেত-নেযাত (শেষ পর্ব)

পূর্ব প্রকাশের পর…

একাদশ। কবি হওয়া নাকি অননুশাসনীয় কাব্যতত্ত্বের পাঠক হওয়া

মার্কিন কাব্যতত্ত্ব অসামাজিক, তাই অননুশাসনীয়। আমি বলছি না অনুশাসন পরিবর্তন করতে, যার ফলে ক্ষমতার আর এক নতুন কাঠামো তৈরি হবে; ধারাবাহিকতাহীন মানে অননুশাসনীয়। আমি এখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নীতি প্রয়োগ করতে চাই। যখনই কোনো শৈলী বা কবি অনুশাসিত হয় এবং যার ফলে সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে স্থানলাভ করে তখনই সেই শৈলীর ভাষা নিগ্রহ ও ক্ষমতার মধ্যবর্তী চাপ হারিয়ে ফেলে এবং মার্কিনত্ব হারায়। মার্কিন ইংরেজিতে কবিতা লেখা কোনো বানিজ্য বা সমবায় প্রথা নয় যা কোনো বিশেষ স্কুল বা কমিউনিটিতে শেখানো যায় (যা সম্ভব সিনেমা বা টিভির ক্ষেত্রে), বরং এ এক টিকে থাকার ব্যক্তিগত লড়াই।

মার্কিন কবিদের লেখা পড়া তাই নিশ্চিতভাবেই ভাষার এক সারি স্বতন্ত্র, বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিগত কুশলতার অনুসরণ। ইউরোপীয় অর্থে মার্কিন কবিতায় ঐতিহ্য হল এক অলৌকিকতা। এমনকী একজন ‘নব্যতর’ ফরাসী বা ব্রিটিশ লেখক একদিন ‘ক্লাসিক’ লেখক হবার আশা নিয়েই লেখেন। ভবিষ্যতের কথা ভাবা কিংবা প্রথাগত অর্থে অতীতের কথা ভাবা, ধারাবাহিকতার চিন্তা হল একজন মার্কিন কবি বা সমালোচকের ধ্বংসপ্রাপ্তি। সুতরাং অ্যাকাডেমিক শৈলীর গুরু জেব্‌স বা দেরিদা, এক নতুন অনুশাসন তৈরির যন্ত্র, যা একজন মার্কিন কবির কাছে একেবারেই প্রাসঙ্গিক নয় যদি না তিনি আক্রান্ত হওয়ার শোচনীয় লক্ষ্য হন।

হ্যারল্ড ব্লুমের প্রভাবজনিত উৎবেগের দৃষ্টান্ত, ভাষা সংক্রান্ত পিতা-পূর্বসুরীর সঙ্গে কবি সংগ্রাম করছেন, এ ধারনা ভুল। অ্যালেন গিন্সবার্গ বা হুইটম্যান ছাড়া আমি এমন কোনো মার্কিন কবির কথা জানি না যিনি যথার্থ মৌলিক লেখা লিখেছেন পূর্ববর্তী লেখককে ফুলেল করে তুলতে। মূলত ডিকিন্‌সন, হাওথর্নে, মেলভিলে, স্টেইন, রেযনিকফ্‌, যুকোফ্‌স্কি, ক্রিলি বা অ্যাশবেরির কোনো মার্কিন শুরু বা শেষ নেই। চারপাশে একটা নতুন অনুশাসন তৈরি করার সমসাময়িক প্রচেষ্টা, উদাহরণস্বরূপ, মেরি রাওল্যান্ডসন, জোনাথন এডওয়ার্ড, ডিকিন্‌সন ও স্টেইনের লেখার যে চেহারা তৈরি করা হয় তাতে করে এঁদের কাজকে ভুল বোঝা হয়। ডিকিনসন বা অন্য কবির লেখায় যে স্বরভঙ্গি (সুসান হোয়ে যাকে বলেন “দ্বিধা”) তার পুনর্গঠন করা সম্ভব নয়, তা সম্পূর্ণভাবে স্বকীয়। স্টেইন-এর পুনরাবৃত্তি বা অ্যাশবেরির সুললিত সম্প্রসারিত বোধি হল ভাষাগত এক যন্ত্র যা পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের দায়িত্ব প্রদান করে কাব্যিক ঐতিহ্যকে ফুলেল করতে, তা বিপথগামী হচ্ছে। এগুলো মার্কিন কবিদের স্বকীয় ও ব্যক্তিগত সমাধান ও স্বরভঙ্গির ফাঁদে আটকে ফেলে যা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা যায় এবং অন্য কবিদের জন্য আংশিকভাবে তা কার্যকর। কবিদের যা একত্র করে তা হল ভাষার সঙ্গে তাঁদের অপরিবর্তনীয়, মুখোমুখি আক্রমনাত্মক সম্পর্ক। তাঁদের কেউই নিজের মাতৃভাষায় লেখেন না এবং নিজের স্বরভঙ্গি করে তোলার জন্য ভাষাকে বিকৃত করতে হয়।

দ্বাদশ। কবিদের মধ্যে স্বরভঙ্গিজাত সম্পর্ক: তাহলে কি কোনো প্রভাব নেই?

ক্রিলি জুকোফ্‌স্কিকে “আমাদের সকলের শিক্ষক” বলে মনে করেন, কিন্তু ক্রিলি জুকোফ্‌স্কির কাব্যিক শৈলী অনুকরণ বা সম্প্রসারিত করেননি। তিনি তাঁর নির্মাণের মধ্যে দ্বিধা, দুর্বলতা (স্বরভঙ্গির) তৈরি করে এর ভিত নাড়িয়ে দেন। ক্রিলি জুকোফ্‌স্কির কবিতাপাঠে তাঁর পঙ্‌ক্তি বিভাজনে রাখা বিরতিকে শুনতে ভুল করেছিলেন। জুকোফ্‌স্কির কবিতায় (“Songs of Degrees”-এর মতো গীতিকবিতা) তা করতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে তিনি এর শব্দের নির্মাণকৌশল (অত্যধিক বিরতি চিহ্ন যুক্ত করে) ভেঙে ফেলেছিলেন। পঙ্‌ক্তিশেষে ধ্বনির দ্বিধা (সিনট্যাক্স যেমনই হোক না কেন) ক্রিলির কাব্যিক শব্দের মূল, তাঁর আক্রান্তপ্রবণ অন্তরঙ্গতার শক্তি। মূলত জুকোফ্‌স্কির সঙ্গে ক্রিলির স্বরভঙ্গি বিরুদ্ধতার সম্পর্ক। তিনি জুকোফ্‌স্কির কাছ থেকে যা শিখেছিলেন তা হল, তাঁর জন্মগত ভাষা, ইংরেজিকে তার ধ্বনির সামান্য বিমূর্তিত কাঠামো দিয়ে এক অচিন ভাষায় পরিণত করা, যা তিনি উপলব্ধি করতে পারেন, যেখানে তিনি অনুপ্রবেশ করতে পারেন। জুকোফ্‌স্কির কাছে তিনি যা শিখেছিলেন তার নাম মার্কিন ইংরেজি।

বিদেশী জুকোফ্‌স্কি গোঁড়া ক্রিলিকে ইংরেজি শেখান এক বিদেশী ভাষা হিসেবে তার গঠন ও কাঠামোর ক্ষমতা সম্পর্কে, যা সম্পূর্ণরূপে ক্রিলির নিজের ছিল না। তাঁর নিজস্ব দুর্বলতাগুলো, দ্বিধাগুলো সংযুক্ত করতে ক্রিলি জুকোফ্‌স্কির শক্তিশালী ধ্বনি নির্মাণশৈলীকে উপড়ে ফেলেন। ক্রিলির কাছে জুকোফ্‌স্কি এক পরদেশি, যা বাইরে থেকে তাঁর প্রথমজীবনে লেখা কবিতা For Love –এ প্রকাশিত দৃষ্টিকটু কদর্যতা, মেল-শভিনিজমকে মোলায়েম করে তোলে। তাকে দেয় দ্ব্যর্থকতা ও বাহুল্যহীনতা, ভেতরের নারীবিদ্বেষচালিত ক্ষমতার মুখ ঘুরিয়ে দেয় এক আক্রান্তপ্রবণ ও বিষাদসিক্ত ভাষার দিকে।

ত্রয়োদশ। নামহীনের ভাষাই নিগৃহীতের সংগীত

মার্কিন কবিতায় ভাষার পিতা (ঐতিহ্য) ও মাতা (অন্তরঙ্গ ও উদ্দীপক শব্দের ভাষা) বিচ্ছিন্ন হয়। এই সংঘাত মার্কিন কবিতাকে অস্বীকৃত বলে (সামাজিক ও আধ্যাত্মিকভাবে) আক্রমণ করে। নামহীন কী, বলতে সর্বদাই বোঝায় তার ভাষার শরীরে, বস্তুগত সংগীতে কী নেই। দুর্বলতার ভাষা নামহীনতার ভাষায় গোঁড়া পক্ষপাত থাকা উচিত, “কবরিত শব্দের বন্দনা কোরো না”। শব্দের প্রতি কবিদের স্বাভাবিক প্রেম, শব্দের শরীরিকতা সন্দেহভাজন, তাকে সংযত করা আবশ্যক।

শব্দের সংগীত (তাদের নমনীয়তা) হল ঐতিহ্য। শব্দের মধ্যবর্তী সঙ্গীত বাইরের ভাষা, নামহীন। সেই কারণেই ক্রিলি যাঁকে নিখুঁত কর্ণাধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করেন সেই জুকোফ্‌স্কি স্বর-বধির হতে বাধ্য। সেই কারণেই সর্বশ্রেষ্ঠ মার্কিন কবি ডিকিন্সনের কবিতায় উদ্ধৃতিযোগ্য, শারীরিকভাবে মনোরম পংক্তি এত কম। মার্কিন কবিতা অ-সাংগীতিক, ময়ূরের মতো শারীরিক সিদ্ধি অর্জন করতে পারে না। আবার একবার হুইটম্যান আমার থিয়োরির বিপরীতে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেন।

মার্কিন কবিতা (এবং কবি) সর্বদাই শব্দের মধ্যবর্তী স্পেসে আবদ্ধ থাকেন, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যবহৃত ভাষার মধ্যবর্তী ফাটলে, স্বীয় আত্মা ও তাঁর ভাষার বিচ্ছিন্নতার মধ্যে (সাংস্কৃতিক ঐক্যকে যা বাধা দেয়)। তাঁর আত্মা তখন বিরাজ করে অন্য কোথাও। তাই যদি তিনি অন্য কবির দ্বারা প্রভাবিত হন, তবে সেই কবি প্রায়শই অন্য ভাষার, ফরাসি, ভারতীয়, তুর্কি, জার্মান, স্প্যানিশ, জাপানি ইত্যাদি। অথবা প্রায়শই দেখা যায় প্রভাব আসে অন্য মাধ্যমের, কিউবিজম বা পেন্টিং-এর বিমূর্ততাবাদ, জ্যাজ, ফটোগ্রাফি, সিনেমা, টিভি ইত্যাদি। মার্কিন কবিতা হল অন্য ভাষা বা মাধ্যম বা উভয় থেকেই অনুবাদের এক অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় মূল ভাষা (চীনা, ফরাসি, ভিয়েতনামী, তুর্কি, রোমানিয়ান, রাশিয়ান, স্প্যানিশ, ইত্যাদি) বা তার নান্দনিক দর্শনগুলি কোনো যাজকতন্ত্র বা ধর্মতন্ত্র মানে না, কিন্তু একই স্তরে বিরাজ করে। কোনো ভাষাই অন্য ভাষার থেকে উচ্চতর নয়। পরাবাস্তবতা আর প্রাসঙ্গিক নয় সুফিবাদ, বিনির্মাণবাদের থেকে, জেনতত্ত্ব নৃতত্ত্ববাদের থেকে, খোদিত সংকেত ফটোগ্রাফির থেকে, কবি ইউনূস এমরে, জিবিগনিয় হার্বার্ট, জেভিয়ার ভিলৌরোশিয়া আর্থার রিমবদের থেকে।

আমি মনে করি মার্কিন ইংরেজি হল ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ নিরপেক্ষ। এমিলি ডিকিন্‌সনের চেয়ে বেশি স্পষ্ট আর কোথাও নয়। তাঁর কবিতায় সূর্য, পিতা, শিকারি, তিনি, ঈশ্বর (কর্তৃপক্ষের ইমেজ) ইত্যাদির অর্থ কী? কিছুই নয়। তারা মূলত ফাঁকা প্রতীক, মোবি ডিকের সারি, তাদের ঐতিহ্যগত অনুষঙ্গ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিছিন্ন, যার চারপাশে কবি তাঁর কোনোমতে পাঠোদ্ধারযোগ্য আত্মাকে বপন করেছিলেন। বন্দনাগীতের বিভ্রান্তিমূলক সংগীতের নীচে সামান্য অলংকৃত মহিলাটির এই গুরুত্বপূর্ণ ইমেজগুলোর শূন্যতা কবিতার সিনট্যাক্সকে মুক্তি দেয় ও বিপর্যস্ত করে তোলে, সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিগত করে তোলে। মবি ডিক আসলে কী? শুভ্রতার ওপর আক্রমণ, অনুচ্চার্যের এক অসামাজিক, আত্ম-ধ্বংসাত্মক সাধনা, দেশের সমস্ত তালিকা, সমস্ত বিশ্বকোষ, সমস্ত চার্ট, সমস্ত উপাধি যার নামকরণ করতে পারে না। আমাকে ইশ্মায়েল বলো, কবি, যে (আমি) একজন অপ্রকাশিত গল্প / তাঁর সবচেয়ে সূক্ষ্ম শব্দটি … আমি তোমার পিতা …. মনে হচ্ছে ম্যাডাম? না, তা নয়, আমার অভ্যন্তরে যে আছে তার প্রদর্শনী …. দুঃখের অলংকার ও পোশাকগুলো…”

অনুচ্চারিত, অনির্বচনীয়, আমূল আভ্যন্তরীণ অর্থযুক্ত, পিতৃজিহ্বার সঙ্গে সংঘর্ষ নিশ্চিত করে। সঙ্গীত আসন্ন বিপর্যস্ততায়।

চতুর্দশ। লেখক অবরোধে পুনঃপ্রবেশ

আমার প্রথম দীর্ঘকবিতা The Bridge এর আগে দশ বছর আমি মার্কিন ইংরেজি শিখছিলাম। আমি ভেবেছিলাম তুর্কি থেকে আমি ছিন্নমূল হয়েছি, আসলে তা হয়নি; বরং আমি শিখছিলাম মার্কিন ইংরেজির শক্তিশালী ও শীতল নিরপেক্ষতা, যার মধ্যে আমার তুর্কি আত্মা ঢেলে দিতে পারি। আমার মাতৃভাষা তুর্কি, তবু আমি তুর্কিভাষায় লিখতে পারি না। তার উত্তাপের কাছে আমার হৃদয় এক আক্রান্তপ্রবণ মথের মতো। আমি প্রথমে একজন ইহুদি হতে চাই (এবং অঙ্গীভূত হতে নয়) বিদ্রোহী হিসেবে; আমার মাতৃভাষার বিরুদ্ধে এ আমার আত্মসক্ষমতার অনুশাসন। আমি একজন ইহুদি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলাম। দশ বছর ধরে আমি মনে করতাম আমার তুর্কিসম্বন্ধকে মুছে ফেলছি (আমার লেখক অবরোধে); আসলে আমি ভাষা তৈরি করছিলাম, সেই যন্ত্রটা মার্কিন ইংরেজি, যা আমার তুর্কি আত্মার পুনর্বিন্যাস গ্রহণে সমর্থ হবে। একজন কবি হিসেবে, মার্কিন ইংরেজি আমার ইহুদি ভাবনার স্থান গ্রহণ করেছে। আসলে, মার্কিন ইংরেজি ও ইহুদিয়ানা আমার কাছে একই।

আমি অধিকার অর্জনের জন্য মার্কিন ইংরেজিকে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু একজন মার্কিন কবি হিসেবে দেখেছিলাম আমার কোনো অধিকার নেই। শুধু তাই নয়, আমার লেখক অবরোধের শেষে দেখেছিলাম তুর্কি ভাবনা ছাড়া আমার আর কোনো বিষয় নেই। প্রত্যেক মার্কিন কবির মতো আমি দেখেছিলাম আমার অনুপ্রেরণা আসে বাইরে থেকে। এবং সে অনুপ্রেরণা আমার আক্রান্তপ্রবণতা, আমার মাতৃভাষা। আমার বিমাতৃক ভাষার আলোয় আমি সম্মুখীন হলাম শক্তি ও দুর্বলতা, ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিকতা, বিশেষাধিকার ও নিগ্রহ, প্রচণ্ড উত্তাপ ও শীতলতার মিশ্রণে। মাতৃভাষার প্রচণ্ড উত্তাপের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমার স্বীকার করা উচিত মার্কিন কবির নিগ্রহ ও বিচ্ছিন্নতা। মার্কিন ইংরেজির হৃদয়হীন সুদূর নিরপেক্ষতার মধ্যে আমার কোমল হৃদয়কে রক্ষা করি; মার্কিন ইংরেজির ওপর আমার আরোপিত ভাবপ্রকাশে আমার হৃদয় জয়ী হয়। ত্রুটিপূর্ণ সমকক্ষতা ফাটল সৃষ্টি করে, ভেঙে পড়ে। এই ত্রুটিপূর্ণতা, অসম্পূর্ণতা, ভুলগুলোই আবার চরম শক্তি ও তীক্ষ্ণতার কেন্দ্রবিন্দু, একটি মার্কিন কবিতার অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু যেখানে ক্ষমতায়ন এবং নিগ্রহ একীভূত।

তুর্কিয়ানা, ইহুদিয়ানা এবং মার্কিন কবিতা, আমার কাব্যিক ব্যক্তিত্বের অশুদ্ধ বন্ধন, পারস্পরিকভাবে সক্রিয়, যেখানে প্রতিটি পক্ষ অপর পক্ষকে টান দেয় এবং একে অপরকে সুদৃঢ় করে তোলে, তরঙ্গ তোলে ট্র্যাপিজের মতো। পূর্বসুরীর প্রভাব দিয়ে কীভাবে একজন সনাক্তকরণের কথা ভাবতে পারে? সংশ্লিষ্ট হও, অনুকরণ করো, অন্য কবিদের প্রতি মনোযোগ দাও এবং সমস্ত ব্যাপারটাই ভেঙে পড়ে। মার্কিন কবিতার শক্তি কেন্দ্রাতিগ, বহির্মুখী, কিছুটা উত্তেজনাময় অব্যাহতি। প্রতিটি কবি বিচ্ছিন্ন লওট্রেক ট্র্যাপিজে ব্যাধিগ্রস্ত। একটা ঐতিহ্যের কথা ভাবুন, সমস্ত অনুশাসন ভেঙে পড়বে।

জেব্‌স ও দেরিদার মতো তৃতীয় বিশ্বে জন্মগ্রহণ করা একজন ইহুদি আমি। লেখক হিসাবে তাঁদের সঙ্গে আমার পার্থক্য হল, তাঁরা অঙ্গীভূত ইহুদি হতে চেয়েছিলেন, শক্তিশালী কেন্দ্রে্র কাছে আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিলেন, ফরাসি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ক্ষমতার কাছে নিজেদের সনাক্তকরণ করতে চেয়েছিলেন। আমি একজন ইহুদি থাকাই বেছে নিয়েছিলাম। লেখক অবরোধের মরুভূমিতে দশ বছর কাটাবার পর আমি গ্রহণ করতে শিখেছি আমার আরবিয়ানা, যা আমার পরিত্যক্ত ক্রীতদাসী মা, হ্যাগার, তুর্কি বা সেই মার্কিন ইংরেজিতে কথা বলা এক অবৈধ ইহুদি।

মার্কিন কবিতার আত্মজ্ঞানবাদ যে শুধুমাত্র ঐতিহ্যের ধারণাকেই বদলে দিয়েছে তা নয়, প্রভাবের ধারণাতেও পরিবর্তন এনেছে। একজন কবির সঙ্গে অন্য কবিদের সম্পর্ক সুযোগসন্ধানী, ধারাবাহিক পরিহার, সংঘর্ষজনিত পথপরিবর্তন; তবু শক্তিশালী কবিরা খেলোয়াড়ের পিঠের মতো সমস্ত বাধাগুলোর বিরুদ্ধে তাদের চক্রাকার পথ বুনে চলেন শেষ লাইন পর্যন্ত পৌঁছনোর জন্য। ঐতিহ্যের সঙ্গে সনাক্তকরণ হিসাবে প্রভাবের ধারণা অবিশ্বাস্য। একটি মৌলিক মার্কিন কবিতা্র প্রসারণ সবসময় কেন্দ্রাতিগ। যখন ব্যবহৃত ভাষা একটি ভারকেন্দ্র সৃষ্টি করে, তখন কবির অন্তরের মাধ্যাকর্ষণ তাকে টেনে নিয়ে যেতে চায় অন্য কোথাও। একজন বহিরাগত হিসেবে ম্যাগপাইয়ের মতো অন্যদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সুযোগসন্ধানী, অবাধ, শ্রেণীহীন ও ঐতিহ্যহীন। আমার প্রভাবগুলি একটি খনি অঞ্চলের ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়াগুলোর মতো, প্রতিরোধের বিরুদ্ধে বুনে যাওয়া, যদি প্রয়োজন পড়ে তবে উচ্চতর শক্তির বিরুদ্ধে সংঘর্ষ করে বেঁচে থাকা। এখানেই আমার সংঘর্ষের চক্রাকার পথ যা একজন কবি হিসাবে আমার ক্রমবিকাশকে নির্ধারণ করে: শেকসপিয়ারের সনেটগুলো, তুর্কি কবি ওরহ্যান ভেলি, টলস্টয়, তুর্কি কবি ক্যামাল সারেয়া, এনড্রু মার্ভেল, থমাস ব্রাউনি, সুইফ্‌ট এর A Tale Of The Tub, তুর্কি বাউল কবিতা, ক্লেইস্ট-এর Marquis Of O…, জাপানি কবিতা, স্কটিশ দার্শনিক হিউম, তুর্কি সুফি কবি পির সুলতান আবদল, “Ode On A Grecian Urn,” টিভি, মার্কিন সিনেমা Dim Sum, Chan Is Missing, Raising Arizona, Blade Runners, চীনা সিনেমা House Of The Red Lanterns, জাপানি পরিচালক আতামি-র The Funeral, অপেশাদার ফটোগ্রাফি, দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন, উইটজেন্সটাইন, যুক্তিনিষ্ঠ প্রত্যক্ষবাদ, রোলান্ড বার্থা, এজরা পাউন্ডের “The Seafarer,” অ্যাসিমভের Foundation Trilogy, সেফেরিস, ক্যাফাভি, তুর্কি কবি ওরহ্যান আরিফ ইত্যাদি।

পঞ্চদশ। কেন মার্কিন ইংরেজি অন্য ভাষাদের থেকে আলাদা এবং কোনো উপস্বন নেই?

কারণ এটা ডিম্বাকৃতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভাষা কোনো মিথ তৈরি করে না; সিনেমা, টিভি, বা জনপ্রিয় সংগীত যা করে থাকে। মার্কিন সংস্কৃতিতে চলচ্চিত্র, টিভি বা সংগীতের শব্দ থাকে এক পরাধীন অবস্থানে। স্ক্রিপ্ট লেখকদের প্রতি তাদের কুখ্যাত অপব্যবহার সিনেমা শিল্পপতিরা সহজাতভাবেই জানেন। বিংশ শতাব্দীর কোনো মার্কিন কবিতা কি হ্যা্মফ্রে বোগার্টের মুখের মতো অনুরণন তোলে, ম্যারিলিন মনরোর শ্বাসরুদ্ধ সোনালিমার মতো, Who Shot Liberty Valence সিনেমায় জন ওয়েন, জেমস স্টুয়ার্ট এবং লি মারভিনের মধ্যে মাংসের প্লেট ঘিরে যুদ্ধের মতো কিংবা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালী মারফি ব্রাউনের মতো যিনি টিভিতে অবৈধ সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন?

টিভির প্রভাব সবচেয়ে গভীর। সত্য কী এবং কীভাবে তা হৃদয়ঙ্গম করা যায় এই সমসাময়িক জ্ঞানতত্ত্ব বদলে দিয়েছে। অন্তরবাহিরের পার্থক্য (যা মার্কিন কবিতার ভিত্তি), ব্যক্তিগত এবং সর্বজনীন, সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য বিলুপ্ত করেছে। টিভির অন্তর্নিহিত ধারণাটি হল যে বাড়ি (লিভিং রুম) এবং বাক্সের ভিতরটার মধ্যে (যে বড় পৃথিবীকে বাক্সে ধরা যায়) কোনো পার্থক্য নেই, এই অনুপ্রবেশ আন্তরিকতা, সততা এবং সত্যের ধারণাকে প্রভাবিত করছে। জ্ঞানতত্ত্বের এই আমূল পরিবর্তন প্রতিফলিত হচ্ছে টিভিশৈলীতে; তাই টিভিশৈলী মার্কিন কাব্যিকশৈলীর বিপরীত, যা অন্তরবাহিরের মৌলিক পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে গড়া। টিভিশৈলীতে যে নতুন বাস্তবতা প্রতিফলিত হচ্ছে তা মার্কিন কবিতার বহু শাখাবিন্যাস করতে পারে। কিন্তু সে এক অন্য প্রশ্নের অবতারণা। আমি শুধু এখানে কয়েকটি প্রাথমিক মন্তব্য করব।

টিভি স্টাইলের উদ্দেশ্য হল বাক্সের ভিতরবাহিরের মধ্যে প্রতিরোধ হ্রাস করা, স্ক্রিনকে এমন স্বচ্ছ বানানো যেন তা একটি ঝাঁঝরি (Poltergeist চলচ্চিত্রটি এই বিষয় নিয়েই)। মিনিমালিজম এই শৈলীটির ভিত্তি। টিভির ভাষা মিনিমালিস্ট। টেলিভিশনে যারা গুরুস্থানীয়, রেগান, হয়তো বা ক্লিনটন, কত ছোট স্মরণীয় বাক্যাংশ তৈরি করা যায় সে বিষয়ে উভয়েই দক্ষ। মৌখিক অসঙ্গতি তাঁদের খর্ব করে না। রেগ্যান অসংখ্যবার তথ্যের ভুল বিবৃতি দিতে পারেন। ক্লিনটন পারস্পরিক স্বতন্ত্র প্রস্তাব রাখতে পারেন। তাঁদেরকে সংযুক্ত করে তাঁদের তথ্য বা তাঁদের আগুন নয়, বরং তাঁদের “সৌজন্যবোধ”, মিনিমালিস্টের মূল্য যদি কখনও থেকে থাকে, তবে তা হল তাঁদের একই মানুষের ইমেজ (বাক্সের ভিতরবাহির সমান)। কিন্তু যখন মার্কিন বাস্তবতায় স্বার্থের বহুবিধ বিকৃতি তখন সৌজন্যবোধ হল ঐক্যের একটি অপরিহার্য মূল্য। দুটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন মিথ হল অভিবাসন, “অভিবাসীদের জাতি,” এবং ঐক্য, “যুক্তরাষ্ট্র”। টিভি এই বিরোধালঙ্কারের ভারসাম্য রেখে তাদের উভয়কে বজায় রাখে; ভিসুয়াল ও শৈল্পিক কৌশল তৈরি করে যা জাতিকে একসঙ্গে ধারণ করে। অঙ্গীভূত হওয়ার অলৌকিক আভা তৈরি করে ‘অঙ্গীভূত হওয়া”কে একটি মিথে রূপান্তরিত করে, টিভি বিচ্ছিন্নতাকে পরিবর্তীত করে ক্ষনতার রাষ্ট্রে, এ এক ক্ষমতায়ন।

আমেরিকার আসল ভাষা মার্কিন ইংরেজি নয়, বরং টিভি। টিভি হল সংস্কৃতির মহাকর্ষীয় কেন্দ্র। একজন মার্কিন কবি যদি ঐতিহ্যকে সাগ্রহে গ্রহণ করতে চান, তাহলে তাঁর মার্কিন ইংরেজির কাব্যশৈলী গ্রহণ না করে বরং টিভিশৈলী গ্রহণ করা উচিত। একটি মার্কিন কবিতা টিভিশৈলীর মিনিমালিজম (যার নিজেরই আছে অসংখ্য বৈচিত্র্য, রীতি, কাঠামো, ইত্যাদি, এবং স্বভাবতই তা অসীম তাৎপর্যপূর্ণ) এবং অন্তরদৃষ্টির স্বকীয় বিপথগামিতার মধ্যে সংঘর্ষ। তার শক্তি নিহিত আছে তার ফাটল ও বিকৃতিগুলোর মধ্যে যা এই সংঘর্ষের কারণ হতে পারে। এই বিকৃতিগুলো মিনিমালিস্ট স্তরে তার স্বরভঙ্গি। উদাহরণস্বরূপ, আমার কবিতা “Heartbreak Weekend In Atlantic City” একটি পৃথক, স্বচ্ছ দৃশ্যমালা; কিন্তু দৃশ্যগুলো বিকৃত, তির্যক, অসংলগ্ন, খেয়ালি পথে একে অপরকে অনুসরণ করে। স্বরভঙ্গি হল তাদের তৈরি ক্রমবিন্যাস। এটা ভুল ধারণার সৃষ্টি করে, ভিত নাড়িয়ে দেয়, কাব্যিক/টিভি স্তরের দৃঢ়তাকে অন্তরের বিষয় করে তোলে। অ্যাটলান্টিক শহরের এক ভয়ঙ্কর পরিদর্শনের সঠিক প্রভাব আছে এই কবিতায়, কবিতাটি তা রেকর্ড করে এবং টিভির সামনে রিমোট দিয়ে চ্যানেলের বাধ্যতামূলক, খেয়ালি পরিবর্তন, যা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও শীতল, ছদ্ম-নিরপেক্ষ ইমেজের মধ্যে এক সংঘর্ষ, যা হল আসল মার্কিন ভাষা।

যদিও টিভিশৈলী মার্কিন কবিতাশৈলীর থেকে খুবই বিপরীত, তবু তারা রহস্যজনকভাবে অনুরূপ। উভয় ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্নতার ভারসাম্য, উৎপীড়ন ও ক্ষমতা, ক্ষমতায়ন, অঙ্গীভবন এসবের সহাবস্থানের সম্মুখীন হয় সকলেই। উভয় ক্ষেত্রেই সর্বাধিক প্রভাবের জন্য কঠোর নিষ্ঠার প্রবণতা রয়েছে। এই মৌলিক সহাবস্থান টিভি ও তার শৈল্পিক আভাকে কবিতার জন্য এমন এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা তৈরি করে যে টিভি প্রকৃতই কাব্যিক ঐতিহ্য-বিরোধী হয়ে ওঠে। টিভির ভাষা (মার্কিন ইংরেজির মতো) ডিম্বাকৃতি কারণ এটি এক বিরোধালংকার, অর্ধসত্য ও অর্ধমিথ্যা। নিখুঁত সমকক্ষ নয়। ফুটবলের মতো এর প্রয়োজন পড়ে অত্যাধিক আসক্তি, বাধ্যতামূলক ও আত্মরক্ষামূলক মালিকানা। টিভি হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সত্যিকারের ভাষা, তার সাদা পর্দা আমাদের মবি ডিক এবং কবির কাজ হল বিস্ফারিত হওয়া, সংশ্লেষিত হওয়া এবং এর দ্বারাই নিঃশেষিত হওয়া। “Heartbreak Weekend At Atlantic City” কী? মোটের ওপর বলতে গেলে আটল্যান্টিক শহরের কঠিন ও চকচকে স্তরটির (পোষ্টার, স্থাপত্য ইত্যাদি) নীচে একটি মৌলিক আভ্যন্তরীণতা, বাধ্যতামূলক নাবালকত্বের ইঙ্গিত (“Atlantic City Restaurants,” “The Architecture of Atlantic City,” ইত্যাদি) আবিষ্কার করা।

যারা বহিরাগত যেমন কবি, ইহুদি, নারী ইত্যাদি, যাদের দৈনিক ব্যবহৃত মাতৃভাষা নেই, তাদের পরিণতি হল নাবালকত্ব। এটা দুর্বলতা। অন্যদিকে মার্কিন ভাষায় শব্দের আসল ক্ষমতা হল এই মিথবিমুখতা। প্রতিটি মার্কিন কবিতাই ব্যক্তিগত, নিজের অস্তিত্ব দাবি করার স্বতন্ত্র হাতিয়ার, মিথ ভেঙে সৌজন্যের স্তরের ওপর নিজেকে প্রকাশ করা। এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ায় শব্দগুলো (বা কবিতাগুলো) শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাই, মার্কিন কবিতা ধারাবাহিকতাহীন হওয়া উচিত। বহুবিধতার মধ্যে এই ঐক্যই (টিভির সৌজন্য) একমাত্র মার্কিন মিথ। কিছু কবিদের এই মিথ তৈরির প্রচেষ্টা (উদাহরণস্বরূপ, চার্লস ওলসন) বৈচিত্র্যহীন হয়ে ওঠে কারণ মার্কিন শব্দগুলি খুবই ব্যক্তিগত, আত্মজ্ঞানবাদী। যে মুহূর্তে ভাষা এই মিথের অনুরণন লাভ করে, সেই মুহূর্তেই সর্বব্যাপী টিভি তাকে অধিকার করে। ব্লেক বা রিমবদ, স্টেইন বা ডিকিনসন যাঁরা এই মিথের স্রষ্টা, তাঁরা সততই মোহসঞ্চারী, কিন্তু আমার মনে হয় তা অপ্রাসঙ্গিক।

ষষ্ঠদশ। মার্কিন কবি ও কবিতার সামাজিক অবস্থান

একজন মার্কিন কবির সবচেয়ে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল মার্কিন সংস্কৃতিতে শব্দের পরাধীন অবস্থানকে জানা, গ্রহণ করা ও তাকেই কাজে লাগানো। একজন কবি হতে চাওয়া মানে একজন বলির পশু বা বহিরাগত হতে চাওয়া। মার্কিন ইংরেজি বেছে নেওয়া মানে একটি অসীম তাৎপর্যপূর্ণ মাধ্যম নির্বাচন করা নিজের সংজ্ঞার জন্য, মিথ তৈরি বা প্রকাশ্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য নয়। যেভাবেই পুনর্বিন্যস্ত করা হোক একজন মার্কিন কবি যেখানে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে সেখানে কোনো অনুশাসন বা ঐতিহ্য থাকতে পারে না। স্কুল কলেজের অপরিহার্য বাধ্যতামূলক মৌখিক শিক্ষা্র পর একজন কবি বা পাঠকের (শব্দমোহের জন্য বিচ্ছিন্ন যিনি) কাব্যিক অভিজ্ঞতা (লেখা ও পড়া উভয়ত) অন্য আর একজন কবির ভাষা অন্বেষণে লিপ্ত করে। পাঠ্য এবং পাঠকের মধ্যে এই সম্পর্ক কখনই সিনেমা, টিভি এবং তাদের শ্রোতাদের মধ্যে বিদ্যমান অমনোযোগী বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক হতে পারে না। যখন একজন কবি বলেন, “আমি আমার পাঠকের কাছে দাবি করতে চাই”, তিনি তখন এই অদ্ভুত ফাঁকটাকে অচেতন বা সচেতনভাবে স্বীকার করছেন। তিনি আসলে দাবির নির্দোষ ভঙ্গির তুলনায় আরো অন্যকিছু চাইছেন। তিনি আর একটি আত্মাকে তার শরীর ত্যাগ করতে বলছেন (এটা সহজ নয়, বিশেষত উপভোগ্য অভিজ্ঞতা নয়) এবং ঝাঁপ দিতে বলছেন অন্য একজনের ভাষার অন্ধকারের মধ্যে। নিজের নির্মাণে সম্পূর্ণ অন্য একজনের ব্যক্তিগত অনুরণন সংগ্রহ করা। এটাই তার শুদ্ধতা।

একজন মার্কিন কবি অবশ্যই তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া জাতীয় কাব্যিক অনুশাসন ছাড়া আর সবকিছুতেই আগ্রহী হন। মার্কিন কবিতা বা কবির জীবনীশক্তি হল ক্রমাগত ভিন্নতার অনুপ্রবেশ: ভিন্ন শিল্প, ভিন্ন মিডিয়া বা ভিনভাষার কবি। উদাহরণস্বরূপ, ডিকিনসন তাঁর বাগানের মৌমাছি ও ফুলকে ভালবাসেন, এটা আমহার্স্টের ল্যান্ডস্কেপ। রেজনিকফ ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্পোন্নত আমেরিকার দুর্দশায় আচ্ছন্ন। টনি টাওলে সংগীত ভালোবাসেন। স্টেইনের নিকটতম বন্ধুরা শিল্পী ছিলেন। আমি তুর্কিভাষা ও সে ভাষায় প্রেমের কবিতার সুফিবাদে আচ্ছন্ন। কিন্তু আমার মনে হয় না যে এই সংস্রবগুলোর জন্য আমাদের কেউই ঔপন্যাসিক, চিত্রশিল্পী বা হর্টিকালচারিস্টের পরিবর্তে কবি হয়ে উঠেছি। এই অনুপ্রবেশগুলো বাস্তবতা, আদেশ বা স্বচ্ছ পৃষ্ঠতলের এক অলীক টিস্যু তৈরি করে, যার মধ্যে কবি তাঁর ভেতরের অসুরকে আঘাত করতে পারেন, যা অবশ্যই অনুচ্চারিত থাকা অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, ডিকিনসনের সত্যিকারের বাড়ি আমহার্স্টের ল্যান্ডস্কেপ নয়, বরং তাঁর বিকৃত শব্দবিন্যাসের ফাটলগুলির মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকে তাঁর বাগানের মৌমাছি ও ফুলের মধ্যে যৌনতা এবং হিংস্রতার নিঃশব্দ চলাচলের ইঙ্গিত। প্রতিটি কবির ভিতরের অসুরটি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু যে অসুরটি আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে তা হল শব্দের প্রতি অত্যাধিক অসামাজিক আসক্তি, যা নিজেই কবিকে একজন বহিরাগত ও নিগৃহীত করে তোলে। প্রতিটি কাব্যিক কৃতিত্ব অর্জন একটি সংগ্রাম, শব্দ দ্বারা অর্জিত প্রাধান্য, ক্ষমতা ও বৃত্তকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো স্ববিরোধী কাজ। একজন মার্কিন কবি মাত্রই শব্দে আসক্ত এবং এটাই তাঁর নিয়তি, অনির্বচনীয়কে উচ্চারণ করা। এটা সাদা, সাদা তিমি, সাদা পর্দা, সাদা ভাষা, দুর্বলতা এবং বিচ্ছিন্নতার চিহ্নের ওপর ক্রমাগত আক্রমণ। তাঁর সমস্ত শক্তি ও কাজের ক্ষমতা আহরিত হয় অস্বীকারের বিরুদ্ধতা থেকে, ভাষা ব্যবহারের জন্য তাঁকে গ্রহণ করতে হয় ভাষার সামাজিক নিকৃষ্টতা (এবং তাঁর অনির্বচনীয় আভ্যন্তরীণ অস্তিত্ব) ঘটনার বাধ্যতামূলক পুঞ্জিভবন এবং তাকে প্রতিহত করতে ছোট ছোট ধোঁয়াটে আবরণ।

শেষ।

The original English text is available on the following link:

Questions of Accent (Final Ch.)

 

 

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাংলার নবজাগরণের দু একটি কথা

একটি পরাধীন দেশ আর তার বাসিন্দাদের মনে স্বাধীনতার আকুতি আমরা দেখেছিলাম ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে। এর…..

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

কবি চন্ডীদাস ও চন্ডীভিটে

  কেতুগ্রামে যেখানে চন্ডীদাস বাস করতেন সেইস্থানটি চন্ডীভিটে নামে লোকমুখে প্রচারিত। চোদ্দপুরুষের ভিটে বাঙালির মনে…..

নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার: নারীজাগৃতি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

নারীর আপন ভাগ্য জয় করিবার: নারীজাগৃতি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

নবজাগরণের সঙ্গে নারীর জাগরণ, নারীর মর্যাদা ও সুরক্ষা, এবং নারীমুক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ভারতে এই নবজাগরণের…..