হল্লা বোল

অভিজিৎ হাজরা
কবিতা
Bengali
হল্লা বোল

মাদকতা

আবারও চোখের পরে ভেসে উঠলো —-
হারিয়ে যাওয়া সেই দু-খানি চোখ ।
যে চোখের গভীরতায় খুঁজেছি নিজেকে ,
যে চোখের মণিতে দেখতে চেয়েছি নিজেকে ,
হ্যাঁ স্পষ্ট মনে পড়ে — ঐ চোখের ভাষা
একবার তাকিয়েই বুঝতাম কী বলতে চাই !
অনেক কথা হয়েছিল ঐ চোখের ইশারায়
দুই ব্যালকনির মাঝে অপলকে দাঁড়িয়ে ,
বৃষ্টি মুখর অলস বেলায় একটু ঝাপসা দেখাতো
রিমঝিম মৌন মুখর বৃষ্টি অনেক কথা বলতো ।
সেই পরিচিত চোখ দুখানি হঠাৎ দৃষ্টি পাল্টালো
আমার চোখে সমুদ্রের সে গভীরতা ছিল না ,
বেকারত্বের যন্ত্রণায় গাছের কোটর দুখানি চোখ
সেদিন শ্যাম রাখি না কুল রাখি — কঠিন যন্ত্রণা ।
হঠাৎ আবছা হতে হতে সেই চোখ দুটো
একেবারে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল ——–
রাত্রিতে মাঝে মাঝে স্বপ্নে কথা হতো ওদের সাথে ,
আজ আমার সামনে সেই একই দুখানি চোখ
হ্যাঁ আজ‌ও ওরা কিছু বলতে চায় —–
দুচোখের ভাষা আমায় আবার ভাবুক করলো ,
আমি ঠিকঠাক পড়ছি তো ওদের ভাষা !
চোখ দুটি আজ‌ও আমায় হাতছানি দেয় ।

 

হল্লা বোল

আরেকটু কাল বাঁচার আশায়
বাঁচি , মরণ বুকে নিয়ে !
বাঁচার স্বপ্ন দেখার আশায়
তোরা আর থাকিস নে ঘুমিয়ে ।
দু’হাত মুঠো করে ,
এবার — হল্লা বোল ।
জ্বলন্ত এই চুল্লিতে দে একটু হাওয়া
গনগনে আঁচ করুক সব গ্ৰাস ,
হিসেব নিকেষ কীসের চাওয়া পাওয়া ?
শিশুর চোখে ভাসছে শুধুই সন্ত্রাস !
দু’হাত মুঠো করে ,
এবার — হল্লা বোল ।
প্রতিদিন বারুদের গন্ধ মেখে
এ অভাগা দেশে জন্ম নেয় শিশু
আদর্শ এখানে ধরাশায়ী রক্ত মেখে
গাছে ঝোলে নিথর , প্রতিবাদী যিশু
দু’হাত মুঠো করে ,
এবার — হল্লা বোল ।
ডিগ্রিধারী বেকারত্ব লাইনে দাঁড়িয়ে
হতাশা ক্লিষ্ট যন্ত্রণায় জীবন
পাঁচ বছরে প্রতিশ্রুতিরা গেছে গায়েব হয়ে
নীরবতায় দেখি প্রিয়জনের মরণ ।
দু’হাত মুঠো করে ,
এবার — হল্লা বোল ।
গণতন্ত্র আজ একটা যন্ত্র
ফন্দিবাজ আর ধান্দাবাজে ভরা ,
না আওড়ালে শেখানো মন্ত্র
নামের উপর চন্দ্রবিন্দু — তুমি মরা ।
দু’হাত মুঠো করে ,
এবার — হল্লা বোল ।
মরতে তোমায় হবেই একদিন
জরা,ব্যাধি, মহামারী বা বারুদে পুড়ে ,
দেখতে হবে সংস্কৃতি হচ্ছে বিলীন
পাল্টা নীতির যাঁতাকলে পড়ে ।
দু’হাত মুঠো করে ,
এবার — হল্লা বোল ।
না বদলা চাইনা , না বদল চাই না
শব্দগুলো শুনলেই গা ঘ্যানঘ্যান করে ,
ভণ্ডের দল দূর হটাও — আমরা চাই না
দেশ গড়ব সবার মতো করে ।
দু’হাত মুঠো করে ,
এবার — হল্লা বোল ।

 

রক্তে লেখা দলিল

রক্ত দিয়ে লেখা হয় সভ্যতার ইতিহাস
যুগ যুগ ধরে বরাবরের প্রথা —-
যুগান্তর ঘটে রক্তঝরা সংগ্ৰামে
রক্ত দিয়েই লেখা হয় সভ্যতার দলিল ।
তবে সব রক্ত সমান হয় না !
যে রক্ত টগবগ করে দৌড়ায় ,
যে রক্তের প্রতি বিন্দুতে স্বপ্নমাখা ,
যে রক্তে আছে দৃঢ় আত্মবিশ্বাস ,
যে রক্তের রঙ প্রভাতী সূর্য ,
সেই রক্তেই মজবুত হয় সভ্যতার ভিত ।
যতো রক্ত ঝরেছে ——
মাপলে একটা বঙ্গোপসাগর হতো ,
কিছু রক্তক্ষরণ ব্যার্থতার গ্লানি মাখা ,
কিছু রক্তক্ষরণ পরেছে বিজয়মাল্য ,
কিছু রক্তক্ষরণ যুগিয়েছে ভরসা ,
কিছু রক্তক্ষরণে পৃথিবী বেগবতী ।
এখনো ঝরছে রক্ত ——
ভবিষ্যতে ও ঝরবে রক্ষার সাধ্য কার ?
বিপ্লব মানেই তো পরিবর্তন ,
পরিবর্তন বরাবরই আসে রক্তের বিনিময়ে ,
রক্তে লেখা হয় সভ্যতার ইতিহাস ,
ইতিহাস যে চিরকাল অমলিন ।

 

অপেক্ষার প্রহর

বিকেলের কনে দেখা আলোয় গা ভিজিয়ে
বসে আছি ভুবনডাঙার খোলা মাঠে
সায়ন্তিকা তোমায় একটু দেখার অপেক্ষায় ।
দেখতে দেখতে সাঁঝবাতিরা জ্বলে উঠলো
জ্যোৎস্না পোকারা — রচলো আলোর বাসর
অলস বেলায় একলা আমি তোমার প্রতীক্ষায় ।
মিলিয়ে গেছে দোয়েল পাখি ছাতিম গাছের ফাঁকে
হারিয়ে গেছে আমার ক্লান্ত সময় চাঁদের আলো মেখে
বসে আছি দূর আকাশের সন্ধ্যাতারা ছোঁয়ার বাসনায় ।
নিঝুম রাতে বিষন্নতার সুর গিটারের তারে ……
মালকোষ রাগে ঝরে পড়ে বিরহের ইস্তাহার
বুকের মাঝে দগ্ধক্ষরণ — অশ্রু হয়ে মুক্ত ঝরে
বিনিদ্র রাতে তোমার স্মৃতি স্বপ্ন হয়ে ঘুমিয়ে যায় ।
অপেক্ষারা প্রহর গুনছে ঘোসলায় বসে
স্বপ্নেরা আজ হিমেল পরশে মেঘ হয়ে গেছে
শিশিরে সিক্ত হয়ে আমি প্রেমের কাব্য সাজায় ।
সায়ন্তিকা — এখনো তোমার অপেক্ষায় …….
ঝরা পাতার কান্নার রোল – আমাকে উদাসী করে
ভুলে যায় দিনক্ষণ — হারিয়ে যায় সময় ।
কোকিলের কুহুতান নিয়ে আসে মায়াবী বিকেল
প্রখর তপন তাপে –শুকায় আমার মাঠের ফসল
মন পাখিটা শিকল ছিঁড়ে পালিয়ে যায় ।
সায়ন্তিকা মনের আজ ভীষণ জ্বর ……
মন যে পোড়ে দারুন নির্মম দহন চিতায়
আজ ও আমি বসে আছি তোমার অপেক্ষায় ।
সায়ন্তিকা তোমায় ভেবে ভেবে…
আমি হাঁটতে পারি ক্লান্ত অবসন্ন শরীরে দীর্ঘ পথ
তুমি দাঁড়িয়ে থেকো চাঁদের পাহাড় চূড়ায় ।

অভিজিৎ হাজরা। জন্ম ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের শান্তি নিকেতনে।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ