হারিয়ে গেল নীলা

পৃথা ব্যানার্জি
গল্প
Bengali
হারিয়ে গেল নীলা

মাঝরাত্রি পর্যন্ত সৌভিকের সাথে চ্যাট করা নীলার একটা নেশায় দাঁড়িয়েছে। আজ নিয়ে মাত্র দশদিনের পরিচয়, কিন্তু নীলার মনে হয় যেন বহুযুগের পরিচিত ওরা। সৌভিক কিন্তু শুধু চ্যাটে সন্তুষ্ট নয়, সে চায় ফোনে কথা বলতে। আর নীলার পক্ষে বাড়ির লোককে আড়াল করে ফোন করা খুবই অসুবিধে। তাই প্রায় প্রতিদিনই সৌভিককে বোঝায় সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে।

কাল রাত্রে সৌভিক জানতে চেয়েছে সে ঠিক কোথায় থাকে? নীলার একটু সংকোচ হয় বলতে যে সে গ্রামে থাকে বা তাদের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। সৌভিকের প্রোফাইল দেখে সে বুঝেছে খুবই বড় ঘরের ছেলে। নিত্য নতুন ড্রেসে বিভিন্ন মলের ছবি পোস্ট করে। নীলার কাছে যা শুধুমাত্র কল্পনা। কিন্তু বেড়ালের ভাগ্যেও তো শিকে ছিঁড়তে পারে, কপালের গুণেই হোক আর ভাগ্যের ভুলেই হোক! নীলার বাবা মা ভাই বোন সবাই পিসির মেয়ের বিয়েতে গেল। নীলা নানান অজুহাত দেখিয়ে একলা রয়ে গেল। বাবা মাও মনে করল দিনকাল খারাপ, খালি বাড়ি না রাখাই ভালো। এই দুটো দিন নষ্ট যেন না হয় তাই নীলা সৌভিককে ফোন করল। সৌভিক খুব খুশি। দু’জনে অনেকক্ষণ কথা বলার পর সৌভিক জানালো কাল সকালে সে গাড়ি নিয়ে আসছে আর সারাদিন তারা ঘুরবে, আর বাইরেই নীলার পছন্দের খাবার খেয়ে সারাটাদিন আনন্দ করবে।

প্রথমে তো নীলা ভয় পেয়ে গেল, কারণ যদি চেনা কেউ তাকে দেখে ফেলে। কিন্তু সৌভিকের প্রচণ্ড জেদের কাছে নীলাকে হার মানতেই হল। তবে একটু রদবদল করে নিল। গাড়িটা তাদের গ্রামের স্টপেজে না এনে একটু দূরে গঞ্জের বাজারের একদম শেষে রাখতে বলল। নীলা ভাবতেই পারেনি এতোটা আনন্দ তার জীবনে আসতে পারে। সে ঠিকসময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেখলো সৌভিক গাড়ীর গায়ে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। ছবির থেকে সুন্দর আরও বেশি। একটু ভয়ও করতে লাগলো যে এমন একজন কি তার বন্ধু হতে পারে?

–“সৌভিক, অনেক অপেক্ষা করতে হল তো”!

–“নী –লা–“!  পেছন ফিরে হাসি মুখে সৌভিক বলল, –“তোমার মতোন সুন্দরীর জন্য এইটুকু তো করতেই পারি। তোমাকে যা আশা করছিলাম তার থেকেও অনেক বেশি মিষ্টি তুমি”!

–“এতোটা বলোনা যা মিথ্যে মনে হয়”।

–“গাড়িতে বসে কথাগুলো বললে বা শুনলে ভালো হতো না”! সৌভিক একটু হেসে বলল।

এর আগে নীলা কোনোদিন এমন গাড়িতে ওঠেনি। হাঁ ট্যাক্সিতে উঠেছে, কিন্তু এমন –!

বুকের মধ্যে ধুকপুকানি নিয়ে উঠে পড়ল। গাড়ি এগিয়ে চলল। খানিক যাবার পর সৌভিক নীলার হাতটা ধরে বলল, -“আজ আমি খুবই খুশি তোমাকে পাশে পেয়ে। আমার তো মনেই হয়না যে মাত্র কটা দিন তোমার সঙ্গে আমার পরিচয়। আজও মনে আছে যেদিন তোমায় প্রথম দেখেছিলাম ফেসবুকের মাধ্যমে। দেখেই মনে হয়েছিল এই সেই মেয়ে যাকে আমি মনের মধ্যে খুঁজেছিলাম”।

–“জানিনা যা হচ্ছে তা স্বপ্ন না সত্যি! আমার মতো একটা সাধারণ মেয়ের জীবনে এতো সুখ, কি জানি”!

–“সেটা আমি বুঝবো। তুমি শুধু একটু বুদ্ধি করে বার হতে চেষ্টা কর। মাত্র দু’টো মাসের ব্যাপার। তারপর মামা বিজনেস ট্যুর থেকে ফিরলেই তোমাদের বাড়ি যাবে বিয়ের কথা বলতে”।

–“আর তোমার বাবা মা”?

–“হুমম, তুমি তো জানো না। আমার বাবা মা অনেক ছোটোবেলায় আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। আমি মামার কাছেই মানুষ। আমার জন্যেই মামা বিয়ে করে নি। পাছে মাইমা আমাকে কষ্ট দেয়”!

–“তোমার মামা রাজি হবেন‌ কি আমার মতোন এমন একটা গরীব সাধারণ —

–“ব্যাস নীলা, এ বিষয়ে আর একটাও কথা নয়‌। ‘গরীব, সাধারণ’ এই সব কথা একদম বলবেনা। সবচাইতে আসল কথা  হচ্ছে মানুষের মন। সেই মন যখন আর একটা মনকে খুঁজে পায় তখন সেখানে সব কথা যে বন্ধ হয়ে যায়”।

নীলা কিছু বলতে পারলো না। চোখ দুটো বন্ধ করে চেষ্টা করল সমস্ত সুখ আর আনন্দকে অনুভব করতে। গাড়ি ছুটে চলল আপন গতিতে দুটো ভালোলাগা মনকে সাথে নিয়ে।

–“আগে এসেছো তুমি এই রাস্তায়”? সৌভিক নীলার অবাক হওয়া চোখের দিকে দেখে জিজ্ঞেস করল।

–“না, বিশেষ কোথাও যাবার সুযোগ আসেনি কখনও”।

–“তাহলে চল এইখানটা একটু দেখে নাও। কৃত্রিমভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক আশ্চর্য লীলাভূমি। আমরা অনেকক্ষণ বেড়িয়েছি তাই একটু বিশ্রাম আর একটু কিছু খাবার দরকার”।

নীলা শুধুই ঘাড় নেড়ে দিল। কারণ কিছু বলার মতো মন ছিলো না। এতোদিন যা সিনেমায় দেখেছে আজ নিজে সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে।

কাউন্টারে নাম লিখে এসে দাঁড়ালো ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘরের সামনে। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে অবাক! কুঁড়ে ঘরের ভেতর রাজকুমারের শয়নকক্ষ।

নীলার আশ্চর্য্যমাখা চোখ দুটো দেখে সৌভিকের মুখে ভেসে উঠলো এক চিলতে হাসি। জিজ্ঞেস করল, –“পছন্দ হয়েছে? এখানে একটু বিশ্রাম আর খাওয়া। তারপর বোটিং”।

সেদিন ওইখানেই সারাটা দিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে এলো নীলা। বাড়ি ফিরেও তার স্বপ্নের ঘোর কাটলো না। চুপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। আজ বাড়ি ফাঁকা এইটা ভেবেও মনটা হালকা হল নীলার। কারণ এইসময়ে কথা বলতে বা শুনতে কোনোটাই ভালো লাগছেনা। সারাদিনের সৌভিকের ভদ্র শান্ত ব্যাবহার আর সুন্দর কথাগুলো ঘুরতে থাকলো নীলার মন জুড়ে। এখন হাসি পাচ্ছে কিন্তু তখন তো হাওয়া উড়ে গিয়েছিল যখন সৌভিক রুমের দরজা বন্ধ করেছিল। তার মুখের অবস্থা দেখে সৌভিক দুহাতে তার মুখটা তুলে বলেছিল যে সে তার ভালোবাসা, আর ভালোবাসার অসম্মান কেউ করে না।

নীলার সাহস একটু বাড়লো। বাড়িতে মিথ্যে বলে তারপর থেকে মাঝে মাঝেই বার হতে লাগলো। এর মধ্যেই একদিন সৌভিক তাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে এলো। বিরাট একটা এপার্টমেন্টের দশ তলায় একটা ফ্লাটে। নীলা একটু অবাক হল দেখে যে ওদের স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী ফ্ল্যাট সাজানো নয়। মনে হয় যেন সবসময় কেউ থাকে না। সৌভিকের সাথে পুরো ফ্ল্যাটটা ঘুরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো নীলা। সৌভিক জানতে চাইল তার পছন্দ হয়েছে কিনা?

–“খুব সুন্দর কিন্তু কেমন একটা থমথমে ভাব ছড়িয়ে আছে। তোমার ভয় করে না একলা থাকো”? একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলল নীলা।

–“মামা বাইরে গেলে তখন একলাই থাকি না হলে তো মামা আর আমি। জানো তো এই ফ্ল্যাটটা কেনার পরেই বাবা মা এক এক্সিডেন্টে চলে যায়। তাই মামা আর সাজায়নি ফ্ল্যাটটা। মামা বলেছে আমার বিয়ের আগে সাজাবে, যতদিন না বিয়ে করছি এইভাবেই থাকবে। তাহলে বুঝতে পারছ তো এই ফ্ল্যাট সাজানোর দায়িত্ব তোমার”।

কিছুটা সংশয় নীলার মন থেকে দুর হল।

নীলার হাতে ফ্যামিলি এলবামটা দিয়ে সৌভিক গেল কফি করতে।

নীলার হাতে কফির কাপটা দিয়ে সৌভিক বলল, –“তুমি বাড়িতে আমাদের কথাটা একটু বলে রাখবে, তাহলে মামা যখন কথা বলবে তখন অসুবিধে হবে না”।

সৌভিকের এই কথাটা নীলার মনের সব দ্বিধা দ্বন্দকে মিটিয়ে দিল।

বাড়ি ফিরে অনেক চেষ্টা করেও সেদিন বলতে পারলোনা। এদিকে সৌভিক জানিয়ে দিল মামা দিন পনেরোর মধ্যেই ফিরছে। আর ফিরেই মামা যাবে নীলাদের বাড়ি। মামা একদম দেরি করতে চাইছে না।

রাত্রিটা কাটিয়ে নীলা পরদিন সাহস করে মা’কে বলেই ফেলল। তরপর যখন বাবার কানে কথা উঠল বাবা এক কথায় না করে দিল।  নীলা কান্নায় ডুবে জিজ্ঞেস করল, –“বাবা তোমার অপছন্দের কারণটা তো বল”।

–“আমি আশ্চর্য হচ্ছি তোমার সাহস দেখে। এতোটা নির্লজ্জ তুমি কবে থেকে হলে যে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে তুমি এইভাবে প্রশ্ন করছ”?

নীলা বুঝতে পারলো এখন যদি সে একটু নরম হয়ে যায় তাহলে আর কখনোই মাথা তুলতে পারবে না। তাই জেদি ঘোড়ার মতোই ঘার বেঁকিয়ে সে আবার একই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল বাবার দিকে।

তখন নীলার মা বলল, –“নীলা, ছেলেটার একটাই দোষ সে বড়লোক। এই বড়লোকরা এমন একটা জাতি হয় যারা শুধুই দুঃখ দেয়”।

–“তোমার মা ঠিকই বলেছে, তাই তুমি ভুলে যাও ওই ছেলেকে”

–“সম্ভব নয়”। নির্ভিক গলা নীলার। “আগে তোমরা তাকে দেখো, কথা বল তারপর এই বিষয়ে কথা হবে”।

নীলা ঘরে এসে ভাবতে বসল কী করা যায়। কোনোও সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে শেষকালে সৌভিককে সব জানালো। সৌভিক লিখল  –“চিন্তার কিছু কারণ নেই। পৃথিবীর কোনোও শক্তি তাদের বিয়ে আটকাতে পারবেনা। সে ঠিক সময়ে আসবে কথা বলতে আর বিয়ে করতেও”।

নীলা বুঝতে পারল বাবা মা একটা ঝড়কে ডাক দিয়েছে। সৌভিকের মামা সৌভিকের খুশির জন্য সবকিছু করতে পারে।

নীলা ঠিক করল বাবা মাকে ভালো করে সব বুঝিয়ে বলবে। জানিয়ে দেবে সে নিজে সৌভিকের বাড়ি দেখে এসেছে।

কিন্তু তার চেষ্টা সফল হলনা। বাবা মা মানতে চাইলোনা কোনোওভাবেই। এইরকম ঝামেলা যখন চলছে তখন সৌভিকের মামা সুরজিৎ চ্যাটার্জি ভাগ্নেকে সঙ্গে করে নীলাদের বাড়ি আসলেন আর সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব রাখলেন। সুরজিৎ চ্যাটার্জির অমায়িক ব্যবহারের কাছে নীলার বাবা মাকে রাজি হতেই হল একদিন তাদের বাড়ি যাবার জন্যে। স্বীকার করতে বাধ্য হল যে সব বড়লোক খারাপ হয়না।

মামার কথা অনুযায়ী এক রবিবারে সৌভিক এলো নীলার বাবা মাকে নিয়ে যেতে। ছেলে, ছেলের মামা, ছেলের ঘর বাড়ি সব পছন্দ হলেও নীলার বাবা ঠিক মন থেকে মানতে পারছিলনা সৌভিককে। অথচ তার কোনও সঠিক ব্যাখ্যাও নেই তার কাছে। এইসব চিন্তা ভাবনার মাঝে সৌভিকের মামা ফোনে জানালেন বিয়ের কেনাকাটা করার জন্য নীলাকে আসতে হবে তাই সৌভিক যাচ্ছে নীলাকে আনতে‌। একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও নীলার বাবাকে রাজি হতেই হল। প্রথমতঃ নীলার জেদ আর দ্বিতীয় সুরজিৎ বাবুর কথার কায়দা। ভদ্রলোকের কথার সামনে কিছুতেই সে নিজের কথা রাখতে পারছে না।

নীলা যখন বার হল সৌভিকের সাথে তখন নীলার মা বলল, –“নীলা তুমি নিজের ইচ্ছায় এই পথে পা বাড়িয়েছ। আমরা অনেক চেষ্টা করেও তোমাকে ফেরাতে পারলাম না। কারণ মানুষ তার মনের অনুভূতি কাউকে বোঝাতে পারেনা। তাই আমরাও হেরে গিয়েছি। তোমার বিয়ে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দেব তবে কোনোদিন কোনো অসুবিধে হলে ফিরে এসোনা নিজেই সামলে নিও”।

নীলার চোখে যে সুন্দর ভবিষ্যৎ ভাসছে তাতে এই কথাগুলো খুবই অবান্তর বলে মনে হল। কোনোও উত্তর না দিয়ে সে বেড়িয়ে গেল।

আজ সৌভিক বাড়ি পর্যন্ত আসেনি, রঙ্গোলী মলে অপেক্ষা করছে। নীলার পক্ষে এমন জায়গায় একলা যাওয়া খুবই অস্বস্তিকর তাই গেটের সামনে থেকেই সৌভিককে ফোন করল সে যেন একটু বাইরে আসে।

–“ইসস তোমাকে যা লাগছে, একদম নীলাম্বরী”।

পেছন ফিরে সৌভিককে দেখে নীলা একটু অস্বস্থিতে পড়ে গেল। প্রকৃতই আজ সে একটু সেজেছে আর সেই সাজের প্রশংসা যদি প্রিয়জনের কাছ থেকে আসে তখন সত্যিই খুব ভালো লাগে। মুখটা নিচু করেই  বলল, –“ধ্যাৎ কি যে বলো, আমি আবার সুন্দর”!

–“নিজেকে কেউই জানতে পারেনা নীলা, জানতে হয় ভালোবাসার মানুষের চোখ দিয়ে। এখন চল দেখি কিছু পছন্দ হয় কিনা”!

–“পছন্দই যদি হবেনা তাহলে এসেছো কেন”?

–“তোমার বাড়ির কাছে তাই”।

সৌভিক একটু ঘুরে দেখলো কিন্তু তার কিছুই পছন্দ হলনা। এমন সময় মামার ফোন। ঘরে কিছু লোক এসেছেন তারা নতুন প্রোজেক্ট নিয়ে সৌভিকের সাথেই কথা বলতে চায়। ফোনটা রেখে সৌভিক রাগের মাথায় বলে উঠল, –“ধুসস ভালোলাগেনা, মামা আমাকে কি ঝামেলায় যে ফেলেছে এই ব্যবসায় ঢুকিয়ে”!

–“মামার তো বয়েস হচ্ছে। তোমাকেই তো দেখতে হবে এখন”।

–“উফ নীলা, তুমি এখন থেকেই মামার দিকে কথা বলছ? তাহলে চল আজ থেকে এই নতুন প্রোজেক্টে তোমাকেও পার্টনার করে নিলাম। তুমিও আমার সঙ্গে  কাজ করবে”।

–“এমা, আমি এই সব সম্বন্ধে কিছুই জানিনা”!

–“আমি সব শিখিয়ে দেব”।

বাড়িতে ঢুকে ওরা দেখল চারজন লোক সুরজিৎ বাবুর সাথে কথা বলছেন।

সৌভিকের সাথে কথা বলার সময় লোকগুলো যেন কেমনভাবে নীলাকে দেখছিল। নীলার ভালো না লাগায় সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে দাঁড়ালো। একটু পরেই সৌভিক এলো।

–“কি ব্যাপার, তুমি চলে এলে”?

–“ওরা এমন বিচ্ছিরিভাবে তাকাচ্ছিল–

–“কি যে বল! ওসব দেখার ওদের সময় আছে! এখন চল আমি তোমার নাম দিয়েছি”।

নীলা এসে বসলে ওরা নীলার শরীর স্বাস্থ্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করল। কোনোদিন কোনোও ভারি অসুখ হয়েছিল কিনা? নীলা কারণটা বুঝতে না পারলেও উত্তরগুলো দিয়ে দিল। সুরজিৎ বাবু ওদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, –“আপনাদের ঠিক ধারনা নেই গ্রামের মেয়েরা শহরের মেয়েদের থেকে একদম সুস্থ থাকে। ওদের লাঙস, হার্ট, কিডনি একদম জীবাণুমুক্ত”।

নীলা বিরক্ত হয়ে সৌভিককে জিজ্ঞেস করল এ কোন ধরনের কথা হচ্ছে?

সৌভিক নীলাকে বুঝিয়ে বলল যে এখনকার দিনে দুটো মানুষের যখন বিয়ের কথা হয় তখন দুজনকেই সব টেস্ট করাতে হয়।

সুরজিৎ বাবু বললেন, –“বিজনেসের টাকাটা এইবারে ঠিক করে নেওয়া হোক। জিনিস অনুযায়ী আমরা চার লাখে ছাড়ব”। একজন সাথে সাথেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

–“অসম্ভব, আমরা দুইএর বেশি একটা টাকাও দেবোনা। কারণ মাল নেওয়া থেকে ডেলিভারি হওয়া পর্যন্ত আমাদের অনেক খরচ করতে হয়”।

–“কোনও অসুবিধে নেই। আমাদের হাতে তিনটে পার্টি আছে” কথাগুলো বলে সুরজিৎ বাবু উঠে দাঁড়ালেন। সৌভিকের দিকে ফিরে বললেন, –“তোমরা কোথাও খাওয়া দাওয়া সেরে ওকে ছেড়ে এসো। অন্যদিন কেনাকাটা করে নিও”।

সেদিন কেনাকাটা না হওয়ায় নীলার মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। সৌভিক বুঝতে পারলো তাই একটা সুন্দর পার্স কিনলো নীলার জন্য।

এইভাবে কেনাকাটা আর বিজনেস মিটিংয়ের মধ্যে দিয়ে পনেরোদিন কেটে গেল। নীলাদের ঘরে বসে দু-পক্ষ ঠিক এক মাস পরে আগামী পাঁচ তারিখে বিয়ের দিন ঠিক করে নিল। সৌভিক মামাকে বলল সে নীলাকে নিয়ে দু’দিন দিঘা থেকে ঘুরে আসতে চায়। মামার সম্মতি আর নীলার উৎসাহে নীলার বাবা মা-র আপত্তি থাকলোনা। ওরা বেড়িয়ে গেল।

দু দিনে ফেরার কথা সেখানে তিন দিন অপেক্ষার পর নীলার বাবা ফোন করল মেয়েকে। ফোন বন্ধ। সৌভিক আর সুরজিৎ বাবুরও ফোন বন্ধ। সৌভিকের ফ্ল্যাটে এসে দেখল তালা বন্ধ। আশপাশের কেউ কিছু বলতে পারলোনা। উপায় না দেখে নীলার বাবা পুলিশের কাছে এলো। মামা ভাগ্নের ছবি দেখাতেই পুলিশ জানালো এরা বিভিন্ন নাম আর পরিচয় নিয়ে সারা ভারতবর্ষে জাল ফেলে রেখেছে। এদের টার্গেট গ্রামের সরল কম বয়সী মেয়েদের বিদেশে চালান দেওয়া মোটা টাকার বিনিময়ে। পুলিশ জানতে চাইল নীলার ফেসবুক আর বন্ধুদের কথা। বন্ধুদের কথা বলতে পারল নীলার মা তবে ফেসবুক সম্বন্ধে কিছুই বলতে পারলোনা। কারণ ফোনটাই তো নেই। পুলিশ তাদের নিজেদের পদ্ধতিতে সার্চ করে নীলা বা সৌভিক নামের কোনো একাউন্ট পেলনা। পুলিশ জানালো ছ’মাস আগে ফরিদাবাদ থানা এলাকায় একই কেস হয়েছিল। সেখানে ছিল কাকা ভাইপো শুধু মেকাপটা অন্যরকম ছিল। ওই থানার পুলিশ আজও ওই কেসের কোনো সমাধান করতে পারেনি। এমন কোনও ক্লু ওরা ছাড়ছেনা যা দেখে আমরা সামান্য পথ এগুতে পারি। আমরা আপনাদের কেস লিখে নিলাম এবং কাজ শুরুও করে দিলাম। নীলার বাবা ঘরে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। বার বার বলতে লাগলো- “আমার মন কিছুতেই সায় দেয়নি। কতবার আটকাতে চেষ্টা করেছিলাম”।

নীলার মা বলল,–“আজ থেকে এই বাড়িতে ওই মেয়ের কথা কেউ মুখে আনবেনা। নীলা নামে এবাড়িতে কেউ কোনদিন ছিলনা”।

পৃথা ব্যানার্জি। গল্পকার ও বাচিকশিল্পী। জন্ম ও নিবাস ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যের কলকাতায়।

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..