হায়াসিন্থ

শিখা কর্মকার
কবিতা
Bengali
হায়াসিন্থ

স্নিগ্ধ ভালোবাসাটি

যখন অঘোরে ঘুমিয়ে থাকা অশ্বত্থের পাতার উপর জেগে থেকে সারারাত পায়ে পা ঘষে নিদ্রাহীন ঝিঁঝিঁ, আর আমার দুচোখের দৃষ্টি হারিয়ে যায় তোমার স্বপ্ন চুঁইয়ে নামা উপত্যকায়। যখন ভুলে গিয়ে নাম-ধাম-বংশ-গোত্র-কুলের কথা, ছুঁয়ে ছেনে চিনি স্পর্শ কাকে বলে, যখন আমি নিবিড় মন্ত্র লিখে ফেলি তোমার মসৃণ ত্বকে, যখন সুতীব্র অশান্ত ঢেউ ছাড়া আর কিছুর অস্তিত্ব থাকেনা এই মহাপৃথিবীতে, যখন আমরা আচ্ছাদিত করি নিজেদের শুধু মগ্নতার আভাসে, আর অসহ্য সুখের বন্যায় ভেসে যায় এক আকাশ নক্ষত্র, তখন সমস্ত প্রতিবন্ধতাকে অস্বীকার করে স্নিগ্ধ ভালোবাসাটি লিখে রাখে তার নাম আমাদের স্মৃতির ভেতরে।

স্মৃতি

এসেছিলে, চলে গেছো নিঃশব্দে, অন্য পথ দিয়ে।যা ছিল বলার, তা বলা হলনা তো। উঠোনময় জমা দিন, এক পা এক পা করে হাঁটবার বেলা, তারপরে উচ্ছ্বসিত জীবন। একমুঠো ধুসর স্মৃতির ভেতরে কোথায় যে হারালে।

বুকের ভিতরে আজো ঘুরে ফিরে আসে নিঃসঙ্গ হরিণ, পথ হারানো পাখি, শুকোতে থাকা নদি। শিরার ভিতরে আজো কত কথা, গানের সুরে সুরে বেজে চলে পাঁজরে পাঁজরে। তোমার জন্য অপেক্ষা করে করে ক্লান্ত দুচোখ দ্যাখেনি চেয়ে, বন্যার মত এসে সব ভিজিয়ে দিয়ে আবার ফিরলে কখন নিঃসঙ্গতার ভেতরে । অনন্ত তৃষ্ণা নিয়ে আমিই শুধু আটকে থাকলাম বিষণ্ণ ভাঁটায় ।

হায়াসিন্থ

হায়াসিন্থ, কেন ফোটো ? সুগন্ধ ছড়াও কেন ছিঁড়ে ফেলা গানের মত যা একদিন ঝমঝমিয়ে বাজাত আমাকে? তোমার নীলাভ রঙ ধার করে, দিনান্ত হয় এইখানে। পীচট্রি লেকটি ছুঁয়ে, ডেকে ফিরলে বাসাতে, কিছু রাজহাঁস, গাছের আড়াল থেকে, নিঃশব্দে উড়ে নামে লক্ষ্মীপ্যাঁচাগুলি। নামে রাতপোকা, আলো নিয়ে খুঁজে মরে কার প্রিয় মুখ!

ঘাসেদের বুক থেকে হামাগুড়ি দিতে দিতে, কালো রঙ ঢেকে ফ্যালে নির্জন কোটর, বেড়ার ওধারে ছোটা ঘোড়ার কেশর, সাঁকোর কিনারাগুলি, গুডসন রোড । অবোধ দৃষ্টি নিয়ে ফিরুক বাগানে কেউ, তুমিও কি চেয়েছিলে প্রিয় হায়াসিন্থ? চেটে দিক ক্ষতমুখ, আদুরে শিশুর, তার অশ্বমাতা, মুছে দিক ব্যথা, চেয়েছিলে? উড়ুক হামিং তার ডানার সুরেতে, ভাগ করে নিক মধু, মৌমাছির সাথে? উড়ে যাক তুলোবীজ, না জেনেই পৌঁছানোর ঘরের ঠিকানা। আমরাও কি উড়ছিনা এতদিন, কিছুই না জেনে, বলো, বাসছিনা কি ভালো?

পুড়িয়ে খাকরি করে মেরেছি যে বীজ, প্রিয় হায়াসিন্থ, দেখো কি অদৃশ্য মায়াবলে, তারও ভেতরে হাসে পুস্পিত কুসুম। তুমিও কি শুনেছ তবে, প্রাণের স্পন্দন বাজে পাথরেরও বুকে? পেয়েছ কি আভা তার রোদমাখা স্রোতে? ফিরবো আমিও বন্ধু এইখানে ভেবে, জিম্মায় রেখেছি মাছ, শাপলার সংসার, পাড়ে এসে ঘুরে যাওয়া বীভারের দল। হায়াসিন্থ, বন্ধু আমার, এ অসার সংসারে, বাড়িয়েছ আশা। অসময়ে ফিরলে সে, বোল তাকে তুমি, “চিরকাল সে প্রাণ আমার, মৃতসঞ্জীবনী”।

অপেক্ষাগুলি

অপেক্ষাগুলি থেকে যায় বাকলের ফাঁকে প্রজাপতির ডিম হয়ে। থেকে যায় ফুল ও মানুষের গর্ভকোষে । মাঠকে মাঠ, দ্বীপকে দ্বীপ ডুবে যায় ভুমিকম্পের ও সময়ের গর্ভে । হাজার বছর পরে সেখানে গিয়ে নিঃশ্বাস নিলে টের পাই এসব একদিন ছিল অন্য কারো রাজত্ব। এইসব গোলাপের পাতা ও পাপড়িতে লেগে থাকা শিশির ছিল তাদের নম্র অশ্রুবিন্দু, বেদনার্ত প্রেমের সাক্ষী, অনুভবে মিশে যাওয়া আত্মা।

দিগন্তের মত দূরের দিকে তাকিয়ে থাকো । চিরকাল ধরে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকা জলপ্রপাতের মত আকুল হয়ে ঝরে যায় সারাটাজীবন আমার, তবু সাড়া মেলেনা কিছুতেই। প্রতিরাতে জ্বর আসে, যেভাবে বসন্তে কুঁড়ি আসে গাছ ভরে, সেভাবেই প্রতি অঙ্গ অবশ করে দেয় অন্য এক জ্বরে। তুমি বোঝনা । তুমি পুষ্পের পাপড়িতে কোমলতা খুঁজে পাও, কিন্তু তার আভায় দশদিক বদলে যাওয়া রূপ দেখতে পাওনা, ছুঁয়ে যায়না অনুভূতি । হৃদয় অন্ধ বলে তুমি বুঝতে পারোনা, আমি বেড়ে উঠতে থাকা ধানের ক্ষেতে বাতাসের মত লগ্ন হয়ে আছি। আমি আছি ডিম ভেঙে কচি সাপেরা বেরিয়ে গেলে, রয়ে যাওয়া লালাটুকুর মত, অবহেলায়, নিঃস্বতা বুকে নিয়ে, আছি অনাদরে, একাকীত্বের ভেতরে ।

সুখের সুর

তুমিও তো জানতে জীবন দীর্ঘ এক পথ। সে পথে যেতে যেতে দেখা হয় সুখ ও দুঃখমাখা মানুষের সাথে। চোখে পড়ে কল্লোলিত নদী মনখারাপ করে চলে যাচ্ছে যেদিকে দুচোখ যায় । নিঃসঙ্গ মানুষের পদচ্ছাপ চলে গেছে অচেনা এক জগতের দিকে তবু তার আশায় কেউ পথ চেয়ে আছে সারাজীবন, থাকবনা বলেও।

সারা পৃথিবীর সুখের সীমারেখা এখন অন্য কোথাও আঁকা । হয়ত তা জানালার ওধারে, ঠিক যেখানে রেনপাখিটি ডাকতে আসে। তুমি সারা বছর বের হওনি, তবু সে বোঝেনা । তুমি যে তার গল্প নও, তার গানের উৎস নও, সে বোঝেনা । সারা পৃথিবীতে তত শব্দ নেই, যা দিয়ে তোমার ধ্বসে যাওয়া জীবনের কথা ধরে রাখা যায় তাও সে বোঝেনা । সে শুধু বোঝে হালকা হয়ে প্রেমে ভেসে যাওয়া কি, হয়ত তাই তার গানে এখনো জেগে থাকে নিবিড়তার উচ্ছাস, সুখের সুর।

শিখা কর্মকার। কবি। জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা ভারতের পশ্চিমবঙ্গরাজ্যে, বর্তমান নিবাস উত্তর আমেরিকার আটলান্টা, জর্জিয়া। পেশায় শিক্ষিকা, নেশায় ফটোগ্রাফার, ও ভালোবাসায় কবিতা। পনেরো বছরের অধিককাল স্বেচ্ছাসেবিকা বিভিন্ন স্কুল ও লাইব্রেরিতে। দশ বছরের অধিক জর্জিয়াতেই সঞ্চালিকা ও মুখপাত্রী একটি বিশিষ্ট...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

প্রতিভাস

প্রতিভাস

স্পষ্টতা অন্ধকারের মতো স্পষ্টতা আলোর মধ্যগগনে নেই। উত্তাপে ঝলসে যাওয়া চোখে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয় রাত…..

চিঠি

ক্ষোভ রোদের দোকানি হয়ে, ছুঁয়ে গ্যাছি দূর পরবাস আলোর ক্রেতারা দেখে, শূন্য ঝুলি খালি সর্বনাশ।…..