হৃদমাঝারে

হৃদমাঝারে
গল্প
Bengali
হৃদমাঝারে

Change is the only constant in the world.

আমরা চার বন্ধু।  রমেন, জীবন, বিশু আর আমি।  যেখানেই যেতাম একসাথে থাকতাম। বিশু ছিলো আমাদের দলের অলিখিত নেতা।  নেতা তো এমনি এমনি হয় না।  তার কাজ,দল চালানোর কৌশল তাকে নেতা বানিয়েছিলো।  একদিন দুপুর বেলায় সে আমাদের ডাক দিলো তার বাঁশি বাজিয়ে।  বাঁশির ডাক শুনেই মন চঞ্চল হয়ে উঠতো।  ঠিক যেনো রাধার পোড়া বাঁশির ডাক।  চুপি চুপি বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বটতলায়।  আমাদের মিলন অফিস ছিলো এই বটতলা।  চারজন ছুটে চলে যেতাম মাঠে। সেখানে বিশুবলতো, দাড়া কয়েকটা তাল কাঁকড়া ধরি । ভেজে খাওয়া যাবে।

বলেই হাত ভরে দিলো সোজা ধানের জমির গর্তে। একটা মাগুর ধরেছি, বলেই মাথা টিপে হাত বের করতেই দেখা গেলো মাছ নয়একটা বড় কালো কেউটে সাপ।  বিশু সাপটাকে সাঁ সাঁ করে ঘুরিয়ে সহজেই ছুঁড়ে দিলো দূরে। তারপর তাল কাঁকড়া ধরে ভেজে খাওয়া হলো মাঠে।  ভাজার সমস্ত সরঞ্জাম বিশু লুকিয়ে রাখতো একটা পোড়ো বাড়িতে। সাঁতার কাটতে যেতাম নতুন পুকুরে। একবার ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলাম তার প্রখর বুদ্ধির জোরে।  মাথার চুল ধরে টেনে তুলেছিলো ডাঙায়।

গ্রীষ্ম অবকাশে বট গাছের ডালে পা ভাঁজ করে বাদুড়ঝোলা খেলতাম বিশুর নেতৃত্বে। তারপর ঝোল ঝাপটি। উঁচু ডাল থেকে লাফিয়ে পড়তাম খড়ের গাদায়।  এসব খেলা বিশুর আবিষ্কার।  তারপর সন্ধ্যা হলেই গ্রামের বদমাশ লোকটিকে ভয় দেখাত বিশু।  সুদখোর সুরেশ মহাজন বটগাছের ডাল থেকে শুনলো, কি রে বেটা খুব তো চলেছিস হনহনিয়ে।  আয় তোকে গাছে ঝোলাই।  সুদখোর অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো।  তারপর থেকে ও পথে যেত না মহাজন। সাদা চুলো গান্ধিবুড়িকে রোজ সন্ধ্যাবেলা নিজের মুড়ি খাইয়ে আসতো অতি আদরে। বিশু বলতো, আমি তো রাতে খাবো।  বুড়ির কেউ নেই,  আমি আছি তো।  শ্রদ্ধায় মাথা নত হত নেতার হাসিতে।

একবার বন্যার সময় স্কুল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের নেতা।  কোথাও সাঁতার জল কোথাও বুক অবধি জল। একটা সাপ বিশুর হাতে জড়িয়ে ধরেছে।  বিশু এক ঝটকায় ঝেরে ফেলে দিলো সাপটা। স্কুল আমাদের যেতেই হবে।  সাঁতার কাটতে কাটতে আমাদের সে কি উল্লাস।  যে কোনো কঠিন কাজের সামনাসামনি বুক চিতিয়ে সমাধান করার মতো মানসিকতা বিশুর ছিলো।  সে সামনে আর আমরা চলেছি তার পিছুপিছু।  শেষ অবধি পৌঁছে গেলাম স্কুল।  হেড মাষ্টারমশাই খুব বাহবা দিলেন স্কুলে আসার জন্য।  তিনি বললেন, ইচ্ছা থাকলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।

টিফিনের সময় ছুটি হয়ে গেলো।  আসার সময় একটা নৌকো পাওয়া গেলো।  মাঝি বললেন, আমার বয়স হয়েছে আমি একা অতদূর নৌকা বাইতে পারবো নি বাবু। তাছাড়া আমার এখনও খাওয়া হয় নি।

বিশু সঙ্গে সঙ্গে নিজের টিফিন বের করে দিলো। আমরাও মন্ত্রমুগ্ধের মতো টিফিন বের করে দিলাম।  মাঝি ভাই বললেন, এসো সবাই এক হয়ে খেয়ে লি।  তারপর নৌকার কান্ডারি হলো বিশু। আর আমরা সবাই মুড়ি মাখিয়ে খেতে শুরু করলাম।  মাঝি ভাই ও বিশু খেলো।  ধীরে ধীরে পৌঁছে গেলাম গ্রামে। মাঝি ভাইকে পারিশ্রমিক দিয়ে বিদায় জানালাম।

পরের দিন রবিবার। রঙিন সকাল।  আকাশে মেঘের আনাগোনা। কাশের কারসাজি নদীর তীর জুড়ে।  বন্যার জল নেমে গিয়েছে। পুজো পুজো ভাব। বিশু কাশফুলের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। কয়েকদিন হলো তাকে দেখা যাচ্ছে না।

আমি ঘুরতে ঘুরতে পুজো বাড়ির ঠাকুর দেখতে গেলাম। সেখানে দেখি বিশু হাতে কাদা মেখে শিল্পীকে সাহায্য করছে।  তিন দিন ধরে এখানেই তার ডেরা।  এখন তার মনে বাজছে ঢাকের ঢ্যামকুড়াকুড়। মন মন্দিরে তার দুর্গা গ্রামদেশ ছাড়িয়ে অভাবি বাতাসে বাতাসে।  পুজো বাড়িতে আমাকে দেখেও কোনো কথা না বলে হাঁটতে হাঁটতে বাইরে চলে গেলো।

আমি জানি সে এখন চাল, ডাল নিয়ে সর্দার বুড়িকে রেঁধে খাওয়াবে।  সে বলে, ওর যে কেউ নেই। ও খাবে কি?

বিশুর বাবা বছরে একবার বাড়ি আসেন। তিনি ভারতীয় সৈন্য বিভাগে কাজ করেন। বাড়িতে এলেই বিশুর হাতে হাতখরচ বাবদ তিনি বেশ কিছু টাকা দিয়ে যান। সেই টাকা বিশু লোকের উপকারে কাজে লাগায়।

বড়ো অবাক হয়ে ভাবি, ছোটো বয়সে এতবড় মন সে পেল কোথা থেকে?

স্কুলের দূরত্ব অনেক বেশি হওয়ায় আমাদের চার বন্ধুর বাড়ির গার্জেনরা শলা পরামর্শ করে হোষ্টেলে থাকার কথা বললেন।  দায়িত্ব নিলো বিশু।  কিন্তু হেড মাষ্টারমশাই বললেন, সেশনের মাঝে হোষ্টেল পাবি না।  ঘর ভাড়া নিয়ে চারজনে থাক।  পরীক্ষা এসে গেছে।  কাছাকাছি থাকিস তিনটি মাস।  রেজাল্ট ভালো হবে।

ঘুরে ঘুরে অবশেষে ভাড়া ঘর পেলাম। কিন্তু বাড়িওয়ালার পাশের প্রতিবেশি বললেন, সাবধান ওই বাড়িতে ভূত আছে। আমরা ভয় পেয়ে তিনজনে বলেুু উঠলাম, তাহলে অন্য ঘর দেখি চল।

বিশু বললো, টাকা দেওয়া হয়ে গেছে। ভূতের বাড়িতেই থাকবো।  বিশু যখন সঙ্গে আছে, ভয় কি তোদের।

তার অভয় বাণী ভরসা করে আমরা মাল পত্তর নিয়ে ঢুকে পড়লাম লড়াইয়ের কোর্টে।  ক্যাপটেন বিশু বাড়িটা এক চক্কর পাক দিয়ে হাতে একটা লাঠি নিয়ে বললো, চলে আয় ভূতের বাচ্চা। আমরা ওর সাহস দেখে অবাক হতাম। রমেন বলে উঠলো, ভূতের শেষ দেখে ছাড়বো।  জীবনের মরণের ভয় একটু বেশি।  সে কাঁপা গলায় বলে উঠলো, যদি গলা টিপে ধরে ভূত। বিশু বললো,  ভয় নেই, আমি একাই একশো।  তোর কিছু হবে না। হলে আমার হবে।

এই বাড়ির নিচু তলায় কিছু অসামাজিক লোকের কাজকর্ম বিশু এক সপ্তাহের মধ্যেই টের পেয়ে গেলো।  তারাই এই ভূতের ভয় দেখায়। একদিন জীবন বাথরুম গেছে এমন সময় নাকি সুরে একজন বলে উঠলো, এঁখান থেকে পাঁলা।  ঘাড় মটকে দেবো। আবার একদিন রমেন ভয় পেলো।  ঠিক সেই বাথরুমে।  বিশু তদন্ত করে দেখলো বাথরুমের ভেন্টিলেটার ভেঙ্গে একটা সরু দড়ি ঢোকানো হয়েছে।  বাইরে গিয়ে দেখলো দড়িটা নিচের ঘরের বারান্দায় শেষ হয়েছে।  বাথরুমে ভাঙ্গা কাঁচে টান পরলে বিকট আওয়াজ হয়।  আর মুখ বাড়িয়ে মুখোশ পড়ে নাকি সুরের কথায় সকলেই ভয় পাবে। বিশু বললো সবাই তৈরি থাকিস। আজ রাতেই ভূত ধরবো।

আজ আর কেউ স্কুল গেলাম না।  একটা উত্তেজনা রাতে জাগিয়ে রেখেছে।  এবার সেই বিকট শব্দ। বিশু বাঘের মতো লাফিয়ে লাঠি হাতে নিচের তলায় গিয়ে জলজ্যান্ত ভূতের পাছায় লাঠির আঘাতে ভূতকে কাবু করে ফেললো।  ভূত বাবাজি জোড় হাতে বলছে, ছেড়ে দাও বাবা আমি আর ওসব করবো না।  ভূতের সঙ্গিরা সব পালিয়েছে, আমাদের হাতে লাঠি দেখে।  বিশু বললো, যাও,  যেখানে বিশু আছে সেখানে চালাকি করার চেষ্টা কোরো না। বিপদে পড়বে।

তারপর থেকে আর কোনোদিন ভূতের উপদ্রব হয়নি সেই বাড়িতে।

বিশুর বাহাদুরি দেখেই আমরা সাহসী হয়ে উঠেছিলাম। বিশুর সঙ্গে আমরা বেরোলে সকলের চোখেমুখে একটা সাহসের,শান্তির ছাপ ফুটে উঠতো। পাড়ার কোনো মানুষ বিপদে পরলে বিপদের বন্ধু এই টাইগার বিশুকেই স্মরণ করতো। তার সঙ্গে আমরা তো থাকতাম অবশ্যই। রমেন, জীবন,বিশু,আমি একবার বন্যার সময় নৌকা করে মানুষের খাবার জোগাড় করতে চড়খী গ্রামে গিয়েছিলাম। হেলিকপ্টার থেকে চিড়ের বস্তা,গুড়ের বস্তা ফেলছে চড়খীর ব্রীজে যার আসল নাম কাশীরাম দাস সেতু। সেখান থেকে আমরা চিড়ে, গুড়ের পাটালি নৌকায় তুললাম। রমেন পেটুক। বললো, একটু টেষ্ট করলে হয় না। বিশু বললো, এখন এটা সকলের সম্পত্তি।  যা হবে সকলের সামনে হবে। কেউ হাত দিবি না। এখন তাড়াতাড়ি চল। বান বাড়ছে। বিশু দাঁড় টানেআর আমরা সবাই সাহায্য করে নৌকা ও খাবার নিয়ে চলে এলাম নতুন পুকুরের পাড়ে। সেখানে বাড়ি বাড়ি সকলকে সমানভাবে খাবার ভাগ করে দিলো বিশু। তারপর আমরা বাড়ি এসে  জীবনের মায়ের হাতের রান্না, গরম খিচুড়ি আর পেঁপের তরকারি খেলাম।  অমৃতের স্বাদ। বিশু বললো, কাকীমা অনেক পেঁপে গাছ পড়ে গেছে বন্যার স্রোতে। আমরা আপনাকে অনেক পেঁপে এনে দেবো। সেবার বন্যায় পেঁপে, গ্রামের লোকের প্রাণ বাঁচিয়েছিলো। আমাদের গ্রাম অজয় নদীর ধারে।  গ্রামগুলিও খুব নীচুস্থানে অবস্থিত।  নদীর নাব্যতা বা গভীরতা অল্প। ফলে বন্যা প্রায় প্রতি বছর দেখা দিয়ে যেতো। জল যখন কমে যেতো তখন তোতনের মা ও পাড়ার মা বোনেরা মাঠে মাছ ধরার জন্য যেতো। নানারকমের শাক, ঢোল কলমি, শুশুনি তুলতো।  খুব ভালো লাগতো নানারকমের মাছ ভাজা খেতে। আমি দেখলাম,

তোতনের মা মাঠ থেকে দুই তিন রকমের শাক তুলেছে।  ওরা ভিটামিন বোঝে না, শরীরচর্চ্চাও বোঝে না।  ওরা জানে খাটবো, রোজগার করবো আর খাবো পেট ভরে।  মাঠেই পাওয়া যেতো বেশির ভাগ শাক, সব্জী। খলসে, ও আরও নানারকমের মাছ মাঠের জলে সাঁতার কেটে বেড়াতো।

বেলে, তে চোখো,চ্যাঙ,ছিঙুরি,গচিমাছ ছাড়াও ছোটো কাঁকড়া তাল কাঁকড়া পাওয়া যেতো।  গর্তে হাত ঢুকিয়ে বিশু অনরকবার তআল কাঁকড়া বের করে আমাদের দেখিয়েছে।

পাঁকাল,গুঁতে,কৈ,মাগুর,ল্যাটা প্রভৃতি অসংখ্য মাছ।  বিত্তি পেতে দিতো স্রোতের মুখে।

বিশু বলছে, খাল কেটে মাঝখানে বিত্তি পেতে জল যাওয়ার নালা কেটে দিতো। মাছ লাফিয়ে ওই গর্তে পড়তো। টানা জাল,পাতা জাল দিয়ে মাছ ধরতো। এখন তোতনের মায়ের জায়গায বৌমা মাঠে যায়। কিন্তু কৃষিকাজে সার, ওষুধ প্রয়োগ করার ফলে সেইসব মাছ ইতিহাসের পাতায় চলে গেছে। শাকপাতাও পায় না মা বোনেরা। এখন সব বাজারমুখী।।  তখন শাক আঁচলে করে নিয়ে গিয়ে বাউরীবউ মুড়ি নিয় আসতো চাষি বাড়ি থেকে। মাঠের টাটকা শাক সবাই নিতো জলের দরে।  আজ আর টাটকা কিছু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশুর কথা একশো শতাংশ সত্য। এখন আমরা বড় হয়ে গেছি।  কিন্তু, স্বর্ণ যুগের সেইসব স্মৃতি মনের মণিকোঠায় চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

বিশুর কথা ভোলা যায় না। স্কুলের বন্ধু হলেও হৃদয়ের মণিকোঠায় চিরদিনের মতো ঠাঁই করে নিয়েছে সে। জোর করে কারও হ।দয় দখল করা য়ায় না। তার জন্য নীল আকাশের মতো হৃদয়ের প্রসারতা চাই। বললো,অনুপম। অনুপম তার দলবল নিয়ে স্কুল থেকে ছাত্রদের ও ছাত্রীদের পুরী বেড়াতে নিয়ে গিয়ে ছিলো। অনুপম জনপ্রিয় ভালো গৃহশিক্ষক। একটা ঘর ভাড়া করেছিলো শহরে। অনুপমের বয়স বত্রিশ বছর। ছাত্রদের বলতো,স্যার বলবি না। ওসব ভালো লাগে না। দাদা বলবি বা নাম ধরেও ডাকতে পারিস। অন্তরের ভালো লাগা বা শ্র দ্ধা থাকলেই অনেক। যদি তোদের মধ্যে একটা হৃদয়ে জায়গা হয় আমার সেটাই যথেষ্ট। গুঁতিয়ে হরিনাম হয় না রে। সামনে ভক্তি আর পেছনে গালাগালি। পছন্দ করি না কাকা।

ছাত্রদের মধ্যে বিশু খুব ডানপিটে ছেলে। অনুপম দাদা বাথরুমে গেলেই তার আলনায় ঝোলানো জামার পকেট থেকে সিগারেট বের করে খেতো। অনুপম জানতো। কিছু বলতো না। পড়ানোর সময় বলতো,সিগারেট খেলে ক্যানসার হয়, ধর্ষণ করলে ফাঁসি হয়। তবু কিছু মানুষ এগুলো ভুলে যায়। সাবধান। শুধু পড়াশোনা নয়। মানুষ হতে হবে।

বিশু পুরী বেড়ানোর দলে ক্যাপটেন। অনুপম ছেলে মেয়েদের দেখাশোনার দায়ীত্ব বিশুর ওপর দিয়েছে। তাদের জন্য জান দিতেও পিছুপা হবে না বিশু,একথা সবাই জানে।

ট্রেনের সিট খুঁজে সবাই উঠে বসলো জগন্নাথ এক্স্প্রেস। ঠিক পরের দিন দশটার সময় পৌঁছে গেলো পুরী হোটেলে। সেখানে একটা সুন্দর ফুলের বাগানে তারা অনেক ছবি তুললো। রবি একটা ফুল তুলেছে। গোলাপ। হোটেলের মালকিন ডেকে পাঠালেন স্যারকে। বললেন,হাজার টাকা ফাইন দিতে হবে। যারা ফুলের মর্যাদা দিতে জানে না, গুণীজনের মান দিতে জানে না, তাদের শাস্তি হওয়ায় উচিত। স্যার অগতির গতি বিশুকে ডেকে পাঠালেন। বিশু এসেই ম্যাডামকে বললো,ম্যাডাম আমাদের দলে একটি ছেলে ভুল করেছে। ভুল তো মানুষের হয়। কিন্তু আপনি তার থেকে বড়ো ভুল করতে চলেছেন।

-কি রকম ভুল?

-আপনি গোলাপের চারায় পিঁপড়ের সারি দেখেছেন?

-কই না তো?

-আমি কিন্তু প্রথমেই দেখেছি, এবং সকালবেলা দোকান থেকে গ্যামাক্সিন পাউডার কিনে এনেছি। পিঁপড়ে মারার বিষ।

-দেখলে আমিও আনতাম। দিন ছিটিয়ে দিন। একবেলাতে মরে যাবে।

-হ্যাঁ,আপনার ফাইন কতো?

-না,না আর দিতে হবে না। ফুল যে ভালোবাসে। তা ব্যাথা বোঝে, আমি তাকে শ্রদ্ধা করি।

এমনি কত সমস্যা যে বিশু চুটকিতে সমাধান করে দিতো তার ইয়ত্তা নাই। নুলিয়াদের সঙ্গে সমুদ্রে স্নান করতো। সে যেনো সমুদ্রের সন্তান। কত সখ্য জলের সঙ্গে। ভাসিয়ে রাখতো তাকে মায়ের আদরে। ঝুলু,মিলু জিজ্ঞেস করতো, আমরা কেন ওর মতো হতে পারি না। ম্যাডাম বলেছিলেন,ওসব মন কোটিতে গুটি। ওসব মনের তল পেতে গেলে নিজেকে রাঙিয়ে নিতে হবে ওর হৃদয় রঙে।

তারপর আমরা ফিরে এসেছিলাম। আমরা প্রত্যেকে উপহার দিয়েছিলাম আমাদের প্রাণের বিশুকে। দুদিন পরে দেখলাম ও সব উপহার বিলিয়ে দিচ্ছে বায়েনপাড়ার বন্ধুদের।

বিশু ও আমরা তখন, বিল্বেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার বন্ধু ছিল অনেক। তার মধ্যে সর্দার ছিলো বিশু। এখন যার কথা বলবো তার নাম অলক।বাড়ি তার কোমডাঙ্গা। স্কুলে যত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো তার প্রধান দায়ীত্বে থাকত আমাদের দলের প্রধান বিশু। আর কান টানলেই মাথা আসে। হাত বাড়ালেই বন্ধুদল হাজির। বিশু মানেই আমরা সবাই। আমাদের বন্ধুরা এই পরোপকারী নির্ভিক নেতার ভক্ত।

স্কুলে ঠিক হলো এবার রবীন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠান হবে সন্ধ্যাবেলায়। নাটক,আবৃত্তি,গান সব হবে। হষ্টেলের ছেলেরা বললো,বিশুদা তোমাকে থাকতে হবেই।বিশু বন্ধুদের কথা ভেবে বললো,আমাদের বাড়ি অমেকদূর।প্রায় চার ক্রোশ দূরে।হেঁটে আমরা যাওয়া আসা করি

দিনেরবেলা বলে সম্ভব।

মাষ্টারমশাই বললেন,বিশু তুমি আর তোমার দলবল থাকবে। তোমাদের ছাড়া অনুষ্ঠান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। প্রয়োজনে রাতটা হষ্টেলে কাটাবে।

বিশু বললো,তাই হবে স্যর। অসুবিধা হবে না। তবে রাতে থাকা যাবে না।

-কেন? কি এমন রাজকাজ আছে তোমার?

-স্যর,আমার গ্রামের ডোম পাড়ার তিন বুড়ির কাছে আমি রাতে থাকি। তাদের সুবিধার জন্য রাতে আমি কোথাও থাকি না।

মাষ্টারমশাই বিশুকে চেনেন, জানেন।চোখের জল আড়াল করে বললেন,বেশ তাই হবে।

তারপর চলে এলো ২৫শে বৈশাখ। দিনের বেলা বলা হলো সকলের বাড়িতে। দুপুরে ঘুমিয়ে নিলাম সবাই।তারপর সকলকে সঙ্গে করে বিশু চললো স্কুলে।কোমডাঙ্গার অলক চলে এলো আমাদের সঙ্গে। আলপথে হেঁটে চলে এলাম কাঙরা গাবা। সেখানে একটা কাঁদর।তার পাশে একটা ঝুড়ি নামা বটগাছ।দিনের বেলাতেই জায়গাটা অন্ধকার। বিশু বললো আমি রাতে ফিরবো। তোরা হষ্টেলে থেকে যেতে পারিস। আমি বললাম,না আমরা সবাই বাড়ি ফিরবো। বিশু বললো,তাই হবে।

তারপর কাঁদর পেরিয়ে চলে এলাম হেঁটে স্কুলে। তারপর কাজ শুরু হলো। বিশু ঘোষকের ভূমিকায়।বড় সুন্দর অনুষ্ঠান পরিচালনা করে বিশু। প্রথমে লীলা উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করলো,আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে”। তার  পর সভাপতি নির্বাচন।প্রদীপ প্রজ্জ্বলন,প্রধান অতিথি বরণ হলো।সকলে কবিগুরুর গলায় মালা দিলেন। তাঁর সম্বন্ধে দু চার কথা বললেন।

আমি বললাম,সভাপতি নির্বাচন আগে করলে হত না। বিশু বললো,জানি সব জানি। তবে কি জানিস,আমার প্রিয় কবির জন্মদিনে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো করার মত তাঁকে আগে বরণ করলাম। বাংলার মাষ্টারমশাই বললেন,তুই বিশু যাই করিস আমাদের ভালো লাগে। চালিয়ে যা।তারপর নাটক হতে হতে রাত দশটা বেজে গেলো।বিশু তাড়াতাড়ি স্যারের হাতে দায়ীত্ব দিয়ে আমাদের কাছে চলে এলো। হষ্টেলে খাওয়া হলো। তারপর বেড়িয়ে পড়লাম বাড়ির উদ্দেশ্য।

আমরা দুটো হ্যারিকেন এনেছিলাম।রতন বললো,বিশু হ্যারিকেন দুটো জ্বালিয়ে নি। বিশু বললো,অনেকটা পথ। দুটো হ্যারিকেন একসাথে জ্বালাস না। একটা হলেই হবে। আমি সামনে থাকবো। আর সাপ খোপ আছে। সবাই পা ফেলবি পরিষ্কার জায়গায়।

তারপর বিশু সামনে আর আমরা পিছনে। বেশ দ্রুত হাঁটছি আমরা। খিড়কি পুকুর,বটতলার মাঠ,তেমাথার মাঠ পেরিয়ে আমরা চলে এলাম কাঙরা গাবায়। এখানে একটা কাঁদর আছে। ছোটো নদীর মত। এবার পার হতে হবে। আমরা গামছা পড়ছি এমন সময় দেখলাম অলক প্যান্ট জামা পরেই জলে নামছে। বিশু বললো,অলক তুই সাঁতার জানিস না। পাকামি করিস না।

বিশু ছুটে গিয়ে অলককে ধরতে গেলো আর সঙ্গে সঙ্গেই এক বিকট হাসি অলকের মুখে। যে অলক সাত চরে রা কাড়ে না সেই অলক ভূতুড়ে হাসি হাসতে হাসতে কাঁদরের জলের উপর দিয়ে হেঁটে পার হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো। আমি বললাম,বিশু অলক কই? বিশু বললো,এই কাঙরা গাবায় ভূত আছে। এসব তার কাসাজি। শুনে রতন ও আমি বু বু করতে লাগলাম ভয়ে। বিশু বললো,চল ওপাড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই। আমরা কাঁপতে কাঁপতে জল পার হয়ে ছুটে চলে গেলাম অনেক দূরে। বিশু বললো,হ্যারিকেন দুটো ফেলে এসেছি। চল নিয়ে আসি। আমরা বললাম,বিশু তোর পায়ে পড়ি বাড়ি চল। হ্যারিকেন চুলোয় যাক।

তারপর বিশু ও আমরা অলকের বাড়ি গেলাম। বাড়ি যেতেই ওর বাবা বাইরে এলেন। বিশু বললো,কাকু অলক ফিরেছে। কাকু বললেন,না তো।সে কোথায় গেলো। বিশু সব ঘটনা খুলে বললো।কাকু বললেন,চলো আমরা সবাই থানায় যাই। সেখানে একটা খবর দেওয়া দরকার। আমি জানি কাঙরা গাবায় তেনারা থাকেন। রাতে তোমাদের যাওয়া ঠিক হয় নাই গো।

থানায় মেজবাবু সব শুনে বললেন,কাল সকাল অবধি অপেক্ষা করুন। দেখা যাক লাশ পেলেই সব বোঝা যাবে।

বিশু বললো,ও মরে নি। হাওয়ায় উড়ে গেছে। মেজবাবু বললেন,ঠিক আছে। সব কথাই শুনে রাখলাম। দেখা যাক এটা নিশি ভূতের কাজ কি না?

থানা থেকে বেড়িয়ে আমরা সবাই অলকের বাড়িতে থাকলাম আর বিশু চলে গেলো তার নিজের কাজে।ও বললো,সকালবেলা আমি আপনার বাড়ি চলে আসবো কাকু। আপনি চিন্তা করবেন না। নিশি ভূত কাউকে প্রাণে মারে না।

এই বলে সে চলে গেলো ডোম পাড়ার বুড়িমার কাছে।

কাকু বললেন,বিশু ঠিক বলেছে। আমার অলক ঠিক ফিরে আসবে।

তখন কোনো মোবাইল ছিলো না। ল্যান্ড ফোন দু একটা বাড়িতে ছিলো। বিশু সকলের বাড়ি গিয়ে বলেছিলো,ওরা সবাই অলকের বাড়িতে আছে।কাল দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ করেছেন কাকু।বিকেলে সবাই চলে আসবে।

আমরা সবাই রাত জেগে গল্প করে কাটিয়ে দিলাম। অলকের বাবা লিকার চা করে খাওয়ালেন। ধীরে ধীরে পূব আকাশে সূর্য উঠলো।সব ভয় সরে গিয়ে আলো ফুটে উঠলো।

সবাই আমরা উৎকন্ঠা নিয়ে বসে আছি। কখন আসবে বিশু। ঠিক সকাল দশটায় পুলিশের গাড়ি চলে এলো গ্রামে। আমরা সবাই অবাক হয়ে দেখলাম পুলিশের গাড়ি থেকে নামছে অলক। এর মধ্যে বিশুও হন্ত দন্ত হয়ে আমাদের কাছে এসে বললো,যাক কাকু, অলক এসে গেছে। মেজবাবু কাকুকে বললেন,এটাই আপনার ছেলে অলক তো?

-হ্যাঁ স্যার।

-আমাদের থানার আশেপাশে ঘুরতে দেখে ওকে নিয়ে এলাম। আমাদের স্থির বিশ্বাস ছিলো এটা অলক। ওর মুখে সব কিছু শুনলে বুঝতে পারবেন ওর সমস্যা। যাই হোক, আমরা আসি।

পুলিশের গাড়ি চলে গেলো। প্রায় দুঘন্টা হলো অলক ঘুমিয়ে আছে। দুপুর একটায় ওর ঘুম ভাঙ্গলো।বিশু জিজ্ঞাসা করলো,তোর কি হয়েছিলো বল তো অলক?

অলক বলতে শুরু করলো তার অলৌকিক কাহিনী।

সে বললো,আমরা সবাই যখন কাঙরা গাবায় কাঁদর পার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি তখনই আমাকে খনা গলায় নিশি ভূতটা বললো,কি রে তোর বাড়ি গিয়ে ডাকলাম। সাড়া পেলুম না। তাই গন্ধ পেয়ে এখানে এলাম। চল আমার সঙ্গে তোকে হাওড়া ব্রীজ দেখিয়ে আনি। আমি বললাম,এই রাতে বন্ধুদের ছেড়ে আমি হাওড়া যাবো না। নিশিটা বললো,যা বলবো শুনবি।তা না হলে উঁচু থেকে ফেলে দেবো।আমি আর ভয়ে কথা বলিনি। নিশি আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেলো হাওড়া ব্রীজে। আমি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছিলাম। তারপর যখন নিশিটা আমাকে নিচে নামালো তখন জ্ঞান এলো। নিশি বললো,কেমন লাগছে। কি খাবি বল। তারপর আবার বললো,গঙ্গার জলে সাঁতা কাটবি নাকি?

আমি বললাম,আমি সাঁতার জানি না।

নিশি বললো,আমি থাকলে ওসব কিছু দরকার হয় না। এই বলে আমাকে ওপর থেকে গঙ্গার বুকে ঝুপ করে ফেলে দিলো।তারপর জামাটা মুঠো করে পুুতুলের মত তুলে নিয়ে ওপরে এলো।আমি ভাবলাম, আমার জীবনের শেষ দিন আজকে। নিশি মনের কথা জানতে পেরে বললো,আমরা প্রাণে মারি না কাউকে। শুধু ঘুরে বেড়াই।কাজ করি। তারপর দিনের আলো ফুটতেই নিশিটা পালিয়ে গেলো।

আমি দেখলাম একজন ভদ্রলোক আমার হাতে একশো টাকা দিলেন। তিনি বললেন,তোমাকে দেখে তো ভালো ছেলে মনল হচ্চে।তা তুমি এখানে কেন?

আমি বললাম, আপনি বিশ্বাস করবেন না আমার কথা। আমাকে নিশি ভূতে এখানে এনেছে।

ভদ্রলোক বললেন,আমি বিশ্বাস করি। তুমি সাবধানে যাবে।

আমি বললাম,আমাকে কাটোয়ার ট্রেনে চাপিয়ে দেবেন।

ভদ্রলোক বললেন,নিশ্চয়। ভোর চারটে পাঁচের ট্রেনটা পাবে চলো।

আমি তার সাথে চলে গেলাম। তিনি বললেন,মর্নিং ওয়াকে এই পথেই আমার আসা যাওয়া। তাই তোমার সঙ্গে দেখা হলো। যাও আর কোথাও নাববে না। সোজা বাড়ি চলে যাও।

অলক বললো,বুঝলাম অনেক ভালো লোক কলকাতায় আছেন। তারপর ট্রেন থামলো থানার কাছের স্টেশনে। সেখান থেকেই পুলিশ আমাকে ধরে আর এখানে নিয়ে আসে।

অলক আবার বললো,আমি আরও একটু ঘুমোবো। কাকু বললেন,ভাত খেয়ে নে। অলক বললো,পরে খাবো।

অলক খেলো না বলে বিশু ও আমরা না খেয়ে চলে এলাম। কাকু আর জোর করেন নি।

ছোটো থেকে বড়ো  হলো।সত্যি কি বড় হলো।

বন্ধুর বলতো ওর বয়স বেড়েছে,মনটা কিন্তু শিশুর মতো রয়ে গেছে। ছোটোবেলায় কেউটে সাপ ধরা,গঙ্গা সাঁতার কেটে পেরোনো,গ্রামে গিয়ে ভূত ধরা সব মনে পরে বন্ধুদের। বাউড়ি বৌকে নিজের খাবার দিয়ে দিতো বিশু। সেই বিশু আজ নিজে একমুঠো খাওয়ার জন্য ছাত্র পড়ায়।বিয়ে করেছে সে।একটা কন্যা সন্তান হয়েছে।তারা গ্রামের বাড়িতে বড়দার কাছে থাকে।বড়দাকে মাসে পাঁচশো টাকা দিয়ে আসে।বিশু বাসা ভাড়া করে থাকে শহরে।একটা বোতল আর বিছানা তার সম্পত্তি।খাওয়াটা বেড়ার সস্তার হোটেলে সেরে নেয়। একটা ট্রেনের যাত্রীর মত তার জীবন।তবু তার মনে আনন্দের অভাব ছিলো না। আনন্দের ফেরিওয়ালা সে।কারও কোনো অসুবিধা হলেই তার ডাক পড়তো আগে।এবার বিশু চললো গঙ্গার ধারে নীলুদার আশ্রমে। নীলুদা বললেন,ওই তো সামান্য রোজগার। নিজেই সব খেয়ে নিলে পরিবারকে খাওয়াবি কি?

বিশু বললো,দাদা,তোমার ঘাড়ে বোঝা হয়ে যাবো আমি।তুমি সাধক মানুষ।তোমার অসুবিধা হবে না তো? নীলুদা বললেন,আমি ওসব বুঝি না।যদি আমি খেতে পাই। তোরও একমুঠো হবে।যা ওপরের ঘরে যা। রাত হোলো।বিশুর ঘুম আসে না,গঙ্গার ধারে ওপাড়ে মরা মানুষ পুড়ছে।শবদেহের পোড়া গন্ধ ভেসে আসছে।হঠাৎ বিশু শুনতে পেলো,কিঁ রেঁ,ভয় পাঁচ্ছিস? বিশু তাড়াতাড়ি নীচে নেমে এলো।নীলুদা বললেন,কি রে ঘুম আসছে না? এই নে খা। তারপর গিয়ে শুয়ে পড়।মোরোব্বা খেয়ে ঠাকুরকে প্রণাম জানিয়ে বিশু শুয়ে পড়লো।ঘুম ভাঙ্গলো একদম সকালে। সকালে হরিনাম শুনলো।মন্দিরের সিঁড়িতে জল দিয়ে ধুয়ে ফুল রাখলো। তারপর চলে গেলো ছাত্র পড়াতে। সেখানে চা বিস্কুট খেলো। পরপর বারোটা অবধি ছাত্র পড়াতো। যেসব ছাত্ররা স্কুলে যেতো না,তারা ফোন করে ডেকে নিতো বিশু মাষ্টারকে। ছাত্রদের সঙ্গ তার ভালো লাগতো।তবে দু একটি বাড়িতে ছাত্রের অভিভাবক বসে থাকতেন। পড়ানো পরখ করতেন। তারওপরই মাষ্টারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করতো।একবার এক বড়লোকের বাড়িতে মালকিনের ধমকে সে অপমানিত হয়ে পড়ানো ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলো।কারণ,ছাত্র প্রথম স্থান অধিকার করতে পারে নি।বিশু বলেছিলো,এবার পারেনি,আসছে বার পারবে নিশ্চয়।মহিলা বলেছিলেন,সরকারি চাকরি পাবে না,সেকেন্ড হলে। ফার্ষ্ট হতে হবে। আমি অন্য মাষ্টার দেখবো।বিশু ছেড়ে দিয়েছিলো পড়ানোটা।তারপর এলো সুখবর।নীলুদা বললেন,তুই মায়ের সেবা করে যা। মা তোকে দেখবেন।সত্যি,মা দেখেছিলেন।জীবনের কঠিন সময়ে মা সত্যিই একটা পার্শ্বশিক্ষকের চাকরী পাইয়ে দিয়েছিলেন। বিশুর ভাই খবর পাঠালো,দাদা গ্রামের স্কুলে দু হাজার টাকায় পার্শ্ব শিক্ষক নেবে। তুমি আ্যপ্লাই করো।বিশু পেয়ে গিয়েছিলো চাকরীটা।টিউশানির থেকে ভালো।মাইনে কম হলেও নিশ্চয়তা আছে।বিশু বন্ধুদের বললো।বন্ধুরা বললো,তুই সকলকে সাহায্য করিস। তোর কোনোদিন অভাব হবে না। মানুষের আশীর্বাদ তোর সঙ্গে আছে। তারপর নীলুদার আশীর্বাদে বিশুর নিজস্ব বাড়ি হোলো।আর বাসা বাড়ি নয়।নিজের বাড়িতে নিয়ে এলো মেয়ে আর বৌকে।  চারদিকে বাঁশের বেড়া। কাছেই একটা গরীব পাড়া আর একটা পুকুর।সাপের রাজত্ব।সেখানে ঘর বাঁধলো বিশু। একবার রাতে বিরাট এক গোখরো ঢুকে পড়লো বিশুর ঘরে।ফণা তুলে ফোঁস ফোঁস করছে সাপটা।মশারির ভেতরে বৌ আর ঘুমন্ত কন্যা। বিশু এক হাতে লাঠি নিয়ে ফণা চেপে ধরলো সাপটার। আর অন্য হাতে সাপের লেজ ধরে ঝুলিয়ে নিয়ে এলো বাইরে।

তারপর বনের ভিতর ছেড়ে দিলো সাপটা। রাত হলেই তার উঠোন দিয়ে চলাচল করতো নানারকম সাপ।ডোমনা চিতি,শাঁখামুটি,চন্দ্রবোড়া,গোখরো কিছুই বাদ ছিলো না। সকলে বলতো মাঝমাঠে বাড়ি করলে ওইরকমই হয়। বিশু কি করে বোঝাবে,সে প্রকৃতির সন্তান। এই বন,জঙ্গল,সাপ তার বড় প্রিয়। সে সবাইকে নিয়ে আনন্দে থাকতে চায় না। কিন্তু মানুষ, সবাইতো আর সমান হয় না। প্রতিবেশিদের একজন তাকে শিক্ষা দিতে চায়,গাড়ি,বাড়ি আর নারী, ভেবেচিন্তে নিতে হয়। বড় নিষ্ঠুর কিছু মানুষ। গাড়ি,বাড়ি জড় পদার্থের সঙ্গে মায়ের তুলনা করে।বিড়বিড় করে সে। মনে ভাবে,আমি বিশু, আমার সামনে যা তা কথা বলে পার পেয়ে যায় এখন মানুষ।কিন্তু জানে না,এই বিশু ওদের শায়েস্তা করতে পারে এক মিনিটে।কিন্তু সময় বড় বিচারক।সে আজ বিশুকে কঠিন লড়াইয়ে নামিয়ে দিয়েছে। জীবনে টিকে থাকার লড়াই। এই যুদ্ধে ক্রোধের জায়গা নেই। ক্রোধকে জয় করার লড়াইয়ে জিততে হবে। তবেই হবে তার জয়।

সে এখন তার বাড়িতে অনেক ফুল গাছ লাগায়।আর অনেক ফুলের মাঝে সে সহজ হয়ে যায়।

ভাটফুল,ঢোল কলমি,পাহাড়ি কলমি র ফুলের ঘ্রাণে, প্রাণে ভারতবর্ষের নির্মল সুন্দর গন্ধ ভেসে ওঠে।সুবাসে মন মাতোয়ারা। বসন্তের রঙ বাহারি ফুলের গানে হৃদয় দুলে ওঠে বিশুর।

ফল গাছের মাঝে বসে সে ভাবে পুরোনো দিনের কথা। সে জানে, change is the only constant in the world.

বিশু ভাবছে পুরোনো দিনের কথা, শীতকালে বন্ধুরা গোল হয়ে বসতাম।মাঝখানে জ্বলতো আগুন। পাতা চোতা কুড়িয়ে দিতাম আগুনে। আগুন নিভতো না। সেই আগুনে সেঁকে নিতাম হাত পা। আবার বাড়িতে গিয়ে মায়ের রান্নাঘরে মাটির তৈরি উনুনে সেঁকে নিতাম শীতল হাত,পা। মা সরজুগুলি,পিঠে বানাতেন। উনুনের ধারে বসে নলেন গুড়ের সঙ্গে আয়েস করে খেতাম। পায়েস খেতাম শেষ পাতে। রকমারি খাবারের সুগন্ধে মৌ মৌ করতো মায়ের হেঁসেল ঘর। পালো, বলে একরকমের খাবার মা বানাতেন যত্ন করে। সকালে উঠেই পালো খেয়ে ভুরিভোজ সারতাম। তারপর পিঠে রোদ লাগিয়ে  সরব পড়া। বোঝার থেকে চিৎকার হতো বেশি। আনন্দ পেতাম সরব পড়ার প্রতিযোগিতায়। পাশের বাড়ির বন্ধুদের সরব পাঠের আওয়াজ পেলেই,ততোধিক জোরে শুরু করতাম পাঠ। স্কুলে গিয়ে তার আলোচনা হতো ক্লাসে। আরও জোরে পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রতিযোগিতা চলতো মাসের পর মাস। কোনো দুঃখ,কষ্ট আমাদের মনে রেখাপাত করতে পারতো না। জীবনের আনন্দ ছড়ানো থাকতো ধুলো জোড়া  পথে। এই ধুলো,মাটির সুগন্ধ আমাদের ভারতবর্ষের প্রাণ।

বিশু ভাবে,জন্মালাম মানুষ হয়ে অথচ মানুষের কিছু করতে পারলাম না,এই শোকে বিশু মনে মনে কাঁদে।

বিশুর তার বন্ধু অলকেশকে ভোলে নি ।সে বিশুর খুব প্রিয় ছিলো। অলকেশ শান্ত ভদ্র ছেলে।লেখাপড়ায় খুব ভালো।পরোপকারী।ভালো চাকরী করে। তার ভাই নিখিলেশ আরও ভালো চাকরী করে।বাবা পেনশন ভোগী।অলকেশের কাছেই বাবা,মা থাকেন।তারও এক কন্যা। আর আছে তার স্ত্রী।সেও স্কুল শিক্ষিকা।এই অবধি সব ভালো।হঠাৎ মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়লো।ধনেপ্রাণে মারার রোগ।পৃথিবীটা অলকেশের কাছে বড় শূণ্য হয়ে ঘুরতে লাগলো।জীবন অর্থহীন মনে হোলো।মাসে দুলক্ষ টাকা খরচ। তাহলে কিছুদিন মাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে। এখন কোন দিকে যাবে অলকেশ।সব আয় এক করেও তো মাসে দুলক্ষ হবে না। অলকেশের মা বললেন, আমাকে বাড়ি নিয়ে চ।আমার কিছুই হয় নি।মনের জোরের কাছে ক্যান্সার হেরে গেলো…

আজ দশ বছর পরেও অলকেশের মা জীবিত।

বিশুর মুখে সত্য ঘটনা শুনতাম গল্প শোনার আগ্রহে। একবার বিশু তার মামার বাড়ি নিয়ে গেলো আমাদের।বিলের ধারে বনভোজনের জন্য বসেছি।এমন সময়ে,মুর্শিদাবাদের বিলে সত্তরজন লোক নিয়ে বাসটি জলে পরলো সেদিন ঠিক সেই সময়ে বিলের পাড়ে এসেছিলো প্রকৃতির সন্তান বিশু।তার মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে,বন্ধুদের নিয়ে।

বাসটা জলে পরা মাত্র পাড়ে বাঁধা নৌকো খুলে মাঝিকে পাঠালো মাঝ বিলে। আর নিজে ডুব সাঁতারে প্রায় তিরিশ ফুট নিচে নেমে তুলে আনলো প্রাণ। আবার ডুব দিলো। এইভাবে প্রায় দশজনের প্রাণ বাঁচালো বিশু।নৌকায় তুলে, নিয়ে এলো বিলের পাড়ে। তাদের মধ্যে একজন মারা গেলো। আর বাকি নয়জনকে পাঠিয়ে দিলো হাসপাতালে।

জনতা রেগে আগুন ধরিয়ে দিলো আর একটি বাসে।

বিশু বললো,এসো আমরা সবাই প্রাণ বাঁচাই। আগুন ধরিয়ে কোনো সুরাহা হবে না। তার কথায় কাজ হলো। সবাই একত্রে বাঁচালো আরও প্রাণ। আর বাকি মানুষগুলো মরে ভাসতে থকলো চোখের সামনে,মরা মাছের মতো। বিশুর চোখ থেকে কয়েকফোঁটা জল পরলো শান্ত বিলের জলে। জলের ভাষা পড়তে জানে বিশু। সে শুনতে পেলো,একটা পাগল বলছে, আমার তো অপরাধ নেই। শান্ত বুকে আছাড় মেরে মানুষ মারার দল টাকার লোভে আইন মানে না।রাস্তায় চলার নিয়ম জানে না।  তবু তোমাকে আমি শ্রদ্ধা জানাই বিশু।তুমি প্রকৃতির  সন্তান। এই পাগলটা বিশুকে খুব ভালোবাসতো।সে তাকে বলতো,তুই আমার ভগবান বিশু…

বিশু বলতো, ভগবান নই, আমি মানুষ।মানুষের জন্য তাই আমার হৃদয় কাঁদে।

বিশুর বয়স বাড়ছে আমাদের বয়সের তালে তালে। কিন্তু তার মনের বয়স বাড়ে নি আমাদের মতো। কোনো বাচ্চাকে রাস্তায় দেখলে কোলে তুলে আদর করা, কুকুর ছানা দেখলে কোলে নেওয়া এখনও তার প্রিয় সখ। তার স্পর্শে সেজন ধন্য হয়ে যেতো।

বিশু এখন দু একটা গান লেখে। আবার নিজের কন্ঠে গায়। তার গাওয়া গানে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে।

Change is the only constant in the world. আমরা চার বন্ধু।  রমেন, জীবন, বিশু আর আমি।  যেখানেই যেতাম একসাথে থাকতাম। বিশু ছিলো আমাদের দলের অলিখিত নেতা।  নেতা তো এমনি এমনি হয় না।  তার কাজ,দল চালানোর কৌশল তাকে নেতা বানিয়েছিলো।  একদিন...

এই বিভাগের অন্যান্য লেখাসমূহ

উত্তরাধিকার

উত্তরাধিকার

কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটা পঞ্চান্নতে ডাইনিং রুমের উত্তরের দেয়ালে কাঠের ফ্রেমে বাঁধাই করা ফুলদানিতে বর্ণিল…..